রংপুর সিটি নির্বাচন : বিব্রত আওয়ামী লীগ

ক্রাইমবার্তা ডেস্করিপোট: রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফার কাছে আওয়ামী লীগ প্রার্থী সরফুদ্দীন আহম্মেদ ঝন্টুর ৯৮ হাজার ভোটের ব্যবধানে হেরে যাওয়া নিয়ে দলটির সদরে-অন্দরে চলছে পরাজয়ের পোস্টমর্টেম, চুলচেরা বিশ্লেষণ। আওয়ামী লীগের স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় নেতাদের সূত্রে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, বিষয়টি নিয়ে আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে বিব্রত হওয়ার পাশাপাশি এর প্রভাব বাকি ছয় সিটি ও জাতীয় নির্বাচনে পড়ার আশঙ্কায় ভুগছে।

আওয়ামী লীগের স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় একাধিক নেতা এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, সদ্য অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী ঝন্টু যে ৬২ হাজার ৪০০ ভোট পেয়েছেন, সেটি দলের ভোটব্যাংক। বাড়তি কোনো ভোট যোগ হয়নি এই নির্বাচনে। এর মধ্যে হিন্দুদের ভোট রয়েছে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার। বাকি ভোটগুলো আওয়ামী লীগের সমর্থক ও কর্মীর। তবে রংপুর সিটিতে আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক এক লাখ ২০ হাজার বলে দাবি করেছেন দলের মহানগর সাধারণ সম্পাদক তুষার কান্তি মণ্ডল।

তাহলে কেন দলের প্রার্থী ভোট অর্ধেক পেলেন- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি  জানান, প্রার্থীর সমন্বয়হীনতা ও খামখেয়ালিপনার কারণে তিনি অর্ধেক ভোট পাননি। যে ৬২ হাজার ভোট তিনি পেয়েছেন তা রংপুরে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ সব অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের, যারা সব সময় মাঠে থাকেন। কিন্তু যারা আওয়ামী লীগের সাধারণ ভোটার, তাদেরকে দলের প্রার্থী সমন্বয় করতে না পারায় তারা তাকে ভোট না দিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। যুক্তি হিসেবে তিনি বলেন, রংপুর যে আওয়ামী লীগের ঘাঁটি তার প্রমাণ ৩৩টি সাধারণ ও ১১টি সংরক্ষিত কাউন্সিলরের মধ্যে ২৪টি কাউন্সিলর পদেই আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা বিপুলভাবে জয়লাভ করেছেন। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয়, সাধারণ ভোটারদের সাথে প্রার্থীর সমন্বয়হীনতার কারণে তিনি কম ভোট পেয়েছেন।

এ দিকে জেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ (মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন) রংপুর চেম্বারের সাবেক প্রেসিডেন্ট আবুল কাশেম  বলেন, প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা না থাকায় আমাদের সরকারের আমলে ব্যাপক উন্নয়ন সত্ত্বেও সাধারণ ভোটারদের ভোট তিনি পাননি। তিনি যে ভোট পেয়েছেন তা দলের ভোটব্যাংক। আওয়ামী লীগের সব ভোট তিনি পেয়েছেন।

এ দিকে আওয়ামী ঘরানার রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা  বলেন, রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ফলাফলে প্রমাণিত হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রংপুরবাসীকে যে উন্নয়ন উপহার দিয়েছেন, রংপুরবাসী তা মনে রাখেনি। অবশ্য এ কারণে তারা সাবেক মেয়র ও পরাজিত প্রার্থী সরফুদ্দীন আহম্মেদ ঝন্টুকেই দায়ী করেছেন। তারা বলেছেন, ৯৮ হাজার ৮৯ ভোটের বিশাল ব্যবধানে পরাজয় এই সরকারের জন্য একটি বিপদসঙ্কেত। প্রার্থী সিলেকশন করার আগে আরো একবার ভালো করে মাঠের অবস্থা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন ছিল।
তারা আরো বলেন, আওয়ামী লীগ প্রার্থী হওয়ার জন্য জেলা উপদেষ্টা সাবেক মেয়র সরফুদ্দীন আহম্মেদ ঝন্টু, মহানগর সভাপতি সাফিউর রহমার সফি, সেক্রেটারি তুষার কান্তি মণ্ডল, জেলা কোষাধ্যক্ষ আবুল কাশেম, মহানগর প্রচার সম্পাদক রেজাউল ইসলাম মিলন, জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মোসাদ্দেক হোসেন বাবলু, কেন্দ্রীয় উপকমিটির সাবেক সহসম্পাদক রাশেক রহমানসহ ডজনখানেক নেতা ছাড়াও সাবেক পৌরমেয়র এ কে এম আব্দুর রউফ মানিক প্রচারণা চালিয়েছিলেন। এর বাইরে এফবিসিসিআইর সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মোস্তফা আজাদ চৌধুরীর নামও ছিল মনোনয়ন দৌড়ে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে গিয়ে একটি শক্ত লবিংয়ে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেয়া হয়েছিল ঝন্টুকে। এই মনোনয়ন সঠিক হয়নি বলে মনে করেন এসব বিশ্লেষক।

অবশ্য আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সূত্র জানায়, মনোনয়ন দেয়ার সময়ই আওয়ামী লীগ জানত এই সিটিতে তারা বিজয়ী হবে না; কিন্তু টার্গেট ছিল সম্মানজনকভাবে হেরে যাওয়া। সে কারণে সিটির ব্যাপক উন্নয়ন, প্রথমবারের নির্বাচনে এক লাখ পাঁচ হাজার ২৫৫ ভোট পেয়ে মেয়র নির্বাচিত হওয়াসহ আর্থিকভাবে ফিট প্রার্থী হিসেবেই ঝন্টুকে বেছে নিয়েছিল আওয়ামী লীগ। কিন্তু প্রথম নির্বাচনে ঝন্টুর ওই ভোট পাওয়ার নেপথ্যে ছিল সে সময়ে জাতীয় পার্টির দুই প্রার্থীর দ্বন্দ্ব এবং সিটি করপোরেশন ও বিভাগ আন্দোলনে ঝন্টুর সম্পৃক্ততা।

কিন্তু এবারের নির্বাচনে ঝন্টুর জনসমর্থন আসলে কতটুকু আছে তা যাচাই করার বিষয়টি মাথায় ছিল না আওয়ামী লীগের হাইকমান্ডের। এ ছাড়াও ক্ষমতায় থাকায় আওয়ামী লীগের টানা আট বছরের বিভিন্ন বিষয় এবং ঝন্টুর জাসদ, জাতীয় পার্টি, বিএনপি, জাতীয় পার্টি (মঞ্জু) এবং আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত হওয়ার বিষয়টিও আমলে রাখেনি আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড। সে কারণে এখানে তাদের প্রার্থী মনোনয়ন সিদ্ধান্ত ব্যর্থ হয়েছে। লজ্জাজনকভাবে হারতে হয়েছে মহাজোটের শরিক দলের প্রার্থীর কাছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের স্লোগানের কোনো প্রতিফলন হয়নি এখানে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলেছেন, মনোনয়ন দেয়ার পরপরই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে গেলেও আওয়ামী ঘরানার বুদ্ধিজীবী, গোয়েন্দা জরিপ এবং বিভিন্ন কর্নার থেকে বিষয়টি হাইকমান্ডের গোচরীভূত করা হলেও তারা কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেননি। এ কারণে পুরো প্রচারণায় কেন্দ্রীয় এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর মধ্যে কোনো সমন্বয় ছিল না প্রার্থীর সাথে। ঝন্টুর সাথে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রচারণা সেল পুরো সময়জুড়েই ছিল সমন্বয়হীন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা আরো বলছেন, প্রথম মেয়র হিসেবে ঝন্টুর উন্নয়নের ফর্দ বেশ লম্বা ও কার্যকর ছিল। কিন্তু নগরীর প্রধান প্রধান সড়ক নির্মাণ, সংস্কার ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা নির্মাণে সমন্বয়হীনতার বিষয়টি ভোটের ছয় মাস আগ থেকে এতই দৃশ্যমান হয়ে ওঠে যে, সেদিকে মেয়র দৃষ্টিই দেননি। এ বিষয়ে ঠিকাদাররা ঝন্টুকে বিভিন্নভাবে বুঝিয়ে রেখেছিলেন। সে কারণে ভোটের সময় বিষয়টি সবচেয়ে বেশি ফোকাস হয়। ফলে সাধারণ মানুষের ভোট পড়েনি নৌকায়। সরকারের নিপীড়নের শিকার সাধারণ মানুষ নৌকা ঠেকাতে লাঙ্গলে ভোট দিয়েছেন। লাঙ্গল প্রতীকের প্রার্থীর সাধারণ মানুষের সাথে যোগাযোগ এবং প্রতীক হিসেবে লাঙ্গলের প্রতি ভালোবাসাও এ ক্ষেত্রে বড় কাজ দিয়েছে।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সূত্র জানিয়েছে, বিশাল ভোটের ব্যবধানে হেরে যাওয়ার বিষয়টি যেন অন্য ছয় সিটি করপোরেশন এবং জাতীয় নির্বাচনে কোনো প্রভাব ফেলতে না পারে, সেজন্য কেন্দ্র থেকে ইতোমধ্যে এই সিটিতে বড় ব্যবধানে পরাজয়ের কারণ অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। অনুসন্ধান শেষে চুলচেরা বিশ্লেষণ করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে রংপুরে ঘাঁটি টিকিয়ে রাখতে তারা পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।নয়া দিগন্ত

Facebook Comments
Please follow and like us: