সরকারী দুই খ্যাত থেকে বেতন গ্রহণ করায় সাতক্ষীরায় ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা

ক্রাইমবার্তা ডেস্করিপোট:: ইউপি চেয়ারম্যান হিসেবে সরকারি ভাতা গ্রহণ, আবার অধ্যক্ষ হিসেবে কলেজ থেকে বেতন গ্রহণ, একই ব্যক্তি কর্তৃক সরকারের দুটি বিভাগ থেকে আর্থিক সুবিধা নেয়ার অভিযোগসহ নানাবিধও দুর্নীতির ঘটনা তদন্তে প্রমাণিত হওয়ার পর সাতক্ষীরার দুর্নীতি দমন ট্রাইব্যুনাল ও দায়রা জজ আদালতে মামলা দায়ের করা হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যানকে তদন্ত করে আগামী ৪ অক্টোবরের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমাদানের নির্দেশ দিয়েছেন বিজ্ঞ বিচারক।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার সাতানী গ্রামের মৃত আকবর আলীর ছেলে আব্দুল্যাহ আল মাহমুদ বাদী হয়ে সদরের ৪নং ঘোনা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও শহীদ স্মৃতি ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ ফজলুল রহমান মোশাসহ ৪জনকে আসামী করে গত ২ আগস্ট দুর্নীতি দমন ট্রাইব্যুনাল ও দায়রা জজ সাদিকুল ইসলাম তালুকদারের আদালতে এ মামলা দায়ের করেন। মামলা নং ৭/১৮। ১৬১ পিসি তৎসহ ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(১)‘খ’ ‘গ’ ‘ঘ’ ‘ঙ’ (২) (৩)-‘২’ ও (৪) ধারা মোতাবেক। এ মামলার অপর আসামীরা হলেন, শহরের কাটিয়া নারকেলতলার মৃত আব্দুস সোবহানের ছেলে ওই কলেজের প্রফেসর আলমগীর কবির, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর খুলনা অঞ্চলের প্রাক্তন উপ-পরিচালক মো. জাকির হোসেন, সদরের ভাড়–খালি গ্রামের মৃত বজলুর রহমান বিশ^াসের ছেলে শহীদ স্মৃতি ডিগ্রি কলেজের বর্তমান সভাপতি আলতাফ হোসেন ও শহীদ স্মৃতি ডিগ্রি কলেজের প্রধান সহকারি, সাতানী গ্রামের নওশের আলী সরদারের ছেলে মাগফুর রহমান। এ মামলায় সরকারের দায়িত্বশীল কয়েকজন কর্মকর্তাসহ মোট ৮জনকে স্বাক্ষী করা হয়েছে।
মামলার বিবরণে জানা যায়, ২নং আসামী আলমগীর কবিরের পিতা আব্দুস সোবহান শহীদ স্মৃতি ডিগ্রি কলেজের সভাপতির দায়িত্বে থাকাকালিন আসামী ফজলুর রহমান ওই কলেজে সহকারি প্রফেসর হিসেবে নিয়োগ পান। পরে তিনি ২০১৭ সালে সহকারী প্রফেসর পদে পদত্যাগ পত্র জমা দিয়ে অবৈধভাবে গঠিত গভর্ণিং বডি ও অবৈধভাবে নিয়োগ বোর্ড গঠনের মাধ্যমে উপাধ্যক্ষ হয়ে ২৪ ঘন্টার নোটিশ দ্বারা রেজুলেশন করে যোগদান সম্পন্ন করেন। কিন্তু উপাধ্যক্ষ পদে বেতন না আসায় সহকারি প্রফেসর পদ দেখিয়ে ২০১৪ সালের পহেলা ডিসেম্বর থেকে অবৈধভাবে কয়েক মাসের বেতন উত্তোলন করেন যার পরিমান ২লাখ ৬২হাজার ৫৭৩ টাকা। যাহা শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কর্তৃক গেল বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর ৪৯৬৬ নং স্মারকের তদন্ত প্রতিবেদনে প্রমানিত হয়ে উক্ত অর্থ ব্যাংক চালানের মাধ্যমে সরকারের অনুকুলে ফেরতেরও নির্দেশ দেয়া হয়।
এজাহারে আরও জানা গেছে, ২নং আসামী আলমগীর কবির এর পিতা মৃত আব্দুস সোবহান ওই কলেজের সভাপতি থাকাকালিন দুই বছর অসুস্থ্য হয়ে জ্ঞানহীন অবস্থায় বিছানায় পড়ে থাকে। এসময় আসামী ফজলুর রহমান ও আলমগীর কবির উভয়ে মিলে যোগসাজস করে আব্দুস সোবহানের স্বাক্ষর জাল করে রেজুলেশান দেখিয়ে অবৈধভাবে কলেজের সরকারি অর্থ উত্তোলন করে আত্মসাত করে। একই পন্থায় শিক্ষক নিয়োগ করে কোটি টাকা আত্মসাত করে। এরমধ্যে লোক দেখানোর জন্য ২০ লক্ষ টাকা ৪জন দাতা কলেজ ফান্ডে দান করেছে মর্মে দেখানো হয়। দানকৃত ব্যক্তিদের মধ্যে বাশদহা গ্রামের তৌহিদুর রহমান, শেখ শরিফুজ্জামান বিপুল, জাহাঙ্গীর কবির ও অজ্ঞাত এক ব্যক্তি রয়েছে। অভিযোগ করা হয়েছে, এ সমস্ত ব্যক্তিরা সরকারি করদাতা নন ও ট্যাক্স প্রদান করেন না। তাদের আয়ের সহিত অর্থ ডোনেশনের সংগতিও নেই। এমনকি দাতা সদস্য হওয়ার যোগ্যও নন। ফজলুর রহমান মোশা মোটা অংকের অর্থ নিয়ে তার কিছু অংশ কাগজে কলমে কলেজ ফান্ডে ডোনেশান দেখিয়ে নিজের অপকর্ম ঢাকার অপচেষ্টা করেছেন মাত্র। শুধু তাই নয়, শহীদ স্মৃতি কলেজকে তিনি ব্যক্তিগত সম্পদ বানিয়ে ফেলেছেন। এই কলেজের বর্তমান সভাপতি আলতাফ হোসেন অধ্যক্ষ ফজলুর রহমান মোশার আপন ভগ্নিপতি, অভিভাবক সদস্য সেলিম উদ্দীন আপন ভাগিনা, শিক্ষক প্রতিনিধি মো. আব্দুর রশিদ আপন ভায়রা। নিজের লোক দিয়ে গভর্ণিং বডি বানিয়ে ৩নং আসামী মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর খুলনা অঞ্চলের প্রাক্তন উপ-পরিচালক মো. জাকির হোসেনের সহযোগিতায় উক্ত কলেজে বিভিন্ন পদে শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে কোটি কোটি টাকা উপার্যন ও আত্মসাত করার অভিযোগ রয়েছে। ক্ষমতার অপব্যবহার করে মেধাশূন্য এসব শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে প্রতিষ্ঠানকে নিন্মমুখি করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত তিনি।
এজাহারে আরও জানাগেছে, ৩নং আসামী মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর খুলনা অঞ্চলের প্রাক্তন উপ-পরিচালক মো. জাকির হোসেনকে ১নং আসামী আর্থিক সুবিধা দিয়ে কোন তদন্ত ছাড়াই উপাধ্যক্ষ দীপক কুমার, রাষ্ট্র বিজ্ঞানের নাহিদা সুলতানা, পদার্থ বিদ্যার বিশ^জিৎ সরকারের বেতন ছাড় দিয়ে যোগদানের মেয়াদ কাগজে কলমে বৃদ্ধি করিয়ে বেতন দিয়ে সরকারি লক্ষ লক্ষ টাকা আত্মসাত করার সুযোগ তৈরি করে দেয়। আসামীদের একে অপরের যোগসাজসের ঘটনা সরকারের উচ্চ পর্যায়ে অভিযোগ করলে অবৈধ ক্ষমতার বলে তার কোন ব্যবস্থা না হওয়ায় প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে অভিযোগ অতপর তদন্তে অনেক কিছুই প্রমাণিত বলে জানানো হয়। উক্ত কলেজের বৈধভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত সভাপতি নাজমুলকে বাদ দিয়ে আব্দুস সোবহানকে সভাপতি করে ফজলুর রহমানকে উপাধ্যক্ষ থেকে অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ প্রদান করেন। এছাড়াও আইন ও বিধি বিধান না মেনে এপ্রতিষ্ঠানের রক্ষিত সরকারি গাছ কেটে নিজের বাড়ির ফার্ণিচার তৈরি করার অভিযোগ অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, পহেলা জানুয়ারী ২০১৫ থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০১৭ পর্যন্ত অবৈধ ঘোষণা করা হয় গভর্ণিং বডিকে। এরপর মেয়াদ বর্হিভূত ওই কমিটি কিভাবে আর্থিক লেনদেন করেন তা নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন? অথচ অধ্যক্ষ ফজলুর রহমান মোশা ও সভাপতি আলতাফ হোসেন দুজনে মিলে শহীদ স্মৃতি ডিগ্রি কলেজের ডিপোজিট ফা- থেকে পরস্পর যোগসাজসে জনতা ব্যাংক আগরদাড়ি শাখা থেকে ২২জুন ২০১৭ তারিখে ২লাখ ৭৩ হাজার টাকা, ৯জুলাই ২০১৭ তারিখে ১লাখ ৮ হাজার ১শ’ টাকা, ১৭ জুলাই ২০১৭ তারিখে ১ লাখ ৪ হাজার টাকা, ২১ জানুয়ারী ২০১৮ তারিখে ১ লাখ টাকা, ২৪ জানুয়ারি ২০১৮ তারিখে ৫০ হাজার টাকা, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ তারিখে ৩ লাখ ২৯ হাজার ৫শ টাকা, ২১ মার্চ ২০১৮ তারিখে ১ লাখ ৪২ হাজার ৫শ টাকা, ২২ মার্চ ২০১৮ তারিখে ১ লাখ ৪৫ হাজার টাকা, ২৪ মার্চ ২০১৮ তারিখে ১ লাখ ১০ হাজার টাকা, ১০ এপ্রিল ২০১৮ তারিখে ১লাখ ৩৩ হাজার ৮৬৬ টাকা, ২৩ মে ২০১৮ তারিখে ১ লাখ ২ হাজার ৫৬০ টাকা ও ২৮ মে ২০১৮ তারিখে ৫০ হাজার, সর্বমোট ১৬ লাখ ৪৮ হাজার ৫২৬ টাকা বিধি বির্হভূতভাবে উত্তোলন করে দূর্ণীতির মাধ্যমে আত্মসাত করেন। ব্যাংক স্টেসমেন্টে দেখা যায় মেয়াদ উত্তীর্ণ কমিটি দ্বারা এই টাকা উত্তোলন ও খরচ দেখানো হয়েছে যা বিশ^বিদ্যালয়ের আর্থিক নীতিমালা অনুসরণ করা হয়নি। বিপুল পরিমান এই টাকা দিয়ে কলেজের প্রাচীর ও গেট নির্মাণ বাবদ ব্যয় দেখানো হয়। যা টেন্ডারের মাধ্যমে করার নির্দেশনা থাকলেও করেছেন নিজেরাই।
অধ্যক্ষ ফজলুর রহমান মোশা সরকারের অনুমতি ছাড়াই গত ২৮ জানুয়ারী ২০১৪ হতে ৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৪ তারিখ পর্যন্ত পাসপোর্ট নং- এফ-০৩৫০৫৩৬ ভারত গমনে যান। যা সরকারি কর্মচারি নীতিমালা বর্হিভূত। তিনি সাতক্ষীরা শহরের সরদার পাড়া এলাকায় ৪তলা বিশিষ্ট বিলাস বহুল ভবন নির্মান, গ্রামের বাড়ি ঘোনায় দুই তলা বিশিষ্ট বিলাস বহুল ভবন নির্মাণ ও ঢাকা মেট্রো-গ-২৮-১৬৮৩ বিলাস বহুল প্রাইভেট কার ক্রয় করেছেন। এছাড়াও রয়েছে বিপুল পরিমান ব্যাংক ব্যালেন্স ও স্থাবর অ-স্থাবর সম্পদ। কিভাবে এত অর্থের মালিক বনেছেন তা নিয়েও রয়েছে নানা বিতর্ক।
এদিকে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রফেসর ড. এসএম ওয়াহিদুজ্জামান গত ১৯.০৯.২০১৭ তারিখে ৪৯৬৬ নং স্মারকের এক তদন্ত প্রতিবেদনে বলেছেন, শহীদ স্মৃতি ডিগ্রি কলেজের অবৈধভাবে গঠিত গভর্ণিং বডি দ্বারা নিয়োগ বোর্ড গঠন করে ফজলুর রহমান নিজে অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ নিয়েছেন। আরও একাধিক শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছেন। ফজলুর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত না করে অত্র অফিসে মিথ্যা প্রতিবেদন পাঠিয়েছেন উল্লেখ করার পাশাপাশি ২নং কলামে বলেন, ফজলুর রহমান উপাধ্যক্ষ এবং অধ্যক্ষ পদে এমপিও ভুক্তি না হওয়া পর্যন্ত সহকারি অধ্যাপকের বেতন ভাতা বাবদ উত্তোলিত ২লাখ ৬২ হাজার ৫৩৭ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দানের আদেশ প্রদান করা যেতে পারে। এছাড়াও উক্ত প্রতিবেদনের ৮নং কলামে বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারিদের জন্য প্রণীত জনবল কাঠামোর ফেব্রুয়ারি/২০১০ প্রণীত, ২৪-০৩-২০১৩ এ সংশোধিত) ধারা ১১ এর উপধারা ১৩ অনুযায়ী একই সময়ে তিনি দুটি পৃথক প্রতিষ্ঠানে পেশাগত দায়িত্ব পালন এবং বেতন ভাতা গ্রহণ করতে পারেন না। এবিষয়ে তাকে বিধি মোতাবেক নির্দেশনা প্রদান করা যায়।
তবে উপরোক্ত অভিযোগ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন দাবি করে চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান মোশা গণমাধ্যমকে জানান, বাদীর নামে ৩টি মামলা রানিং আছে কলেজ সংক্রান্ত। আমার নামে কি মামলা করবে এমনটি জানিয়ে বলেন, তাদের দাবী সকল কমিটি অবৈধ। কমিটি দেয়ার মালিক জাতীয় বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বৈধ অবৈধতার বিচার সেখানেই হবে। তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন অভিযোগ ৭বার তদন্ত হয়েছে। আমি ভারতে গিয়েছি কেন, আমার ভারতে যাওয়ার অধিকার নেই? তিনি আরও বলেন, ডা. শহিদুর রহমান ৯৪ সালে আমাকেই নিয়োগ দিয়ে আবার আমাকেই বলে অবৈধ। অভিযোগ আদালতে পেশ হয়েছে। তদন্তে মিথ্যা প্রমানিত হলেই মানহানির মামলা ঠুকে দেয়া হবে বলে জানান তিনি।
এদিকে শহীদ স্মৃতি কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ডা. শহীদুর রহমান জানান, আমার মনে হয় সাতানীতে কলেজ প্রতিষ্ঠা করে জীবনে একটা ভুল করেছি। এলাকার মানুষের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করার লক্ষ নিয়ে কলেজ প্রতিষ্ঠার পর থেকে ঝামেলাই আছি। তিনি আরও বলেন, অত্র এলাকায় কোন শিক্ষিত লোক নেই তাই কমিটির সভাপতি করতে ঘোনা ইউনিয়নের ভাড়–খালি গ্রাম থেকে ডিগ্রি পাশ লোক হায়ার করে আনা হয়েছে। নিজের পকেটস্থ লোকজন দিয়ে কমিটি করে লুটপাট করার অভিযোগ এনে তিনি আরও বলেন, কলেজের ডিপোজিট ফান্ড থেকে সাড়ে ১৬ লাখের বেশি টাকা তুলে প্রাচীর ও গেট নির্মানে ৫/৬ লাখ টাকা খরজ করে বাকি টাকা হজম করে ফেলা হয়েছে। শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে নেয়া হয়েছে লক্ষ লক্ষ টাকা। অথচ যেন দেখার কেউ নেই।

Facebook Comments
Please follow and like us: