ছাত্র-যুব সমাজ ধ্বংসের হাতিয়ার মোবাইল গেমস্ ও মাদক -বিলাল মাহিনী

এমন জীবন তুমি করিবে গঠন,মরণে হাসিবে তুমি কাঁদিবে ভুবন। কবিতার এ চরণ দুটি আজকের যুবক ও ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য খুবই অর্থবহ। আজকের সমাজ, রাষ্ট্র ও শিক্ষা ব্যবস্থায় ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার অভাবে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়েছে সমাজ ধ্বংসের হাতিয়ার মোবাইল গেমস্ ও সর্বনাশা মাদক। আজকের তরুণ ছাত্র-যুবকরাই আগামী দিনের দেশ ও জাতির কর্ণধার। যুব সমাজই পারে শত বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে দেশকে স্বপ্নের দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে। তাই সুকান্ত ভট্টাচার্য তাঁর ‘আঠারো বছর বয়স’ কবিতায় বলেছেন-‘পথ চলতে এ বয়স যায় না থেমে/ এদেশের বুকে আঠারো আসুক নেমে।’

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, যুবসমাজ এখন বিপথে পরিচালিত হচ্ছে। যুবসমাজের অবক্ষয়ের কারণে জাতি হতাশায় নিমজ্জিত। যুবসমাজের অবক্ষয় জাতির বুকে গভীর ক্ষত তৈরি করছে। গোটা সমাজকে ঠেলে দিচ্ছে অনিশ্চিত অন্ধকারের দিকে। আর এই সমস্যার প্রতিকার না হলে দেশ ও জাতি ভয়াবহ অবস্থার সম্মুখীন হবে। যুবসমাজের অবক্ষয়ের কারণে জাতীয় জীবনে নেমে আসে চরম দুঃখ-দুর্দশা, বিপর্যয় ও হতাশা। জীবনে সৎ, সুন্দর, কল্যাণকর ও শান্তির মাধ্যমে বেঁচে থাকতে হলে কতগুলো গুণের প্রয়োজন হয়। আর এই সব গুণকেই সাধারণত মূল্যবোধ বলা হয়। সামাজিক ও ধর্মীয় এসব মূল্যবোধ যুবসমাজকে সত্য, সুন্দর ও মঙ্গলের দিকে পরিচালিত করে। বর্তমান সমাজে এ সকল মূল্যবোধের অনুশীলন ক্রমশই হ্রাস পাচ্ছে। ফলে যুবসমাজ বিপদগামী হচ্ছে।

বাংলাদেশের রাজনীতি ধীরে ধীরে পেশিশক্তি নির্ভর হয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিকভাবে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন বিপথগামী যুবকদের ব্যবহার করছে। আবার বিপথগামী ছাত্র-যুবকেরা কেন্দ্রীয় এবং জাতীয় নেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় পেয়ে আরো বেপরোয়া হয়ে যায়। দুর্বল অর্থনৈতিক সমাজব্যবস্থাও যুব সমাজের অবক্ষয়ের জন্য অনেকাংশে দায়ী।
আমাদের সমাজের তরুন-যুবকদের অবক্ষয়ের অন্যতম কারণ হলো বিদেশি সংস্কৃতির নামে এক ধরণের অপসংস্কৃতির প্রসার। বর্তমানে আমাদের চলচ্চিত্রের অশ্লীল নাচ, গান, সংলাপ যুবসমাজকে ক্রমান্বয়ে গ্রাস করে ফেলছে। ডিশ এন্টেনার প্রভাবে বিদেশি অপসংস্কৃতি আমাদের যুবসমাজকে চেপে ধরেছে। তাছাড়া রুচিহীন পোশাক-পরিচ্ছদও অবক্ষয়ের অন্যতম কারণ।

বেকারত্ব ও মাদকাসক্তির প্রভাব : আমাদের দেশের যেসব ছাত্র-যুব সমাজ লেখাপড়া শেষ করে চাকরি পায় না তারা নানা রকম মানসিক হতাশায় ভোগে। চাকরির অভাবে তারা অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে। দীর্ঘ সময় এই অবস্থা চলতে থাকলে তাদের ভেতরে ক্ষোভ জন্ম নেয়। আর এই ক্ষোভ থেকেই তারা চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, হত্যা ও অপহরণসহ নানা পাপ কাজে লিপ্ত হয়। আবার কোনো দেশের যুব সম্প্রদায় মাদকাসক্ত হওয়া মানে নৈতিক চরিত্রের চূড়ান্ত অধঃপতন। ফেনসিডিল, গাঁজা, আফিম, ভাং ইত্যাদি মাদকদ্রব্য সর্বত্র পাওয়া যায়। আর এ সুযোগ গ্রহণ করে যুবসমাজ ধ্বংস হচ্ছে।

শিক্ষা ক্ষেত্রে অব্যবস্থাপনা ও বিশৃংখলা অনেক সময় ছাত্র-ছাত্রীদের বিপথে পরিচালিত করে। ভর্তির সমস্যা, পরীক্ষা পিছিয়ে নেওয়া, ফল প্রকাশের বিলম্ব, সেশনজট এবং যখন তখন ধর্মঘট ইত্যাদি ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে মানসিক বিপর্যয় সৃষ্টি করে। তাছাড়া যে সব প্রতিষ্ঠানে বোমাবাজি, ককটেলবাজি এবং মারামারি লেগেই থাকে সেসব প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীদের মনে সব সময় ভয়-ভীতি কাজ করে। আবার কখনও দেখা যায় যে, গুটিকয়েক সন্ত্রাসী সমস্ত ছাত্র সমাজকে জিম্মি করে রাখে।
মোবাইল গেমস এটি একটি বিনোদন। একটি গেমিং অ্যাডিকশন। আধুনিক প্রযুক্তির অন্যতম উপহার। বেকার মানুষের প্রিয় বন্ধু। ছাত্র-যুব প্রজন্মের সর্বক্ষণের সঙ্গী। আরও রয়েছে কত কি! তবে এত কিছুর পরেও এটিকেই আমরা বলছি ‘ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি’। আর এটিই বাস্তবতা। বর্তমান সময়টা তথ্যপ্রযুক্তির যুগ। তথ্যপ্রযুক্তি সবকিছু এনে দিয়েছে আমাদের হাতের মুঠোয়। করে দিয়েছে সব কাজের সুযোগ-সুবিধা। মানুষের বিকল্প এখন আধুনিক প্রযুক্তি। তথ্যপ্রযুক্তি সহজলভ্য হওয়ায় সবার হাতে হাতে নানা ধরনের ডিভাইস রয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে ইলেকট্রনিক ভিডিও গেমস অর্থাৎ গেমিং অ্যাডিকশন। বর্তমান সময়ে এমন তরুন-যুবক খুব দুর্লভ, যার কাছে স্মার্টফোন আছে; কিন্তু গেমস খেলে না। এটি আমাদের যেমন সাময়িক আনন্দ দিচ্ছে, ঠিক তেমনি কেড়ে নিচ্ছে মহামূল্যবান অনেক কিছু। মারা যাচ্ছে শিশু-কিশোরের সুপ্ত প্রতিভা। চুষে খাচ্ছে মহামূল্যবান সময়। নষ্ট করছে কোটি মানুষের অমূল্য জীবন। শেষ করছে মাতৃভূমির সুনাম ও জশ-খ্যাতি।

স্মার্টফোন হাতের মুঠোয় থাকায় দেশীয় খেলাধুলা দিন দিন বিলীন হয়ে যাচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে অতীতের ঐতিহ্য খেলাধুলা বা শারীরিক ব্যায়াম। এখন আর দেখা যায় না স্কুল-মাদ্রাসা ছুটি হলে লাটিম নিয়ে মেতে ওঠা। মার্বেল নিয়ে খেলাধুলা। ঘুড়ি নিয়ে রৌদ্রভরা দুপুরে মাঠে দৌড়ানো। শিশু-কিশোররা আজ মেতে উঠেছে মোবাইল গেমসে। জেগে উঠেছে নেশা আসক্তিতে। বর্তমান ছাত্র-যুব প্রজন্ম মাঠে গিয়ে খেলার চেয়ে মোবাইল ফোনেই বিভিন্ন গেম খেলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে। সারাক্ষণ মোবাইল গেমস পাবজি, ফ্রি ফায়ারের মতো হিংস্র সব ভিডিও গেমস নিয়ে ব্যস্ত। ফলে তারা ঝুঁকে পড়ছে অশ্লীলতার দিকে। ধাবিত হচ্ছে বিভিন্ন অপকর্মে। জড়িয়ে পড়ছে ধর্ষণ ও মদ্যপানসহ নানা অসঙ্গতিপূর্ণ সামাজিক ব্যাধিতে। মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে মানবতার বদান্যতা থেকে। সরে যাচ্ছে ইসলামের সুশীতল ছায়া থেকে। এভাবেই দিনের পর দিন শেষ হয়ে যাচ্ছে যুব প্রজন্মের একঝাঁক কিশোর-কিশোরী, ছাত্র-যুবক।

ভিডিও গেমসের প্রতি শিশু-কিশোরদের আগ্রহ নতুন কিছু নয়। তবে আগের তুলনায় এখন শতগুণ বেশি। এই আসক্তিকে সম্প্রতি মানসিক রোগের তালিকায় অর্থাৎ সামাজিক ব্যাধিতে অন্তর্ভুক্ত করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। তাই স্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, শিশুদের এসব ভার্চুয়াল গেম থেকে দূরে রেখে আবার মাঠের খেলায় ফেরাতে হবে। না হলে তরুণ প্রজন্ম মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, ‘প্রতিনিয়ত এসব ভিডিও গেমস্ খেললে শরীরে এক ধরনের হরমোন নিঃসারণ হয়। এতে শিশু সবকিছু নিয়েই উত্তেজিত হয়ে পড়ে। বাবা-মায়ের অবাধ্য হয়ে যায়। মেজাজ খিটমিটে হয়ে যায়। তো আমরা এমন নানা আপত্তিকর সমস্যা থেকে কীভাবে রেহাই পেতে পারি।

আমাদের সচেতনতায় হতে পারে আমাদের মুক্তির পথ। তার মধ্যে কয়েকটি হলো- ১. ইন্টারনেট ব্যবহারের আগে নিজেকে কতটুকু নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম, তা আগে বিবেচনা করতে হবে। ২. ইন্টারনেট ব্যবহার করতে দিলে তার একটি সময়সীমা বেঁধে দিতে হবে এবং সময় মেনে চলতে উৎসাহিত করতে হবে। ৩. পিতা-মাতা বাসার ডেস্কটপ কম্পিউটারটি প্রকাশ্য স্থানে রাখুন। শিশু যাতে আপনার সামনে মুঠোফোন, ট্যাব, ল্যাপটপ ইত্যাদি ব্যবহার করে। ৪. বেশি বেশি বই কিনতে হবে, বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। বই হোক নিত্যদিনের সঙ্গী। বইয়ের আলো জেমসের অন্ধকার থেকে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম। ৫. ইন্টারনেট বা গেম আসক্তি কিন্তু মাদকাসক্তির মতোই একটি সমস্যা। প্রয়োজনে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিয়ে এই আসক্তি দূর করতে হবে।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে বান্দার জন্য শ্রেষ্ঠ নিয়ামতগুলোর অন্যতম হলো ‘সময়’। যেটা একবার ফুরিয়ে গেলে আর পাওয়া যায় না। একবার চলে গেলে আর ফেরানো যায় না। সময়ের আবর্তনে সেকেন্ড-মিনিট-ঘণ্টা, দিন-সপ্তাহ-মাস-বছর এভাবেই হারিয়ে যায়। সময়ের ইতিবাচক ব্যবহারই জীবনের সফলতা। সময়ের অপচয় ও অপব্যবহার জীবনের ব্যর্থতা। সময়ের যথাযথ ব্যবহার না করা বা অপব্যবহার করার জন্য জবাবদিহি করতে হবে আল্লাহর দরবারে। মহাগ্রন্থ কোরআন কারিমে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘সময়ের শপথ! মানুষ অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত কিন্তু তারা নয়, যারা ইমান আনে ও সৎকর্ম করে এবং পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দেয় ও ধৈর্যের উপদেশ দেয়।’ (সুরা আসর : ১-৩)। একবার রাসুলুল্লাহ সা. কে প্রশ্ন করা হলো, সৌভাগ্যবান কারা? তিনি বললেন, সৌভাগ্যবান তারা, যারা দীর্ঘায়ু লাভ করেছে এবং তা নেক আমলের মাধ্যমে অতিবাহিত করেছে। পুনরায় জিজ্ঞেস করা হলো, দুর্ভাগা কারা? তিনি বললেন, দুর্ভাগা তারা যারা দীর্ঘায়ু পেয়েছে কিন্তু বৃহৎ সময়কে আমলহীন অতিবাহিত করেছে। (তিরমিজি : ২৩২৯)।
পারিবারিক মূল্যবোধঃ প্রতিটি মানুষই কোনো একটি পরিবারে জন্মগ্রহণ করে। শিশুকাল থেকে সে পরিবারেই বেড়ে উঠে। তারপর সে ধীরে ধীরে সমাজের সাথে পরিচিত হয়। শিশুদের মন শৈশবকালে কাদার মতো নরম থাকে। এই সময় তাদের ইচ্ছা মতো গড়ে তোলা যায়। তাই প্রাথমিক পর্যায়ে পরিবারই পারে তাদের সন্তানদের উপযুক্ত মূল্যবোধের শিক্ষা দিতে।
পরকালে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের হিসাব দিতে হবে। তাই আমরা অযথা মোবাইল গেমস খেলে আমাদের মূল্যবান সময়কে নষ্ট না করি। জীবনকে গেমস্ ও মাদকাসক্তিতে তছনছ করে না ফেলি। জীবন একটি আর এই এক জীবনে ইবাদত করেই জান্নাত হাসিল করতে হবে। আল্লাহ আমাদেরকে হারাম আসক্তি থেকে হেফাজত করে সঠিক দ্বীনি পথে চলার তৌফিক দান করুন। দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতা এবং নাজাত দান করুন।

লেখক : প্রভাষক বি এইচ মাহিনী
পরীক্ষক -ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়,ঢাকা, প্রভাষক-গাজীপুর রউফিয়া কামিল মাদরাসা, অভয়নগর, যশোর।
প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী সম্পাদক : ভৈরব সংস্কৃতি কেন্দ্র ও সিংগাড়ী আঞ্চলিক গণ-গ্রন্থাগার

Check Also

জল বাষ্পের ঢেউ // বিলাল মাহিনী

কৈশোরে ফিরে যায় যৌবন আর্দ্র বায়ুতে ভিজে উড়ু মন জেগে ওঠে সেইসব স্মৃতি দৃশ্যতঃ এখনো …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

***২০১৩-২০২১*** © ক্রাইমবার্তা ডট কম সকল অধিকার সংরক্ষিত।