বাংলার ঋতু বৈচিত্র্যের পালায় হেমন্ত এসেছে দুয়ারে

ক্রাইমবার্তা রিপোটঃ আলম : আবার আসিব ফিরে কবিতায় কবি বলেছেন, ‘হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে/ কুয়াশার বুকে ভেসে একদিন আসিব এ কাঁঠাল-ছায়া বা ‘আমি যদি ঝ’রে যাই কার্তিকের নীল কুয়াশায়/ যখন ঝরিছে ধান বাংলার ক্ষেতে ক্ষেতে ম্লান চোখ বুজে’ হেমন্তের রূপে মুগ্ধ কবি জীবনানন্দ দাশ তাঁর স্বপ্নের রূপসী বাংলা থেকে চিরবিদায় নিয়েছিলেন একদিন এই কার্তিক মাসেই। হেমন্ত দুয়ারে আজ। পেঁজা তুলার মতো ছন্নছাড়া মেঘমালা বিদায় নিয়েছে, হেসে উঠেছে কার্তিকের ঝকঝকে আকাশ। বাতাসে হিম হিম গন্ধ, ভোরের চেহারা আলাদা করে ঠাহর করা যায়। মাটির কাছাকাছি আলতো কুয়াশা জমে, ঘাসের ডগায় বুঝি বা মুক্তোদানার মতো শিশিরেরা অস্থায়ী নিবাস গড়ে। গাঁয়ের দিকে ঋতুবদলের বৈচিত্র্য বেশ চোখে পড়ে। আমন ধানের চনমনে গন্ধে মাতোয়ারা কৃষকের মন। সোনারং ধানের ফলনের ওপর অনেকটাই নির্ভর করে গ্রামীণ জীবন। ফলন ভালো হলে কৃষাণির গায়ে উঠবে নতুন শাড়ি, নাকে নোলক, পায়ে মল, বাচ্চারা পাবে দুটো ভালোমন্দ খাবার, খেলনা ঘুড়ি, মিহিদানা, রসগোল্লা। মুক্তো বিন্দুর মতো শিশির জমতে শুরু করেছে ঘাসের ডগায়, ধানের শীষের প’রে। আদিগন্ত মাঠ জুড়ে এখন ধানের প্রাচুর্য। হলুদে-সবুজে একাকার অপরূপ প্রকৃতি। চারদিকে ধূসর আবহ ঘিরে রাখছে। শেষ বিকালে কুয়াশার আবছা চাদর প্রকৃতিকে ঢেকে শিশিরের শব্দের মতো নামছে সন্ধ্যা। ‘সবুজ পাতার খামের ভেতর/ হলুদ গাঁদা চিঠি লেখে/ কোন পাথারের ওপার থেকে/ আনল ডেকে হেমন্তকে…আজ সোমবার কার্তিক মাসের ৭ তারিখ। আবহমান বাংলায় ষড় ঋতুর পরিক্রমায় এলো হেমন্ত।
আমাদের দেশ ষড়ঋতুর দেশ। এখানে দু’মাস পর পর রূপ বদলায় প্রকৃতি। সেই ধারাবাহিকতায় আজ এসেছে কার্তিক। এ মাসের প্রথম দিন থেকে শুরু হলো হেমন্ত। শীতের বাহন বলা হয় হেমন্তকে। এই তো সেদিন ঘূর্ণিঝড় তিতলির প্রভাবে টানা অকাল বর্ষণের পর থেকে হালকা হালকা শীত অনুভূত হয়েছে । অনুভূতিশীল মানুষ বিশেষকরে যারা মধ্যরাত পর্যন্ত কাজে থাকেন, তারাই অনুধাবন করেছেন , কী সুন্দর বৃষ্টি নেমেছিল! কবিতার ছন্দের মতো,প্রিয় গানের সুরের মতো ঝরেছে বৃষ্টি। আর এই বৃষ্টিস্নাত ঝিরিঝিরি হাওয়া মনে করে দিয়েছিল শীতের কথা। শীতের আগে একটু শীত শীত অনুভূতি! এই অনুভূতি থেকেই আবার মনে পড়লো কবিগুরুর গান ‘হিমের রাতে ওই গগণের দীপগুলিরে হেমন্তিকা, করলো গোপন আঁচল ঘিরে, ঘিরে।
কবিগুরু রবীন্দ্র নাথ ঠাকুরের ভাষায় ‘হায় হেমন্তলক্ষ্মি, তোমার নয়ন কেন ঢাকা-/ হিমের ঘন ঘোমটাখানি ধূমল রঙে আঁকা।/ সন্ধ্যাপ্রদীপ তোমার হাতে মলিন হেরি কুয়াশাতে,/ কণ্ঠে তোমার বাণী যেন করুণ বাষ্পে মাখা।/ ধরার আঁচল ভরে দিলে প্রচুর সোনার ধানে।/ দিগঙ্গনার অঙ্গন আজ পূর্ণ তোমার দানে…।
জীবনানন্দ দাশের ও খুব প্রিয় মাস কার্তিক। তাঁর কবিতায় কতবার যে কার্তিকের কথা এসেছে। ‘শুয়েছে ভোরের রোদ ধানের উপরে মাথা পেতে, / অলস গেঁয়োর মতো এইখানে কার্তিকের ক্ষেতে; / মাঠের ঘাসের গন্ধ বুকে তার, চোখে তার শিশিরের ঘ্রাণ,/ তাহার আস্বাদ পেয়ে অবসাদে পেকে ওঠে ধান’ (অবসরের গান)। গান, কবিতায় কত রং রূপেই না ধরা দেয় হেমন্ত। তবে হেমন্ত শুধু হেমন্ত নয়, হেমন্ত মানে শীতের আগমনী বার্তা। একটু খেয়াল করলেই চোখে পড়ে, ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে প্রকৃতি। শহরে অতটা টের পাওয়া না গেলেও, গ্রামে খুব চোখে পড়ে প্রকৃতির এ বদলে যাওয়া। গাছীরা এখন খেজুর গাছ পরিষ্কার করার কাজ নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন। গ্রামবাংলার এই চিরচেনা রূপ হেমন্তের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।
গতকাল রোববার সন্ধ্যায় অস্ত যাওয়া ৬ কার্তিকের শেষ সূর্যটার সাথে নগরের তপ্ত শ্বাসও অস্ত যাওয়ার কথা, কিন্তু জলবায়ুর যে নিত্য বদল, তাতে এ গরম আরো কিছু দিন থাকবে। অগ্রহায়ণে ধান কাটার সাথে সাথে জেকে বসতে শুরু করবে শীত। হেমন্তকে সবচেয়ে চেনা যায় ভোরের শিশিরে। খুব ভোরে একটি শীতল বাতাসে। সবুজ পাতার গায়ে জমে থাকা শিশির বিন্দু অপার্থিব দৃশ্যমালা রচনা করে। প্রকৃতির কবি জীবনানন্দ দাশের ভাষায়- লিপি কাছে রেখে ধূসর দ্বীপের কাছে আমি/নিস্তব্ধ ছিলাম ব’সে;/শিশির পড়িতেছিল ধীরে-ধীরে খ’সে;/নিমের শাখার থেকে একাকীতম কে পাখি নামি/উড়ে গেলো কুয়াশায়,-কুয়াশার থেকে দূর-কুয়াশায় আরো…।
হেমন্ত জীবন ও প্রকৃতিতে এক আশ্চর্য সময় হয়ে ওঠে। বর্ষার পরে এই সময়ে বৃক্ষ রাজি থাকে সবুজে ভরা। ভরা থাকে খাল-বিল নদী-নালা। বিল জুড়ে সাদা-লাল শাপলা আর পদ্ম ফুলের সমারোহ। এই হেমন্তের দুই রূপ প্রতিভাত হয়। প্রথম মাসটির এক রূপ। পরেরটির অন্য। এক সময় হেমন্তের প্রথম মাসটি ছিল অনটনের। ফসল হতো না। বিভিন্ন অঞ্চলে খাদ্যাভাব দেখা দিত। সারা বছরের জন্য জমিয়ে রাখা চাল ফুরিয়ে যেত এ সময়ে এসে। ধানের গোলা শূন্য হয়ে যেত। কার্তিকের দুর্নাম করে তাই বলা হতো ‘মরা কার্তিক’। কবি গুরুর কবিতায়ও আভাস পাওয়া যায় মন্দ্রাক্রান্ত কার্তিকের। কবিগুরু লিখেছেন- ‘শূন্য এখন ফুলের বাগান, দোয়েল কোকিল গাহে না গান,/কাশ ঝরে যায় নদীর তীরে।’
অগ্রহায়ণে আবার উল্টো চিত্র। নবান্নের এই মাস সমৃদ্ধির। এ সময় মাঠের সোনালি ফসল কাটা শুরু হয়। নতুন ধানের আমেজে মাতোয়ারা গৃহকোণ। বছর শেষে নব উদ্দীপনায় আন্দোলিত হয় গাঁয়ের সহজ-সরল মানুষ। ফসল তোলা শেষ, এবার নবান্নের আয়োজনে মেতে ওঠে গৃহবধূ। ধনলক্ষ্মির প্রতি তাদের কৃতজ্ঞতার যেন কোনো শেষ নেই। শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, নবান্ন উৎসবের মধ্য দিয়ে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে গ্রামবাসী তাদের স্বতঃস্ফূর্ত অন্তরঙ্গতাকে আরও একবার নবায়ন করে নেয়। জীবনকে উদ্যাপন করে নতুনভাবে প্রাণের আলোয়। দিনভর ব্যস্ততা শেষে সাঁঝের আলোয় বসে টপ্পাগানের আসর। গাঁয়ের দিকে এখনো হুঁকোর প্রচলন আছে। কৃষাণ-বউ কলকে সাজানোয় ব্যস্ত, পাছে গায়কের রসভঙ্গ হয়। বেশ রাত অবধি চলে গানের আসর। তারপর মাটির বিছানায় শুয়ে স্বপ্নবিভোর ঘুম। অগ্রহায়ণ পুরোটাজুড়ে সারা বাংলায় চলবে নবান্ন উৎসব। বাঙালির প্রধান ও প্রাচীনতম উৎসবগুলোর অন্যতম নবান্ন। আবহাওয়াবিদদের মতে, এখন থেকে যত দিন যাবে ততই সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রার পার্থক্য কমতে থাকবে। পার্থক্য যত কমবে তত শীত বাড়তে থাকবে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে এখন প্রকৃতি যেন আর নিয়ম মানছে না। কেমন খামখেয়ালী হয়ে উঠেছে।
হেমন্তের প্রকৃতির সকালের সোনারঙা রোদ বাড়িয়ে দেয় বাংলার পথঘাট আর মাঠের উজ্জ্বলতা, গ্রামের মাঠে যতদূর চোখ যায় সোনালি ধান। লাউয়ের মাচায় তরুণীর মতো লিকলিকে প্রতিটি ডগার খিলখিল হাসি, হাওড়-বিলে অতিথি পাখিদের ডানা ঝাপটানোর শব্দ। কুয়াশার ধূসর চাদর গায়ে হুট করে এক ভোরে দুয়ারে হানা দেয় কমনীয় শীত। বাউলেরা রঙিন পোশাকে গান গেয়ে বেড়ায়। জুঁই, গোলাপ, শাপলা, বাগানবিলাসসহ অনেক ফুলের ভেতর দিয়ে প্রকৃতি প্রাণ ফিরে পায়। এ সময়ের নির্মল বাতাস প্রকৃতিকে আকর্ষণীয় করে তোলে। প্রকৃতির নির্যাসে মাটির কাছাকাছি আলতো কুয়াশা জমে, কুয়াশার স্মৃতি রোমন্থন করে ঘাসের ডগায় মুক্তোর দানার মতো শিশিরেরা অস্থায়ী নিবাস গড়ে। অতিথি পাখিরা গ্রামবাংলার আতিথেয়তা গ্রহণের উদ্দেশ্যে নোঙর ফেলে অগ্রহায়ণের শেষে। প্রকৃতি তখন ক্রমশই মুখর হয়ে ওঠে পরিযায়ী পাখিদের কলকাকলীতে। এই উৎসবের মধ্য দিয়ে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে গ্রামবাসী তাদের স্বতঃস্ফূর্ত অন্তরঙ্গতাকে আরও একবার নবায়ন করে নেয় নতুন করে।

Facebook Comments
Please follow and like us: