জাপা নেতা মোরশেদ মুরাদ ও স্ত্রীর বিরুদ্ধে ১০টি ব্যাংকের প্রায় ৬শ’ কোটি টাকার ঋণ গ্রহণের অভিযোগ:মামলা

ক্রাইমবার্তা ডেস্করিপোর্ট:    কামাল : চট্টগ্রামে ঋণের ভারে দেউলিয়া হওয়ার পথে জাতীয় পার্টির নেতা মোরশেদ মুরাদ ইব্রাহিম ও তার পত্নী এমপি মাহজাবীন পরিবার। মোরশেদ মুরাদ ইব্রাহিম জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান ও তার স্ত্রী মাহজাবিন মোরশেদ চট্টগ্রাম মহানগর জাতীয় পার্টির সভাপতি ও জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনের মহিলা এমপি। মোরশেদ মুরাদ ইব্রাহিম চট্টগ্রামের বনেদী পরিবার খ্যাত সেকান্দর হোসেন মিয়ার সন্তান। এমপি মাহজাবিন তার স্ত্রী। তারা ক্রিস্টাল গ্রুপের কর্ণধার। ক্রিস্টাল গ্রুপ মূলত মাছ ধরা ও সমুদ্রগামী জাহাজ ক্রয়-বিক্রয় ও উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। শুরুর দিকে প্রতিষ্ঠানটি লাভজনক হলেও গত সাড়ে ৫ বছর ধরে ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে জড়িত তার পরিবারের প্রায় ৭ সদস্য। প্রত্যেকের নামে রয়েছে আরো বেশ কয়েকটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান। সবমিলে এসব প্রতিষ্ঠানের নামে রয়েছে দেশের প্রায় ১০টি ব্যাংকের প্রায় ৬শ’ কোটি টাকার ঋণ। প্রভাব খাটিয়ে চলা চট্টগ্রামের এই পরিবারের কোন সদস্যের দিকে চোখ তুলে তাকাতেও কেউ সাহস পেতো না । নানা জালিয়াতির সাথে জড়িত এই পরিবারের ব্যবসায়িক সদস্যদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ দফায় দফায় গণমাধ্যমে এলেও সরকারের কোন সংস্থাই তাদের অপকর্মের বিরুদ্ধে টু-শব্দও করেনি। তাদের প্রভাব দিন দিনই বেড়েছে। অবশেষে জাপা নেতা মোরশেদ মুরাদ ইব্রাহিম ও তার স্ত্রী জাপা এমপি মাহজাবিন মোরশেদের বিরুদ্ধে মামলা হলো। মামলার সংখ্যাও দুটি
জানা গেছে, বেসিক ব্যাংক থেকে নেয়া ২৭৫ কোটি টাকা ঋণের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে জাতীয় পার্টির নেতা মোরশেদ মুরাদ ইব্রাহিম ও তার স্ত্রী সংসদ সদস্য মাহজাবীন মোরশেদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন- দুদক। গতকাল বুধবার দুপুরে চট্টগ্রামের ডবলমুরিং থানায় দন্ডবিধির ৪০৯ ও ৪২০ ধারা এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় দুটি মামলা করেন দুদক কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক সিরাজুল হক। দুই মামলায় আরও তিনজনকে আসামী করা হয়েছে, যাদের মধ্যে দুইজন বেসিক ব্যাংকের কর্মকর্তা।
মোরশেদ মুরাদ ইব্রাহিম বর্তমানে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান। তিনি চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক সভাপতি। আর তার স্ত্রী মাহজাবীন মোরশেদ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনের (মহিলা আসন-৪৫) সদস্য।
গত ২০১৬ সালের ৯ জুন জাপার ১৮ ভাইস চেয়ারম্যান ও ৯ উপদেষ্টার নাম ঘোষণা করেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। ১৮ জন ভাইস চেয়ারম্যানের মধ্যে রয়েছেন, মোরশেদ মুরাদ ইব্রাহিম।
দুদকের সহকারী পরিচালক সিরাজুল হক গতকাল রাতে গণমাধ্যমকে বলেন, ১৩৪ কোটি এবং ১৪১ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুটি মামলা করা হয়েছে। “২০১০ সাল থেকে পরবর্তী সময়ে এলসি খোলার নামে এবং ঋণ হিসেবে এসব অর্থ নেওয়া হলেও তা পরিশোধ করা হয়নি। এছাড়া ঋণের বিপরীতে তাদের কোনো মর্টগেজও নেই।”
১৩৪ কোটি টাকা আত্মসাতের মামলাটিতে আসামী মোরশেদ মুরাদ ইব্রাহিম। তিনি ক্রিস্টাল স্টিল অ্যান্ড শিপ ব্রেকিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে বেসিক ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখা থেকে ওই ঋণের আবেদন করেছিলেন। এই মামলার অন্য আসামী বেসিক ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে এম সাজেদুর রহমান।
১৪১ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে করা অপর মামলায় আসামী করা হয়েছে সাংসদ মাহজাবীন মোরশেদকে। তিনি আইজি নেভিগেশন নামের একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে ওই ঋণ আবেদন করেছিলেন। এই মামলার অন্য দুই আসামী হলেন আইজি নেভিগেশন লিমিটেড পরিচালক সৈয়দ মোজাফফর হোসেন এবং বেসিক ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী ফখরুল ইসলাম।
ডবলমুরিং থানার ওসি একেএম মহিউদ্দিন সেলিম জানিয়েছেন ,পারিবারিক প্রতিষ্ঠান আইজি নেভিগেশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে মাহজাবিন মোরশেদ (৪৮) এবং ক্রিস্টাল স্টিল এন্ড শিপ ব্রেকিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে মোরশেদ মুরাদ ইব্রাহিম (৫১) মামলায় আসামী হয়েছে।  দুজন স্ব স্ব প্রতিষ্ঠানের পক্ষে বেসিক ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছিলেন।
সূত্রমতে, ২০১০ সালে আইজি নেভিগেশন লিমিটেডের নামে বেসিক ব্যাংক থেকে ১৪১ কোটি ১ লাখ ৪৬ হাজার ১০৫ টাকা ১১ পয়সা ঋণের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে এজাহারে।  এতে মাহজাবিন মোরশেদের সঙ্গে আসামী হয়েছেন একই প্রতিষ্ঠানের পরিচালক সৈয়দ মোজাফফর আহমেদ (৫৯) এবং বেসিক ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী ফখরুল ইসলাম (৬০)।
অপর মামলায় ২০০৯ সালে ক্রিস্টাল স্টিল এন্ড শিপ ব্রেকিংয়ের নামে বেসিক ব্যাংক থেকে ১৩৪ কোটি ৯৩ লাখ ৬৬ হাজার ১৮৫ টাকা ১৭ পয়সা ঋণের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে।  এই মামলায় মোরশেদ মুরাদ ইব্রাহিমের সঙ্গে আসামী হয়েছেন বেসিক ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক একেএম সাজেদুর রহমান (৬৩)।
ডবলমুরিং থানার ওসি একেএম মহিউদ্দিন সেলিম বলেন, পৃথকভাবে ঋণ নিয়ে আত্মসাতের অভিযোগে মামলা দুটি দায়ের হয়েছে।
ওই পরিবারের যত কীর্তি……
মোরশেদ মুরাদের অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানকে ১৭ কোটি টাকা ঋণ
২০১৬ সালের ৭ মার্চ গণমাধ্যমে খবর আসে মোরশেদ মুরাদ ইব্রাহিমের অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে ১৭ কোটি টাকা ঋণ দিয়ে বিপাকে পড়ে যায় চতুর্থ প্রজন্মের বেসরকারী ব্যাংক-ফারমার্স ব্যাংক। সুদাসলে তা ওই সময় পর্যন্ত ১৮ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায় বলে খবরে প্রকাশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুসন্ধানে এই তথ্য পাওয়ার কথা জানায় গণমাধ্যমটি।
ওই সময়ের খবরে বলা হয় , চিটাগাং চেম্বারের সাবেক সভাপতি  মোরশেদ মুরাদ ইব্রাহিম ফারমার্স ব্যাংকের অন্যতম পরিচালক। মাঝিরঘাটের ক্রিস্টাল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তিনি। তার প্রতিষ্ঠান ক্রিস্টাল ফিশারিজের ট্রলার গরিবে নেওয়াজ কেনার জন্য রয়েল ডিপ সি ফিশিং নামের একটি প্রতিষ্ঠানের নামে গত বছরের (২০১৫) প্রথম দিকে ওই ঋণ দেয় ফারমার্স ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়, রয়েল ডিপ সি ফিশিং নামের ওই প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা খাতুনগঞ্জ কমার্স ব্যাংক ভবনের দ্বিতীয় তলায় গিয়ে এর কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। তবে ফারমার্স ব্যাংকের পরিচালক মোরশেদ মুরাদ ইব্রাহিমের আরেকটি প্রতিষ্ঠান আইজি নেভিগেশন অফিসের ঠিকানাতেই ছিল রয়েল ডিপ সি ফিশিংয়ের অফিস। সন্দেহ আরো ঘনীভূত হয় ক্রিস্টাল ফিশারিজের ওয়েবসাইটের তথ্যে।
লেনদেনের এক বছর কেটে গেলেও প্রতিষ্ঠানটি গরীবে নেওয়াজকে তার ট্রলার হিসেবেই দাবি করছে। কিন্তু খতিয়ে দেখতে মাঝিরঘাটে ক্রিস্টাল ফিশারিজের অফিসে গিয়ে জানা গেল, ট্রলারটি এখনো তাদের তত্ত্বাবধানেই আছে। অর্থাৎ মালিকানা বদল হয়নি। আর ঋণের নামে ব্যাংকের টাকা হাতিয়ে নিতে কাগজে কলমে বদল করা হয় মালিকানা।
এই ঋণের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিপোর্টে বলা হয়েছে, ব্যাংকের পরিচালককে বিশেষ সুবিধা দিতে শাখার কল রিপোর্টের আগেই প্রধান কার্যালয় থেকে ঋণ অনুমোদন দেয়া হয়। কীভাবে এত বড় অনিয়ম হলো, তা জানতে ফারমার্স ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে যোগাযোগ করলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কেউ কথা বলতে রাজি হননি।
তবে ফারমার্স ব্যাংকের খাতুনগঞ্জ শাখার  দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ঋণ অনুমোদনের আগে এ প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ না দেয়ার পক্ষে ছিল ফারমার্স ব্যাংকের খাতুনগঞ্জ শাখা। শাখাটি তখন স্পষ্ট উল্লেখ করেছিল যে ফিশিং ট্রলারটি কেনার জন্য ঋণ দেয়া হলে তাতে লাভের কোনো সম্ভাবনা নেই, লোকসানের আশঙ্কাই বেশি। কিন্তু তাদের মতামতকে কোনো পাত্তা দেয়া হয়নি।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, রয়েল ডিপ সি ফিশিংয়ের নামে ঋণ ছাড় দেয়া হয়েছে। ঋণ গ্রহণের সময় এর ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছে খাতুনগঞ্জে। কিন্তু বাস্তবে খাতুনগঞ্জে প্রতিষ্ঠানটি নেই।
ফারমার্স ব্যাংক কোন নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে তাদের অন্যতম পরিচালক মোরশেদ মুরাদ ইব্রাহিমের অস্তিত্ববিহীন প্রতিষ্ঠানের নামে ১৭ কোটি টাকা ঋণ দিয়ে চরম বিপাকে পড়েছিল। এখন ওই ব্যাংকের পরিচালক পদে মোরশেদ মুরাদ নেই ।
চট্টগ্রামে ঋণের ভারে দেউলিয়া মুরাদ-এমপি মাহজাবীন পরিবার!
চট্টগ্রামের একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালের মাঝামাঝিতে মোরশেদ মুরাদ ইব্রাহিম ও মাহজাবিন মোরশেদের পরিচালনাধীন ক্রিস্টাল গ্রুপের নামের ৬শ’ কোটি ঋণের মধ্যে বেসিক ব্যাংকের প্রায় ১৩০ কোটি টাকা পরিশোধ না করায় বেসিক ব্যাংক, চট্টগ্রাম আগ্রাবাদ শাখা কর্তৃক তাদের মালিকানাধীন ক্রিস্টাল স্টিল অ্যান্ড শিপব্রেকিং প্রতিষ্ঠানটির নামে নিলাম বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। এ নিয়ে নানা মহলে সৃষ্টি হয় মিশ্র প্রতিক্রিয়া। এর আগে ফারমার্স ব্যাংক, খাতুনগঞ্জ শাখা ১৮ কোটি টাকা ও গুলশান শাখা থেকে ২৯ কোটি ঋণ নিয়ে বেনামি প্রতিষ্ঠানে জাহাজ ক্রয় করে একটি কিস্তিও না দিয়ে টাকা আত্মসাতের ঘটনায় চট্টগ্রামে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। জাতীয় পার্টির নেতা ও স্ত্রী এমপির প্রভাব খাটিয়ে দেশের বিভিন্ন ব্যাংক থেকে শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে এ পরিবারের বিরুদ্ধে। পরিবারের বিভিন্ন সদস্যদের নামে বেনামি প্রতিষ্ঠান খুলে এসব ঋণ হাতিয়ে নেয়া হয়। বিচ্ছিন্নভাবে পরিবারের সদস্যদের নামের ঋণ নেয়ায় অর্থমন্ত্রীর ঋণখেলাপীর তালিকায় তাদের নাম আসেনি বলে ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা জানান।
বেসিক ব্যাংক সূত্রে আরো জানা যায়, ২০১৬ সালের মধ্যে বেসিক ব্যাংকের মূল ক্যাপিটালের ১০ ভাগ রয়েছে দেশের ২৪টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে। এ ২৪টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মুরশেদ মুরাদ ইব্রাহিমের রয়েছে ৩টি প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ। মুরশেদ মুরাদ ইব্রাহিমের মালিকানাধীন তিনটি প্রতিষ্ঠান আইজি নেভিগেশনের নামে রয়েছে ১১৯ কোটি টাকা, বে-নেভিগেশনের নামে রয়েছে ১১৬ কোটি টাকা, ক্রিস্টাল স্টিল অ্যান্ড শিপব্রেকিং-এর নামে রয়েছে ১১৬ কোটি টাকা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মুরশেদ মুরাদ ইব্রাহিম ও তার স্ত্রী এমপি মাহজাবিন মোরশেদ, তার ভাই রাশেদ মুরাদ ইব্রাহিম ও তার স্ত্রী কানিজ ফাতেমা রাশেদ, আরেক ভাই ফয়সাল মুরাদ ও তার স্ত্রী হুমায়ারা কারিম ক্রিস্টাল গ্রুপের সঙ্গে জড়িত। তাদের সবার নামে রয়েছে ক্রিস্টাল গ্রুপের বেশ কয়েকটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান। তাদের প্রত্যেকের নামে রয়েছে দেশের বেশ কয়েকটি ব্যাংকে ৬শ’ কোটি টাকার বেশি ঋণ। ঋণখেলাপি হওয়ায় বেশ কয়েকটি ব্যাংক মামলা করেছে তাদের বিরুদ্ধে। অনিয়মিতভাবে কিস্তি চলছে কয়েকটি ঋণের। আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে ফারমার্সের ব্যাংকের ১৮ কোটি টাকা ও ২৯ কোটি টাকা।
জানা যায়, তার পরিবারের সদস্যদের নামে যেসব ব্যাংকে ঋণ নেয়া হয়েছে এগুলো হলো বেসিক ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখা, সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখা, ন্যাশনাল ক্রেডিট অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখা, মেঘনা ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখা, ফারমার্স ব্যাংক খাতুনগঞ্জ শাখা, বেসিক ব্যাংক ঢাকা মতিঝিল দিলকুশা শাখা, রূপালী ব্যাংক মতিঝিল শাখা, বিডি ফাইন্যান্স ঢাকা প্রিমিয়ার ব্যাংক বনানী শাখা, আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক চট্টগ্রাম ও আর নিজাম রোড শাখা, ট্রাস্ট ব্যাংক দিলকুশা শাখা, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স লিমিটেড মতিঝিল শাখা, ন্যাশন্যাল ফাইন্যান্স লিমিটেড ঢাকা, সিটি ব্যাংক গুলশান শাখা।
এসব ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা জানান, মুরশেদ মুরাদ ইব্রাহিমের নামে কয়েকটি ব্যাংকে ৪শ’ কোটি টাকার মতো ব্যাংক ঋণ রয়েছে। তার স্ত্রীর নামে রয়েছে প্রায় দেড়শ’ কোটি টাকা। আর বাকিগুলো রয়েছে তার পরিবারের অন্য সদস্যদের নামে।
খোঁজ নিয়ে আরো জানা যায়, এমপি মাহজাবিনের নামে ১২৩ কোটি ৩২ লাখ টাকা দুই ব্যাংক থেকে নেয়া ঋণখেলাপি হয়েছে। বেসিক ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখা ও ট্রাস্ট ব্যাংক দিলকুশা শাখা থেকে ক্রিস্টাল গ্রুপের দুই অঙ্গ প্রতিষ্ঠান আইজি নেভিগেশন লিমিটেড ও প্রোটেকটিভ ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডের নামে নেয়া হয়। মাহজাবিন মোরশেদ আইজি নেভিগেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রোটেকটিভ ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্বে আছেন।
বেসিক ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখার মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ জানান, আইজি নেভিগেশনের নামে বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ রয়েছে। দিন দিন তাদের দেনা বেড়েই চলছে। দেনার কারণে আমরা ওই প্রতিষ্ঠানের জাহাজ ক্রিস্টাল গোল্ড আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আটক করেছি। তিনি জানান, বেসিক ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখা থেকে নেভিগেশন জাহাজ এমভি ক্রিস্টালের নামের ওভার ড্রাফট ও মেয়াদি ঋণ নেয়া হয়েছে। ঋণের মেয়াদ যথাক্রমে ২০১৫ সালের ২৭ মে এবং ২০২১ সালের ১৮ ডিসেম্বর। ইতিমধ্যে মেয়াদি ঋণটি একবার পুনঃতফসিল করা হয়েছে। কিন্তু এরপর কিস্তি দেয়া অনিয়মিত হয়ে পড়ে। তিনি আরো জানান, ২০১৬ সালের ২৯ আগস্ট পর্যন্ত ওভার ড্রাফট ঋণের স্থিতি ছিল ১৮ কোটি ৯৭ লাখ টাকা, মেয়াদি ঋণের স্থিতি ছিল ১০১ কোটি ৮ লাখ টাকা। এ ঋণ দুটির কিস্তি নিয়মিত করার জন্য বারবার তাগাদা দেয়া হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি বলে তিনি জানান। এ ক্ষেত্রে খেলাপি ঋণের পরিমাণ হালনাগাদ করা হলে টাকার অঙ্ক আরো বাড়বে বলে তিনি জানান।
অন্যদিকে প্রোটেকটিভ ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডের নামে ট্রাস্ট ব্যাংকের দিলকুশা শাখা থেকে ঋণ নেয়া হয়। ২০১৭ সালের ২৩ মার্চ পর্যন্ত ওই ঋণের স্থিতি দাঁড়ায় তিন কোটি ২৬ লাখ ৮৯ হাজার ২৫৬ টাকা। ঋণের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০১৬ সালের ৩১ জুলাই। ওই ঋণটিও এখন খেলাপি হয়ে গেছে। ট্রাস্ট ব্যাংক থেকে ২০১৭ সালের ২৩ মার্চ একটি চিঠিও দেয়া হয়েছে।
এ ছাড়া স্ত্রীর ১২৩ কোটি টাকা ঋণ ছাড়াও মুরশেদ মুরাদ ইব্রাহিমের মালিকানাধীন ক্রিস্টাল স্টিল অ্যান্ড শিপব্রেকিং একটি প্রতিষ্ঠানের নামে বেসিক ব্যাংক থেকে ১৩০ কোটি ৯৩ লাখ ৩৭ হাজার টাকা ঋণ নেয়া হয়। এ ঋণ পরিশোধ না করায় বেসিক ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখা ২০১৭ সালের শুরুর দিকে  এ প্রতিষ্ঠানটিকে নিলামে তুলে। এ নিয়ে চট্টগ্রামের ব্যবসায়িক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে মুরশেদ মুরাদ ইব্রাহিম ও তার স্ত্রী এমপি মাহজাবিনের নামে ছাড়াও তার আত্মীয়-পরিজনের নামে আরো শত কোটি টাকার ব্যাংক ঋণ রয়েছে। এসব ঋণ পরিশোধ না হওয়ায় তার আত্মীয়-পরিজনের মধ্যে কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলাও করে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
বন্ধকি সম্পত্তি  নিলামে…..
পাওনা আদায়ে চট্টগ্রামের ব্যবসাী মোরশেদ মুরাদ ইব্রাহিমের মালিকানাধীন মেসার্স ক্রিস্টাল স্টিল অ্যান্ড শিপব্রেকিং লিমিটেডের বন্ধকি সম্পত্তি ২০১৭ সালের জুলাইতে আবারও নিলামে তোলে রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখা। প্রথম দফায় কোনো আগ্রহী ক্রেতা না-পাওয়ায় দ্বিতীয় দফায় নিলামে তোলা হয় ওই গ্রুপের বন্ধকী সম্পত্তি । মোরশেদ মুরাদ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে গড়েছেন ক্রিস্টাল গ্রুপ। এ গ্রুপের ক্রিস্টাল নেভিগেশন লিমিটেড, বে নেভেগেশন লিমিটেড, আইজি নেভেগেশন লিমিটেড, ক্রিস্টাল ল্যান্ডমার্ক লিমিটেড, ইব্রাহিম ফার্মস লিমিটেড, ম্যাক ট্রেড লিমিটেড, ক্রিস্টাল ফিশারিজ লিমিটেড, এমআরএফ ফিশারিজ, ফারুক অ্যান্ড সন্স লিমিটেড ইত্যাদি নামে একাধিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান আছে।
জাহাজের ক্রুদের বেতন না দেয়ায় জাহাজ আটক
২০১৬ সালের জুন মাসে জাহাজের ক্রুদের বেতন না দেওয়ায় ক্রিস্টাল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোরশেদ মুরাদ ইব্রাহিমের মালিকানাধীন ‘ক্রিস্টাল গোল্ড’ নামে একটি জাহাজ আটক করে উচ্চ আদালত। এছাড়া ‘ক্রিস্টাল সাফায়ার’ নামে অপর জাহাজের ক্রুদেরও বেতন দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ ওঠে তখন।
৬৪ লাখ ৩৯ হাজার ৬১৭ টাকা বকেয়া বেতন না পেয়ে ‘ক্রিস্টাল গোল্ড’ জাহাজের মাস্টার ক্যাপ্টেন মো. জাকির হোসেন ও প্রধান প্রকৌশলী ইকবাল হোসেন উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৬ সালের ৫ নবেম্বর জাহাজের বিরুদ্ধে আটক ওয়ারেন্ট জারি করেন উচ্চ আদালত। জাহাজটি যাতে চট্টগ্রাম বন্দর ত্যাগ করতে না পারে সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে মার্কেন্টাইল মেরিন ডিপার্টমেন্টের (এমএমডি) প্রিন্সিপাল অফিসারকে আদেশের কপি পাঠান আদালত।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ক্রিস্টাল গোন্ড ও ক্রিস্টাল সাফায়ার জাহাজের ক্রুরা বেতন না পেয়ে ২০১৭ সালের জুনে নৌ-পরিবহন অধিদফতর, সরকারি শিপিং অফিস, নাবিক ও প্রবাসী শ্রমিক কল্যাণ পরিদফতরে লিখিত অভিযোগ দেয়। অভিযোগের প্রেক্ষিতে মেনিং এজেন্ট ও জাহাজের মালিকপক্ষকে বেশ কয়েকবার ওই সময় তাগাদাপত্র দেয় নৌ-পরিবহন অধিদফতর ও সরকারি শিপিং অফিস। কিন্তু এতেও কোনো কাজ হয়নি। পরে জাহাজের মাস্টার ক্যাপ্টেন জাকির হোসেন ও প্রধান প্রকৌশলী ইকবাল হোসেন উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করে।
২০১৬ সালের  ১৫ অক্টোবর ক্রিস্টাল গোল্ড জাহাজের মাস্টার ও প্রধান প্রকৌশলীসহ ৫ নাবিক তাদের বকেয়া বেতন পরিশোধের বিষয়ে নৌ-পরিবহন অধিদফতরে অভিযোগ দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে নৌ-পরিবহন অধিদফতরের উপ-পরিচালক (শিপিং) মো. শাহজাহান হাওলাদার ক্রিস্টাল আইজি নেভিগেশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা বরাবর নাবিকদের বকেয়া বেতন পরিশোধের তাগিদপত্র দেন।
ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ‘নাবিক রিক্রুটিং এজেন্ট (লাইসেন্স) বিধিমালা-২০০৫ এর বিধি (৭) (খ) মোতাবেক নাবিকদের যথাসময়ে বেতন পরিশোধ জাহাজ মালিক ও কোম্পানির দায়িত্ব।’ তাই জাহাজের নাবিকদের বেতন পরিশোধ করে দ্রুত নৌ-পরিবহন অধিদফতরকে অবহিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
আরেক জালিয়াতি : স্বাক্ষর জাল করে পর্ষদে অন্তর্ভুক্তি 
২০১৫ সালের জুলাই মাসের শেষ দিকে একটি গণমাধ্যমে খবর বেরোয় যে , স্বাক্ষর জাল করে পরিচালক হিসেবে ব্যবসায়ীর নাম অন্তর্ভুক্তির অভিযোগ উঠে প্রটেক্টিভ ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের বিরুদ্ধে। অভিযোগ করেছেন চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী মোরশেদ আরিফ চৌধুরী। এ ব্যাপারে প্রটেক্টিভ ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের চিঠিও দিয়েছিলেন তিনি। তবে বিষয়টির সমাধান না হওয়ায় বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) হস্তক্ষেপ চেয়ে ওই বছরের ২৯ জুন মঙ্গলবার সংস্থাটিতে লিখিত অভিযোগ করেছেন মোরশেদ আরিফ চৌধুরী।
চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, ‘প্রটেক্টিভ ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড কোম্পানি গঠনের আগে আমি ২৫ মার্চ ২০১৩ তারিখে এর  অংশীদারি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলাম। নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও সরকারের অনুমোদন পেলে কোম্পানির উদ্যোক্তা হিসেবে থাকতে আগ্রহী ১৭ জন ওই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। কিন্তু রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মস, ঢাকায় দাখিলকৃত মেমোরেন্ডাম অ্যান্ড আর্টিকেলস অব অ্যাসোসিয়েশনে শেয়ারহোল্ডার তালিকায় নিজের নাম দেখে আমি অবাক হয়েছি। ১০ টাকা মূল্যের ৯ লাখ শেয়ারের মালিক হিসেবে ওই তালিকার ১০ নম্বরে আমার নাম রয়েছে। কারণ উল্লেখিত শেয়ারের গ্রাহক হিসেবে ৯০ লাখ টাকা আমি কোম্পানিকে দিইনি এবং ওই দলিলে স্বাক্ষরও করিনি। আমার নামে কোনো শেয়ার সার্টিফিকেটও ইস্যু করা হয়নি। কাজেই এটা মোটামুটি স্পষ্ট যে, আমার নাম-ঠিকানা ইত্যাদি আমার সম্মতি ছাড়াই ব্যবহার হয়েছে এবং আমার স্বাক্ষরও জাল করা হয়েছে। আমার নামের পাশে কে স্বাক্ষর করেছে, তাও আমি জানি না।’
এ ব্যাপারে অভিযোগকারী মোরশেদ আরিফ চৌধুরী বলেন, ‘প্রটেক্টিভ ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের অন্যতম উদ্যোক্তা মোরশেদ মুরাদ ইব্রাহিমের প্রস্তাব পেয়ে আমি অংশীদারি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলাম। কিন্তু কোম্পানি গঠনের পর তিনি আমাকে এতে অন্তর্ভুক্ত করতে আপত্তি জানান। পরে জানতে পারি, আমার নাম পরিচালক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ব্যবসায়ী হিসেবে প্রাপ্য কর রেয়াত ও অন্যান্য সুবিধা নেয়ার জন্য আমার অজ্ঞাতে এভাবে নাম ব্যবহার করা হয়েছে।’
প্রটেক্টিভ ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির আরেক উদ্যোক্তা পরিচালক সাবেক মন্ত্রী মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম। ২০১৩ সালে তার হাতেই প্রটেক্টিভ ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের লাইসেন্স তুলে দেয় আইডিআরএ। যদিও বর্তমানে কোম্পানির ওয়েবসাইটে পরিচালক হিসেবে তার নাম নেই।
সার্বিক বিষয়ে কথা বলতে গতকাল বুধবার বিকেল ৪ টা ৩৫ মিনিটে মোরশেদ মুরাদের মুঠোফোনে যোগযোগের চেষ্টা করা হলে সেটি বন্ধ পাওয়া যাওয়ায় তার কোন বক্তব্য পাওয়া যায় নি। এরপর রাত সোয়া ৮ টার দিকে তার স্ত্রী জাপার এমপি মাহজাবিন মোরশেদের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও বন্ধ থাকায় তারও কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

১১জানুয়ারী,২০১৮বৃহস্পতিবার::ক্রাইমর্বাতা.কম/সংগ্রাম/আসাবি

Facebook Comments
Please follow and like us: