আগস্ট ৮, ২০১৯
পুরো কাশ্মীর যেন এক কারাগার গ্রেফতার চার শতাধিক নেতা# সাত লক্ষাধিক নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েন

# তিন দশকে ৯৫ হাজার কাশ্মীরি নিহত
# কোনো সরকারই জম্মু ও কাশ্মীরের অবস্থা পাল্টাতে পারে না : কংগ্রেস
# ভারতের অবৈধ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে লড়বে পাকিস্তান
ক্রাইমর্বাতা ডেস্কিরেপাট: : বিশ্বের সবচেয়ে সামরিকীকৃত এলাকা মনে করা হয় ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু-কাশ্মীরকে। সেনাবাহিনী, আধা-সামরিক বাহিনী ও পুলিশ সদস্য মিলিয়ে সেখানে ৭ লক্ষাধিক নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্য মোতায়েন রয়েছে। সোমবার রাজ্যটির স্বায়ত্তশাসন ও বিশেষ অধিকার বাতিলের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে পুরো উপত্যকাকে কারাগারে পরিণত করেছে ভারত সরকার। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে’র খবরে বলা হয়েছে, হোটেল, গেস্ট হাউস, সরকারি ও বেসরকারি ভবনকে অস্থায়ী কারাগার বানানো হয়েছে। গ্রেফতার করা হয়েছে ৪ শতাধিক রাজনীতিক, উপদেষ্টা ও স্বাধীনতাপন্থী নেতাদের। পুরো উপত্যকা যেন পরিণত হয়েছে এক কারাগারে। ইন্ডিয়া টুডে।
সরকারের নির্দেশ অনুসারে, চেন্তৌর, হারি নিবাস, ফরেস্ট গেস্ট হাউসের মতো হোটেল ও গেস্ট হাউস এবং সরকারি ও বেসরকারি ভবনকে অস্থায়ী কারাগার বানানো হয়েছে। সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ওমর আব্দুল্লাহ ও মেহবুবা মুফতিকে গ্রেফতার করে হরি নিবাসের পৃথক দু’টি কটেজে রাখা হয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ সব নেতাকেই গ্রেফতার করা হয়েছে। বাদ পড়েছেন শুধু ড. ফারুক আব্দুল্লাহ ও ৯১ বছরের স্বাধীনতাপন্থী নেতা সৈয়দ আলি গিলানি। গত মঙ্গলবার মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলার সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন ফারুক আব্দুল্লাহ। ন্যাশনাল কনফারেন্সের নেতা ও সাবেক মুখ্যমন্ত্রীর বাবার অভিযোগ, সরকার তাকে গৃহবন্দি করেছে। যদিও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ তা অস্বীকার করেছেন।
শ্রীনগর থেকে নির্বাচিত এমপি ফারুক আব্দুল্লাহ বাড়ির পেছনের গেইটে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি অভিযোগ করেন, লোকসভায় ৩৭০ ধারার বিলোপ নিয়ে আয়োজিত ভোটাভুটিতে তাকে অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হয়নি।
জম্মু-কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রীর নিরাপত্তা কর্মকর্তা শাফকাত খান এ সময় ফারুক আব্দুল্লাহের বাসার বাইরে অবস্থান করছিলেন। তিনি দাবি করেন, প্রবীণ এই নেতাকে তার গুপকার বাড়িতে নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় রাখা হয়েছে। তাকেও বাড়িতে প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে না।
ফারুক আব্দুল্লাহ বলেন, মোদি সরকারের এই পদক্ষেপ একেবারেই অসাংবিধানিক। ৩৭০ ধারার জন্য বুকে গুলী নিতে রাজি আছি। আমি জানি না কোথায় আছে আমার ছেলে। সরকার আমাকে গৃহবন্দি করে রেখেছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ লোকসভায় দাবি করেছেন ফারুক আব্দুল্লাহকে গৃহবন্দি করা হয়নি। কিন্তু এটা স্পষ্ট যে তার চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। মঙ্গলবার সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে বাড়ি থেকে বের হতে চাইলে বাধা প্রাপ্ত হন তিনি।
সূত্রের বরাত দিয়ে ইন্ডিয়া টুডে লিখেছে, মেহবুবা মুফতি দুই-তিন পোশাক সঙ্গে নিয়ে গ্রেফতার মেনে নিয়েছেন। কিন্তু তার দুই মেয়ে সাক্ষাৎ করতে চাইলে প্রত্যাখ্যান করা হয়। অন্যদিকে, ওমর আব্দুল্লাহ কেঁদেছেন।
জম্মু-কাশ্মীর পুলিশের ডিজি দিলবাগ সিং বলেন, প্রশাসনের নির্দেশে রাজনৈতিক নেতাদের গৃহবন্দি রাখা হয়েছে।
সূত্র জানায়, রাজনৈতিক নেতাদের সহসাই মুক্তি মিলছে না। যেসব নেতা উসকানিমূলক বক্তব্য দিতে পারেন তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এই বড় ধরনের গ্রেফতার অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে যাতে করে কোনও প্রতিবাদ না হয়।
তিন দশকে ভারতীয় বাহিনীর হাতে ৯৫ হাজার কাশ্মীরি নিহত
কাশ্মীরে ভারতীয় বাহিনী গত তিন দশকে ৯৫ হাজার ২৩৮ জন কাশ্মীরি স্বাধীনতাকামীকে হত্যা করেছে। ১৯৮৯ সালের জানুয়ারি থেকে এ হিসাব ধরা হয়েছে। এ সময়ে সাত হাজার ১২০ জনকে কারাবন্দি রাখা হয়েছে।
কাশ্মীরি গ্লোবালের এক খবর বলছে, ১১ হাজার ১০৭ নারী ভারতীয় বাহিনীর নিগৃহের শিকার হয়েছেন। এক লাখ ৯ হাজার ১৯১টি আবাসিক ভবন ও স্থাপনা ধ্বংস করা হয়েছে।
আট হাজার কাশ্মীরিকে কারা হেফাজতে নেয়ার পর এখন পর্যন্ত তাদের কোনো খোঁজ মেলেনি বলে খবরে উল্লেখ করা হয়েছে।
কেবল চলতি বছরেই পিএইচডি গবেষক, প্রকৌশল বিদ্যার শিক্ষার্থীসহ ৩৫০ কাশ্মীরিকে হত্যা করেছে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা।
নিহতদের মধ্যে রয়েছেন- হুররিয়াত নেতা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ রাফি ভাট, ড. মান্নান বসির ওয়ানি, ড. সবজার আহমাদ সোফি, ড. আবদুল আহাদ ঘানি, এমফিল গবেষক আদিমাদ ফয়েজ মালি, ২৪ বছর বয়সী প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইশা ফাজালি, স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী সাইয়েদ ওয়াশি সফি শাহ, আসিফ আহমেদ মালিক, মীর হাফিজুল্লাহ, তারিক আহমেদ ঘানি।
এ বছরেই শিশু, তরুণ, শিক্ষার্থী, নারী ও হুররিয়াত নেতাসহ দুই হাজার ৩৪৮ জনকে আটক করা হয়েছে।
প্রতিরোধ নেতা সাব্বির আহমাদ শাহ, নাঈম আহমেদ খান, সাইয়োদ আসিয়া আন্দ্রাবি, ফেহমিদা সোফি, নাহিদা নাসরিন, আলতাফি আহমেদ শাহ, আইয়াজ মুহাম্মদ আকবর, পীর সাইফুল্লাহ, রাজা মেরাজুদ্দিন কালওয়াল, শাহিদুল ইসলাম, ফারুক আহমেদ ধর, মুহাম্মদ আসলাম ওয়ানি, ব্যবসায়ী জহুর ওয়াতালি, সাঈয়েদ শহীদ শাহ, গুলাম মুহাম্মদ ভাটকে দিল্লির তিহার কারাগারে আটকে রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া বহু কাশ্মীরি ভারতের বিভিন্ন কারাগারে ধুঁকে ধুঁকে মরছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৬ সালের ৮ জুলাই স্বাধীনতাকামী তরুণ নেতা বুরহান ওয়ানিকে বিচারবহির্ভূত হত্যা করা হয়।
মেহবুবা মুফতির সঙ্গে কাউকে দেখা করতে দেওয়া হচ্ছে না
ভারতের জম্মু-কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতিকে নির্জন কারাবাসে রাখা হয়েছে। তার সঙ্গে দলীয় নেতাকর্মী ও আইনজীবীদের দেখা করা অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। গতকাল বুধবার ভারতীয় সম্প্রচারমাধ্যম এনডিটিভিকে এ কথা জানিয়েছেন তার মেয়ে ইলতিজা জাবেদ। জম্মু-কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন ও বিশেষ মর্যাদা বাতিলের পর গত সোমবার গ্রেফতার করা হয়েছে রাজ্যটির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতিকে। গত রবিবার মধ্যরাত থেকেই গৃহবন্দি ছিলেন তিনি।
ভারতীয় সংবিধানের যে ৩৭০ নম্বর অনুচ্ছেদে কাশ্মীরকে স্বায়ত্তশাসিত রাজ্যের মর্যাদা দেওয়া হয়েছিলো, গত সোমবার সেটি বাতিলের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। ওইদিন (৫ আগস্ট) প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সাক্ষাতের পর এ ঘোষণা দেন তিনি। পরে ভারত শাসিত কাশ্মীরে মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ ও কারফিউ জারির মধ্যে দেশটির পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষে বিরোধীদের তীব্র বাধা ও বাগ-বিতন্ডার মধ্যেই জম্মু-কাশ্মীর রাজ্যকে কেন্দ্রশাসিত দুইটি অঞ্চলে পরিণত করার বিলটি পাস হয়। গ্রেফতার করা হয় সাবেক মুখ্যমন্ত্রী, নির্বাচিত রাজনীতিবিদকে। পরে গত মঙ্গলবার (৬ আগস্ট) দেশটির পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ লোকসভায়ও বিলটি পাস হয়।
ইলতিজা জাবেদ বলেন, ‘গতকাল (৬ আগস্ট) তার মাকে (মেহবুবা মুফতি) নিয়ে যাওয়া হয়েছে। হরি নিবাস নামে পরিচিত সরকারি গেস্টহাউজে তাকে বন্দি করে রাখা হয়েছে। আমাদের তার সংস্পর্শে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। দেখা করতে দেওয়া হয়নি। টেলিফোন ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ থাকায় তার সঙ্গে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রয়েছে’। মোবাইল ও টেলিফোনের নেটওয়ার্ক বন্ধ থাকায় অডিও বার্তার মাধ্যমে এনডিটিভিকে এ তথ্য জানান ইলতিজা।
ইলতিজা বলেন, মেহবুবাকে নির্জন কারাবাসে রাখা হয়েছে। আমার মার সঙ্গে রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও আইনজীবীদের দেখা করার অনুমতি দেয়া হচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, এটা শুধু আমার মায়ের সঙ্গে করা হচ্ছে তা নয়, সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ওমর আব্দুল্লাহর সঙ্গেও একই আচরণ করা হচ্ছে। আমি মনে করি, ভারত সরকার বুঝে গেছে তারা অন্যায় করেছে। তারা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সঙ্গে অপরাধী ও দুর্বৃত্তের মতো ব্যবহার করছে।
জম্মু-কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন ও বিশেষ সুবিধা বাতিলের পর গত সোমবার গ্রেফতার করা হয়েছে রাজ্যটির দুই সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ওমর আব্দুল্লাহ ও মেহবুবা মুফতিকে। কাশ্মীরের পিপলস কনফারেন্সের দুই নেতা সাজ্জাদ লোন এবং ইমরান আনসারিকেও বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। গত রবিবার মধ্যরাত থেকেই গৃহবন্দি ছিলেন তারা। পরে গত সোমবার মেহবুবাকে কাশ্মীরের রাজধানী শ্রীনগরের কাছে সরকারি গেস্টহাউজে নেওয়া হয়।
গতকাল (৬ আগস্ট) পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে জম্মু-কাশ্মীরকে পুনর্গঠন বিল উপস্থাপনের সময় উচ্চকক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে পাস হওয়ায় সবাইকে ধন্যবাদ জানান দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, এটা ভারতের জন্য ঐতিহাসিক মুহূর্ত।
৩৭০ ধারা বাতিলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে পিটিশন
জম্মু-কাশ্মীরকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল ঘোষণা করতে মোদি সরকারের নেয়া সাম্প্রতিক পদক্ষেপকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে পিটিশন দায়ের করেছেন এম.এল শর্মা নামের এক আইনজীবী। তার দাবি, এ ব্যাপারে যে পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে, তা ‘অসাংবিধানিক’। জরুরি ভিত্তিতে ওই মামলার শুনানির আবেদনও করেছেন শর্মা।
গত সোমবার ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের মধ্য দিয়ে কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসনের অধিকার কেড়ে নেওয়ার পাশাপাশি জম্মু-কাশ্মীরের প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে রাজ্য থেকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করতে রাজ্যসভায় বিল পাস করে বিজেপি সরকার। পরদিন গত মঙ্গলবার লোকসভায়ও পাস হয় বিলটি। জম্মু-কাশ্মীর পুনর্গঠন বিল ২০১৯ নামের এ বিলের আওতায় জম্মু-কাশ্মীরকে দু’ভাগ করে দুটি পৃথক কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল পরিণত করার কথা বলা হয়েছে। জম্মু-কাশ্মীর ও লাদাখ হবে পৃথক কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল।
কেন্দ্রীয় সরকারের এমন সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে মঙ্গলবার (৬ আগস্ট) সর্বোচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হন আইনজীবী শর্মা। তার যুক্তি হলো, ৩৭০ অনুচ্ছেদ খারিজ করতে গেলে জম্মু-কাশ্মীরের বিধানসভায় তা নিয়ে আলোচনা করতে হতো। কিন্তু, তা না করেই একতরফাভাবে ওই অনুচ্ছেদ বাতিল করা হয়েছে বলে দাবি তার। অবশ্য, মোদি সরকারের পাল্টা যুক্তি হলো, ৩৭০ অনুচ্ছেদ অস্থায়ী। তা যে কোনও সময় বাতিল হয়ে যেতে পারে। আর সেই ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে রাষ্ট্রপতিকেই। সরকারের দাবি হলো, জম্মু-কাশ্মীরে এখন আর বিধানসভা নেই। সেখানে রাষ্ট্রপতির শাসন চলছে। তাই রাষ্ট্রপতি ওই নির্দেশিকা জারি করেছেন।
সোমবারই সাবেক আইএএস শাহ ফয়সালের তৈরি নতুন দল জম্মু-কাশ্মীর পিপলস মুভমেন্ট জানিয়েছিল, তারা ৩৭০ ধারা বাতিলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে যাবে। ওই দিনই দলের নেত্রী শেহলা রশিদ বলেন, ‘রাষ্ট্রপতির নির্দেশিকাকে চ্যালেঞ্জ করে আমরা সুপ্রিম কোর্টে যাব।’ তার আগেই অবশ্য শীর্ষ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন আইনজীবী এমএল শর্মা। বুধবার (৭ আগস্ট) এ নিয়ে শুনানি হতে পারে।
কোনও সরকারই জম্মু-কাশ্মীরের অবস্থা পাল্টাতে পারে না -কংগ্রেস
ভারতের বিরোধী দল কংগ্রেস বলেছে, জম্মু-কাশ্মীর ভারতের সঙ্গে একীভূত হয়েছিল একটি রাজ্য হিসেবে। কোনও সরকারের ক্ষমতা নেই এই অবস্থা পরিবর্তন বা দ্বিখণ্ডিত করা অথবা কোনও অংশকে কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলে পরিণত করার। মঙ্গলবার কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকের এই অবস্থান জানানো হয়েছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি এ খবর জানিয়েছে।
কাশ্মীর ইস্যুতে কেন্দ্রীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এই সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে দলের অবস্থান ঠিক করতে বৈঠকে বসে কংগ্রেসের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক সংস্থা। বৈঠকে কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্তকে একতরফা, নির্লজ্জ ও সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক ধারার বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
দীর্ঘ বৈঠকে কংগ্রেসের সিদ্ধান্তে উল্লেখ করা হয়েছে, জম্মু ও কাশ্মীর ভারতের সঙ্গে একীভূত হয়েছিল একটি রাজ্য হিসেবে এবং কোনও সরকারের ক্ষমতা নেই এই অবস্থার পরিবর্তন বা বিভক্ত বা কোনও এলাকাকে কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলে পরিণত করার।
নির্বাচনে ভরাডুবির পর নেতৃত্ব নিয়ে সংকটে থাকা কংগ্রেস কাশ্মীর ইস্যুতে দলের সবাইকে একই অবস্থানে নিয়ে আসতে চাইছে। এ লক্ষ্যেই দল এই অবস্থান নিলো। যদিও দলের অবস্থানের বিরুদ্ধে বিজেপির এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন কয়েকজন কংগ্রেস নেতা। সোমবার সরকার সিদ্ধান্ত জানালেও বুধবার এসে কংগ্রেস তাদের অবস্থান জানালো। যদিও এখন কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধী কোনও আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেননি। সদ্য সাবেক সভাপতি রাহুল গান্ধী টুইটারে নিজের অবস্থান জানিয়েছেন।
রাহুল লিখেছেন, জম্মু-কাশ্মীরকে একতরফাভাবে দ্বিখণ্ডিত করে, নির্বাচিত নেতৃবৃদ্ধকে কারাবন্দি ও সংবিধান লঙ্ঘন করে জাতীয় সংহতির উন্নতি সম্ভব হবে না। এই দেশটি জনগণের দ্বারা তৈরি হয়েছে, এটা জমির কোনও প্লট নয়। কার্যনির্বাহী ক্ষমতার অপব্যবহার আমাদের জাতীয় সুরক্ষার জন্য মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে।
কাশ্মীর নিয়ে ভারতের ‘অবৈধ সিদ্ধান্তের’ বিরুদ্ধে লড়বে পাকিস্তান
জম্মু-কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন প্রত্যাহার করার ভারতীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে লড়ার অঙ্গীকার করেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান।
ভারতের এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে মন্তব্য করেছেন তিনি, জানিয়েছে বিবিসি।
ভারত কাশ্মীরীদের জাতিগতভাবে নির্মূল করতে পারে, তিনি এমন আশঙ্কা করছেন বলেও জানিয়েছেন ইমরান। সোমবার ভারতের সরকার যে সিদ্ধান্তটি ঘোষণা করেছে সে বিষয়ে ‘বিশ্বকে জানাতে’ চান বলেও জানিয়েছেন তিনি।
ইমরান বলেন, “জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে আমরা এখন এটি পর্যালোচনা করে দেখছি, এটি সাধারণ পরিষদে তুলবো আমরা, সব ফোরামেই রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে আলোচনা করবো, এটি গণমাধ্যমে তুলে ধরবো এবং বিশ্বকে জানাবো।”
জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা রদ করার মাধ্যমে ভারত মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কাশ্মীরের জনসংখ্যাতাত্ত্বিক চেহারা পরিবর্তনের সুযোগ পাবে, তিনি এমনটি মনে করছেন বলে জানান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী।
“আমি শঙ্কিত, এখন কাশ্মীরে জাতিগত নির্মূল করা শুরু হতে পারে। তারা স্থানীয়দের সরিয়ে অন্যদের এনে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ বানাতে পারে, যেন স্থানীয়রা দাসে পরিণত হয়,” বলেন তিনি।
এর আগে পাকিস্তানের ক্ষমতাধর সেনাপ্রধান জানান, তার সৈন্যরা কাশ্মীরীদের ‘ন্যায্য সংগ্রামে’ তাদের পাশে থাকবে।
প্রতিবেশী চীনও ভারতের সিদ্ধান্তকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বর্ণনা করে এর বিরোধিতা করবে বলে জানিয়েছে।
ভারত সরকার জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল করার পর থেকে অঞ্চলটি অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। কাশ্মীরের টেলিযোগাযোগ ও গণমাধ্যম বন্ধ রাখা হয়েছে, এর সঙ্গে যোগ হয়েছে কারফিউ।
চীনকে পাল্টা হুঁশিয়ারি ভারতের
জম্মু-কাশ্মীর পুনর্গঠন বিল-২০১৯ এর আওতায় লাদাখকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করার সিদ্ধান্তকে নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে দাবি করেছে ভারত। এ ব্যাপারে মন্তব্য না করতে চীনকে হুঁশিয়ারি দিয়েছে দেশটি। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের বেইজিং সফরকে সামনে রেখে গত মঙ্গলবার এ সতর্ক বার্তা দেওয়া হয়। আগামী ১১ আগস্ট থেকে ১৩ আগস্ট পর্যন্ত জয়শঙ্করের চীন সফরে থাকার কথা।
গত মঙ্গলবারই চীনের হুঁশিয়ারির জবাবে পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়েছে দিল্লি। জম্মু-কাশ্মীর পুনর্গঠন বিল ২০১৯-কে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে দাবি করা হয়। চীনকে এ ব্যাপারে মন্তব্য না করার আহ্বান জানিয়ে ভারতীয় পররাষ্ট্র দফতরের মুখপাত্র বলেন, ‘ভারত অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে কথা বলে না এবং অন্য দেশগুলোও একই পথ অনুসরণ করবে বলে আশা রাখি আমরা।’
বিরোধপূর্ণ এলাকা লাদাখের নিয়ন্ত্রণ বেইজিংয়ের হাতে হলেও ভারত বরাবরই একে নিজেদের এলাকা বলে দাবি করে আসছে। এ এলাকাকে ভারতের কেন্দ্র শাসনের আওতায় নিয়ে যাওয়ার ঘোষণার বিরুদ্ধে ক্ষোভ জানিয়ে মঙ্গলবার বেইজিং এর বিবৃতিতে বলা হয়েছিল,‘চীন-ভারত সীমান্তের পশ্চিম অংশে ভারতের প্রশাসনিক এখতিয়ারের মধ্যে চীনা এলাকার অন্তর্ভুক্তি নিয়ে বরাবরই বিরোধিতা করে আসছে বেইজিং। এ অবস্থানটি দৃঢ়,অবিচল ও কখনও পরিবর্তন হয়নি। সম্প্রতি দেশের অভ্যন্তরীণ আইন সংশোধনের মধ্য দিয়ে ভারতীয় পক্ষ একতরফা চীনের আঞ্চলিক সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ করে যাচ্ছে।’
ভারত কাশ্মীর চায়, কাশ্মীরিদের নয়
হাট-বাজার ও দোকান-পাট বন্ধ, স্কুল ও কলেজ ছুটি, সড়কে ব্যারিকেড ও বন্দুকহাতে নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্যরা সতর্ক প্রহরায় এবং শুধু হাসপাতালের জরুরি সেবায় নিয়োজিত যানবাহন চলাচল করছে।
কিছুদিন ধরেই ভারত সরকারের পদক্ষেপ নিয়ে কাশ্মীরে দুই ধরনের মনোভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছিল: ক্ষোভ অথবা আশা। কিন্তু কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন ও বিশেষ অধিকার বাতিল এবং জম্মু-কাশ্মীরকে দ্বিখ-িত করে কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলে পরিণত করার খবর শোনার পর মঙ্গলবার কাশ্মীরিদের চোখে-মুখে ফুটে উঠেছে শুধু পরাজয়ের চিহ্ন।
শ্রীনগরের লাল চকের কাছাকাছি এলাকার ৪৫ বছরের বাসিন্দা সাঈদ খান বলেন, এখন আর মত জানতে চেয়ে কী লাভ? সবকিছুই তো শেষ।
কাশ্মীরের রাজধানী যেন এক ভুতুড়ে শহর এবং খানের এই অনুভূতি অনেকের কথাতেই প্রতিধ্বনিত হচ্ছে: হোক তা বাটমালোর এক ফল বিক্রেতা বা জনমানবহীন ঈদগাহের পাশ দিয়ে ছেলে হাঁটিয়ে নেওয়া কোনও এক বাবা কিংবা রামবাগে ব্যারিকেডের পাশে প্রহরায় দাঁড়ানো এক পুলিশ সদস্য।
রবিবার থেকে কার্যত অচল শ্রীনগর। টেলিযোগাযোগ ও ইন্টারনেট বন্ধ, উপত্যকাজুড়ে বিধিনিষেধ এবং অতিরিক্ত সেনা মোতায়েনে শ্রীনগরে দখলকৃত কোনও শহর বলেই মনে হচ্ছে।
সাঈদ খান বলেন, ২০১৬ সালের বিক্ষোভের পর গত বছর পরিস্থিতির দারুণ উন্নতি হয়েছে। স্বাধীনতাপন্থীরা জেলে, কোনও ধর্মঘট বা হরতাল নেই, ইট-পাটকেল ছোঁড়ার ঘটনা খুব কম হয়েছে, স্কুলগুলো চলছিল, দোকান-পাট ছিল খোলা এবং পর্যটকদের আগমন বেড়েছিল। সবাই খুশি ছিল। কিন্তু একটি সিদ্ধান্তেই ভারতের পক্ষে থাকা সব কাশ্মীরিকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছে সরকার। আমি জানি না, কবে কখন আমরা এই সিদ্ধান্তের ভয়াবহতা থেকে মুক্তি পাবো।

Facebook Comments
Please follow and like us:
একই রকম সংবাদ


www.crimebarta.com সম্পাদক ও প্রকাশক মো: আবু শোয়েব এবেল

ইউনাইর্টেড প্রির্ন্টাস,হোল্ডিং নং-০, দোকান নং-০( জাহান প্রির্ন্টস প্রেস),শহীদ নাজমুল সরণী,পাকাপুলের মোড়,সাতক্ষীরা। মোবাইল: ০১৭১৫-১৪৪৮৮৪,০১৭১২৩৩৩২৯৯ e-mail: crimebarta@gmail.com