ঐতিহাসিক বদর দিবস : ঘটনা ও শিক্ষা

১৭ রমজান ঐতিহাসিক বদর দিবস। বছর ঘুরে দিনটি আমাদের মাঝে আসে ঈমানি চেতনায় জাগিয়ে তুলতে। সত্য ও সুন্দরের পক্ষে আত্মনিবেদিত হয়ে শোষণ, নিপীড়ন, ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও জুলুমতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করা বড় জিহাদ। ইসলামে আক্রান্ত হলেই যুদ্ধ করার অনুমতি রয়েছে। কোনোভাবেই আগে আক্রমণ ইসলাম অনুমোদন করে না। ইসলাম শান্তি ও মানবতার ধর্ম। অন্যায়ভাবে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বার্থে তুচ্ছ বিষয়ে যুদ্ধ-সংঘাতে লিপ্ত হওয়া ইসলামের শিক্ষা নয়। নিজ থেকে যুদ্ধ বাঁধিয়ে কোথাও ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়নি। কেবল সশস্ত্র যুদ্ধে ইসলাম প্রতিষ্ঠার নজির ইতিহাসে পাওয়া যায় না। অথচ আজ দুনিয়াজুড়ে ইসলামের নামে কুচক্রীরা সশস্ত্র ও হিংসা পন্থায় ‘জিহাদ’ শুরু করেছে। অথচ এভাবে ইসলাম প্রতিষ্ঠার নামে সন্ত্রাসী কার্যকলাপকে ‘জিহাদ’ বলার সুযোগ নেই। নিরীহ মানুষকে হত্যা ও সন্ত্রাসবাদ কখনো জিহাদ নয়।

দ্বিতীয় হিজরির ১৭ ই রমজান ইতিহাস বিখ্যাত ‘বদর যুদ্ধ’ সংঘটিত হয়েছিল। বিশ্ব সভ্যতার ইতিহাসে এ দিবসটি অনন্য অবস্থান দখল করে রেখেছে। হিজরি দ্বিতীয় সন। রমজান মাস। কোরাইশদের একটি সুবিশাল বাণিজ্য কাফেলা বিপুল অর্থ-সম্পদ ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য অস্ত্র ক্রয় করে সিরিয়া থেকে ফিরছিল। তাদের দলপতি আবু সুফিয়ানের ভয় ছিল মুসলমানরা এগুলো তাদের থেকে ছিনিয়ে নেবে। তাই তারা  মক্কায় খবর পাঠাল যে তাদের সাহয্যের প্রয়োজন। মক্কার কোরাইশরা যেন তাদের দলবল নিয়ে অতি দ্রুত এখানে এসে পৌছে। তাদেরকে এই  মহাবিপদ থেকে উদ্ধার করে। কোরাইশরা সব সময়ই মুসলমানদের মূলোচ্ছেদ করার জন্য বিভিন্ন ফন্দি-ফিকির করে বেড়াত। তাই মুসলমানদের অস্তিত্ব রক্ষায় রাজনৈতিক নীতি ও কৌশল হিসেবে তাদের শক্তিমত্তা বিনষ্ট করার খুবই প্রয়োজন ছিল।
মক্কার কোরাইশদের সকল প্রকার শক্তির প্রধান উৎস ছিল সিরিয়ার বাণিজ্য; মুসলমানদের জন্য কোরাইশদের এই বাণিজ্যিক উন্নত ধারা বন্ধ করে দেয়ার প্রয়োজন দেখা দিল। কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ানের খবরটি মক্কায় পৌঁছলে কোরাইশরা এক হজার জনের বিশাল সেনাদল নিয়ে মুসলমানদের মোকাবেলায় বেরিয়ে পড়ল। আবু জেহেল সহ কোরাইশদের বড় বড় নেতারা ১০০ ঘোড়া আর ৭০০ উট নিয়ে এ যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছিল। প্রিয় নবী স. তাদের যুদ্ধবহর সম্পর্কে জানতে পারেন। তখন ১২ ই রমজান। নবীজি স. তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। ৩১৩ জন মুহাজির ও আনসার সাহাবি নিয়ে তাদের মোকাবেলার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েন। সাহাবায়ে কেরাম তাদের জীবন ও জীবনের অর্জিত সমস্ত সম্পদ নবীজির নিকট সমর্পণ করে দিলেন।
নবীজি স. বদর অভিমুখে রওয়ানা হলেন। অতঃপর বদর প্রান্তরর নিকটবর্তী স্থানে অবতরণ করেন। ২য় হিজরির ১৭ ই রমজান ৬২৪ খৃষ্টাব্দের ১১ ই মার্চ শুক্রবার এখানেই সংঘটিত হয় ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধ। ১৭ ই রমজান। শুক্রবার রাত। বদর যুদ্ধের পূর্বরাত। সৈন্যদের শ্রেণীবিন্যাস শেষ হয়েছে। সবাই ক্লান্ত-শ্রান্ত। হঠাৎ বৃষ্টি এল। মুসলমান যোদ্ধারা ঘুমিয়ে পড়ল। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন বাহিনীর সকল ক্লান্তি দূর হয়ে গেল এবং যুদ্ধের জন্য দেহমন প্রস্তুতি হয়ে গেল।
নবীজি স. তার বাহিনীকে বললেন, চূড়ান্ত নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত কেউ যুদ্ধ শুরু করবে না। কোরাইশদের পক্ষ থেকে ব্যাপক হারে তীরবৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত তোমরা কেউ তীর ছুঁড়বে না। তোমাদের ওপরে তাদের তরবারি আসার আগে তোমরা কেউ তরবারি চালাবে না। এরপর কোরাইশদের পক্ষ থেকে যুদ্ধের আগুন জ্বলে উঠল এবং মুসলমানরা যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়লেন। এই ঐতিহাসিক যুদ্ধে মুসলানদের ঐতিহাসিক বিজয় রচিত হল। কোরাইশদের অনেক কাফের যোদ্ধারা মুসলমানদের হাতে বন্দি হল। এটা ছিল ইসলামের প্রথম সিদ্ধান্ত মূলক মুসলমানদের পরিকল্পিত সামরিক জেহাদ।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে নবীজি স. মহান আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করলেন, হে আল্লাহ! তুমি যদি চাও দুনিয়াতে তোমার ইবাদত করার মতো কেউ না থাকুক, তাহলে এই ক্ষুদ্র দলটিকে নিশ্চিহ্ন হতে দাও। কিন্তু মহান আল্লাহ তা চাননি। তাই প্রায় নিরস্ত্র মুষ্টিমেয় মুসলমান যোদ্ধাদের কাছে পরাজিত হয় সুসজ্জিত বিশাল কোরাইশ বাহিনী।
কোরাইশদের অহংকারের পতন হয়। যা ছিল মহান আল্লাহর কুদরতের প্রমাণ। এই যুদ্ধে মুসলমানদের ১৪ জন সাহাবি যোদ্ধা শহিদ হন। কোরাইশদের ৭০ জন নিহত এবং ৭০ জন কাফের যোদ্ধা মুসলমানদের হাতে বন্দি হয়। এ যুদ্ধে কোরাইশদের ২৪ জন সেনাপ্রধান নিহন হয়। কোরাইশদের প্রধান সেনাপতি আবু জেহলকে হত্যা করেন দুজন সহোদর আনসার কিশোর সাহাবি হজরত মাআজ ও মুআজ র.। নিয়ম অনুযায়ী যুদ্ধ শেষে বদর প্রান্তর মুসলমানরা ৩ দিন পর্যন্ত অবস্থান করেন, চতুর্থ দিনে নবীজি স. সবাইকে নিয়ে মদিনার পথে রওনা করেন। তাঁর সাথে ছিল বন্দি কোরায়েশরা এবং যুদ্ধলব্ধ সম্পদ। যুদ্ধবন্ধীদের সাথে আল্লাহর নবী ও মুসলিমরা যে সহমর্মিতা দেখান বিশ্বের ইতিহাসে তার নজির পাওয়া মুশকিল।
বদর দিবসের শিক্ষা :
বদর যুদ্ধের ফলাফল ছিল আল্লাহর কুদরতের নমুনা। মুসলমানদের জন্য এক ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। ইসলাম যে শিক্ষা মুসলমানদের প্রতিনিয়ত দিয়ে আসছে। আর তা হলো-
সব কাজে আল্লাহর ওপর অগাধ বিশ্বাস এবং ভরসা রাখা। আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে চেষ্টা চালিয়ে গেলে সত্যের বিজয় হবেই। বিপদ-আপদসহ সর্বাবস্থায় আল্লাহর ওপর আস্থাশীল হওয়াই হলো বদরের ঐতিহাসিক সুমহান শিক্ষা ও চেতনা। বদর দিবসের শিক্ষা হচ্ছে, অন্যায়কারী অন্যায়-অপরাধ সংঘটিত করেও পার না পাওয়া। সব অপরাধীকে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা, দেশ ও সমাজে ইনসাফ ও মানবতার রাজত্ব প্রতিষ্ঠা এবং কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে সতত সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়াই বদর দিবসের আসল তাৎপর্য ও শিক্ষা।
আসুন আমরা বদরের যুদ্ধ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করি। শান্তি প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করি। রমজানের মাগফিরাতের এই দশকে আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাই। বদরের যুদ্ধে শাহাদাৎকারীদের উসিলায় মহান আল্লাহ আমাদের ক্ষমা করে দেন। শান্তি ও সমৃদ্ধির বাংলাদেশ এবং বিশ্ব গড়তে সত্য ও সুন্দরের পথে পথ চলি।
লেখক : বিলাল মাহিনী, প্রভাষক : গাজীপুর রউফিয়া কামিল মাদরাসা, অভয়নগর, যশোর।
  প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী সম্পাদক : সিংগাড়ী আঞ্চলিক গণগ্রন্থাগার ও ভৈরব সংস্কৃতি কেন্দ্র, অভয়নগর, যশোর।
  আজীবন সদস্য : নওয়াপাড়া ইনস্টিটিউট।

Check Also

পবিত্র লাইলাতুল কদরের আমল ফজিলত গুরুত্ব ও তাৎপর্য

লাইলাতুল কদর বা ভাগ্য নির্ধারণ রাত্রি মুসলিম জীবনে অতিপূণ্যময় ও অনন্য রজনী। এ রাতের সম্মানেই …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

***২০১৩-২০২১*** © ক্রাইমবার্তা ডট কম সকল অধিকার সংরক্ষিত।