নকল প্রসাধনী কারখানার মালিক আ’লীগ নেতা!

ক্রাইমবার্তা ডেস্করিপোর্ট:ক্ষমতাসীন দলের নাম ভাঙিয়ে নানা অপকর্ম করে চলেছেন পুরান ঢাকার চকবাজার থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম। তার নেতৃত্বে নামিদামি কোম্পানির মোড়কে দেশেই তৈরি হচ্ছে নকল সব প্রসাধনী

চকবাজারের সোয়ারীঘাট, লালবাগের ঘোড়া শহীদ মাজারের পাশে রয়েছে ক্ষমতাসীন দলের এ নেতার একাধিক কারখানা। যেখান থেকে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর নকল প্রসাধনী দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছে যায় তার নিয়ন্ত্রিত মার্কেটিং নেটওয়ার্কের মাধ্যমে। যার বেশিরভাগ নকল ও নিন্মমানের। এ সুবাদে সরকারি দলের প্রভাব খাটিয়ে তিনি বছরে কোটি কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। দীর্ঘ অনুসন্ধান চালিয়ে এ বিষয়ে চাঞ্চল্যকর নানা তথ্য পাওয়া গেছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে গুরুতর এ অভিযোগের প্রমাণও মিলেছে। তবে প্রশাসন নির্বিকার। সব জানলেও কোনো ব্যবস্থা নেয় না। দলের স্থানীয় নেতাকর্মীদের অনেকে তার প্রতি ক্ষুব্ধ। তারা দলের ভাবমূর্তি রক্ষার স্বার্থে এসব অভিযোগের তদন্ত ও বিচার দাবি করেন।

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, সিরাজুল ইসলাম স্থানীয় একজন প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতার নাম ব্যবহার করে জনস্বার্থ পরিপন্থী এসব কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি প্রকাশ্যে বলে থাকেন, যতদিন আমার বড় ভাই সঙ্গে আছে, ততদিন কেউ আমাকে কিছু করতে পারবে না। কেননা বড় ভাইয়ের সব খরচ তো আমাকেই চালাতে হয়। তার বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের স্থানীয় কয়েকজন নেতাকর্মী যুগান্তরকে বলেন, তিনি আসলে কখনও আওয়ামী লীগের ছিলেন না। দুই নম্বর পথে কাঁচা টাকা রোজগার করে রাতারাতি দলের এক প্রভাবশালী নেতার হাত ধরে আজ এখানে চলে এসেছেন। কিন্তু আসলে তিনি সুবিধাবাদী। আর যদ্দূর জানি, তার এসব অপকর্মের কথা বড় ভাই জানেন না। জানলে তাকে শেল্টার দিতেন না। তারা আরও জানান, সিরাজুল ইসলাম বর্তমানে এতটাই প্রভাবশালী যে, কেউ তার বিরুদ্ধে টুঁ শব্দটি করার সাহস পান না। তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতি পদ পাওয়ার পর থেকে ধরাকে সরা জ্ঞান করতে শুরু করেছেন। তার নেতৃত্বে চকবাজার এলাকায় গড়ে উঠেছে সন্ত্রাসী বাহিনী। বিভিন্ন স্থানে চাঁদা ও দখলবাজির নানা অভিযোগ রয়েছে এ বাহিনীর বিরুদ্ধে।

অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকার চকবাজার থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম  বলেন, ‘আমি প্রসাধনসামগ্রীর পুরনো কৌটা ও বোতল সংগ্রহ করে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের প্রসাধনসামগ্রী বানিয়ে থাকি। বাজারজাত করি। এটা অনেকেই করে।

তবে এটি অন্যায় কিনা, তা তিনি জানেন না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এ ব্যবসায় দলীয় পদ বা দলের প্রভাব খাটানোর কোনো সুযোগ নেই।

জানা যায়, চকবাজার সোয়ারীঘাট এলাকায় পুরনো জীর্ণ দ্বিতল একটি ভবনে সিরাজুল ইসলামের নকল প্রসাধনী তৈরির কারখানার সন্ধান মেলে। সম্প্রতি ভবনটির নিচতলায় দেখা যায়, প্রসাধনসামগ্রীর পুরনো কৌটা ও বোতলের স্তূপ। দোতলায় গিয়ে দেখা গেল, ৮-৯ জন শ্রমিক কাজ করছেন। তাদের কেউ বিভিন্ন কেমিক্যাল দিয়ে পারফিউম, কেউ আবার হাতের সাহায্যে পাউডার কৌটায় মোড়কীকরণ করছেন। এছাড়া খাজা দেওয়ান লেনে একটি পুরনো বাড়িতে তার এ ধরনের আরও একটি কারখানার সন্ধান পাওয়া গেছে। তবে সেখানে সাংবাদিক পরিচয়ে প্রবেশের কোনো সুযোগ নেই। সাধারণ কেউ চাইলেই ঢুকতে পারেন না। প্রতিবেদক বিশেষ কৌশলে সেখানে যেতে সক্ষম হন।

এ আওয়ামী লীগ নেতা বিদেশি নামিদামি ব্র্যান্ডের বিভিন্ন প্রসাধনী খালি বোতল ও কৌটা সংগ্রহ করার জন্য দেশের বিভিন্ন স্থানে লোক নিয়োগ দিয়েছেন। তারা এসব সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠিয়ে থাকে। আর সেগুলো ব্যবহার করে তিনি নকল প্রসাধনী তৈরি করে বাজারে বিক্রি করেন। এভাবে রাতারাতি আলাদীনের চেরাগ পেয়ে গেছেন।

এদিকে আওয়ামী লীগ নেতা সিরাজুল ইসলামের জুতা তৈরির ৩টি কারখানাও আছে। কারখানাগুলোর অবস্থান ইসলামবাগ, কামরাঙ্গীরচর ও চকবাজার এলাকায়। সেখানেও বেআইনি কর্মকাণ্ডের শেষ নেই। এখানে জুতা তৈরির জন্য তিনি বিদেশ থেকে স্টাবিলাইজার, এপক্সি, ওবি, পিউ ও সোলিউশন নামে পাঁচ ধরনের দাহ্য কেমিক্যাল আমদানি করে থাকেন। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় তিনি পরিমাণে বেশি আনেন। আবার কখনও কখনও স্থানীয় বড় আমদানিকারকদের কাছ থেকে এসব কাঁচামাল কিনে থাকেন। তবে এখানেও তার সরকারি দলের ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে থাকেন। একবার কারও কাছ থেকে এসব কাঁচামাল কিনতে পারলে কেল্লাফতে। তাকে আর টাকা দিতে চান না। কেউ টাকা চাইতে গেলে বলা হয়, তিনি দলীয় কাজে খুব ব্যস্ত ইত্যাদি।

সূত্র জানায়, এখানেই শেষ নয়, জুতা তৈরির জন্য আমদানি করা কেমিক্যালের মধ্যে এমন কিছু কেমিক্যাল আছে, যেগুলো বোমা তৈরির জন্যও কাজে লাগে। অথচ সরকারি দলের নেতা হওয়া সত্ত্বেও শুধু টাকার লোভে তিনি এসব কেমিক্যাল গোপনে বাইরে অসাধু চক্রের হাতে বিক্রি করে দেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত কয়েক বছরে পুরান ঢাকায় ব্যবসার জন্য গুরুত্বপূর্ণ চকবাজার এলাকা চলছে তার হাতের ইশারায়। চকবাজার সোয়ারীঘাটের স্থানীয় বাসিন্দা ব্যবসায়ী আবুল কালাম আজাদ কাছে অভিযোগ করেন, কাকে ধরতে হবে, কাকে ছাড়তে হবে, তা নির্ধারণ করে দেন আওয়ামী লীগ নেতা সিরাজুল ইসলাম।

শুধু এ ‘ধরা-ছাড়ার’ বাণিজ্যেই প্রতিমাসে কোটি টাকা আয় করেন সিরাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, ক্ষমতাসীন দলের নাম ভাঙিয়ে প্রকাশ্যেই নকল প্রসাধনী তৈরি করে সারা দেশে ছড়িয়ে দিচ্ছেন প্রভাবশালী এ নেতা। পুলিশ প্রশাসন কখনও তার কারখানায় হানা দেয়ার সাহস দেখায় না।

এ বিষয়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগের একজন সিনিয়র নেতা বলেন, ‘সিরাজুল ইসলামের কারণে দলের ভাবমূর্তি নানাভাবে ক্ষুণœ হচ্ছে। তার বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু একজন বড় ভাই তাকে শেল্টার দেন। এ কারণে তারাও কিছু করতে পারছেন না। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে শিগগিরই বিষয়টি জানাব। না হলে এখানে আওয়ামী লীগের ভোট চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’ এ নেতার দাবি, ‘তার বিরুদ্ধে একটা শক্ত তদন্ত হওয়া দরকার। গোয়েন্দা সংস্থা এ কাজটা খুব সহজে করতে পারে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘তাকে অবিলম্বে দলের সভাপতির পদ থেকে সরাতে হবে। না হলে নির্বাচনের বছরে আমরা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হব।’ যুগান্তর

Facebook Comments
Please follow and like us: