বিপুল ভোটে নৌকার হাবিব বিজয়ী

সিলেট-৩ আসনের উপনির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছেন আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থী হাবিবুর রহমান হাবিব। তিনি পেয়েছেন ৯০ হাজার ৬৪ ভোট। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীকের আতিকুর রহমান আতিক পেয়েছেন ২৪ হাজার ৭৫২ ভোট।

বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত মোটর গাড়ি প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী শফি আহমদ চৌধুরী পেয়েছেন ৫ হাজার ১৩৫ ভোট। বাংলাদেশ কংগ্রেসের জুনায়েদ মো. মিয়া পেয়েছেন ৬৪০ ভোট। সব মিলিয়ে ভোট পড়েছে ১ লাখ ২০ হাজার ৫৯১ ভোট। ওই আসনের মোট ভোট ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৮৭৩। শনিবার রাত ৯টায় সিলেটের জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা কাজী এমদাদুল ইসলাম এ ফলাফল ঘোষণা করেন।

এর আগে ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) পদ্ধতিতে সকাল ৮টা ২০ মিনিটে দক্ষিণ সুমার ধরগাঁও জালালিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নিজের কেন্দ্রে সন্ত্রীক ভোট প্রদান করেন আওয়ামী লীগ প্রার্থী হাবিবুর রহমান হাবিব। ভোট প্রদান শেষে হাবিব প্রতিক্রিয়ায় বলেন, শান্তিপূর্ণ উপায়ে গণরায়ের ফলাফল যা হবে মেনে নেব।

জাপা প্রার্থী আতিকুর রহমান আতিক যান্ত্রিক জটিলতার কারণে নিজের ভোট দিতে পারেননি। গতকাল শনিবার ভোট শুরু হওয়ার পর সকালে তার নিজ কেন্দ্র মোগলাবাজার রেবতী রমন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দিতে গিয়ে ফিরে আসেন তিনি।

রেবতী রমন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার মাসুদ রানা এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, পরে বিকালে এসে তিনি ভোট দিয়ে গেছেন। দক্ষিণ সুরমার দাউদিয়া গৌছ উদ্দিন সিনিয়র মাদ্রাসা কেন্দ্রে ভোট প্রদান করেন স্বতন্ত্র প্রার্থী শফি আহমেদ চৌধুরী।

শনিবার সিলেট-৩ আসনের উপনির্বাচনে দক্ষিণ সুরমা, ফেঞ্চুগঞ্জ ও বালাগঞ্জে ১৪৯টি কেন্দ্রে সকাল ৮টায় ভোটগ্রহণ শুরু হয়ে বিকাল ৪টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ভোটগ্রহণ চলে। এ আসনের উপনির্বাচনে ৪ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

প্রার্থীরা হলেন- আওয়ামী লীগ প্রার্থী হাবিবুর রহমান হাবিব, জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীকের আতিকুর রহমান আতিক, স্বতন্ত্র প্রার্থী মোটরগাড়ি প্রতীকের বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত ও সাবেক সংসদ সদস্য শফি আহমেদ চৌধুরী ও বাংলাদেশ কংগ্রেসের জুনায়েদ মোহাম্মদ মিয়া ডাব প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

শনিবার দুপুরে জাপা প্রার্থী আতিকুর রহমান সাংবাদিকদের কাছে নির্বাচন নিয়ে অভিযোগ করে বলেন, ফেঞ্চুগঞ্জের ৭টি কেন্দ্র আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা দখল করে নিয়েছেন। পিটাইটিকর, কাসিম আলী স্কুল ও চন্ডিবাজারসহ অন্যান্য কেন্দ্রে থেকে লাঙ্গলের এজেন্টদের মারধর করে বের করে দেয়া হয়েছে। ভোটারদেরও মারধর ও ভয়ভীতি দেখিয়ে কেন্দ্র থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে।

দক্ষিণ সুরমার কুচাই রামপুর সেন্টার থেকে লাঙ্গলের এজেন্ট বের করে দেওয়া হয়েছে। লাঙ্গলের ভোটারদের জোর করে নৌকায় ভোট দেওয়া হয়েছে। এজেন্টেদের বের করে দেওয়ার খবর পেয়ে আতিক ছুটে যান ফেঞ্চুগঞ্জ কাসিম আলী ভোট কেন্দ্রে। সেখোনে গিয়ে তার এজেন্টদের কেন্দ্রের ভেতরে দেখতে পেয়েছেন বলে তথ্য নিশ্চিত করেন লাঙ্গল প্রতীকের এজেন্ট শাহিন মিয়া।

স্বতন্ত্র প্রার্থী, সাবেক সাংসদ ও বিএনপির বহিষ্কৃত কেন্দ্রীয় নেতা শফি আহমেদ চৌধুরী দুপুরে বিভিন্ন ভোট কেন্দ্র ঘুরে এসে অভিযোগ করে বলেন, ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) পদ্ধতিতে ভোট দিতে এখনো মানুষ অভ্যস্ত নয়। ভোট দিতে গিয়ে মানুষকে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। ভোটের আগে ইভিএম নিয়ে ভোটার ও নির্বাচনী কর্মকর্তাদের আরও বেশি করে প্রশিক্ষণের প্রয়োজন ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি বলেন, নিজেও জানতেন না ইভিএমের মাধ্যমে কীভাবে ভোট দিতে হয়। অনেক পোলিং অফিসারও ইভিএম বুঝেন না।

নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে তিনি বলেন, নারী ভোটাররা ইভিএম পদ্ধতিতে ভোট দিতে এসে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছেন। ইভিএম পদ্ধতি সম্পর্কে অনেকেই জানেন না।

যুগান্তরের ফেঞ্চুগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। উপজেলার উত্তর ফেঞ্চুগঞ্জ, উত্তর কুশিয়ারা, মাইজগাঁও ও ঘিলাছড়া ইউনিয়নের বিভিন্ন কেন্দ্রে সরেজমিন দেখা যায়, অধিকাংশ কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি তেমন ছিল না। প্রায় প্রতিটি ভোটকেন্দ্র ছিল ফাঁকা। তরুণ ও তরুণী ভোটারের উপস্থিতি খুবই কম। ফেঞ্চুগঞ্জ সদর ইউনিয়নের পিঠাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ছত্তিশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চন্ডীপ্রসাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রগুলোতে ভোটারদের ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। তবে নারী ভোটারের উপস্থিতি খুব কম ছিল।

সরেজমিন দেখা গেছে, অধিকাংশ কেন্দ্রে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর এজেন্টদের সঙ্গে সমঝোতা করেছেন জাতীয় পার্টির এজেন্টরা। ভোটগ্রহণ চলাকালীন কেন্দ্র থেকে বের হয়ে যান এজেন্টরা। আবার জাতীয় পার্টির প্রার্থী আতিকুর রহমান আতিক কেন্দ্র পরিদর্শনে গেলে তার এজেন্টরা কেন্দ্রে ঢুকে পড়েন।

বালাগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, উপজেলার কোথাও কোনো উত্তাপ ছিল না। শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে বালাগঞ্জ উপজেলার ৩৪টি ভোট কেন্দ্রে সকাল থেকে ভোটার উপস্থিতি কম ছিল। খুবই স্বল্পসংখ্যক নারী ভোটার ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। বিকাল ৪টা পর্যন্ত নৌকার প্রার্থী হাবিবুর রহমান হাবিব ছাড়া অন্য কোনো প্রার্থীকে বালাগঞ্জ এলাকায় দেখা যায়নি। সকাল থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল জোরদার ছিল। ফলে কোথাও কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।

১২টি ভোট কেন্দ্র ঘুরে প্রিসাইডিং অফিসারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিকাল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত প্রায় ৩০-৩২ ভাগ ভোট দেয়া হয়েছে। নির্বাচনী এলাকায় সকাল থেকে ছোট যানবাহনগুলো নির্বিঘ্নে চলাচল করেছে। মোটরসাইকেলে চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও হলুদ কাপড়ে নৌকার ছবিযুক্ত বিশেষ সংকেতে অসংখ্য মোটরসাইকেল চলাচল করতে দেখা গেছে।

লাঙ্গল প্রতীকের প্রার্থী আতিকুর রহমান আতিকের কয়েকজন এজেন্ট অভিযোগ করে বলেন, ভোট কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্তরা পক্ষপাতিত্ব করেছেন। ইভিএম সম্পর্কে ধারণা না থাকায় লাঙ্গলের ভোটারদের ভোট কৌশলে নৌকায় দেওয়া হয়েছে।

রাজাপুর ভোট কেন্দ্রে লাঙ্গলের একজন এজেন্ট নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নৌকার লোকজন আমাকে জোর করে কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়। প্রতিবাদ করায় মামলা-হামলার ভয় দেখানো হয়েছে।

বালাগঞ্জ উপজেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি শেখ মো. ফজলু মিয়া বলেন, ভোট কেন্দ্রে এজেন্টদের ভয় দেখিয়ে জিম্মি করা হয়েছে। আমার ভোট কেন্দ্র গৌরীন্নাথপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লাঙ্গলের ভোটারদের নৌকায় ভোট দিতে বাধ্য করা হয়েছে। অনেকে ভোট না দিয়ে চলে এসেছেন।

তবে সংশ্লিষ্ট প্রিসাইডিং অফিসাররা এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে।

Check Also

আশাশুনি ইঁদুর মারা বিদ্যুতের তারে জড়িয়ে দু’জনের মৃত্যু

আশাশুনি উপজেলার শোভনালীতে ধান ক্ষেতের ইঁদুরের উপদ্রব দমন করতে পেতে রাখা বৈদ্যুতিক তারের ফাঁদে আটকে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

***২০১৩-২০২১*** © ক্রাইমবার্তা ডট কম সকল অধিকার সংরক্ষিত।