সাতক্ষীরা-৪ আসনে জোট-মহাজোটের প্রার্থী নিয়ে শেষ মুহূর্তেও একের পর এক চমক

ক্রাইমবার্তা রিপোর্টঃ  আজ (৮নভেম্বর) একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফশীল ঘোষণা করবেন সিইসি। একাদশ সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে বিগত কয়েক মাস যাবত সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর-কালিগঞ্জ আংশিক) আসনে জোর নির্বাচনী তৎপরতা চালাচ্ছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা। নির্বাচনে জয়লাভ করলে এলাকার সার্বিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। তবে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীরা পুরোদমে মাঠ দখলে রাখলেও শরীক দল জাপা নেতাকর্মীদের ভূমিকা ছিল অনেকটাই নীরব। অপরদিকে মামলার জালে আটকা পড়া বিএনপি ও জামায়াতের অধিকাংশ নেতা-কর্মী এখনও এলাকাছাড়া। তফশীল ঘোষণার মুখোমুখি সময়েও তারা কোনো প্রকার রাজনৈতিক তৎপরতা চালাতে পারছেন না। এর মধ্যেও আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দৌড়ে থাকা প্রার্থীদের পাশাপাশি বিএনপি-জামায়াতের সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে চলছে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা।
শ্যামনগর উপজেলার ১২ ইউনিয়ন ও কালিগঞ্জের ১২ টির মধ্যে ৮টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত সাতক্ষীরা-৪ আসন। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থী এসএম জগলুল হায়দার বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এই আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি এলাকার উন্নয়নে ব্যাপক কাজ করেছেন। দলীয় নেতা-কর্মীদের সাথে সম্পর্কের পাশাপাশি তৃণমূলের সাথে রয়েছে গাঢ় সম্পর্ক। তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে এবারও মহাজোট থেকে মনোনয়ন পাবেন বলে অনেকটা নিশ্চিত হলেও শেষ মুহূর্তে মহাজোটের প্রার্থী কে হচ্ছেন তা নিয়ে একের পর এক চমক সৃষ্টি হচ্ছে। এই চমকের মূলে রয়েছেন জাপা’র সাবেক সংসদ সদস্য এইচএম গোলাম রেজা। নবম সংসদে তিনি জাপা (এরশাদ) থেকে সাংসদ নির্বাচিত হন। কিন্তু মেয়াদ পূর্তির পূর্বেই জাপা থেকে বহিষ্কৃত হন তিনি। যোগ দেন জাপা’র কাজী জাফর গ্রুপে। জাপা’র চেয়ারম্যান হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদের সাথে পূর্বের বিরোধ মিটিয়ে আবারও এইচএম গোলাম রেজা মহাজোটের প্রার্থী হবেন বলে সম্প্রতি গুঞ্জন শুরু হয়। এর মধ্যেই হঠাৎ করে আনুষ্ঠানিক ভাবে এইচএম গোলাম রেজা সাবেক রাষ্ট্রপতি ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিকল্পধারা বাংলাদেশে যোগ দেন। যোগদানের পর সপ্তাহ না পেরুতেই তিনি শ্যামনগর উপজেলা সদরে জনসভা করছেন আজ (বৃহস্পতিবার)। এই জনসভায় বিকল্পধারা বাংলাদেশের সভাপতি ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক মেজর (অব:) আব্দুল মান্নানসহ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত থাকবেন বলে জানা গেছে। এদিকে সাতক্ষীরা-৪ আসনে জাতীয় পার্টি থেকে প্রার্থী হচ্ছেন স্বয়ং দলটির চেয়ারম্যান সাবেক রাষ্ট্রপতি হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদ। গতকাল বুধবার থেকে এমনটাই প্রচার করছেন শ্যামনগর ও কালিগঞ্জ উপজেলা জাতীয় পার্টির নেতৃবৃন্দ। খুব শীঘ্রই হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদ নির্বাচনী জনসভা করে সাতক্ষীরা-৪ আসনে তার প্রার্থিতার বিষয়টি নিশ্চিত করবেন বলে তারা জানান। এর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত জাপা প্রার্থী হিসেবে জোর দাবিদার ছিলেন জাপা’র কেন্দ্রীয় শিল্প ও বাণিজ্য বিষয়ক সম্পাদক বিশিষ্ট শিল্পপতি আব্দুস সাত্তার মোড়ল। তিনি দশম সংসদ নির্বাচনে জাপা’র প্রার্থী ছিলেন। কিন্তু নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে জাপা’র দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে দলীয় চেয়ারম্যান এরশাদের নির্দেশে আব্দুস সাত্তার মোড়ল মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেন।
সাতক্ষীরা-৪ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে নৌকা প্রতীক পাওয়ার আশায় দীর্ঘদিন যাবত গণসংযোগ ও সরকারের উন্নয়ন সফলতা প্রচার করে চলেছেন দলটির একাধিক নেতা। এর মধ্যে রয়েছেন শ্যামনগর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এসএম আতউল হক দোলন। তার পিতা এসএম ফজলুল হক আওয়ামী লীগ থেকে দু’বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পারিবারিক সূত্রে এসএম আতাউল হক দোলন এলাকার মানুষের কাছে বেশ পরিচিত। তাছাড়া সংগঠনের একটি বড় অংশ তার পাশে রয়েছে। তিনি মনোনয়ন পেলে আগামীতে নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে আসনটি আওয়ামী লীগকে উপহার দিতে পারবেন এবং এলাকার মানুষের ভাগ্য উন্নয়ণে কাজ করবেন বলে জানিয়েছেন।
জেলা আওয়ামী লীগের শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক শফিউল আযম লেলিন। তিনি শ্যামনগরের গাবুরা ইউপি’র চেয়ারম্যান ছিলেন। এলাকার মানুষের সাথে তার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তিনিও নৌকা প্রতিকের প্রার্থী হতে দীর্ঘদিন যাবত মাঠে রয়েছেন। গণসংযোগ, শো-ডাউন, সরকারের উন্নয়ন সংক্রান্ত লিফলেট প্রচার করছেন। আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা আস্থার পাত্র হিসেবে তাকে নৌকার দায়িত্ব দেবেন এমনটাই দাবি তার।
অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা শেখ আতাউর রহমান। সুনামের সাথে পুলিশ বিভাগের চাকরি শেষে তিনি এলাকার মানুষের সেবায় কাজ করছেন। ইতোমধ্যে মসজিদ, মাদ্রাসা, ইয়াতিমখানা ও নি¤œ মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন। নানামূখী সেবার মাধ্যমে তিনি দলীয় নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি সর্বস্তরের মানুষের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি আগামী নির্বাচনে নৌকার প্রার্থী হিসেবে এই আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চান। এজন্য মাদক ও জঙ্গিবাদ বিরোধী সমাবেশ, লিফলেট বিতরণ, প্রামাণ্য চিত্র প্রদর্শণ, শো-ডাউন করে সরকারের উন্নয়ন প্রচার করছেন। আগামী নির্বাচনে নৌকা প্রতিকে মনোনয়ন পেলে বিপুল ভোটের ব্যবধানে তিনি জয়লাভ করবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। নির্বাচিত হলে তিনি সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ মুক্ত এলাকা হিসেবে সাতক্ষীরা-৪ আসনকে গড়ে তুলবেন বলে প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন।
উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও মৌতলা ইউপি চেয়ারম্যান সাঈদ মেহেদী। তিনি এর আগে উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। ছাত্রলীগে নেতৃত্বে দেন সাঈদ মেহেদী। এক পর্যায়ে তিনি উপজেলা আওয়ামী যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগ পরিবারের সন্তান তিনি। সাবেক এই ছাত্রনেতা দলীয় কর্মকান্ডে বরাবরই সক্রিয়। তিনি এবার সংসদ নির্বাচনে নৌকার মনোনয়ন চান। এজন্য তিনি প্রচার-প্রচারণা অব্যাহত রেখেছেন।
গোপালগঞ্জের মেয়ে মাসুদা খানম মেধা। বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের রোকেয়া হল শাখার সভানেত্রী ছিলেন তিনি। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সদস্য মাসুদা খানম মেধা বর্তমানে বৈবাহিক সূত্রে শ্যামনগরে বসবাস করছেন। তিনিও এই আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী। সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকান্ড তুলে ধরে প্রচার প্রচারণা চালাচ্ছেন এবং গণসংযোগ করছেন মাসুদা খানম মেধা।
বিএনপি থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন সাবেক সংসদ সদস্য কাজী আলাউদ্দীন। তিনি ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাপা (না-ফি) থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সংসদ সদস্য থাকাকালে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সড়ক, কালভার্ট, বিদ্যুতায়নসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকান্ড করে তিনি জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। কাজী আলাউদ্দীন পরবর্তীতে বিএনপিতে যোগদান করেন। বিএনপি’র বর্তমান কেন্দ্রীয় এই নেতা একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি’র মনোনয়ন প্রত্যাশী। হেভিওয়েট এই প্রার্থী ইতোমধ্যে দলীয় নেতাকর্মীদের সাথে নিয়ে এই নির্বাচনী এলাকায় গণসংযোগ চালিয়েছেন। এর প্রেক্ষিতে বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক মামলাও হয়েছে তার বিরুদ্ধে। কাজী আলাউদ্দীন বিএনপি থেকে মনোনয়ন পাবেন বলে দলীয় নেতাকর্মীরা জোর আশাবাদ ব্যক্ত করছেন।
এই আসনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন দাবি করছেন শ্যামনগর উপজেলা বিএনপি’র সভাপতি ও নকিপুর হরিচরণ পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জিএম আব্দুল ওয়াহেদ। তিনিও দীর্ঘদিন যাবত সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।
এই আসনে জামাত দলীয় সাবেক এমপি গাজী নজরুল ইসলামও মনোনয়ন চাইবেন বলে দলটির তৃণমুলের নেতাকর্মীরা জানিয়েছে। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন গাজী নজরুল ইসলাম। সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন জামাতের নিবন্ধন বাতিল করায় শেষ পর্যন্ত জামাতের এই শক্তিশালী প্রার্থী কোন প্রক্রিয়ায় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন তা এখনও নিশ্চিত নয়।
শ্যামনগর আতরজান মহিলা মহাবিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও জাতীয় কৃষক জোট কেন্দ্রীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আশেক-ই-এলাহী। তিনি সাতক্ষীরা-৪ আসনের জাসদ মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চান। নির্বাচিত হলে তিনি মৌলবাদ সাম্প্রদায়িকতা মুক্ত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করবেন বলে জানিয়েছেন।

Facebook Comments
Please follow and like us: