সিঙ্গাপুরের শীর্ষ ধনীর তালিকায় বাংলাদেশী ব্যবসায়ী

ক্রাইমবার্তা রিপোট:  ফোর্বস ম্যাগাজিনের করা সিঙ্গাপুরের শীর্ষ ৫০ ধনীর তালিকায় এসেছে বাংলাদেশী ব্যবসায়ী সামিট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আজিজ খান ও তার পরিবারের নাম। অর্থ-বাণিজ্যের সাময়িকী ফোর্বস বলছে, জুলাই পর্যন্ত হিসাবে সামিট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজিজ খান ও তার পরিবারের সম্পদের পরিমাণ ৯১ কোটি ডলার। আর ওই সম্পদ নিয়ে সিঙ্গাপুরের শীর্ষ ৫০ ধনীর তালিকায় এ বছর আজিজ খানের নাম রয়েছে ৩৪ নম্বরে।

৬৩ বছর বয়সী আজিজ খান গত এক দশকের বেশি সময় ধরে সিঙ্গাপুরে স্থায়ী বাসিন্দা। বাংলাদেশে বিদ্যুৎ, বন্দর, ফাইবার অপটিকস, কমিউনিকেশনস, হসপিটালিটি, ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক, রিয়েল এস্টেট খাতে ব্যবসা রয়েছে সামিট গ্রুপের।

সামিট গ্রুপের প্রতিষ্ঠান সামিট পাওয়ার ইন্টারন্যাশনাল সম্প্রতি সিঙ্গাপুর স্টক এক্সচেঞ্জে (এসজিএক্স) তালিকাভুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এশিয়ায় বিভিন্ন দেশে বিনিয়োগের জন্য এসজিএক্স থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে চায় আজিজ খানের কোম্পানি।

গত ফেব্রুয়ারিতে এ বিষয়ে রয়টার্সকে তিনি বলেন, “বাংলাদেশের শেয়ারবাজার অনেক ছোট, আর আমাদের বিনিয়োগের জন্য আরও অনেক বেশি অর্থ প্রয়োজন। সিঙ্গাপুর একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে।ফলে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার জন্য এটি একটা ভালো জায়গা।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর একজন সদস্য অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা ফারুক খানের ভাই। ফারুক খান ২০০৯-২০১৩ মেয়াদে বাংলাদেশের বাণিজ্য এবং বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন।

দুই বছর আগে ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টস আইসিআইজের প্রকাশিত অফশোর লিকস ডেটাবেইজে আজিজ খান ও তার পরিবারের সদস্যদেরও নাম আসে। তবে সামিট চেয়ারম্যান সে সময় কোনো ধরনের অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেন বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের কাছে।

সামিট পাওয়ার ইন্টারন্যাশনালের সিঙ্গাপুর হেডকোয়র্টারে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহীর দায়িত্বে আছেন আজিজ খানের মেয়ে আয়েশা আজিজ খান। আজিজ, ফারুকের আরেক ভাই জাফর উমেদ খানও এ কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে আছেন।

প্রথমে ট্রেডিং কোম্পানি হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও পরে বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবসা এসে দ্রুত উন্নতি হতে থাকে সামিটের ব্যবসার।

১৯৯৮ সালে সামিটের প্রথম বিদ্যুৎকেন্দ্রটি উৎপাদনে যায়। বর্তমানে সামিটের ১৭টি কেন্দ্র দেশের মোট বিদ্যুতের চাহিদার ৯ শতাংশের যোগান দিচ্ছে বলে তাদের ওয়েবসাইটের তথ্য।

সামিট পাওয়ার গতবছর যুক্তরাষ্ট্রের জেনারেল ইলেকট্রিক (জিই) এবং জাপানের মিৎসুবিশি করপোরেশনের সাথে মিলে বাংলাদেশে ৩০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দেয়।

এর আওতায় দুই হাজার ৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার চারটি বিদ্যুৎকেন্দ্র, দুটি এলএনজি টার্মিনাল, একটি তেলের টার্মিনাল এবং একটি এইচএফওভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।

আরো পড়ুন : বড় শিল্প গ্রুপের হাতে বন্দী ব্যাংকিং খাত
আশরাফুল ইসলাম (১৩ আগস্ট ২০১৮, ১৩:৪৯)
উদ্দেশ্য ছিল বিশেষ সুবিধা নিয়ে ঋণ পুনর্গঠনের মাধ্যমে শিল্প গ্রুপগুলো লোকসান কাঠিয়ে উঠবে। একই সাথে প্রতিষ্ঠানগুলো চালু রেখে আয়-উপার্জনের মাধ্যমে ঋণের অর্থ পরিশোধ করবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ঋণ পুনর্গঠনের সুবিধা নেয়ার পর প্রতিষ্ঠানগুলো তা পরিশোধ করছে না। যে পরিমাণ ঋণ পুনর্গঠন করেছিল তার কিস্তি পরিশোধ না করায় সুদে-আসলে তা ক্রমন্বয়ে বেড়ে যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, উচ্চ আদালত থেকে খেলাপি ঋণের ওপর স্থাগিতাদেশ নিয়ে বড় বড় গ্রুপ অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ সুবিধা নিচ্ছে। এতে ব্যাংকের পুঞ্জীভূত খেলাপি ঋণ বেড়ে যাচ্ছে। বেড়ে যাচ্ছে লোকসানের পাল্লা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান মতে, মাত্র ১ ও ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ও সুদের ওপর বিশেষ ছাড় নিয়ে ১১টি শিল্প গ্রুপ ১৪ হাজার ৯৪৫ কোটি টাকার ঋণ পুনর্গঠন করেছিল। ঋণের কিস্তি পরিশোধ না করায় ওই ঋণ আবার খেলাপি হয়ে পড়েছে। গত মার্চ মাস শেষে সুদে-আসলে তা বেড়ে হয়েছে ১৭ হাজার ১০৩ কোটি টাকা। ২৪টি ব্যাংক থেকে এ সুবিধা নিয়েছিল শিল্প গ্রুপগুলো। ঋণ পরিশোধ না করায় ব্যাংকগুলো এখন চরম বেকায়দায় পড়ে গেছে। ব্যাংকগুলোর পুঞ্জীভূত খেলাপি ঋণ বেড়ে যাচ্ছে। এতে ব্যাংকের মুনাফা থেকে খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে গিয়ে ব্যাংকের প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ২৪ ব্যাংকের একটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) গতকাল নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, ২০১৫ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশে প্রভাবশালী এ শিল্প গ্রুপগুলোর বিশেষ সুবিধায় ঋণ নবায়ন করা হয়েছিল। সাধারণত ঋণ নবায়ন করতে পুঞ্জীভূত খেলাপি ঋণের ১৫ শতাংশ নগদে ডাউন পেমেন্ট দিতে হয়। কিন্তু ওই সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশে ১ ও ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট নিয়ে ও ঋণ মঞ্জুরির সময় ধার্যকৃত সুদে বিশেষ ছাড় দিয়ে ঋণ নবায়ন করা হয়েছিল। ওই সময় ব্যাংকের প্রকৃতপক্ষে ক্ষতি হলেও আশা করা হয়েছিল বিশেষ সুবিধা নিয়ে শিল্প গ্রুপগুলো ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করবে। কিন্তু বাস্তবে উল্টোটি হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান বিশেষ সুবিধা নিয়ে ঋণ পুনর্গঠন করে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করছে না।

উল্টো তাদেরকে খেলাপিও বলা যাবে না। কেউ কেউ উচ্চ আদালত থেকে স্থাগিতাদেশ নিয়েছেন। উচ্চ আদালত থেকে রিট নিয়ে আবার অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছেন। অথচ, ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী ঋণখেলাপি গ্রাহক অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারবেন না। অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে আবার তারা খেলাপি হয়ে যাচ্ছেন। এভাবেই ব্যাংকিং খাত তাদের হাতে বন্দী হয়ে পড়েছে।

ব্যাংকগুলো থেকে প্রাপ্ত প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, সরকার সমর্থিত দেশের প্রভাবশালী একটি শিল্প গ্রুপ বিশেষ সুবিধায় পাঁচ হাজার ২১৬ কোটি টাকার ঋণ নবায়ন করেছিল। ঋণের কিস্তি পরিশোধ না করায় ওই ঋণ এখন সুদে-আসলে ছয় হাজার ৬৪৭ কোটি টাকা হয়েছে।

দেশের প্রথম প্রজন্মে একটি ব্যাংকের প্রায় এককভাবে নিয়ন্ত্রণকারী সরকার সমর্থক এক প্রভাবশালী শিল্প গ্রুপ বিশেষ সুবিধায় এক হাজার ৭৭৫ কোটি ৮৩ লাখ টাকার ঋণ নবায়ন করেছিল। কিন্তু ওই প্রতিষ্ঠানও ঋণের কিস্তি পরিশোধ না করায় এখন সুদে-আসলে তা প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। অপর এক গ্রুপ এক হাজার ১৫২ কোটি টাকার ঋণ বিশেষ সুবিধায় নবায়ন করেছিল। ওই প্রতিষ্ঠানও ঋণের কিস্তি পরিশোধ না করায় সুদে-আসলে তা দেড় হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। বহুল আলোচিত গ্রুপ এনন টেক্স এক হাজার ৪৯ কোটি টাকার ঋণ পুনর্গঠন করেছিল। কিন্তু তাদের ঋণও এখন সুদে-আসলে এক হাজার ১৫০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এভাবে ১১টি শিল্প গ্রুপ ১৪ হাজার ৯৪৫ কোটি টাকার খেলাপিঋণ বিশেষ সুবিধায় নবায়ন করার পর তা এখন ১৭ হাজার ১০৩ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। তবে, এ হিসাব গত মার্চ প্রান্তিকের।

জুনের হিসাব এখন চূড়ান্ত করা হয়নি। জুনের হিসাবে আরো প্রায় এক হাজার কোটি টাকা বেড়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অপর একটি ব্যাংকের এমডি জানিয়েছেন, দেশের একটি প্রভাবশালী গ্রুপের কাছে তার ব্যাংকের পাওনা আড়াই হাজার কোটি টাকার বেশি। ওই গ্রুপ ব্যবসায়িক মন্দার কথা বলে ঋণ পরিশোধ করছেন না। ঋণগুলো খেলাপি হওয়ার যোগ্য হলেও আদালতের নির্দেশে তা খেলাপি করা যাচ্ছে না। আরো একটি প্রভাবশালী গ্রুপের হাতে ঋণের পরিমাণ আড়াই হাজার কোটি টাকা। একজন সাবেক এমপির মালিকানাধীন গ্রুপের কাছে ঋণের পরিমাণ তিন হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বেনামী ঋণও রয়েছে বলে জানিয়েছেন ওই এমডি।

এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ এর আগে বলেন, বড় গ্রাহকদের সব ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে দেয়া উচিত নয়। ব্যাংকগুলো সবাই মিলে একই গ্রাহককে ঋণ দিচ্ছে, ফলে গ্রাহকের ঋণের পরিমাণ বেশি হয়ে যাচ্ছে। এতে ব্যাংকের ঝুঁকি বাড়ছে। তিনি আরো বলেন, ঋণ কেন্দ্রীভূত হওয়া ঠেকাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগ নেয়া উচিত। একই সাথে বড় শিল্প গ্রুপের ঋণগুলো কঠোরভাবে তদারকি করা উচিত। ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রেও নজরদারি বাড়ানো উচিত।

Facebook Comments
Please follow and like us: