দেড় বছরে সাতক্ষীরায় মৎস্য খাতে ক্ষতি ২৬২ কোটি টাকা

সাতক্ষীরা জেলার উপর দিয়ে অতিবাহিত হওয়া সুপার সাইক্লোন ইয়াস, আম্পান, বুলবুল এবং সম্প্রতি অতিবৃষ্টিতে নদীর ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ ভেঙে ২৬২ কোটি ছয় লাখ ৪৫ হাজার টাকা ক্ষতি হয়েছে মৎস্য খাতে।

সরকারি হিসাবে ২০১৯ সালের নভেম্বর বুলবুল ঝড়ের পর থেকে এ পর্যন্ত প্রাকৃতিক দুর্যোগে জেলায় মৎস্য খাতে এ টাকার ক্ষতি হয়। অপরিকল্পতি মৎস্য ঘের, নদীর বেড়িবাঁধকে মৎস্য ঘেরের বেড়িবাঁধ হিসেবে ব্যবহার করা, বাঁধে ছিদ্র করে নোনা পানি তোলা এবং টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ না করাসহ নানা কারণে জেলার মৎস্য খাতে ক্ষতির পরিমান দিন দিন বেড়েই চলেছে।

টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করে পরিকল্পিতভাবে মৎস্য চাষের উপযোগী করতে তুলতে না পারলে আগামীতে শ্যামনগর ও আশাশুনিসহ জেলার ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে মৎস্য চাষ বন্ধ হতে পারে বলে মনে করছেন চাষিরা।

মৎস্য চাষিরা বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের উদাসীনতার কারণে জেলায় টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ হচ্ছে না। ফলে প্রতি বছর নদীর বেড়িবাঁধ ভেঙে হাজার হাজার হেক্টর মৎস্য ঘের প্লাবিত হচ্ছে। পুঁজি হারিয়ে পথে বসে যাচ্ছে হাজার হাজার ঘের মালিক। পরবর্তীতে ঘুরে দাঁড়ানো অবস্থাও থাকছে না অনেকের।

চাষিরা আরও বলেন, দেশ-বিদেশে এ জেলার মাছের চাহিদা রয়েছে। এক সময় এ জেলার মাছ বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হতো। কিন্তু সেটা দিন দিন হুমকির মুখে চলে যাচ্ছে। আজও জেলার হাজার হাজার হেক্টর মৎস্য ঘের পানির নিচে। এভাবে ঘের ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হলে আগামীকে অনেকেই মৎস্য চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে বলেও তারা বলেন।

জেলা মৎস্য অফিস থেকে জানা যায়, সুপার সাইক্লোন ইয়াস, আম্পান, বুলবুল এবং সাম্প্রতি অতিবৃষ্টিতে নদীর ঝুকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ ভেঙে ৩৭ হাজার ৮৭৩ টি মৎস্য ঘেরের ক্ষতি হয়। সরকারিভাবে ক্ষতিগ্রস্থ ঘেরের আয়তন নির্ধারণ করা হয় ৩৫ হাজার ৮৬৫ হেক্টর। এতে ছয় হাজার ১০০ মে. টন মাছ ভেসে যায়। সরকারিভাবে যার মূল্য নির্ধারণ করা হয় ২৩২ কোটি ৬৯ লাখ পাঁচ হাজার টাকা। এ সময় অবকাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে আট কোটি ৪৯ লাখ ৫৮ হাজার টাকার।

এছাড়াও কাঁকড়া ও পোনা মাছের ব্যাপক ক্ষতি হয়। সব মিলিয়ে সরকারি হিসাবে ২০১৯ সালের নভেম্বর থেকে এ পর্যন্ত প্রাকৃতিক দুর্যোগে জেলায় মৎস্য খাতে ক্ষতি হয়েছে ২৬২ কোটি ছয় লাখ ৪৫ হাজার টাকা।  অফিস থেকে আরও জানাযায়, ইয়াসের প্রভাবে জেলায় সাত হাজার ৪৬৮টি মৎস্য ঘেরের ক্ষতি হয়। সরকারি হিসাবে যার আয়তন নির্ধারণ করা হয় ছয় হাজার ৭৩২ হেক্টর। এতে ৩৪৫ মে.টন মাছ ভেসে যায়। সরকারিভাবে যার মূল্য নির্ধারণ করা হয় ১২ কোটি ৫৯ লাখ পাঁচ হাজার টাকা।

এ সময় অবকাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে এক কোটি ৭০ লাখ ৮৬ হাজার টাকার। সব মিলিয়ে সরকারি হিসাবে ইয়াসে মৎস্য খাতে ক্ষতি হয়েছে ১৫ কোটি ৭৫ লাখ ২৬ হাজার টাকা ক্ষতি হয়। আম্পানের প্রভাবে জেলায় ১০ হাজার ৩৭০ টি মৎস্য ঘেরের ক্ষতি হয়। সরকারি হিসাবে যার আয়তন নির্ধারণ করা হয় ১৩ হাজার ৫২৪ হেক্টর। এতে চার হাজার ২৪২ মে.টন মাছ ভেসে যায়। সরকারিভাবে যার মূল্য নির্ধারণ করা হয় একশ ৫৭ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। এ সময় অবকাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে পাঁচ কোটি ৬৫ লাখ ৭২ হাজার টাকার। সব মিলিয়ে সরকারি হিসাবে আম্পানে মৎস্য খাতে ক্ষতি হয়েছে একশ ৭৭ কোটি ১৪ হাজার টাকা ক্ষতি হয়।

বুলবুলের প্রভাবে পাঁচ হাজার ১৭ টি মৎস্য ঘেরের ক্ষতি হয়। সরকারি হিসাবে যার আয়তন নির্ধারণ করা হয় পাঁচ হাজার ৭১৯ হেক্টর। এতে ৪১৪ মে.টন মাছ ভেসে যায়। সরকারি ভাবে যার মূল্য নির্ধারণ করা হয় ১০ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। এ সময় অবকাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে ২৪ লাখ টাকার। সব মিলিয়ে সরকারি হিসাবে বুলবুলের মৎস্য খাতে ক্ষতি হয়েছে ১০ কোটি ৬০ লাখ টাকা ক্ষতি হয়।

চলিতে বছরে ভারি বর্ষণে মৎস্য খাতে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এর প্রভাবে ১৫ হাজার ১৮টি মৎস্য ঘেরের ক্ষতি হয়। সরকারি হিসাবে যার আয়তন নির্ধারণ করা হয় নয় হাজার ৮৯০ হেক্টর। এতে এক হাজার ১১০ মে. টন মাছ ভেসে যায়। সরকারিভাবে যার মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৫২ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এ সময় অবকাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে ৮৯ লাখ টাকার। সব মিলিয়ে সরকারি হিসাবে ভারি বর্ষণে মৎস্য খাতে ক্ষতি হয়েছে ৫৮ কোটি ৫৭ লাখ ১৯ হাজার টাকা ক্ষতি হয়।

অফিস থেকে আরও জানা যায়, জেলার সাত উপজেলায় ৬৬ হাজার ৫৯৭টি মৎস্য ঘের রয়েছে। সরকারিভাবে যার আয়তন নির্ধারণ করা হয়েছে ৬৬ হাজার আটশ ৬২ হেক্টর। ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত জেলায় মাছ উৎপাদন হয়েছে এক লাখ ২৭ হাজার ৪৮ মে. টন। উৎপাদিত এ মাছের মধ্যে সাদা মাছ উৎপাদন হয়েছে ৮৮ হাজার ১৮৫ মে. টন এবং চিংড়ি মাছ উৎপাদন হয়েছে ৩৮ হাজার ৮৬২ মে. টন। গত অর্থ বছরে জেলায় তিন হাজার ৫৪৬ কোটি ২৬ লাখ ৫৭ হাজার ৬০০ টাকার মাছ উৎপাদন হয়ে। উৎপাদিত এ মাছের মধ্যে সাদা মাছ উৎপাদন হয়েছে এক হাজার ৪১০ কোটি ৯৬ লাখ ৬৫ হাজার ৬০০ টাকার এবং চিংড়ি উৎপাদন হয়েছে দুই হাজার ১৩৫ কোটি ২৯ লাখ ৯২ হাজার টাকার।

পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে জানা যায়-সাতক্ষীরায় নদীর বেড়িবাঁধ রয়েছে ছয়শ আশি কিলোমিটার। এর মধ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ডে-১ এর আওতায় রয়েছে সাতক্ষীরা সদর (আংশিক), দেবহাটা, কালিগঞ্জ এবং শ্যামনগর (আংশিক) তিনশ ৮০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ। পানি উন্নয়ন বোর্ডে-২ এর আওতায় রয়েছে কলারোয়া, তালা, সাতক্ষীরা সদর (আংশিক), আশাশুনি ও শ্যামনগর (আংশিক) তিনশ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ। একটি বে-সরকারি উন্নয়ন সংস্থা দেওয়া তথ্য থেকে জানা যায় এসব বেড়িবাঁধের মধ্যে শুধু শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলায় ৫৮টি পয়েন্ট ঝুকিপূর্ণ রয়েছে। যার মধ্যে শ্যামনগরে রয়েছে ৪১টি এবং আশশুনিতে রয়েছে ১৭ টি ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্ট। এসব পয়েন্ট ভেঙ্গে বিভিন্ন সময় হাজার হাজার হেক্টর মৎস্য ঘের প্লাবিত হয়ে কোটি কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে।

তবে আশা কথা হলো-সাতক্ষীরার উপকূলীয় এলাকায় পুরানো বাঁধ সংস্কারের পাশাপাশি টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণে এক হাজার ২০ কোটি টাকার ‘সাতক্ষীরা জেলার পোল্ডার নং-১৫ পুনর্বাসন’ শীর্ষক একটি প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে। ‘সাতক্ষীরা জেলার পোল্ডার নং-১৫ পুনর্বাসন’ শীর্ষক প্রকল্পটি সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বিভাগ-১ এর আওতাধীন জেলার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নে বাস্তবায়ন করা হবে।

সাতক্ষীরা নাগরিক কমিটির আহবায়ক আনিসুর রহিম বলেন, দেশের অথনৈতিক চাহিদা পূরণে মৎস্য চাষের গুরুত্ব অপরিসীম। সেই চাহিদা পূরণে বিশেষ ভূমিকা রাখে সাতক্ষীরা জেলার মৎস্য চাষিরা। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগে বারবারই এ জেলার মৎস্য চাষিরা ক্ষতির সম্মুখিন হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, সরকারে পক্ষতে এ অঞ্চলের সম্পদ রক্ষার জন্য বিভিন্ন সময় বরাদ্দ দেওয়া হলেও পানি উন্নয়ন বোর্ডের অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে ঝুকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ গুলো সঠিকভাবে নির্মাণ হচ্ছে না। ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগে জেলার মৎস্য খাতের ক্ষতি দিন দিন বাড়ছে। প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও মৎস্য বিভাগ সম্মিলিতভাবে উদ্যোগের মাধ্যমে টেকশই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করতে না পারলে আগামীতে জেলার মৎস্য চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে চাষিরা বলে তিনি বলেন।

সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য অফিসার মো: মশিউর রহমান বলেন, টেকসই বেড়িবাঁধ না থাকার কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগে জেলার মৎস্য চাষিরা ব্যাপকভাবে ক্ষতির সম্মুখিন হচ্ছে। আবার অনেক ঘেরে নিজস্ব কোন বাঁধ না থাকায় নদীর বেড়িবাঁধকে ঘেরের বাঁধ হিসেবে ব্যবহার করছে চাষিরা। এতে মৎস্য চাষের ঝুঁকিও বাড়ছে।

তিনি আরও বলেন, সরকারি রাস্তা বা নদীর বাঁধকে ঘেরের বেড়িবাঁধ হিসেবে যাতে ব্যবহার করতে না পারে সে জন্য একটি কমিটি করা হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে এ কমিটি খোজ-খবর নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। তখন ক্ষতি কিছুটা কমতে পারে বলে তিনি আশা করেন।

তিনি আরও বলেন, মৎস্য চাষিদের জন্য সরকারে ঋণ দেওয়ার জন্য অগ্রাধিকার দেওয়া কথা বলা হয়েছে। কিন্তু মৎস্য চাষিরা সাধারণত জমি লীজ নিয়ে মাছ চাষ করছে। কে কারণে ব্যাংক ঋণ গ্রহণের জন্য সঠিক কাগজপত্র ব্যাংকে উপস্থাপন করতে পারে না। তাই ব্যাংক ঋণও গ্রহণ করতে পারে না। এ খাতে প্রচুর অর্থ ব্যাংকে অলস পড়ে আছে উল্লেখ করে তিনি ক্ষতিগ্রস্থ মৎস্য চাষিদের জন্য আরও সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ দেওয়ার আহবান জানান।

Check Also

আশাশুনি ইঁদুর মারা বিদ্যুতের তারে জড়িয়ে দু’জনের মৃত্যু

আশাশুনি উপজেলার শোভনালীতে ধান ক্ষেতের ইঁদুরের উপদ্রব দমন করতে পেতে রাখা বৈদ্যুতিক তারের ফাঁদে আটকে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

***২০১৩-২০২১*** © ক্রাইমবার্তা ডট কম সকল অধিকার সংরক্ষিত।