দুটো পা নেই। তবুও জীবন যুদ্ধে হার না মানা একজন সৈনিক বায়জিদ

ক্রাইমবার্তা রিপোর্ট::সমাজের অন্তরালে কিছু ঘটনা রয়েই যায়। প্রকাশ্যে আসার আগেই অন্ধকারে ডুবে যায়। সাতক্ষীরা শহরের কামাল নগরের বাসিন্দা মোঃ বাইজিদ হাসান। সমাজের সবকিছুর ঊর্ধ্বে গিয়ে নিজের ভার অন্য কারও উপর না চাপিয়ে নিজেই স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন।

বাইজিদ অন্য দশ জনের মত স্বাভাবিক মানুষ হয়ে জন্মগ্রহণ করেনি। সে শারীরিক প্রতিবন্ধী। দুটো পা নেই। তবুও জীবন যুদ্ধে হার না মানা একজন সৈনিক। বায়জিদ ১৯৯৭ সালে এসএসসি, ২০০০ সালে এইচএসসি, ২০০৩ সালে বিএ ও ২০০৬ সালে এমএ পাশে করেন। শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়েও শিক্ষার প্রতি একটা গভীর অনুরাগ ছিল তার। বর্তমানে ভ্রাম্যমাণ কম্পিউটার সার্ভিসের মাধ্যমে উপার্জিত টাকা দিয়ে সে তার পরিবারকে ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা করেন।

ভ্যান গাড়ীতে কম্পিউটার ডেস্কটপ সেট করে প্রতিদিন সাতক্ষীরা নিউ মার্কেটের সামনে এসে মানুষকে বিভিন্ন ধরনের অনলাইন সার্ভিস সেবা দেন। প্রথমদিকে তার এই ভিন্নধর্মী কাজের কারণে অনেকের রোষাণলে পড়তে হয়।

মানুষের দুই পা ভাল থাকার পরও মানুষ কর্মমুখী হচ্ছে না। বরং নানা ধরনের অপরাধমূলক কাজের সাথে জড়িয়ে যাচ্ছে। আর দুই পা নেই এমন একজন মানুষ সমাজের বোঝা না হয়ে, নিজেই স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টায় আছেন দীর্ঘদিন যাবত। তার এমন ভিন্নধর্মী কাজ সকলের নজর কাড়ে। প্রতিদিন নিজেই বাড়ি থেকে ভ্রাম্যমাণ অনলাইন কম্পিউটার সার্ভিসের ভ্যান চালিয়ে শহরে আসেন।

দেশের অন্যতম বিনোদন প্রোগ্রাম ‘ইত্যাদি’, সেখানেও যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল বায়জিদ’র। গত ২৯ ডিসেম্বর ইত্যাদিতে তাকে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেওয়া হয়। কর্তৃপক্ষ কোন সহযোগিতা করেনি, তবে অপেক্ষায় রেখেছেন তাকে। হয়তো ভাল কোন সংবাদ দিবেন।

দুর্বার এ মানুষটির সাথে একান্ত আলাপকালে বলেন, চলার পথে অনেক প্রতিকূল পরিবেশ থাকবে সবগুলোকে হয়তো আমাদের নিজেদের মত করে আয়ত্ব করতে পারব না। কিন্তু কিছুটা চেষ্টা করতে আমাদের দোষ কি? আমি বাগেরহাট জেলার শরণখোলা উপজেলাধীন সোনাতলা গ্রামের দরিদ্র পরিবারে জন্ম গ্রহণ (দুই পা ঘাড়ে নিয়ে) করি। সেখানে আমার জন্মের পর আমার মায়ের কান্নাকাটি দেখে আমারই এক খালু আমার মাকে বলেছিল অত কান্নাকাটি করে লাভ কি? দরকার হলে সার্কাস পার্টির কাছে বিক্রয় করে দিস। আমার প্রতিবন্ধীতা সম্পর্কে এ ধরনের মন্তব্য মানে আমাকে নিয়ে আমার পরিবার আর কি আশা করতে পারে? সেটা প্রশ্নাতিত কিন্তু আমার মা সেটা করেনি। বরং কোলে করে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত স্কুলে নিয়ে যাওয়া আসা করত। পরিশেষে একটা কথা বলতে পারি যে, তুমি তোমার সফলতার হিসাব করো না কারণ তুমি সেখানে সফল হয়েছো। আবার অসফলতার হিসাব করো না কারণ অসফলতা তোমাকে গিলে খাবে। বরং তুমি সেই হিসাবটাই করো যে কতবার তুমি বৈরী পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছো।

এ ভ্রাম্যমাণ অনলাইন সেবা নিয়ে তার ভবিষ্যত ভাবনা সুদূরপ্রসারী। বাস গাড়িতে একটা সময় সে অনেকগুলো পিসি সেটাপ দিয়ে ভ্রাম্যমাণ কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টার গড়ে তুলবে। পাশাপাশি সমাজের অবহেলিত শিক্ষাবঞ্চিত শিশুদের আধুনিক কম্পিউটার প্রশিক্ষণ দিবে। পৃথিবীতে বেঁচে থাকার জন্য সবার সমান অধিকার, বায়জিদ এটার বাস্তবায়ন করতে চান।

Facebook Comments
Please follow and like us: