অক্টোবর ৩০, ২০১৯
তিন চিকিৎসকে চলছে শ্যামনগর উপজেলার ৫০ শয্যা হাসপাতাল

শ্যামনগর প্রতিনিধি: ‘এত বড় হাসপাতাল তবুও নেই কোন চোখের ডাক্তার, হাঁড়ের ডাক্তারও নেই। তাই বাধ্য হয়ে এখন স্ত্রীকে নিয়ে হাঁড়ের ডাক্তার দেখাতি যেতে হবে প্রায় ত্রিশ কি. মি. দুরের নলতার বেসরকারী হাসপাতালে’। শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের টিকিট কাউন্টারের সামনে দাঁড়ানো মহররম হোসেন আক্ষেপ করেই এসব কথা বলেন।

ক্ষুব্ধ মহররম হোসেনের দাবি কাঁধের যন্ত্রণায় কাতর অসুস্থ স্ত্রী তাসলিমাকে নিয়ে প্রায় ২২  কি. মি. দুরবর্তী পদ্মপুকুর পাখিমারা এলাকা থেকে এসেছেন সাত সকালে। কিন্তু টিকিট নেয়ার সময় অর্থপেডিক্স এর চিকিৎসক না থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে স্ত্রীকে নিয়ে পাশর্^বর্তী উপজেলার বেসরকারি হাসপাতালে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। নিজের চোখের সমস্যার জন্য পরবর্তী দিন তিনি নিজেই স্থানীয় একটি ক্লিনিকে বাইরে থেকে আসা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

এদিকে টাইফয়েড জ¦রে আক্রান্ত সত্তর বছরের বৃদ্ধা মা ও গাইনী সমস্যায় ভুগতে থাকা স্ত্রীকে নিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসা মো. ইউসুফের সমস্যা ভিন্নতর। বেলা সাড়ে ১০টায় মায়ের জন্য টিকিট নিয়ে দেড় ঘন্টা অপেক্ষার পরেও সিরিয়াল আসেনি। সেবা প্রত্যাশীদের দীর্ঘ লাইনের কারণে চিকিৎসকের সাক্ষাৎ পেতে বিলম্ব হচ্ছে জানিয়ে এ পল্লী চিকিৎসক বলেন, মাকে ডাক্তার দেখানোর পর স্ত্রীকে নিয়ে পাশের বেসরকারী হাসপাতালে ছুটতে হবে। শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গাইনীর কোন চিকিৎসক না থাকায় অন্যদের মতো তাকেও বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতালে যেয়ে চিকিৎসা নিতে হবে বলে জানান তিনি।

শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসা সেবা নিয়ে এমন হতাশা, ক্ষোভ ও অসন্তোষ শুধুমাত্র মহররম ও ইউসুফ হোসেনের নয়। বরং ৫০ শয্যা বিশিষ্ট সরকারি এ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা অধিকাংশেরই দাবি ‘চিকিৎসক সংকটে সেবা প্রত্যাশীরা চরম ভোগান্তীর শিকার হচ্ছেন।

তাদের অভিযোগ প্রয়োজনীয় সংখ্যাক চিকিৎসক না থাকার দরুণ রোগীদের ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসকের সাথে প্রথম সাক্ষাৎ এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নীরিক্ষা ও তার ফলাফলের ভিত্তিতে চিকিৎসাপত্র গ্রহণের জন্য একাধিকবার বাড়ি আর হাসপাতালে ‘টানা দিতে’ হচ্ছে। এছাড়া বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাবে অসংখ্যা রোগী প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা বঞ্চিত হচ্ছেন বলেও দাবি অনেকের।

সরেজমিনে শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পরির্দশনে দেখা যায় ঘঁড়ির কাটা বেলা বারটার ঘরে পৌছালেও নারী ও পুরুষ কাউন্টারের সামনে প্রচন্ড ভিড়। ইতিমধ্যে দুই শতাধিক টিকিট ছাড়া হলেও আরও প্রায় শতাধিক রোগী কিংবা তাদের অভিভাবকরা লাইনে দাড়িয়ে ‘বহির্বিভাগে’র টিকিট সংগ্রহ করছে।

এ সময়ে ১০৩, ১০৪ ও ১০৫ নম্বর কক্ষ তিনটিতে তিনজন চিকিৎসক ব্যস্ত সময় পার করছেন পুরাতন ও নুতন রোগীদের চিকিৎসা সেবা দিতে। মাঝেমধ্যে ওই তিন চিকিৎসকেরই কাউকে আবার জরুরী বিভাগসহ দোতলার পুরুষ ও মহিলা ওয়ার্ডে ভর্তি রোগীদের কাছে হাজিরা দিতে হচ্ছে। ফলে বহির্বিভাগে অপেক্ষমান রোগীসহ তাদের স্বজনদের অনেকেই অসন্তোষ্টি প্রকাশ করছে। কেউ কেউ আবার ধৈর্য্যচ্যুতির কারণে সরকারি এ হাসপাতাল ছেড়ে বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিকের দিকে ছুটছে।

শ^াসকষ্টজনিত সমস্যায় ভুগতে থাকা সাত মাস বয়সী শিশুকে নিয়ে সরকারি হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে যেতে উদ্যত গৃহবধু সাবেরা খাতুন জানান, টিকিট নিয়ে এক ঘন্টা যাবত লাইনে দাড়িয়েও ভিতরে যাওয়ার সুযোগ মেলেনি। এদিকে তীব্র গরমে সন্তানের শ^াসকষ্ট বেড়ে যাওয়ায় তাকে পাশের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে নেয়ার কথা জানান কাশিমাড়ী থেকে আসা ঐ গৃহবধু। আগে থেকে ‘সিরিয়ালে’ থাকা অন্য রোগীরা ‘ছাড় দিতে’ সম্মত না হওয়ায় বাধ্য হয়ে সন্তানের কথা ভেবে সরকারি হাসপাতাল ছেড়ে বাইরে যাওয়ার কথা বলেন ঐ নারীর স্বামী মহব্বত আলী।

চিকিৎসকের সাক্ষাৎ লাভের প্রত্যাশায় অপেক্ষমানদের অনেকে জানান, সকালে এসে বেলা দশটায় টিকিট নিয়েও দুই ঘন্টায় চিকিৎসকের কক্ষে প্রবেশ করা যায়নি। হাসপাতালে থাকা সর্বসাকুল্যে মাত্র তিনজন চিকিৎসক বহির্বিভাগে রোগী দেখার কারণে এমন সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে বলে জানান তারা। তবে হঠাৎ করেই এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়নি উল্লেখ করে অনেক রোগীর স্বজনরা বলেন, হাতে গোনা কয়েকজন চিকিৎসক থাকায় দীর্ঘদিন ধরে এমন অচলাবস্থা চলছে শ্যামনগর হাপাতালে।

১০টায় টিকিট সংগ্রহ করে চিকিৎসকের কক্ষে জমা দিলেও দুই ঘন্টায় ডাক পড়েনি ১৬ মাস বয়সী সর্দি কাশিসহ জ¦রাক্রান্ত লাবিবের। লাবিবকে কোলে নিয়ে কক্ষের বাইরে মেঝেতে বসে অপেক্ষমান তার মা মরিয়ম বেগম জানান, ‘যে ডাক্তারকে দেখানোর জন্য টিকিট কাটিছি তিনি ভর্তি রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে কিছুক্ষন আগে নিজ কক্ষে ফিরেছে। রুমে ফিরে আবার খানিক ফাইলপত্রে সই স্বাক্ষর করার পর রোগী দেখতে শুরু করায় দুই ঘন্টায়ও ভিতর থেকে ডাক পড়েনি।

সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে ‘বিড়ম্বনা পোহাতে হচ্ছে’ জানিয়ে কয়েকজন আবার প্রশ্ন তুলেছেন চিকিৎসা সেবার মান নিয়েও। তাদের অনেকেরই দাবি প্রতিদিন প্রায় তিন শতাধিক রোগীকে দেখছেন মাত্র দুই তিনজন ডাক্তার। দ্রুত সময়ের মধ্যে এত রোগীকে দেখার কারনে অনেক রোগী ও তাদের স্বজনদের মধ্যে যথাযথ চিকিৎসা পাওয়ার বিষয়ে শংকা তৈরী হয়েছে। সরকারি হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নেয়ার পরও তাই ফুলবাড়িয়ার আজগর আলী ও ভুরুলিয়ার আব্দুর রশিদসহ অনেকে বেসরকারি হাসপাতাল থেকে দ্বিতীয়বার চিকিৎসা নিয়ে চিকিৎসা ব্যবস্থার বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করেছেন।

বেশ কয়েক রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকার কারনে অনেক ক্ষেত্রে ঝুঁকিপুর্ন অসংখ্যা রোগীকে শ্যামনগর থেকে বাইরে ‘রেফার্ড’ করা হয়। সে ক্ষেত্রে অনেক অসহায় এবং দরিদ্র রোগী এবং তাদের স্বজনদের মারাত্বক অসহায়ত্বের মধ্যে পড়তে হয়।

বংশীপুর এলাকা থেকে স্ত্রী রাশিদা ও নাতি আঁখিকে নিয়ে ডাক্তার দেখাতে আাসা ষাটোর্ধ্ব ফরমান আলী প্রায় দুই ঘন্টাতেও ডাক্তারের সাক্ষাৎ পাননি জানিয়ে বলেন, ‘সরকারি হাসপাতালে ডাক্তার নি’। তিনজন চিকিৎসক রোগী দেখায় দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করেও তাদের ডাক আসেনি। গত সপ্তাহে এসেও একই অভিজ্ঞতা নিয়ে ডাক্তার না দেখিয়ে বাড়ি ফিরতে হয়েছিল বলেও জানান ওই বৃদ্ধ।

প্রতিটি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকার দরুণ অনেকে সরকারি এ হাসপাতাল ছেড়ে রোগী নিয়ে বেসরকারি হাসপাতালে চলে যাচ্ছেন বলেও দাবি করেন লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা আনারুল ইসলাম এবং বুলবুল হোসেনসহ অন্যরা।

উপস্থিত রোগী এবং তাদের স্বজনদের অভিযোগ মূলত চিকিৎসক সংকটই শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অন্যতম প্রধান সমস্যা। সাড়ে তিন লাখেরও কাছাকাছি জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত উপকুলীয় এ জনপদের একমাত্র সরকারি স্বাস্থ্য সেবা কে›ন্দ্রের এমন দুরাবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে সরকারের স্বাস্থ্য সেবা কার্যক্রম নিয়ে। ৩০ থেকে ৫০ কি. মি. দুরবর্তী এলাকা থেকেও আসা রোগী এবং তাদের স্বজনদের দাবি মাতৃত্ব ও শিশুসহ সকল বিষয়ে সরকারি এ হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগ দিয়ে দারিদ্র পীড়িত এ জনপদের মানুষের স্বাস্থ্য সেবার মান উন্নয়ন ঘটানো হোক।

এবিষয়ে শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. ওমর ফারুক চৌধুরী জানান, ৫০ শয্যার এ হাসপাতালের জন্য নির্ধারিত ৩৪ জনের বিপরীতে চিকিৎসক রয়েছে মাত্র তিন জন। সেবা নিতে আসা রোগীরা কিছুটা ভোগান্তীর শিকার হচ্ছে- স্বীকার করে তিনি বলেন, তিনজন চিকিৎসক দিয়ে তিন লক্ষাধিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে যেয়ে রীতিমত হিমশিম খেতে হচ্ছে। সীমিত জনবল নিয়েও জরুরী বিভাগ, ওটি ও বহির্বিভাগে আগত রোগীদের চিকিৎসা দিতে সংশ্লিষ্টরা প্রানান্তকর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বলেও জানান এ চিকিৎসক।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও প. প. কর্মকর্থা অজয় কুমার সাহা বলেন, জনবল সংকটের কারণে কাক্সিক্ষত সেবা দিতে চিকিৎসকসহ স্টাফরা হিমশিম খাচ্ছে। ইতোমধ্যে জনবল চাহিদার তথ্য উর্ধ্বতনদের অবহিত করা হয়েছে। এছাড়া স্বল্প জনবল নিয়ে সেবার মান বৃদ্ধিও চেষ্টা চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, অতি প্রয়োজনীয় একটি এ্যাম্বুলেন্সসহ নুতন ভবন এবং বিভিন্ন ওয়ার্ডেও লাইট ও ফ্যানসমুহ ছাড়াও জরুরী কিছু বিষয়ে অবিলম্বে কাজ শুরু করা হবে

Facebook Comments
Please follow and like us:
একই রকম সংবাদ


www.crimebarta.com সম্পাদক ও প্রকাশক মো: আবু শোয়েব এবেল

ইউনাইর্টেড প্রির্ন্টাস,হোল্ডিং নং-০, দোকান নং-০( জাহান প্রির্ন্টস প্রেস),শহীদ নাজমুল সরণী,পাকাপুলের মোড়,সাতক্ষীরা। মোবাইল: ০১৭১৫-১৪৪৮৮৪,০১৭১২৩৩৩২৯৯ e-mail: crimebarta@gmail.com