পঙ্গু সরকারি কর্মচারির নামে মামলা সাতক্ষীরায় পুলিশ পরিচয়ে ধরে নিয়ে যাওয়ার ছয় দিনেও সন্ধান মেলেনি দু’ শিবির নেতার

সাতক্ষীরা সংবাদদাতাঃঃ পুলিশ পরিচয়ে ধরে নিয়ে যাওয়ার ছয় দিনেও সন্ধান মেলেনি দু’ শিবির নেতার। মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে সাতক্ষীরার তালা উপজেলার মাগুরা ইউনিয়নের চরগ্রামের পুরাতন মসজিদের দোতলা থেকে আটককৃত সাতজনের মধ্যে পাঁচজনকে ঘটনাস্থল ও ভিন্ন সময় উল্লেখ করে বুধবার আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে পাঠানো হয়।
সন্ধান না পাওয়া দু’জন হলো, সাতক্ষীরা জেলা ছাত্র শিবিরের সাধারণ সম্পাদক ও তালা উপজেলার মকলন্দকাটি গ্রামের শেখ আব্দুল হকের ছেলে শেখ আব্দুল গফুর (২০)। সে সাতক্ষীরা সিটি কলেজের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগে অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। অপরজন হলো তালা উপজেলার জালালপুর ইউনিয়ন ছাত্র শিবিরের সাধারণ সম্পাদক ও শ্রীমন্দকাটি গ্রামের আব্দুর রাজ্জাক মোড়লের ছেলে শিমুল মোড়ল (১৮)। সে সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের ইসলামিক ইতিহাসের প্রথম বর্ষের ছাত্র।
রবিবার সকালে সাতক্ষীরা প্রেসক্লাব এলাকায় এসে তালার মকলন্দকাটি গ্রামের আব্দুল হক শেখ ও তার স্ত্রী শাহনাজ খাতুন জানান, তাদের ছেলে আব্দুল গফুর মাগুরায় যাওয়ার কথা বলে মঙ্গলবার ভোরে বাড়ি থেকে মোটর সাইকেলে বের হয়ে যায়। বিকেলে লোকমুখে খবর পান যে চরগ্রাম পুরাতন মসজিদের দোতলা থেকে তাদের ছেলেসহ সাতজনকে পুলিশ পরিচয়ে চোঁখ বেঁধে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। পরদিন বুধবার তিনে খবর পান যে আটককৃত সাতজনের মধ্যে তার ছেলে গফুর ও শ্রীমন্দকাটি গ্রামের শিমুল মোড়ল ব্যতীত পাঁচজনকে আদালতের মাধ্যমে জেলে পাঠানো হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইন, অস্ত্র আইন ও পুলিশের উপর হামলার ঘটনা উল্লেখ করে ঘটনাস্থল কপোতাক্ষ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের একটি কক্ষ দেখিয়ে তালা থানার উপপরিদর্শক নাজমুল হুদা বাদি হয়ে তিনটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় ১২ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা ৫০/৬০জনকে আসামী করা হয়েছে।
একইসাথে আসা শ্রীমন্দকাটি গ্রামের আক্তারবানু জানান, মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে তার দু’ ছেলে সুজন মোড়ল ও শিমুল মোড়লসহ সাতজনকে চোখ বেঁধে চরগ্রাম পুরাতন মসজিদ থেকে পুলিশ পরিচয়ে ধরে নিয়ে যায়। পরদিন সুজনসহ পাঁচজনকে পুলিশের উপর হামলাসহ বিভিন্ন অভিযোগে আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে পাঠানো হয়। অথচ ছেলে ছাত্র শিবির নেতা শিমুল মোড়লকে রবিবার সন্ধা পর্যন্ত সন্ধান পাননি।
শাহানাজ খাতুন ও আক্তারবানু জানান, বুধবার থেকে রবিবার সন্ধা পর্যন্ত তারা ও তাদের স্বজনরা তালা থানা, ডিবি অফিস ও জেলখানাসহ সম্ভাব্য সকল জায়গায় গফুর ও শিমুলের সন্ধান চালিয়েছেন। পুলিশ তাদেরকে আটকের কথা অস্বীকার করলেও জেল হাজতে থাকা সুজন মোড়ল ও অন্যান্য আসামীরা তালা থানা পুলিশ একইসাথে গফুর ও শিমুলসহ সাতজনকে আটক করে বলে দাবি করেছে। তারা গফুর ও শিমুল কোন অপরাধ করলে তাদেরকে প্রচলিত আইনের মাধ্যমে আদালতে হাজির করে বিচার দাবি করেন।
সরেজমিনে শনিবার দুপুরে চরগ্রাম পুরাতন মসজিদ এলাকায় গেলে শাহাদাৎ হোসেন, জাহাঙ্গীর আলম, আঞ্জুয়ারা খাতুন, শাহানারা খাতুন, ইউপি সদস্য শেখ মোজাম্মেল হোসেন, মসজিদের ইমামসহ অনেকেই জানান, মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে উপপরিদর্শক নাজমুলসহ পুলিশের চারজন দু’টি মোটর সাইকেলে প্রথমে নতুন মসজিদ ও পরে পুরাতন মসজিদ এলাকায় আসেন। পরে পুলিশের একটি জিপ এসে মসজিদের দোতলা থেকে কম বয়সী সাতজন যুবককে চোখ মুখ বেঁধে নিয়ে যায়। এ সময় তাদেরকে এলাকা থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়। কপোতাক্ষ মাধ্যমিক বিদ্যালয় এর পার্শ্ববর্তী কামরুল ইসলাম, সবুজ, তুহিনসহ কয়েকজন জানান, বুধবার সকালে এই বিদ্যালয়ের ভিতর থেকে কোন ব্যক্তিকে পুলিশ আটক করেছে এমনটি তারা শোনেননি।
শনিবার বিকেলে সাতক্ষীরা জেলা কারাগারের ফটকে এক সাক্ষাৎকারে সুজন মোড়ল জানান, তার ভাই শিমুল ও গফুরসহ সাতজনকে মঙ্গলবার সকালে পুলিশ চরগ্রাম মসজিদ থেকে আটক করে।
ধুলন্ডা গ্রামের রিয়াজউদ্দিনের ছেলে আশরাফ আলী (৩৫) জানান, ২০১১ সালে তিনি মাগুরা ইউনিয়ন পরিষদের ই- সেবা কেন্দ্রে কর্মরত। এ ছাড়া মাগুরা বাজারে তার এহসান ট্রেডার্স নামে একটি কীটনাশক বিক্রির দোকান রয়েছে। ২০১২ সালে মোটর সাইকেল দুর্ঘটনায় কয়েকটি দাঁত, ডান পা ও ডান হাতের কর্মশক্তি অনেকটাই হারিয়ে ফেলে ক্রেচে ভর করে চলেন। দুর্ঘটনার পর থেকে তিনি স্বাভাবিকভাবে বসে পায়খানা ও প্রস্বাব করতে পারেন না। অথচ উপপরিদর্শক নাজমুল হুদার দায়েরকৃত তিনটি মামলায় পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে তিনি দৌড়ে পালিয়ে গেছেন উল্লেখ করে তার নাম এজাহারভুক্ত করা হয়েছে। বিষয়টি তিনি সাংবাদিকদের মাধ্যমে পুলিশ সুপার মহোদয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চান।
জানতে চাইলে তালা থানার উপপরিদর্শক নাজমুল হুদা জানান, কপোতাক্ষ মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে যে পাঁচজনকে আটক করা হয়েছিল তাদের নামসহ ১২জনের নামে মামলা দেওয়া হয়েছে। আশরাফ আলী পঙ্গু কিনা তা তার জানা নেই। গফুর ও শিমুল সম্পর্কে তিনি কিছু জানেন না।
তালা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাসান হাফিজুর

রহমান জানান, গফুর ও শিমুল সম্পর্কে তার কিছু জানা নেই।
প্রসঙ্গত, ২০১৪ সালের ২৮ এপ্রিল সাতক্ষীরা শহরের কামাননগর গোরস্থানের পাশে একটি ছাত্রাবাসে অবস্থান করাকালিন পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে ছাত্রশিবির নেতা কালিগঞ্জের কৃষ্ণনগর ইউনিয়নের রঘুনাথপুর গ্রামের আমিরুল ইসলাম শাহাদাৎ বরণ করেন। এ সময় ডান পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন ছাত্রশিবিরের সাতক্ষীরা জেলা শাখার বর্তমান সাধারণ সম্পাদক তালা উপজেলার মকলন্দকাটি গ্রামের শেখ আব্দুল হকের ছেলে শেখ আব্দুল গফুর । ছয় দিনেও দুই শিবির নেতার সন্ধান না মেলায় তাদের পরিবার চরম হতাশা বিরাজ করছে। পরিবার দুটির দাবী হয় পুলিশ সন্ধান দিক নতুবা দিনের বেলা প্রকাশ্যে কারা তাদেরকে পুলিশ পরিচয়ে অপহরণ করল তাদের সন্ধান দিক। ০৭জানুয়ারী,২০১৮রবিবার::ক্রাইমর্বাতা.কম/প্রতিনিধি/আসাবি

 

 

 

Facebook Comments
Please follow and like us: