১০ বছরে বাস্তুহারা ৮ হাজার পরিবার

ক্রাইমবার্তা ডেস্করির্পোটঃ

মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার উপর দিয়ে বহমান পদ্মা নদী ও আড়িয়াল খা নদের আগ্রাসনে গত ১০ বছরে সাত থেকে আট হাজার পরিবার বাস্তুহারা হয়েছে। এই দুটি নদীর ভয়াল থাবায় বিপুল সংখ্যক জনবসতি ছাড়াও ১৭টি স্কুল,  ছয় থেকে সাতটি হাট-বাজার, ইউনিয়ন পরিষদ ভবন, রাস্তা-ঘাট ফসলি জমি নদীতে বিলীন হয়েছে।

চলতি বছর এ পর্যন্ত ছয় শতাধিক ঘরবাড়ি ছাড়াও চারটি স্কুল, একটি বাজার, ইউনিয়ন পরিষদ, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, কমিউনিটি ক্লিনিক, ব্রিজ কালভার্ট, পাকা সড়ক বিলীন হয়েছে নদীতে। অস্তিত্ব সংকটে চরের ইউনিয়নগুলো।

এদিকে ভাঙন প্রতিরোধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি চরাঞ্চলবাসীর। ভাঙন প্রতিরোধ করা গেলে আধুনিক সুবিধা সম্পন্ন এ চরগুলো মডেল চরাঞ্চল হতে পারে।

সরেজমিন ভাঙন এলাকা ঘুরে একাধিক সূত্রে জানা যায়, উপজেলার চরজানাজাত, কাঁঠালবাড়ি, বন্দরখোলাসহ আটটি ইউনিয়ন পদ্মা ও আড়িয়াল খা নদ সংলগ্ন। প্রত্যন্ত চরাঞ্চল হলেও স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং আওয়ামী লীগ সংসদীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক নূর-ই আলম চৌধুরীর উদ্যোগে সরকারের নানামুখী পদক্ষেপে চরবাসী পায় বহুতল বিশিষ্ট অসংখ্য স্কুল ভবন, পাকা সড়ক, ব্রীজ-কালভার্ট, ইউনিয়ন পরিষদ, বিদ্যুৎ সংযোগ। কিন্তু প্রতিবছরই উজান থেকে নেমে আসা ঢলে ও বর্ষার পানি দু কুল বেয়ে উপচে পড়লে এসকল ইউনিয়নে ব্যাপক নদীভাঙন দেখা দেয়।

চলতি বছরের আগস্টের শুরু থেকে পদ্মা নদীতে অস্বাভাবিক হারে পানি বৃদ্ধি পেয়ে চরাঞ্চলের তিনটি ইউনিয়ন চরজানাজাত, বন্দরখোলা ও কাঠালবাড়ি ইউনিয়নে ব্যাপক নদীভাঙন দেখা দেয়। গত তিন থেকে চারদিনে ভাঙন আরও প্রকট রুপ নিয়েছে। এ পর্যন্ত পদ্মার চরাঞ্চলের ছয় শতাধিক ঘরবাড়ি, একটি হাইস্কুলসহ চারটি স্কুলভবন নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এই ভাঙনে চরজানাজাত ইউনিয়ন পরিষদ ভবন, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, কমিউনিটি ক্লিনিক, ব্রিজ কালভার্ট , পাকা সড়ক, হাট বাজারও পদ্মায় বিলীন হয়েছে। ভাঙনের তীব্রতায় অনেকাংশে ভবনসহ স্থাপনা সড়ানোও সম্ভব হয়নি। এখনো হুমকিতে মোবাইল কোম্পানির টাওয়ার, একাধিক স্কুল, ইউনিয়ন পরিষদ ভবন, শত শত বাড়ি ঘর।

২০১৭ সালে পদ্মা নদীর ভাঙনে চরাঞ্চলের দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ পাঁচ শতাধিক ঘরবাড়ি ও আড়িয়াল খা নদের ভাঙনে দুই শতাধিক ঘরবাড়ি বিলীন হয়েছিল। ২০১৬ সালে নদী ভাঙনে শুধু এ উপজেলায় আক্রান্ত হয় অন্তত ৫০০ ঘর বাড়ি, দুটি স্কুল। ২০১৫ সালে নদীভাঙনের কবলে এ উপজেলার প্রায় এক হাজার ১০০ পরিবার হয়েছে গৃহহীন।  গত ১০ বছরে এ উপজেলায় ১৭টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ছয়টি হাট বাজারসহ প্রায় সাত থেকে আট হাজার পরিবার নদী ভাঙনে আক্রান্ত হয়ে নিঃস্ব  হয়েছে।

নদী ভাঙন প্রতিরোধে কয়েক বছর আগে আড়িয়াল খা নদের হাজী শরীয়াতুল্লাহ সেতু সংলগ্ন এলাকা ও বহেরাতলায় দুটি নদী শাসন বাঁধ নির্মান ছাড়া বিস্তৃর্ন জনপদ অরক্ষিত থাকায় বর্ষার শুরু থেকেই নদীভাঙন প্রকট রুপ নেয় প্রতি বছর।

নদী ভাঙনে আক্রান্ত বন্দরখোলা এলাকার আলতাফ শেখ বলেন, ‘এ পর্যন্ত তিন বার বাড়ি করছি আর তিন বারই নদী খাইয়া ফালাইছে। এহন কই যামু কি করুম কিছুই বুঝতাছি না।’

আরেক ভাঙন আক্রান্ত চরজানাজাত এলাকার সলেমান হাওলাদার বলেন, ‘পদ্মা নদীরভাঙন এতই ভয়ংকর যে ঘর-বাড়ি সরানোরও সময় দেয় না। গত কয়েকদিনে স্কুল, ইউনিয়ন পরিষদ, হাট-বাজারসহ শতশত ঘরবাড়ি ভাঙছে। এহন আমরা নিঃস্ব।’

চরজানাজাত ইউপি সদস্য আ. মালেক তালুকদার বলেন, ‘আমাদের এলাকা পদ্মা নদীর বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চল হলেও এমপি সাহেবের নিরলস পরিশ্রমে এখানে স্কুল, ইউনিয়ন পরিষদ, পাকা রাস্তা, বিদ্যুৎ সংযোগ সব আধুনিক সুবিধাই ছিল। চর হলেও আমরা খুব শান্তিতে ছিলাম যা দেশের অন্য চরে ছিল না। কিন্তু প্রতিবছরই ভাঙনের শিকার হয়ে আমরা এখন সর্বশান্ত হয়ে গেছি। স্কুল, রাস্তা, ইউনিয়ন পরিষদসহ শতশত বাড়িঘর নদীতে বিলীন হয়েছে। আমাদের একটাই দাবি সরকার দ্রুত নদী ভাঙন প্রতিরোধের ব্যবস্থা করুক।’

চরজানাজাত ইলিয়াস আহমেদ চৌধুরী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুলতান মাহবুব বলেন, ‘ভাঙন প্রতিরোধ করা গেলে সারা দেশে শিবচরের চরাঞ্চল মডেল হতে পারে। তাই নদী ভাঙন প্রতিরোধের জোড়ালো দাবি জানাই।’

শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইমরান আহমেদ বলেন, ‘উপজেলা আটটি ইউনিয়ন পদ্মা ও আড়িয়াল খা নদী বেস্টিত। প্রতি বছরই নদী দুটির ব্যাপক ভাঙন দেখা দেয়। গত ১০ বছরে ১৭টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ইউনিয়ন পরিষদ ভবন, হাট-বাজার, অসংখ্য ব্রিজ-কালভার্ট, ফসলি জমিসহ হাজার হাজার ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। আমরা ভাঙন এলাকায় সহযোগিতা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি।’

Facebook Comments
Please follow and like us: