ফেব্রুয়ারি ৭, ২০২০
শ্যামনগরের ত্রাস যুবলীগ নেতা হাফিজের বিরুদ্ধে শত অভিযোগ: গ্রেপ্তারে স্বস্তি

ক্রাইমবার্তা রিপোটঃ   শ্যামনগরের শীর্ষ সন্ত্রাসী একাধিক মামলার আসামী হাফিজুর রহমান ওরফে হাফিজকে গ্রেপ্তার করেছে শ্যামনগর থানা পুলিশ। ৬ ফেব্রুয়ারি ভোর রাতে শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ এলাকা থেকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও বর্তমান উপজেলা যুবলীগের যুগ্ম-আহবায়ক হাফিজ শ্যামনগর উপজেলা সদরের গোপালপুর গ্রামের মৃত আব্দুল হামিদ সরদারের ছেলে। তার বিরুদ্ধে হত্যা, ধর্ষণ, ডাকাতি, ছিনতাই, চুরি ও চাঁদাবাজিসহ নানা অভিযোগে শ্যামনগর থানায় ১২টি মামলা রয়েছে রয়েছে বলে পুলিশ নিশ্চিত করেছে।
এদিকে হাফিজের গ্রেপ্তারের খবরে এলাকাবাসী নাম প্রকাশ না করলেও স্বস্তির কথা জানিয়েছে। তাদের দাবি হাফিজের মত তার অপরাপর সহযোগীদের আইনের আওতায় এনে এলাকা থেকে সন্ত্রাসের মুলোৎপাটন করা হোক।
প্রসঙ্গত: উল্লেখ্য শ্যামনগরের আলোচিত ‘টপ টেরর’ রেজাউল ইসলাম ওরফে রেজাউল ওরফে ডরমেটর প্রায় তিন বছর পূর্বে পুলিশের সাথে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার পর হাফিজ এ জনপদের নুতন ত্রাস হিসেবে আবির্ভুত হয়। এসময় সে ঘের দখল, চাঁদাবাজি, সংখ্যালঘুর বাড়ি দখলের চেষ্টাসহ একের পর এক অপকর্ম করে রাতারাতি উপকূলীয় এ জনপদের স্বঘোষিত ‘ডন’ বনে যায়।
সরকার দলীয় রাজনৈতিক পরিচিতি থাকায় প্রশাসনও তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা না নিয়ে বরং হাফিজকে সমীহ করতে শুরু করার সুযোগে হাফিজ বন্দুকযুদ্ধে নিহত রেজাউলের জায়গা দখল করে নেয় এবং নিজস্ব একটি ক্যাডার বাহিনী গড়ে তোলে।
গোপালপুরের উজ্জল, আলামিন, রিপন, উত্তমসহ প্রায় বিশ-বাইশ জনের ঐ বাহিনী নিয়ে হাফিজ গোটা উপজেলাজুড়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে নানা অপরাধমুলক কর্মকান্ড শুরু করে। কিন্তু হাফিজ ও তার ক্যাডার বাহিনীর ভয়ে তটস্থ থাকায় ভুক্তোভোগীসহ স্থানীয় কেউই তার বিরুদ্ধে কেউ ‘টু’ শব্দটি পর্যন্ত করতে সাহস পেত না।
স্থানীয় সুত্রে জানা গেছে, প্রায় দুই বছর পুর্বে আলোচিত হাফিজ হরিনগর মালঞ্চ নদীর চরে শাহাজালাল নামের এক যুবককে পিটিয়ে মৃত ভেবে ফেলে যাওয়ার কয়েকদিন পর একই এলাকার এক সংখ্যালঘু পরিবারের বসতভিটা দখলের চেষ্টা চালায়। এঘটনার কয়েক মাস পূর্বে বিএনপি নেতা ও ঠিকাদার আশেক এলাহী মুন্নাকে হায়বাদপুর এলাকা থেকে প্রকাশ্যে অপহরণ করে শারীরিক নির্যাতনের পর পুলিশের হাতে উঠিয়ে দেয় হাফিজ।
গত ঈদ উল আযহার পরের দিন মাসুদুল আলম দোহা নামের এক আইনজীবীকে চন্ডিপুর এলাকার রাস্তার উপর ফেলে বেধড়ক মারপিট করে ঐ দৃশ্যের ভিডিও চিত্র ধারণ করে হাফিজ ও তার ক্যাডার বাহিনী।
অভিযোগ রয়েছে হাফিজ তার ‘গেছো বাহিনী’কে ব্যবহার করে গোপালপুর পিকনিক কর্নারে ঘুরতে আসা দর্শণার্থীদের মূল্যবান সরঞ্জামাদী ছিনতাইসহ পাশর্^বর্তী স্থানসমুহে আটকে রেখে নানাভাবে ব্লাকমেইলিং ও মুক্তিপণ আদায় করতো। কিন্তু তার প্রচন্ড দাপটের কারণে ভুক্তোভোগীরা কখনই প্রশাসন তো দুরের কথা নিজেদের পরিবারের কাছেও এসব তথ্য প্রকাশ করতো না।
একের পর এক এমন অসংখ্য সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চালিয়ে ও ঘটনা ঘটিয়ে ঘটিয়ে রাতারাতি শ্যামনগরের শীর্ষ সন্ত্রাসী বনে যাওয়া হাফিজ এক বছরেরও বেশি সময় পূর্বে বাদঘাটার উঠতি সন্ত্রাসী মোস্তফা ওরফে মোস্তকে নিজের বাহিনীতে ভিড়িয়ে নেয়। এরপর থেকে হাফিজ মোস্ত’র যুগলবন্ধনে হাফিজ বাহিনী সমগ্র শ্যামনগরের সম্পূর্ণ অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রণ নেয়।
অভিযোগ রয়েছে উপজেলা সদরের বাদঘাটা এলাকার প্রাণী সম্পদ অধিপ্তরের সামনের একটি দোকানঘর দখল করে তারা সেখানে কিং ষ্টার ক্লাব নামীয় একটি সংগঠন দাড় করিয়ে এলাকায় একক আধিপত্য নেয়। এর পর থেকে বাদঘাটা, গোপালপুর, ধুমঘাটসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বেশ কয়েকটি ডাকাতি ও ছিনতাই এবং চুরির ঘটনা সংঘটিত হলে সন্দেহের তীর হাফিজ বাহিনীর দিকে উঠে। অতি সম্প্রতি এক পুলিশ কর্মকর্তার বাড়িতে দিনে দুপুরে ডাকাতির ঘটনায় সন্দেহবশত ঐ বাহিনীর আলআমিন, হাসান, আকরাম হোসেন বাবু ও আব্দুর রাজ্জাক এবং জাহাঙ্গীর গ্রেপ্তার হলে ডাকাতি মামলার বেশকিছু আলামত উদ্ধার করে পুলিশ। পরবর্তীতে দুর্ধর্ষ্য এ বাহিনীর অন্যতম সদস্য সাইফুল, রফিকুল, রমজান, উজ্জ্বল গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে বাহিনী প্রধান হাফিজ ও তার একান্ত সহযোগী মোস্ত গা ঢাকা দেয়।
এলাকাবাসীর অভিযোগ জায়গা-জমি আর চিংড়ি ঘের দখল থেকে শুরু করে এহেন অপকর্ম নেই যা হাফিজ বাহিনী করেনি। সরকার দলীয় রাজনৈতিক পরিচয় থাকার পাশাপাশি প্রচন্ড দাপটের কারণে হাফিজ ও তার বাহিনীর বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে সাহস না পাওয়ার কারনে গত তিন বছর ধরে হাফিজ সমগ্র শ্যামনগর উপজেলাজুড়ে মুর্তিমান আতংক।
আরও জানা গেছে সম্প্রতি কৈখালী এলাকার এক স্কুল ছাত্রীকে রাস্তা থেকে উঠিয়ে নিয়ে গোপালপুর এলাকার সৌদি প্রবাসী জনৈক রনজু মিয়ার বাড়িতে কয়েকদিন আটকে রেখে ধর্ষণের অভিযোগে হাফিজের বিরুদ্ধে মামলা হয়। এযাত্রায়ও হাফিজ প্রভাব খাটিয়ে অপহরণের শিকার কিশোরীর দাদা নহর আলীকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করিয়ে তার বিরুদ্ধে ঐ মামলা প্রত্যাহারে বাধ্য করে।
অভিযোগ রয়েছে পুলিশের সোর্স হিসেবে কর্মরত জনৈক মটর সাইকেল চালক কোহিনুর, মাসুদসহ সীমান্তবর্তী এলাকার একাধিক ব্যক্তির মাধ্যমে ভারত থেকে চোরাই পথে গরু ও মাদকদ্রব্য আনিয়ে হাফিজুর ও তার সহযোগী মোস্ত উপজেলার বিভিন্ন অংশে মাদকদ্রব্য সরবরাহ করে।
ইতিপুর্বে ছাত্রলীগ সভাপতি থাকার সময়ে ইয়াবা সেবনরত ছবি ফেসবুকে দিয়ে ব্যাপক সমালোচনার শিকার হন হাফিজুর। সম্প্রতি তার প্রধান সহযোগী মোস্তফা ওরফে মোস্ত’র মাদক সেবনের একটি ছবি প্রকাশ্যে এলে সদর ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে তাকে অব্যাহতি দেয়া হয়।
বিভিন্ন সুত্রে জানা গেছে হাফিজের বিরুদ্ধে শ্যামনগর থানায় ১২টি মামলা থাকার কথা পুলিশ জানালেও খুলনার সোনাডাঙা থানাসহ দেশের বিভিন্ন থানায় হাফিজুরের বিরুদ্ধে আরও বেশ কিছু মামলা রয়েছে। নির্ভরযোগ্য একাধিক সুত্র জানিয়েছে গত কয়েক মাসে পুলিশের ব্যাপক তৎপরতোর পর থেকেই হাফিজ ও প্রধান সহযোগীসহ আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যায়। এক পর্যায়ে পরিস্থিতি উপলব্ধি করে হাফিজ ও মোস্ত’র শেল্টারদাতা শ্যামনগরের এক রেষ্টুরেন্ট ব্যবসায়ী নিজ ভাগ্নে মোস্তকে স্বপরিবারে ভারতে পাঠিয়ে দেয়। তবে সরকার দলীয় গুরুত্বপূর্ণ নেতা হওয়ার পাশাপাশি এলাকায় ব্যাপক প্রভাব থাকার সুযোগে হাফিজ প্রকাশ্যে না এলেও মানুষের নজরদারি এড়িয়ে এলাকায় অবস্থান করছিল। যার প্রেক্ষিতে পুলিশ গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বুধবার ভোর রাতে তাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। এদিকে হাফিজের গ্রেফতারের খবরে গোটা এলাকার মানুষের মাঝে স্বস্তি ফিরে এলেও জামিনে বের হয়ে হাফিজ তার বিরুদ্ধে মুখ খোলা প্রতিপক্ষদের উপর চরম প্রতিশোধ নিতে পারে-এমন আশঙ্কার কথা জানিয়ে এলাকাবাসী তার বিরুদ্ধে মুখ খুলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। এমনকি যারা হাফিজের এসব সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের বর্ণনা ও তথ্য দিয়েছে তারাও নিজেদের নাম পরিচয় প্রকাশে প্রতিবেদককে অনুরোধ করেন।
শ্যামনগর থানার অফিসার ইনচার্জ মো. নাজমুল হুদা এবং ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইয়াছিন আলম জানিয়েছে একটি ধর্ষণ মামলায় গ্রেপ্তারী পরোয়ানা থাকায় তাকে বুধবার ভোর রাতে মুন্সিগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাকে বুধবার দুপুরে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে বলেও জানান শ্যামনগর থানার অফিসার ইনচার্জ

Facebook Comments
Please follow and like us:
একই রকম সংবাদ


চেয়ারম্যান : আলহাজ্ব তৈয়েবুর রহমান (জাহাঙ্গীর) -----------------সম্পাদক ও প্রকাশক ----- ------ মো: আবু শোয়েব এবেল ....... ...মোবাইল: ০১৭১৫-১৪৪৮৮৪ ------------------------- -

ইউনাইর্টেড প্রির্ন্টাস,হোল্ডিং নং-০, দোকান নং-০, শহীদ নাজমুল সরণী,সাতক্ষীরা অফিস যোগাযোগ ০১৭১২৩৩৩২৯৯ e-mail: crimebarta@gmail.com