অধরাই রয়ে গেল সেই ‘হেলমেট বাহিনী’ ॥ ফের আলোচনায়

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : নিরাপদ সড়কের দাবিতে গত আগষ্টের প্রথম সপ্তাহে শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলনের সময় কর্মরত সাংবাদিকদের ওপর হেলমেট পরে হামলা চালানো সেই ‘সন্ত্রাসী’দের একজনকেও এখনো গ্রেফতার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ওই ঘটনার সাড়ে তিন মাস পর ফের আলোচনায় এসেছে ‘হেলমেট বাহিনী’।
গতকাল বুধবার দুপুরে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে পুলিশের সঙ্গে দলীয় কর্মীদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার সময় হেলমেট বাহিনীর তাণ্ডব দেখা গেছে। এ সময় মুখে কালো কাপড় বেঁধে ও মাথায় হেলমেট পড়ে একদল যুবক পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর করে।
এর আগে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের শিক্ষার্থীদের ওপর একইভাবে হামলা করতে দেখা গেছে হেলমেট পরা একদল যুবককে। যাদেরকে পরে ‘হেলমেট বাহিনী’ হিসেবে চিহিৃত করা হয়। তারা অধরাই রয়ে গেল।
গতকাল বুধবার দুপুরে হেলমেট বাহিনীর তা-বের পর বিকেলে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘গত কিছুদিন আগে কোটা সংস্কার আন্দোলন ও নিরাপদ সড়কের আন্দোলনে ছাত্ররা রাস্তায় নেমেছিল। তখন হেলমেট বাহিনীরা রাস্তার গাড়িতে হামলা করেছিল, আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল। আজকেও হেলমেট বাহিনীরা গাড়িতে হামলা করেছে, আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। এই হেলমেটধারী কারা? এরাই হচ্ছে সরকারের এজেন্ট। নিজেরা গাড়িতে আগুন চালিয়ে বিএনপির উপর দোষ চাপায়। তিনি আরও বলেন, প্রথমে এই হেলমেটধারীরা পুলিশের গাড়িতে আগুন জ্বালায়। তারপর গলিতে রাখা সাংবাদিক এবং বিএনপির নেতাকর্মীদের গাড়িতে আগুন জ্বালাতে আসে। তখন বিএনপির নেতাকর্মীরা তাদের ধাওয়া দিয়ে তাড়িয়ে দেয়।’
অধরাই রয়ে গেল ‘হেলমেট-সন্ত্রাসীরা’
নিরাপদ সড়কের দাবিতে চলমান আন্দোলনের সময় কর্মরত সাংবাদিকদের ওপর হেলমেট পরে হামলা চালানো সেই ‘সন্ত্রাসী’দের একজনকেও এখনো গ্রেফতার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এদিকে ঘটনার সাড়ে তিন মাস পার হলেও কাউকেই গ্রেফতার করতে না পারার ক্ষোভ বিরাজ করছে সাধারণ সংবাদকর্মী ও নেতাদের মাঝে। আর প্রকাশ্যে হামলা চালনো ব্যক্তিরা গ্রেফতার না হলে বা তাদের বিচার না হলে সাধারণ মানুষ, সমাজ ও রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে জানিয়েছেন সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশ্লেষকরা।
গত ২৯ জুলাই দুপুরে ঢাকার কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের অদূরে বিমানবন্দর সড়কে (রেডিসন হোটেলের উল্টোদিকে) বাসচাপায় রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী দিয়া খানম মীম ও আব্দুল করিম নিহত হন। এরপর ওই দিন থেকেই নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন রাজধানীর বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলনের সপ্তম দিন গত ৪ আগস্ট জিগাতলা, ধানম-ি এবং সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকায় মাথায় হেলমেট পরে এবং অস্ত্র হাতে ছাত্রদের ওপর হামলা হয়েছিল। ঠিক তার পরের দিনই অর্থাৎ ৫ আগস্ট আবারও ওই এলাকায় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালানো হয়। সেই হামলার ছবি তুলতে গেলে সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকায় হামলার শিকার হন সাংবাদিকরা। মাথায় হেলমেট পরে, অস্ত্র ও লাঠি হাতে প্রকাশ্যেই মারধর করা হয় সংবাদকর্মীদের।
সেই সময় হামলার ঘটনার ও হামলাকারীদের ছবি মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায়। হামলার পর থেকেই উপস্থিত সংবাদকর্মী ও আহত সাংবাদিকদের দাবি ছিল, পুলিশের সামনেই সাংবাদিকদের ওপর বর্বর হামলা চালানো হয়েছে। কিন্তু সে সময় পুলিশের ভূমিকা নিষ্ক্রিয় ছিল।
সংবাদকর্মীদের ওপর চালানো এমন ন্যক্কারজনক হামলার প্রতিবাদ জানাতে রাস্তায় নামে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে), ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিসহ বেশ কিছু সাংবাদিক সংগঠন।
৬ আগস্ট হামলার প্রতিবাদে মানববন্ধন, ৭ আগস্টে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে হামলাকারীদের খুঁজে বের করার আহ্বান জানান সাংবাদিক নেতারা। একই সঙ্গে ব্যবস্থা না নিলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘেরাও কর্মসূচিরও ঘোষণা দেন তারা।
ওই ঘটনার সময় হামলায় আহত হয়েছিলেন অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) ফটোসাংবাদিক এ এম আহাদ, প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক আহমেদ দীপ্ত, ফ্রিল্যান্স ফটোসাংবাদিক পাঠশালার রাহাত করিম, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের আলোকচিত্রী মাহমুদুজ্জামান অভি, চ্যানেল আইয়ের সামিয়া রহমান, বণিক বার্তার পলাশ সিকদার, বিডি মর্নিংয়ের আবু সুফিয়ান, জনকণ্ঠের জাওয়াদ।
হামলার ঘটনায় যা বলেছিলেন দুই মন্ত্রী
সেই হামলার ঘটনার দুই দিন পর অর্থাৎ ৭ আগস্ট তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু সচিবালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেছিলেন, ‘কর্তব্যরত সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে যারা হামলা করেছে, তাদের শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের ছবি আমাদের হাতে এসেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে মৌখিকভাবে অনুরোধ করেছি এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য। তবে আমরা লিখিতভাবেও ব্যবস্থা নিতে বলব। এই হামলার ঘটনা দুঃখজনক।’
এরপর গত ১২ আগস্ট বুড়িচং উপজেলা সদরে ফায়ার সার্ভিস উদ্বোধন অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের ওপর হামলার বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, ‘যারা সাংবাদিকদের ওপর হামলা করেছে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। আমি প্রশাসনকে বলেছি ভিডিও ফুটেজ দেখে হামলাকারীদের চিহ্নিত করে দ্রুত সময়ে ব্যবস্থা নিতে।’
হামলার ঘটনায় যা বলেছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী
এ ঘটনার বিষয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়ার কাছে সাংবাদিকরা প্রশ্ন রেখেছিলেন যে, সাংবাদিক ও ছাত্রদের ওপর হামলাকারীদের গ্রেফতার করা হবে কি না?
ওই প্রশ্নের জবাবে আছাদুজ্জামান মিয়া বলেছিলেন, ‘কেউ অভিযোগ দিলে আমরা ব্যবস্থা নেব। আমরা নিজেরাও হামলাকারীদের চিহ্নিত করার চেষ্টা করছি।’
আর গত ১৩ আগস্ট পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. জাবেদ পাটোয়ারী এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময় সাংবাদিকদের ওপর হামলাকারীদের শনাক্ত করতে গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ কাজ করছে।
সাংবাদিকদের ওপর হামলাকারীদের চিহ্নিত করে গ্রেফতার করতে সময় লাগছে কেন-ওই সময়ে এমন প্রশ্নের জবাবে আইজিপি বলেন, ‘পুলিশ একসঙ্গে সবকিছু করতে পারে, এমনটি নয়। ডিবি চিহ্নিত করার কাজ করছে। এসব ঘটনায় জড়িতদের খুঁজে বের করতে ডিবির একজন অতিরিক্ত কমিশনারকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।’
আইজিপি আরও বলেন, ‘কমিটি তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পরই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
হামলাকারীদের বিচার না হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশ
জানতে চাইলে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক এবং অপরাধ বিশ্লেষক তৌহিদুল হক বলেন, ‘নিরাপদ সড়কের যে আন্দোলনটি হচ্ছিল সেটি আসলে সকলেরই আন্দোলন ছিল। এবার ঈদেও আমরা দেখলাম সড়কে কতগুলো প্রাণ ঝরে গেল। সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই এই আন্দোলনটি সবারই আন্দোলন ছিল। কিন্তু সেই আন্দোলনটি নানাভাবে পর্যবসিত হয়েছ, নানা দিকে মোড় নিয়েছে। আসলে আমাদের দেশের গণমানুষের যে আন্দোলন সেগুলো কখনো রাজনৈতিক মোড়কে, কখনো ধর্মান্ধতার জন্য অন্যদিকে ধাবিত হয়েছে।
আর হেলমেট পরিহিত অবস্থায় দায়িত্ব পালনকালে সংবাদকর্মীদের ওপরে যে হামলা হয়েছে, এর পরপরই সরকারের দুজন মন্ত্রী হামলাকারীদের গ্রেফতারের বা শনাক্তের যে কথাগুলো বলেছেন, আজ পর্যন্ত তার দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখছি না। এই ক্ষেত্রে একটা বিষয় দেখা যায়, এই ধরনের আন্দোলনে বিভিন্ন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীবর্গ বিভিন্নভাবে পরিচালিত করার প্রয়াস আন্দোলনের মধ্যে লক্ষণীয় ছিল।’
তৌহিদুল হক আরও বলেন, ‘সংবাদকর্মীদের মূল কাজ হচ্ছে বিভিন্ন ঝুঁকির মধ্য থেকে সংবাদ সংগ্রহ করা এবং তা পাঠকের সামনে উপস্থাপন করা। সেই কাজে যারা বাধা প্রদান করবে তারা যে দল, মতাদর্শের বা যে আদর্শেরই হোক না কেন, যদি তার বিচার সরকার বা রাষ্ট্র করতে না পারে, তবে দুটি দিক অনিশ্চিত হবে।
প্রথমত হলো, যারা এ ধরনের ঘটনা ঘটনায় তাদের সাহসটা বেড়ে যায়, তারা রাষ্ট্রের যে আইন সেই আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর চেষ্টা করে। আইন না মানার ক্ষেত্রে তাদের একধরনের অনীহা কাজ করে। তারা আইন-কানুন, রাষ্ট্রের মূল্যবোধসহ অন্যান্য বিষয়কে কখনোই তোয়াক্কা করতে চায় না।
দ্বিতীয়ত হলো, যারা পেশাদার সংবাদকর্মী আছেন, তাদের মধ্যেও এই ধরনের একটা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় সংবাদ সংগ্রহের আগ্রহটা অনেক কমে যাবে। কারণ কোনো পেশাই বলে না যে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেই কাজটি করতে হবে।
এর ফলে কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশ, সমাজ এবং সাধারণ মানুষ। কারণ সাধারণ মানুষ প্রকৃত তথ্য পাবে না। দেশ এবং সমাজ যখন প্রকৃত তথ্য না পাবে, তখন যারা নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে রয়েছে, তখন তারা সঠিকভাবে নীতি নির্ধারণী কাজগুলো করতে পারবে না।
এই জন্য সরকারের কাছে সবসময় অনুরোধ রাখা হয়, যে অপরাধ যারাই করবে, তার দলীয় পরিচয় যেটাই হোক না কেন, তাকে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। এর মধ্য দিয়ে সেই ব্যক্তি যেমন অপরাধ করার ব্যাপারে নিরুসাহিত হবে, তেমনি যাদের অপরাধমূলক কাজের মনোবৃত্তি আছে তারাও দূরে থাকবে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষকেন্দ্রিক আন্দোলনগুলোতে মানুষ সম্পৃক্ত হতে পারবে।’

Facebook Comments
Please follow and like us: