চরম ঝুঁকিতে আছে উপকূলীয় ২৫ জেলার প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ

আবু সাইদ বিশ্বাস: উপকূলীয় অঞ্চল সাতক্ষীরা থেকে: ঘূণিঝড় আম্পানের চার মাস পরও ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ সংস্কার না হওয়ায় ফুশে উঠেছে উপকূলীয় বাসী। উপকূলীয় এলাকার মানুষকে নদীর বেড়িবাঁধ ভাঙন ও জলাবদ্ধতার হাত থেকে রক্ষার দাবীতে ১০ হাজার ৮৮৭ জনের গণস্বাক্ষরসহ প্রধানমন্ত্রীকে স্মারকলিপি দিয়েছে সাতক্ষীরা জেলা নাগরিক কমিটি। ১৫ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে দুই ঘন্টাব্যাপি অবস্থান সমাবেশ শেষে বেলা ১টার দিকে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে উক্ত স্মারকলিপি প্রদাান করা হয়।

সূত্র জানায় ষাটের দশকে নির্মিত উপকূলীয় বেড়িবাঁধ যথাযথ সংস্কার ও সংরক্ষণের নামে লুটপাটের ফলে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উপকূলীয় মানুষের জীবন যাত্রা। সর্বশেষ সুপার সাইক্লোন আম্ফানের তান্ডবে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বেড়িবাঁধ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে অরক্ষিত হয়ে আছে। সাগরের জোয়ার-ভাটায় ডুবছে-ভাসছে প্রতিনিয়ত উপকূলীয় জনপদ। চরম ঝুঁকিতে আছে উপকূলীয় ২৫ জেলার প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ।

গবেষণা সূত্র জানায়, গত ৫০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ প্রাণহানি ঘটেছে ১৯৭০ সালের প্রাকৃৃতিক দুর্যোগে ৩ লাখ। এর আগে ১৯৬৫ সালে ঘণ্টায় ১৬১ কিলোমিটার গতি আসা ঘূর্ণিঝড়ে ১৯ হাজার ২৭৯ প্রাণহানি হয়। একই বছর ডিসেম্বরে ২১৭ কিলোমিটার গতিতে ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে ৮৭৩ প্রাণহানি হয়। ১৯৬৬ সালের অক্টোবরের প্রাকৃৃতিক দুর্যোগে ৮৫০ জনের প্রাণহানি হয়। ১৯৮৫ সালের মে মাসের ঘূর্ণিঝড়ের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১৫৪ কিলোমিটার। এর আঘাতে ১১ হাজার ৬৯ প্রাণহানি হয়। ১৯৯১ সালের এপ্রিলে ২২৫ কিলোমিটার গতিতে আসা ঘূর্ণিঝড়ের জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতা ছিল ৬ থেকে ৭.৬ মিটার। এই দুর্যোগে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৮২ প্রাণহানি হয়। ১৯৯৭ সালের মে মাসে ২৩২ কিলোমিটার বেগে আসা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ১৫৫ জনের প্রাণহানি ঘটে। ২০০৭ সালের নভেম্বরের সিডরে ২ হাজার ৩৬৩ জনের প্রাণহানি হয়। এই ঝড়ের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ২২৩ কিলোমিটার। ২০০৯ সালের মে মাসের আইলায় ১৯০ প্রাণহানি হয়। সর্বশেষ ২০২০ সালের ২০ মে ঘুর্ণিঝড় আম্পানে ২০ জনের প্রাণ হাণি হলেও ও বেড়িবাঁধসহ ফসলাদিও ব্যাপক ক্ষতি হয়।
২০০৯ সালের ২৫ মে ঘূর্ণিঝড় আয়লার পর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১০ সালের ২৩ জুলাই সাতক্ষীরার শ্যামনগরে আসেন। তিনি টেকসই বেড়ি বাঁধ নির্মাণ করার ঘোষণা দেন। তিনি বাঁধ কেটে, পাইপ ঢুকিয়ে এলাকার লোনা পানি তোলা বন্ধ করারও নির্দেশ দেন। কিন্তু দীর্ঘ ১২ বছরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সেই ঘোষণা আজও বাস্তবায়ন করা হয়নি।
জেলাবাসি মনে করেন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নদী ভাঙন ও জলাবন্ধতা কবলিত উপকূলীয় এলাকাকে ‘দুর্যোগ প্রবন এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করতে হবে। এই এলাকার উন্নয়নে পৃথক অথরিটি গঠন করতে হবে। দুর্যোগের কারণে এই এলাকা থেকে ব্যাপকহারে অভিবাসন বন্ধ করতে বিশেষ বরাদ্দ ও অর্থনৈতিক প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। জলাবদ্ধ ও ভাঙন কবলিত এলাকার দরিদ্র মানুষের জন্য স্থায়ী রেশনের ব্যবস্থা করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগকে মাথায় রেখে স্থায়ী, মজবুত ও টেকসই বেড়িবাঁধ পুন:নির্মাণ করতে হবে।

জলাবদ্ধতার হাত থেকে সাতক্ষীরা শহর বাঁচাতে পানি নিস্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে। জেলার সকল নদী-খালের জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক প্রবাহ যতদূর সম্ভব পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সকল বাঁধা অপসারণ করতে হবে। ডিএস/সিএস ম্যাপ অনুযায়ী নদী-খালের সীমানা নির্ধারণ করে অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ করতে হবে। ইছামতি নদীর সাথে মরিচ্চাপ-খোলপেটুয়া নদীর সংযোগস্থাপনকারী কুলিয়ার লাবন্যবতি ও পারুলিয়ার সাপমারা খালের দু’পাশের স্লুইস গেট অপসারণ করে জোয়ার-ভাটা চালু করতে হবে। ইছামতি থেকে মাদার নদীর (আদি যমুনা) প্রবাহ স্বাভাবিক করতে হবে।

সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক এসএম মোস্তফা কামাল জানান, টেকসই বাঁধ নির্মানে নতুন মেগাপ্রকল্প গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বাঁধ টেকসই করতে নকশা পরিবর্তন করা হচ্ছে। রক্ষণাবেক্ষণেও নেওয়া হচ্ছে নতুন পরিকল্পনা।এর মধ্যে খুলনার ১৪নং পোল্ডারে ৯৫৭ কোটি ৩৮ লাখ টাকা ও ৩১নং পোল্ডারে এক হাজার ২০১ কোটি ১২ লাখ টাকা এবং সাতক্ষীরার ৫নং পোল্ডারে তিন হাজার ৬৭৪ কোটি তিন লাখ ও ১৫নং পোল্ডারে ৯৯৭ কোটি ৭৮ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। চলতি অর্থবছরে এসব প্রকল্পের কাজ শুরু হবে। তা শেষ হবে তিন বছরের মধ্যে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, অতীতে বেড়িবাঁধ সংস্কার, নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণে স্থানীয় জনগণের মতামত উপেক্ষিত হয়েছে। ফলে প্রতিবছর সরকারি কোটি কোটি টাকা ব্যয় হলেও টেকসই বেড়িবাঁধ হয়নি। তাদের প্রধান দাবি টেকসই বাঁধ। সেই লক্ষ্যে বেশ কিছু সুপারিশও তুলে ধরা হয়েছে।

 

Check Also

কলারোয়ায় মাদকা সন্ধেহে আটক ২৬ জনের মধ্যে ১৫ জনের দেহে মাদক পজেটিভ

কলারোয়া প্রতিনিধিঃ  বুধবার ২৩/০৯/২০২০ ইং তারিখ পুলিশ সুপার, সাতক্ষীরা, জনাব মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান পিপিএম (বার) …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *