সাতক্ষীরায় রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত পরিবারের মধ্যে ঈদের আনন্দ নেই

আবু সাইদ বিশ্বাস: সাতক্ষীরা রাজনৈতিক সহিংসতা ও কথিত বন্দুক যুদ্ধে নিহত পরিবারের মাঝে ঈদের আনন্দ নেই।  ঈদ আসলে নিহতদের কথা মনে পড়ায় নিহত পরিবারে আনন্দের পরিবর্তে বেদনার সুর বাজতে থাকে। অনেক পরিবারের প্রধানকে হত্যা করা হয়েছে। ফলে সেই সব পরিবার নেই কোন ঈদের আনন্দ। এর পরও যে যার মত করে নিহত পরিবার গুলোকে সাহায্য দিয়ে চলেছে। বিএনপিও জামায়াতের পক্ষ থেকে নিহত পরিবার গুলোকে ঈদ সামগ্রী পৌছিয়ে দেয়া হয়েছে। আবার অনেক নিহত পরিবারকে এখনো কেই খোঁজ খরব নেইনি। আ’লীগের পক্ষ থেকেও শহীদ পরিবার গুলোকে সাহায্য করা হচ্ছে। তবে অনেক নিহত পরিবারের অভিযোগ আ’লীগ করার কারণে তাদের পরিবারের সদস্যদেরকে হত্যা করা হয়ে ছিল কিন্তু এখন কোন নেতা তাদের খোঁজ নেই না।

গত ৫ বছরে  জেলায় আ’লীগ,বিএনপিও জামায়াত-শিবিরের অর্ধশতাধীক নেতাকর্মী নিহত হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রতিপক্ষের হামলায়। কথিত বন্ধুক যুদ্ধে নিহত হয়েছে বেশ কয়েক জন। ২০১৩ সালের পর জেলাতে আ’লীগের ২০,জামায়াতের ৩১,বিএনপির ৬ সহ কথিত বন্দুক যুদ্ধে ১০ জনের মত রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ নিহত হয়েছে বলে দলীয় সূত্র জানায়। এসব ঘটনায় প্রায় ৩শ মত মামলা হয়েছে। এসব মামলায় প্রায় ১০ হাজারের মত রাজনৈতিক ব্যক্তিকে আসামী করা হয়েছে। এছাড়া গত ৫ বছরে রাজনৈতিক সহিংসতা মামলার আসামী করা হয়েছে প্রায় ৫০ হাজারের মত বিরোদী দরীয় নেতাকর্মীকে। এসব মামলায় শুধু জামায়াতের ৪০ হাজার আসামী বলে দলটির এক শীর্ষ নেতা জানান। এখনো মামলার আসামী থাকায় বহু নেতাকর্মী বাড়ি ছাড়া।

ঈদ আসলে যেন এসব পরিবারের বেদনা বেড়ে যায়। ঈদ আসলেই নিহতদের কথা বেশি স্মরণ করে নিহতদের পরিবার। সবাই যখন ঈদের কেনাকাটায় ব্যস্ত নিহতদের পরিবার গুলো তখন রক্তমাখা জামা-কাপড় বুকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। সবাই যখন ঈদের নামায আদায় করে তখন তারা কবরের পাশে গিয়ে বিলাপ করে আর দুহাত তুলে আল্লাহর কাছে দোয়া করে। নিহতদের পরিবার গুলো এ ক্রান্তিকাল থেকে মুক্তি চায়।

সাতক্ষীরাতে সবচেয়ে বেশি নিহত হয়েছে আ’লীগ ও জামায়াতের। দলীয় কোন্দলে মৎস্যদল নেতা আমান হত্যায় বিএনপি রাজনৈতিক মাঠ থেকে অনেকটা হাত গুটিয়ে নেই।

২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারী শহরের কদমতলা মোড়ে প্রাকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা করা হয় ছাত্রলীগ সভাপতি সিটি কলেজের প্রভাষক আব্দুল্লাহ আল মামুনকে। একটি মাসুম শিশু নিয়ে পরিবারটি এখন শোকাহত।

মাওলানা দেলাওয়ার হোসেন সাঈদীর ফাঁসির রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে বেশি নিহত হয় সাতক্ষীরায়।

১৭ ডিসেম্বর ২০১৩, মঙ্গলবার দুপুরে কালিগঞ্জ উপজেলা আ’লীগ নেতা মোসলেম উদ্দিন প্রতিপক্ষের হামলায় নিহত হয়। ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারী সাতক্ষীরার সদর উপজেলার আগরদাড়ির বাসিন্দা শিবিরকর্মী ইকবাল হোসেন (তুহিন), বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের জামায়াত কর্মী মাহমুদুল হাসান, গাজীপুর ঘোনার ছনকার জামায়াত কর্মী রবিউল ইসলাম,  পায়রাডাঙ্গার শিবিরকর্মী শাহিন আলম, খানপুরের জামায়াত কর্মী সাইফুল্লাহ, পুরাতন সাাক্ষীরার জামায়াত কর্মী আব্দুস সালাম, দেবহাটা উপজেলার কুলিয়ার শষাডাঙ্গার শিবির কর্মী আলী মোস্তফা, ৩ মার্চ সাতক্ষীরা সদর উপজেলার রইচপুরের জামায়াতকর্মী মাহবুবুর রহমান, ৪ মার্চ কলারোয়া উপজেলার কামারখালীর জামায়াত কর্মী আরিফবিল্লাগ ও তার ভাই জামায়াত কর্মী রুহুল আমীন, ৫ মার্চ একই উপজেলার ওফাফাপুর গ্রামের জামায়াত কর্মী শামসুর রহমান, ১৬ জুলাই  শ্যামনগর উপজেলার শিবির কর্মী মোস্তফা আরিফুজ্জামান, কালিগঞ্জের রঘুরামপুর গ্রামের জামায়াতকর্মী রুহুল আমীন, ২৫ অক্টোবর শ্যামনগরের জয়নগর গ্রামের জামায়াত কর্মী শফিকুল ইসলাম, ৫ নবেম্বর  পাটকেলঘাটার সরুলিয়ার জামায়াতকর্মী আব্দুস সবুর, ২৭ নবেম্বর সাতক্ষীরা সদর উপজেলার শিয়ালডাঙ্গার জামায়াত কর্মী শামছুর রহমান, ২৫ নবেম্বর আশাশুনি উপজেলার বড়দল ইউনিয়নের জামায়াত কর্মী আতিয়ার রহমান, ৩ ডিসেম্বর দেবহাটা উপজেলার শিবিরকর্মী আরিজুল ইসলাম ও গাজীরহাটের হাফেজ হোসেন আলী, ১৬ ডিসেম্বর সাতক্ষীরা সদর উপজেলার সাতানির জামায়াত কর্মী জাহাঙ্গীর মোড়ল ও একই উপজেলার শিয়ালডাঙ্গা গ্রামের জামায়াত কর্মী সাহেব বাবু, ১৩ ডিসেম্বর কলারোয়া গোপিনাথপুর গ্রামের আজিজুর রহমান আজুকে কুপিয়ে একই উপজেলার  আ’লীগ নেতা জজমিয়াকে কুপিয়ে, ৮ ডিসেম্বর জেলা সদর উপজেলার বল্লী ইউনিয়নের আমতলা গ্রামের এজাহার আলী মোড়লকে (৪৫) পিটিয়ে, ৫ ডিসেম্বর রাত ৯টায় সদর উপজেলার কুচপুকুর গ্রামের সিরাজুল ইসলামকে গুলি করে, ৪ ডিসেম্বর রাত ১২টায় কালিগঞ্জ উপজেলার ভাড়া শিমলা গ্রামে মুক্তিযোদ্ধা আলাউদ্দিন খোকনকে  কুপিয়ে, ৩ ডিসেম্বর সাতক্ষীরা-ভোমরা সড়কের মাহমুদপুর এলাকায় গিয়াসউদ্দিন সরদারকে পিটিয়ে, ২১ নবেম্বর রাতে দেবহাটা উপজেলা পারুলিয়া বাজারে আবু রায়হানকে কুপিয়ে, ২৬ নবেম্বর কলারোয়া উপজেলার মীর্জাপুরে মাহমুদুর রহমান বাবুকে পিটিয়ে, ২৬ আগস্ট রাতে সদর উপজেলার শিবপুরে রবিউল ইসলামকে হরিশপুর এলাকায় কুপিয়ে, ১৩ আগস্ট দুপুরে গড়ানবাড়িয়া এলাকায় আলমগীর হোসেনকে  পিটিয়ে, ১৫ জুলাই সকাল ৯টায় দেবহাটার সখিপুর ইউনিয়নে আব্দুল আজিজকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করা হয়। যৗথবাহিনীর গুলীতে নিহত হন সাতক্ষীরার আগরদাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আনারুলইসলাম। ২০১৩ সালের ৫ ডিসেম্বর রাত ৯টার দিকে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার আগরদাড়ি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহসভাপতি নজরুল ইসলামের বাড়িতে হামলা চালিয়ে, গুলি করে হত্যা করা হয় তার বড় ভাই আওয়ামী লীগ কর্মী সিরাজুল ইসলামকে।

২৬ নভেম্বর সকাল সাড়ে ১০টর দিকে পিটিয়ে হত্যা করা হয় কলারোয়া উপজেলার দেয়াড়া ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাহামুদুর রহমান বাবুকে (৩২)।

একই দিন বিকেলে দেয়াড়া ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক রবিউল ইসলামকে (৪০) কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

২১ নভেম্বর রাত সাড়ে ৮টার দিকে দেবহাটার জনবহুল পারুলিয়া বাসস্ট্যান্ডের সামনে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু রায়হানকে (৪২) হত্যা করা হয়।

২৬ আগস্ট রাত ১০টার দিকে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার শিবপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, উপজেলা সদরের তেঁতুলতলা গ্রামের রজব আলীর ছেলে রবিউল ইসলামকে (৫৫) বাড়ি ফেরার পথে হরিশপুর-বারোপোতার মাঝখানে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

১৩ আগস্ট দুপুরে দেবহাটা উপজেলার দক্ষিণ পারুলিয়া গ্রামের শেখ দেলোয়ার হোসেনের ছেলে ও শ্রমিকলীগের নেতা আলমগীর হোসেনকে (৪২) গরানবাড়িয়া এলাকায় পিটিয়ে ও কুপিয়ে জখম হত্যা করা হয়।

১৫ জুলাই সকাল ৯টার দিকে দেবহাটা উপজেলার সখিপুর ইউনিয়নের পাঁচপোতা গ্রামের শুকচাঁদ গাজীর ছেলে ও ৪নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আজিজকে বাড়ি থেকে ডেকে এনে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করা হয়।

২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল শহরের একটি মেসে গুলী করে শিবির সেক্রেটারী আমিনুরকে হত্যা করা হয় ।  একই বছর ২৮ জানুয়ারি  তালায়  ছাত্রদল সভাপতি আজহারুল কথিত বন্দুক যুদ্ধে নিহত হয়। ২৪ ডিসেম্বর সাতক্ষীরা-যশোর সড়কের পাশে ভ্যান নিয়ে যাত্রীর জন্য অপেক্ষা করা অবস্থায় যৌথবাহিনীর বুলেটবিদ্ধ হয়ে হাফিজুল ইসলাম নামের এক ভ্যানচালক নিহত হয়েছে।

৭ জুলাই ২০১৬  সাতক্ষীরার শ্যামনগর  উপজেলার কাশিমারি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারন সম্পাদক অলিউল্লাহ মোল্লা পুলিশের সাথে কথিত বন্দুক যুদ্ধে নিহত হয়েছেন।

সরকারের প্রতিহিংসার শিকার নিহত পরিবারের মাঝে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান’র ঈদ উপহার বিতরণ করা হয়েছে। সাতক্ষীরা তালায় নিহত ২টি পরিবার কাছে তারেক রহমানের পক্ষ থেকে ঈদসামগ্রী পৌঁছে দেন তালা উপজেলা বিএনপি’র নেতৃবৃন্দ।

শুক্রবার (৮ জুন) সকালে দোহার গ্রামে জালালপুর ইউনিয়ন সাধারন সম্পাদক নিহত এস.এম বিপ্লব কবীর’র মা হাতে এবং দুপুর ২টায় ঘোনা গ্রামে ইসলামকাটি ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি নিহত আজহারুল ইসলাম’র মা ও মেয়ের হাতে তারেক রহমানের পাঠানো ঈদ সামগ্রী তুলে দেন উপজেলা বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতৃবৃন্দ।

জামায়াতের পক্ষ থেকেও তাদের দলে নিহত পরিবার সমূহের মধ্যে ঈদ সামগ্রী তুলে দেয়া হযেছে। বেশির ভাগ শহীদ পরিবার বর্তমানে অসহায়। কয়েকজন শহীদ পরিবারের সাথে কথা বলে জানা গেছে তাদের পরিবারে ঈদ নেই। নেই আনন্দ । নেই ঈদের কেনাকাটা। শহীদ পরিবার সমূহের দাবী রাজনৈতিক ঐক্যের মাধ্যমে রাজনৈতিক সহিংসতা নিরাশন করা দরকার।

Facebook Comments
Please follow and like us: