শনিবার , ৮ আগস্ট ২০২০

অপরিকল্পিত চিংড়ি চাষের কারণে কর্মহীন ও উদ্বাস্তু হচ্ছে সাতক্ষীরার কয়েক লক্ষ মানুষঃ বাড়ছে স্বাস্থ্য ঝুঁকি# হুমকিতে জীববৈচিত্র# হ্রাস পাচ্ছে খাদ্য শস্য উৎপাদন

আবু সাইদ বিশ্বাস: সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চল ঘুরে: কৃষি জমিতে লবণ পানি প্রবেশ, চিংড়ি চাষ ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে সাতক্ষীরাসহ উপকূলীয় জেলা সমূহে হাজার হাজার মানুষ কর্মহীন ও উদ্বাস্তু হচ্ছে। বাড়ছে স্বাস্থ্য ঝুঁকি। হুমকিতে পড়েছে জীববৈচিত্র। হ্রাস পাচ্ছে খাদ্য শস্য উৎপাদন। কর্মসংস্থানের অভাবে বেকারত্ব বাড়ছে। কৃষি জমিতে লোনা পানির ব্যবহার হ্রাস করে মিঠা পানির ব্যবহার বড়ানোর পরামর্শ দিলেন সাতক্ষীরা জেলা কৃষি উপপরিচালক বাদল চন্দ্র বিশ্বাস। তার দাবী সম্ভবনাময় এ জেলায় পরিকল্পনা মাফিক মৎস চাষ করতে পারলে কৃষিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসা সম্ভব।
আশির দশকে বানিজ্যিক চিংড়ি চাষের আগে এ জেলার মানুষ ছ’মাস মেয়াদি বাঁধ তৈরি করত যাতে নোনা পানি তাদের জমিতে না ঢুকতে পারে। তখন ওই এলাকায় জমিতে ধান হতো। আর ওই ধানের জমিতে একটু পানির মধ্যে নানা প্রজাতির মাছ হতো। নদীতেও প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। নোনা পানির প্রভাব বাড়ার কারণে জমি তার উৎপাদন ক্ষমতা হারিয়েছে। মানুষের খাদ্যের অভ্যাস বদল হয়ে গেছে। এই এলাকায় এক সময় প্রচুর গরু পালন করত। কিন্তু এখন আর তা দেখা যায় না। গোসম্পদ ধ্বংস, খাদ্যের অভ্যাস বদল, জমির উৎপাদন ক্ষমতা ধ্বংসের পথে।
সাতক্ষীরা জেলা কৃষি অধিদপ্তর সূত্র মতে বিগত ৫ বছরে আবাদ হয়নি এমন পতিত জমি ৪৫ হাজার ১১০ হেক্টর জমি। সাময়িক পতিত আছে আরো ৯১৬ হেক্টর জমি। নদী-নালা, খাল-বিল, পুকুর দ্বারা আবৃত্ত পানির নীচে আছে ৬২ হাজার ৪৯৪ হেক্টর জমি। বাড়ি ঘর,রাস্তা-ঘাট,হাটবাজার ও অন্যান্য অবকাঠামো ও স্থপনা রয়েছে এক লক্ষ ৪১ হাজার ৪২২ হেক্টর জমি। যার বেশিরভাগ অংশ এক সময়ে ফসলি জমি হিসেবে ব্যবহার হত। ফলে এসব সজমিতে এখন আর কৃষি ফসল হয়না। জেলাতে বর্তমানে মোট ফসলি জমি আছে ২লক্ষ ৭০ হাজার ২৯৩ হেক্টর জমি। এর মধ্যে আবাদ যোগ্য জমি আছে এক লক্ষ ৭৭ হাজার ৮১৪ হেক্টর জমি। শুধুৃ কাশিমাড়ী ইউনিয়নে অনাবাদি জমি আছে ৩১৫১ হেক্টর। এসব অনাবাদী জমির পরিমাণ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। যদিও সরকার অনাবাদী ও পতিত জমি চাষাবাদের আওয়তায় আনতে নানা ধরণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
শ্যামনগর উপজেলার কাশিমাড়ী ইউনিয়নের আব্দুল জলিল। পেষায় তিনি এক জন প্রভাসক। এরপও তিনি এক জন চাষী। তিনি জানালেন, দীর্ঘদিন চিংড়ি চাষ হলে জমিতে কৃষিকাজ আর হয় না। জমির উৎপাদন ক্ষমতা ধ্বংস হয়ে যায়। একনাগাড়ে চিংড়ি চাষ হলে এক সময় সেখানে চিংড়িও হয় না। ওই জমি বিরানভূমিতে পরিণত হয়। প্রথম যেখানে চিংড়ি চাষ শুরু হয়েছিল সেই সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ,শ্যামনগর,তালা দেবহাটাসহ আশপাশের বহু এলাকা এখন বিরানভূমি৷
দেশি জাতের যেসব মাছ ছিল সেগুলো শূন্য হয়ে গেছে। যেসব শাক-লতাপাতা হতো সেগুলোও শেষ হয়ে গেছে। খরার সময় নদ নদী,খাল বিল শুষ্ক থাকে।
নদীর পানি নিষ্কাশনের জন্য যে স্লুইস গেট নির্মাণ করা হয়েছিল সেই গেটগুলো বেআইনিভাবে দখল করে চিংড়ি চাষীরা লবণ পানি উঠানোর কাজ করে। এর ফলে গেটের মুখ উঁচু হয়ে যায়। সে কারণে নদীর পানি আর নামতে পারে না। এর ফলে ওই নদী দখল করে চিংড়ি ঘের করে এবং সেখানে আর উজানের পানি আসতে পারে না। ফলে নদী তার নাব্যতা হারিয়ে ফেলে এবং পলি পরে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছে সুন্দরবনের মধ্যে মাছের অভয়াশ্রম। বছরের চলতি সময় উজানের মিষ্টি পানি এবং বর্ষার কারণে সাগরের পানি নদীর পানিতে লবণাক্ততা একটু কম হয় তখন সুন্দরবনের মধ্যে মাছেরা ডিম ছাড়ে। নদী ভরাটের কারণে উজানের মিষ্টি পানি আর আসতে পারে না। সে কারণে লবণাক্ততা একটুও কমে না ফলে মাছেরাও আর ডিম দেয় না। মাছও এখন আর পাওয়া যায় না। আর মিষ্টি পানি আর লবণ পানির প্রভাবে সুন্দরবন অনেক সতেজ থাকে। এখন মিষ্টি পানি না আসায় সুন্দরবনও ধ্বংসপ্রপ্ত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, চিংড়ি ঘের প্রতিষ্ঠিত হয় এক ধরনের মারাত্মক সন্ত্রাসী শক্তির উপর ভিত্তি করে। এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সহযোগিতা নিয়ে। দখল-পালটা দখল নিয়েই এসব চিংড়ি ঘের প্রতিষ্ঠিত। সাতক্ষীরা উপকূলীয় এলাকায় মানুষকে হত্যা করা হয়েছে।চিংড়ি চাষের কারণে অন্য পেশাগুলো বিলুপ্ত হয়ে বহু মানুষ কর্মহীন ও উদ্বাস্তু ও হয়েছে।
সোমবার ঘূণিঝড় আম্পানে ক্ষতিগ্রস্থ শ্যামনগর উপজেলার কাশিমাড়ী সফর করেন সাতক্ষীরা জেলা কৃষি উপপরিচালক বাদল চন্দ্র বিশ্বাস। সেখানে তিনি কৃষকদের সাথে মতবিনিময় করেন। কৃষকরা কৃষি জমিতে লবণ পানি প্রবেশের ক্ষতিকর দিক সমূহ তুলে ধরেন।
এক জন চিংড়ি চাষি জানান, জমিতে নোনা পানি তুলে তিনি চিংড়ি চাষ করেন। এর ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘গ্রামের পুব দিকে তিন বছর আগে নোনা পানি তোলা বন্ধ করে দিলেও সেখানে ফসল ফলছে না। ফলে ফসল না হওয়ার ঝুঁকি নেওয়ার চেয়ে নোনা পানির চিংড়ি ভালো। কারণ তবু কিছু আয় হবে। কিছু না হলে তো একেবারেই শূন্য হাতে থাকতে হবে।’
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইন্সটিটিউটের মহাপরিচালকের দেয়া তথ্য অনুযায়ী ‘চলতি বোরো মৌসুমে জমি আবাদ লক্ষ্যমাত্রা প্রায় এক লাখ হেক্টর কম অর্জিত হয়েছে’; দ্বিতীয়ত, ঘূর্ণিঝড় আম্পানের আঘাতে ৪৭ হাজার হেক্টর জমির বোরো ফসল ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হওয়া।
তাছাড়া করোনা আতঙ্ক ও দীর্ঘায়িত খরার কারণে এবার আউশ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ৫-১৫ শতাংশ কম হয়েছে। যার প্রভাব সাতক্ষীরাতে ও পড়েছে।
গত এক দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল ভিত্তি এবং দারিদহ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধির হার কমে গেছে। কৃষিতে উৎপাদনের হার অধিকতর বৃদ্ধির লক্ষ্যে নব্বইয়ের দশকে সরকার থেকে বিভিন্ন প্রণোদনা দেয়ার ফলে ১৯৯৯-২০০০ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়ায় ৬ দশমিক ৯ শতাংশে (বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০০৫)।
স্বাধীনতার পর কোনো বছরে এটিই ছিল কৃষিতে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি। এরপর কৃষিতে প্রবৃদ্ধি হ্রাস পেতে থাকে। ২০০৭-০৮ এবং ২০০৮-০৯ অর্থবছরে কৃষিতে প্রবৃদ্ধি যথাক্রমে ৩ দশমিক ৮৭ এবং ৩ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশে নেমে এলেও ২০০৯-১০ অর্থবছরে তা বেড়ে ৬ দশমিক ৫৫ শতাংশে দাঁড়ায়। এরপর থেকে অনেকটা ধারাবাহিকভাবে কৃষিতে প্রবৃৃদ্ধির হার হ্রাস পাচ্ছে।
২০১০-১১, ২০১১-১২, ২০১২-১৩, ২০১৩-১৪, ২০১৪-১৫, ২০১৫-১৬, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে কৃষিতে প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়ায় যথাক্রমে ৩ দশমিক ৮৯, ২ দশমিক ৪১, ১ দশমিক ৪৭, ৩ দশমিক ৮১, ২ দশমিক ৪৫, ১ দশমিক ৭৯ এবং ১ দশমিক ৯৬ শতাংশে (বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০১৬, ২০১৭ এবং ২০১৮)।
‘বিগত ১০ বছরে কৃষি খাতে গড় প্রবৃদ্ধি হয়েছে গড়ে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ।’ আর বর্তমান অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের হিসাবে ‘বিগত ১০ বছরে কৃষি খাতে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ গড় প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে’ (অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতা ২০১৯-২০২০)।
সাতক্ষীরার কৃষিখাতকে এগিয়ে নিতে সংশ্লিষ্টরা কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। তারা বলেছেন ১.নামমাত্র মূল্যে কৃষককে সার, বীজ ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ সরবরাহ করতে হবে। এজন্য কৃষিতে সাবসিডির পরিমাণ যথেষ্ট বাড়াতে হবে। ২.দেশে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে মূল ভূমিকা পালনকারী শস্য ও ফসল উপখাতকে এ প্রণোদনা প্যাকেজে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ৩. চলতি আমন আবাদ থেকে যাতে সর্বোচ্চ ফলন পাওয়া যায়, সেজন্য সরকারের উচিত হবে আমন চাষীদের সম্ভাব্য সব ধরনের সহায়তা দেয়া।
৪.জেলা পরিকল্পনা ভিত্তিক অর্থাৎ মিঠা পানির জমিতে কৃষি ও মিঠা পানির সাছ ও লোনা পানির জমিতে চিংড়ি চাষ করতে হবে।

করোনার মতো মহামারীতে যখন অন্যসব খাত চরম ক্ষতিগ্রস্থ তখন কৃষি খাত অনেকটায় সচল। তাই সার্বিক কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধির নিম্নমুখী হার রোধ এবং ঊর্ধ্বমুখী করতে সরকারের সম্ভাব্য সব ধরণের সহযোগীতা ও প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করার দাবী এখাতে জড়িতদের।

About ক্রাইমবার্তা ডটকম

Check Also

এবার করোনা আক্রান্ত মাশরাফির মা-বাবাসহ পরিবারের ৪ সদস্য

ক্রাইমবার্তা রিপোট :  এবার করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন মাশরাফি বিন মর্তুজার বাবা গোলাম মোর্তুজা স্বপন ও  …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *