জনপ্রিয় হয়ে উঠছে বাইসাইকেল

  • এস এম মুকুল

মাথায় হেলমেট, হাতে গ্লাভস এবং পিঠে ব্যাগ নিয়ে অদ্ভুত সুন্দর দ্বিচক্রযানে করে কিছু ছাত্র ক্যাম্পাসে আসছে। টিএসসি, কার্জন হল, কলাভবন, হাকিম চত্বরসহ সমগ্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় এখন সাইকেলের আনাগোনা খুব বেশি দেখা যাচ্ছে। আকার, আকৃতিসহ সবদিক দিয়েই এসব বাইসাইকেল এখন অত্যাধুনিক এবং চোখ ধাঁধানো। বোঝা যাচ্ছে, পরিচিত এই বাহনটির ব্যবসা বেশ রমরমা। গত কয়েক বছরে যানজটের রাজধানীতে বাইসাইকেল ব্যবহারে ‘বিপ্লব’ ঘটেছে। তরুণদের গুরুত্বপূর্ণ বাহনে পরিণত হয়ে উঠেছে বাইসাইকেল। বিক্রেতারা জানিয়েছেন, গত কয়েক বছরে দেশে সাইকেলের চাহিদা বেড়েছে ৪০ শতাংশের বেশি।

পরিবেশবান্ধব বাহন

বাইসাইকেল একটি অতি পরিচিত ও জনপ্রিয় বাহন। জার্মানির ব্যারন কার্ল ভোন ১৮৬৮ সালে এই বাহনটি পৃথিবীকে উপহার দেন। তবে তার আবিষ্কৃত সাইকেলের রূপ দিন দিন পরিবর্তন হয়ে বর্তমান আকৃতিতে এসেছে। এই বাহনটি সহজ, নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব, কম খরচ, চালনায় সহজবোধ্য সর্বোপরি শারীরিক শ্রমবান্ধবÑ যা শরীরের জন্য খুবই উপকারী। এসব বিবেচনায় বাইসাইকেল প্রাচীন জনপ্রিয় বাহন হিসেবে সুপরিচিত। এই বাইসাইকেল চালনার সঙ্গে তারুণ্যের উন্মাদনার বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। বিশ্বে বিভিন্ন দেশে এখন সাইকেল চালনাকে স্বাস্থ্যপ্রদ, নিরাপদ, সময় সাশ্রয়ী এবং যানজট নিরসনের উপায় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এ কারণে পরিবেশবান্ধব বাহন হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে দুই চাকার বাইসাইকেল। বড় হচ্ছে সাইকেলের বাজার। অনেকে আবার সাইকেল আন্দোলনও করছেন। যারা চান সবাই সাইকেল চালাক। এতে জ্বালানি সাশ্রয় হবে, পরিবেশ দূষণ হতে রক্ষা পাবে, স্বাস্থ্য ঠিক থাকবে। এত কিছুর পরও কেন সাইকেল নয়!

জনপ্রিয়তা বাড়ছে বাইসাইকেলের

দেশে বাইসাইকেলের বৃহত্তম পাইকারি বাজারে সারাক্ষণই ক্রেতাদের ভিড় লেগে থাকে। গত কয়েক বছরে বাইসাইকেলে বিক্রি ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। ব্যবসায়ীরা জানালেন বর্তমানে দুই চাকার এই যানের বার্ষিক চাহিদার পরিমাণ প্রায় পাঁচ লাখ পিস। এখন বছরে প্রায় পাঁচ লাখ বাইসাইকেলের বিক্রি হয় দেশের বাজারে দেশীয় উৎপাদকরা বাইসাইকেলের রফতানির পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে মনোযোগী হয়ে উঠেছেন। বাংলাদেশে বাইসাইকেলের সবচেয়ে বড় বাজার রাজধানীর বংশালে। সেখানে সাইকেলের প্রায় ২০০ দোকান। ব্যবসায়ীদের সূত্রে জানা গেছে, সারাদেশে খুচরা বিক্রেতার সংখ্যা চার হাজারের বেশি। দেশের বাজারে কানাডা, ট্রেক, হিরো রেঞ্জার, ম্যাক্স, লক্স, জোহান, ফুজি ও তাইওয়ানের তৈরি মেরিডাসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সাইকেল পাওয়া যায়। কার্বন বাইসাইকেল এক থেকে দেড় লাখ টাকা, এলুমিনিয়ামের সাইকেল ২১ থেকে ৭০ হাজার টাকা, ইস্পাতের বাইক ৫ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকায় পাওয়া যায়। দেশে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সাইকেল তৈরির কারখানা গড়ে তুলেছে। এর মধ্যে রয়েছে মেঘনা গ্রুপ, আলিতা বাংলাদেশ লি., নর্থবেঙ্গল সাইকেল ইন্ডাস্ট্রিজ, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপও উল্লেখযোগ্য।

রফতানিতে আশা জাগাচ্ছে বাইসাইকেল

এক সময় বাইসাইকেলের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ছিল আমদানিনির্ভর। এখন উৎপাদন খরচ আর গুণগত মানের বিবেচনায় বাংলাদেশের বাইসাইকেল বিশ্ববাজারে রফতানির জায়গা করে নিয়েছে। বিশ্বমন্দার মাঝেও বাইসাইকেল রফতানিতে ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, শুধু ইউরোপে বছরে ৩ কোটি বাইসাইকেল কেনা হয়। এছাড়া বছরে দুবার সাইকেলের টায়ার পরিবর্তন করতে হয় বলে বাংলাদেশ থেকে টায়ার রফতানিরও সুযোগ রয়েছে। ইউরোপসহ ব্রাজিল ও তাইওয়ানে এসব টায়ার রফতানি হচ্ছে। ইউরোপীয় দেশগুলোতে বাংলাদেশে তৈরি ব্যতিক্রমধর্মী বাইসাইকেল দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে। সম্ভাবনাময় এ খাতের মাধ্যমে প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ পিস সাইকেল রফতানি করা সম্ভব।

কোভিড-১৯ পরবর্তী বিশ্ববাজারে বেড়েছে দেশের বাইসাইকেল রফতানি। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে বাইসাইকেল রফতানি থেকে আয় এক কোটি ৮৭ লাখ ডলার বা প্রায় ১৫৯ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ৮৫ টাকা হিসাবে)।

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) আগস্ট মাসের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের বাইসাইকেলে রফতানি আগের বছরের আগস্টের চেয়ে বেড়েছে প্রায় ১৩ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের আগস্টে লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক কোটি ৬৬ লাখ ১০ হাজার ডলার। লক্ষ্যমাত্রা থেকে আয় বেড়েছে ১৩ দশমিক ০৬ শতাংশ। ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাইসাইকেল রফতানি থেকে আয় হয়েছে আট কোটি ২৮ লাখ ডলার। চলতি অর্থবছরে বাইসাইকেল রফতানির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১০ কোটি ডলার।

আছে সুযোগ ও সম্ভাবনা

শ্রমঘন এই শিল্পে বিপুল সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে ব্যবসায়ীরা বলেন, সস্তা শ্রমিক ও প্রায় ৭০ শতাংশের বেশি কাঁচামাল স্থানীয়ভাবে উৎপাদন হয়। ৩০ শতাংশ খুচরা যন্ত্রাংশ আসে চীন, কোরিয়া তাইওয়ান থেকে। সাশ্রয়ী হওয়ার ফলে দেশের বাইসাইকেলের চাহিদা বাড়ছে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের দেশগুলোতে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে সরকার বাংলাদেশ থেকে বাইসাইকেল আমদানির ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রস্তাব করেছে, বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা সেখানে গিয়ে যৌথভাবে বিনিয়োগও করতে পারে।

Check Also

হাতের কাছেই হরিণের মাংশ বেচাকেনা: বনরক্ষীরদের সহয়তায় শরিণ শিকার!

আবু সাইদ বিশ্বাস: সাতক্ষীরা: বনদস্যু ও বাঘের সংখ্যা কমতে থাকায় করোনায় সুন্দরবনে হরিণ ও বাঘ …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *