শ্যামনগরে ভাঙন আতঙ্কে ৫০হাজার মানুষ

সামিউল মনির, শ্যামনগর: সিগনাল উঠলি ধড়ে (দেহে) আর জান থাকে না। ঘর দোর (দোয়ার) ফিলিয়ে বাচ্চা কাচ্চা নে সাইক্লোন শেল্টারে ছুটতি হয়। মরমর অবস্থায় কাটে প্রতিটা মুহূর্ত। কথাগুলো বলেন, দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরার চকবারা গ্রামের জেসমিন পারভীন। এলাকা এখন মানুষ বসবাসের উপযুক্ত নি-দাবি করে ঐ গৃহবধু আরও বলেন, ভাঙতি ভাঙতি বাঁধ এখন চিংড়ি ঘেরের আইল হুয়ে গেছে। এক্ষুণি ব্যবস্থা না নিলি আর এটটা আইলা হলি-ই, লাশ সব সাগরে ভেসে যাবে।

ডুমুরিয়া গ্রামের খসরুর রহমান জানান, নদীতে জোয়ারের চাপ আর আকাশে কালো মেঘ দিখা গেলি মরণের চিন্তা চেপি ধরে। ভাঙাচোরা বাঁধ নদীতে বিলীনের আতংকে সারা রাত দু’চোখ এক করতি পারিনে। সারা রাত বসি থাকতি হয়। অনেক সময় সাইক্লোন শেল্টারেও জায়গা মেলে না- উল্লেখ করে তিনি বলেন, ঝড়, বৃষ্টি, প্লাবনের সময় অনেকে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধেই আশ্রয় নেয়। গত আট-দশ বছর টানা ভাঙতেছে- জানিয়ে তিনি আরও বলেন, জোড়াতালির মেরামত ছাড়া কখনো এক কোদাল মাটি বাঁধের উপর পড়তি দেখিনি।

তবে শুধুমাত্র জেসমীন আর খসরুর না। বরং জীর্ণশীর্ণ বাঁধ ভেঙে মুহূর্তেই বানের পানিতে ভেসে যাওয়ার শংকায় গোটা গাবুরা জনপদের হাজারও মানুষ। চারপাশে ঘিরে থাকা উপকূল রক্ষা বাঁধের চরম দুরাবস্থা প্রতিনিয়ত ভীতসন্ত্রস্থ করে তুলছে তাদের। নদীর সাথে উচ্চতা হ্রাসের পাশাপাশি দুর্বল হয়ে পড়া বাঁধের কারণে গুরুত্বপূর্ণ এ জনপদকে ঘিরে থাকা খোলপেটুয়া ও কপোতাক্ষ নদী স্থানীয়দের জন্য প্রায়শই প্রাণসংহারী রূপ নিচ্ছে। প্রতি বছর একাধিকবার ভাঙনমুখে পড়ে সমগ্র জনপদ বার বার প্লাবিত হওয়ায় সেখানে বসবাস রীতিমত দুু:সহ উঠেছে। কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় আইলা পরবর্তী এক দশকেও টেকসই উপকুল রক্ষা বাঁধ বাঁধা হয়নি বলেও অভিযোগ স্থানীয়দের।

সরেজমিনে শ্যামনগর উপজেলার দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরা ঘুরে দেখা গেছে ষাটের দশকে নির্মিত উপকূল রক্ষা বাঁধের বিভিন্ন স্থানের ভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। অধিকাংশ স্থান এতটা নিচু হয়ে গেছে যে বড় ধরনের জোয়ার হলেই বাঁধ ছাপিয়ে পানি লোকালয়ে প্রবেশ করে। আবার অবিরাম ভাঙনের কারণে কোন কোন স্থানে বাঁেধর উপরিভাগ মাত্র তিন-চার ফুট অবশিষ্ট রয়েছে।
দীর্ঘদিন বাঁধে কোন কাজ না করা ও ভাঙন পরবর্তী সময়ে নামকাওয়াস্তে সংস্কারের কারণে বাঁধ মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে দাবি স্থানীয়দের। দ্রুত সময়ের মধ্যে নতুন ডিজাইনে বাঁধ নির্মিত না হলে গাবুরার পাশাপাশি সুন্দরবন তীরবর্তী সমগ্র শ্যামনগর উপজেলা অস্তিত্ব সংকটে পড়বে বলেও জানান তারা।

কখন ঝড় ওঠে কখন পানি ঢোকে এমন চিন্তাই রাত জেগে বুসে থাকি-জানিয়ে হরিশখালী গ্রামের বৃদ্ধ আব্দুল গফ্ফার বলেন, বুড়ো বয়সে ক’দিন পর পর সাইক্লোনে যাতি আসতি অনেক কষ্ট। সংকেত দিলি লোকজন বাড়ি থাকতি দেয় না জানিয়ে তিনি আরও বলেন, এই টানাটানির মধ্যি রাস্তায় পুড়ে মুরে যাব। যদি বাঁধের ব্যবস্থাডা প্রধানমন্ত্রী করে দিত তবে হয়ত শান্তিতি মরণ হতো।
সোরা গ্রামের হোসনেআরা বেগম বলেন, এমন এলাকায় মানুষ বাস করতি পারে না। যাওয়ার কোন জায়গা নি, তাই জীবনের সাথে যুদ্ধ কুরে আমরা টিকে রইছি। বাঁধ না হলি গাবুরায় বসবাস হবে না- উল্লেখ করে তারই প্রতিবেশী ময়না বেগম ও জেলেখালী গ্রামের মোস্তাসিম বিল্লাহসহ অন্যরা জানান, বার বার ভাঙনে এলাকার চিংড়িঘের, ফসলের জমি আর খাবার পানির পুকুর তলিয়ে যায়। পরিবার পরিজন নিয়ে দীর্ঘদিন খোলা আকাশের নিচে দিনাতিপাত করতে হয় জানিয়ে তারা বলেন, গোটা এলাকা বৃক্ষ শুন্য হয়ে পড়ার পাশাপাশি অবিরাম ভাঙনে রাস্তাঘাট পর্যন্ত নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। জরুরী ভিত্তিতে গাবুরাকে ঘিরে থাকা বাঁধ নুতনভাবে নির্মাণ না করা হলে গোটা জনপদকে পরিত্যক্ত ঘোষনা করতে হবে বলেও দাবি স্থানীয়দের।

ভাঙন কবলিত বাঁধ নিয়ে আতঙ্ক আর হতাশার পাশাপাশি অনেকে আবার অপর্যাপ্ত সাইক্লোন শেল্টার নিয়ে আক্ষেপ করেন। তহুরা বিবি ও আনোয়ারা বেগমসহ অনেকে জানান, বাতাস হলেই তারা বাড়িঘর ছেড়ে সাইক্লোন শেল্টারে যান। কিন্তু সেখানে জায়গা সংকুলান না হওয়ায় চরম দুভোগের মধ্যে পড়তে হয় সবাইকে। এছাড়া অনেক ক্ষেত্রে বাড়ি থেকে সাইক্লোন শেল্টার ৪-৫ কি. মি. দূরে হওয়াতে ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে কাঁচা রাস্তা মাড়িয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের যাওয়ান সময়েও তারা দুর্ঘটনার শিকার হওয়ার দাবি করেন। যুগোপযোগী টেকসই বাঁধসহ গাবুরাতে আরও বেশি সংখ্যক সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণেরও দাবি জানান তারা।
বর্তমানে যেভাবে জোয়ার উঠতেছে তাতে যেকোন সময় আমাগো এলাকা প্লাবিত হতি পারে, সাইক্লোন শেল্টারও অনেক দুরি। বড় জোয়ারে বাঁধ ভাঙলি লাশ খুঁজে পাবা না। কথাগুলো বলেই সাটোর্ধ্ব মরিয়ম বিবি জানান, তোমরা এটটু প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমাগো কথাডা বুলো।

প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ জনপদ গাবুরাকে রক্ষা করা যাবে না-বলে মন্তব্য করেন ইউপি চেয়ারম্যান মাসুদুল আলম। চারপাশে নদী বেষ্ঠিত বঙ্গোপসাগর ও সুন্দরবনের কোলে গড়ে ওঠা গাবুরাকে রক্ষা করতে না পারলে গোটা শ্যামনগর উপজেলা ঝুঁকিতে পড়বে বলেও দাবি তার।
তিনি জানান, সামান্য ঝড় বৃষ্টি আর জলোচ্ছ্বাস হলেই বাঁধ ভাঙে। স্থানীয়রা ভাগ্যগুনে বেঁচে যাচ্ছে জানিয়ে তিনি আরও বলেন চারপাশ বাঁধা না গেলে একদশকের মধ্যে গাবুরা সাগরের বুকে হারিয়ে যাবে। শ্যামনগর, কালিগঞ্জ ও আশাশুনি উপজেলাকে রক্ষার অংশ হিসেবে দ্রুত গাবুরায় টেকসই বাঁধ নির্মাণে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের শ্যামনগর পওর বিভাগের সেকশন অফিসার সাজ্জাদুল ইসলাম জানান, চারপাশের নদীর চর দেবে যাওয়া ছাড়াও ¯্রােতের গতিপথ পরিবর্তনের ফলে বার বার গাবুরার বাঁধ ভাঙছে। প্রতিবার ভাঙনে শত শত কোটি টাকার সম্পদ বিনষ্টের পাশাপাশি স্থানীয়রা অবর্ণনীয় দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে। ধারাবাহিক ভাঙনের ফলে গাবুরার অবকাঠামো বলতে কিছু নেই জানিয়ে তিনি বলেন, দশ বছর আগেও গাবুরাকে ঘিরে থাকা বাঁধ ২৭ কি. মি. ছিল। কিন্তু অব্যাহত ভাঙনে আয়তন কমলেও গাবুরাকে রক্ষা করতে এখনই ৩০ কি. মি. এর বেশি বাঁধ নির্মাণ করতে হবে। দ্রুত উদ্যোগ না নিলে গাবুরা মানুষ বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়বে।

Check Also

বিএনপি নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে সরকারের উপর দোষ চাপাচ্ছে : কাদের

ক্রাইমবাতা ডেস্করিপোট:  বিএনপি নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে সরকারের উপর দোষ চাপাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগের …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *