এম রিয়াছাত আলী ছিলেন দক্ষিণ বাংলার আলোক বর্তিতা

আবু সাইদ বিশ্বাস: সাতক্ষীরার আশাশুনি ঘুরে ফিরে: যার চোখের পানিতে রাতের জায়নামাজের বিছানা ভিজে যেত আর দিনের বেলা কাটতো ইসলামের খেদমতে আর ঘুমের মধ্যে কোরআন তেলওয়াত শোনা যেত এমন এক জন মানব দরদী ছিলেন দক্ষিণ বঙ্গের শ্রেষ্ঠ আলেম বার বার নির্বাচিত এমপি মাওলানা রিয়াছাত আলী বিশ^াস। এই মানুষটির ৬ষ্ঠ মৃত্যুবাষিকী ছিল ১০ মার্চ। ২০১৬ সালের এই দিনে সবাইকে কাঁদিয়ে তিনি পরলোক গমন করেন ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অন্যতম সিপাহসালার সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার সাবেক সংসদ সদস্য ও বিখ্যাত আলেমে দ্বীন, প্রবীণ রাজনীতিবিদ এবং জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় শূরা সদস্য ছিলেন মাওলানা এ এম রিয়াছাত আলী বিশ্বাস । ২০১৬ সালের ১০ মার্চ বৃহস্পতিবার বেলা ১০টা ৫৮ মিনিটে বার্ধক্যজনিত কারণে হৃদরাগে আক্রান্ত হয়ে আশাশুনি উপজেলার কুড়িকাউনিয়া গ্রামের নিজ বাড়িতে তিনি ইন্তিকাল করেন। ৮৪ বছর বয়সের এই মানুষটির জীবন যুদ্ধ নিয়ে মানুষের জানার আগ্রহ ক্রমেই বাড়ছে।

বিপদে-আপদে সবাই তার কাছে যেতেন। অসুখ-বিশুখ হলে তাঁর কাছে যেতেন দোয়া নিতে। এমনকি হিন্দু সম্পদায়ের লোকেরাও হুজুরের কাছে পানি পড়া নিতে যেতেন। তিনি নিজেকে বড় কিছু মনে না করলে দক্ষিঞ্চালের মানুষ তাকে পীর হিসেবে সম্মান করতো। তাঁকে সরণ করতে চাই যেন গোটা দেশ ।
মাওলানা এম রিয়াছাত আলী বিশ্বাস ১৯৩৭ সালে ২৮ ডিসেম্বর আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর ইউনিয়নের কুড়িকাউনিয়া গ্রামের এক সমভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম মৃত জনাব আলী বিশ^াস ও মাতা মৃত রাহিলা খাতুন।
ছাত্র জীবন : মাওলানা এ এম রিয়াছাত আলী বিশ্বাস ১৯৪৬ সালে শ্যামনগরউপজেলার পাতাখালী মাদরাসা থেকে ৮ম শ্রেণী ও ১৯৪৮ সালে একই মাদরাসাথেকে দাখিল পাস করেন। ১৯৪৮ সালে বাগেরহাট জেলার সোনাতুনিয়া ফাজিল মাদরাসা থেকে আলিম ও ফাজিল পাস করেন। তিনি ১৯৫৪ সালে বরিশাল শরশিনা কামিল মাদরাসা থেকে হাদিসের ওপর কামিল ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৫৮-হতে -১৯৬৪ পর্যন্ত প্রতাপনগর মাদ্র্রাসার প্রতিষ্ঠাত প্রিন্সিপাল, ১৯৬৫-১৯৬৮ ঘুগরাকিট ফাজিল মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল ১৯৬৮-১৯৭১ পর্যন্ত প্রতাপনগর হাইস্কুলের ইংরেজি শিক্ষক ১৯৭৩-১৯৭৭ ঘুগরাকটি ফাজিল মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল ১৯৭৭-১৯৯৩ পর্যন্ত আবার প্রতাপনগর ফাজিল মাদ্রাসায় প্রিন্সিপাল দায়িত্ব পালন করেন।

রাজনৈতিক জীবন : মাওলানা এ এম রিয়াছাত আলী বিশ^াস ১৯৫৮ ও ১৯৬৩ সালে প্রতাপনগর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য এবং ১৯৭৭ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত ইউপি চেয়ারম্যান ছিলেন। ইউপি চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালনকালে তিনি রাষ্ট্রীয় স্বর্ণ পদক লাভ করেন। তিনি ১৯৯১ সালে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মনোনয়নে সাতক্ষীরা-৩ (আশাশুনি) আসন থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য ও ২০০১ সালে চার দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে একই আসন থেকে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০১ সালে সংসদ সদস্য থাকা অবস্থায় তিনি বাংলাদেশ সরকারে অর্থ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং বাচাইকৃত ৪ সদস্য বিশিষ্ট্য কমিটির চেয়ারম্যান থাকাকালীন বাংলাদেশ র্যা ব বাহিনী গঠনের অন্যতম প্রস্তাবক ছিলেন। তিনি ১৯৯১ সালে তৎকালীন সরকারের বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন।

তিনি সংসদ থাকা কালিন আশাশুনি উপজেলায় ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়। প্রায় ৫৭ কটি টাকার রাস্ত ঘাট করেন। প্রতিটি ইউনিয়নের সংযোগ রাস্তা সহ উপজেলার সকল গুরুত্ব রাস্তা ঘাট তার আমলে নির্মিত। আশাশুনি ব্রিজ, তেতুলিয়া ব্রিজ, বহুল আলোচিত মানিকখালী ব্রিজের ভিত্তিপ্রস্তর তাঁর হাত দিয়েই হয়েছিল। উপজেলা পরষিদ ভবন, হাসপাতাল ভবন, বিভাগীয় এতিম কমপ্লেক্স সবই তার অবদান। সাতক্ষীবা জেলায় পল্লিবিদুৎ এর ১৩২ কেভি সাবগ্রীট ও আশাশুনি উপজেলায় সাবষ্টেশন ও তার অবদান।এছাড়া উপজেলায় ১৫০ কিঃ মিঃ উপরে বিন্দুতের নুতন সংযোগ দেন। আশাশুনি উপজেলার অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তার উন্নয়নের ছোয়া আছে।তিনি সরকারী ভাবে ২বার লন্ডন ও পাকিস্থান সফর করেন।

তাঁর ছেলে নুরুল আফসার জানান,আব্বা যেখানে যেতে আমাকে প্রায় সাথে করে নিয়ে যেতেন। তার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হতে শুরু করে মাহফিলে ষ্টেজ পর্যন্ত। প্রিন্সিপাল থাকা অবস্থা প্রতি বছর কিছু জমিজমা বানিয়েছেন। কিন্তু জাতীয় সংসদ সদস্য হওয়ার পর, আর কোন সম্পদ বানাতে পারেননি। তিনি ছিলেন এমন একজন জন প্রতিনিধি যে,চেয়াম্যান থাকা কালিন প্রজেক্টের চাল বেচে গেলে তা সম্পূর্ন সরকারের কোষাগারে জমা দিতেন। যদিও এই জমা দেওয়াটা ছিল জটিল কাজ। তাই চেয়ারম্যান থাকা কালীন তখনকার প্রেসিডেন্ট তাকে ডেকে নিয়ে পুরুস্কৃত করেন এবং প্রেসিডেন্ট নিজ হাতে ডাব কেটে খাওয়ায়ে বলেন আপনার মত চেয়ারম্যানরা এ জাতীর জন্য গর্ব। তিনি সংসদ সদস্য হওয়ার পরও তার বসত বাড়ি থেকে গেল গোলের ছাউনি। বিলসিতা দুরে থাক, তার বেতন ভাতার অধিকাংশ খরচ করতেন এলাকার উন্নয়নের পিছনে ছোটা-ছুটিতে, গরিব দুঃখির মাঝে ও ইসলামী আন্দোলনের পিছনে।
তার সন্তান হিসাবে আমরা জানি তিনি যখন ঘুমেয়ে থাকতেন অধিকাংশ রাত ঘুমের মধ্যে সুললিত কন্ঠে কোরআন তেলায়াত করতেন। মাঝে মাঝে ঘুমের ভিতর নামাজ পড়তে যা বাস্তব নামাজের ন্যায়, যার ভিতর থাকতো রুকু, সেজদা, তাজবিহ সব কিছু । যেনে বুঝে কোন প্রকার অন্যায় মিথ্যার আশ্রয় তিনি কোন দিন নিতেন না।
তার ছেলে আরো জানান, তিনি ছিলেন হিন্দুদের কাছে দেবতার মতো। এলাকার অধিকাংশ হিন্দু তাকে ভোট দিত। কারন ১৯৭১ সালে হিন্দুদের জন্য অনেক কিছু করেছিল। আমাদের বাড়ি ছিল তাদের আশ্রয়ের জায়গা। অনেকে যখন বাধ্য হয়ে ভারতে চলে যান ,তখন তারা বিভিন্ন নেতা সহ আব্বার কাছে তাদের সম্পদ গচ্ছিত রেখে যায়। পরবর্তিতে ফিরে এসে তারা আব্বা ছাড়া কারোর হতে তারা তাদের সেই আমানাত সঠিক ভাবে বুঝে পাই নাই।
তিনি আরো বলেন আব্বার প্রতি সাধারণ মানুষের ভাল বাসার প্রমান দেখেছি আব্বার জানাযায় লাখ মাুষের অংশগ্রহণে। হাজার হাজার হিন্দুকেও দেখেছি আব্বাকে শেষ বারের মতো একবার দেখতে। সাংবাদিক সহ বিশিষ্ট জনদের মন্তব্য ছিল, কোন বিভাগিও শহরে এতো বড় জানাযা এই প্রথম। তা আবার একটি প্রত্যন্ত গ্রামে।
তার ছেলে নুরুল অঅফসার আরো জানান, আব্বা বড় ইচ্ছা ছিল আমি যেন তার জানাযা পড়তে পারি। আল্লাহ সেইচ্ছা পুরোন করলেন অলৌকিক ভাবে। ১০ মাচ/২০১৬ বৃহস্পতি বার ১২ টায় জেল খানায় বসে জানতে পারলাম যে, বেলা ১১টায় আব্বা দুনিয়া ছেড়ে চির বিদায় নিয়েছে। মুহুর্তে মধ্যে যেন জেল খানার সবকিছু থেমে গেল । শুধু দেখলাম বন্দিদের চোখের পানি । জেল কতৃপক্ষের এক জন দায়িত্বশীল ব্যাক্তি জনতার মাঝে এসে বল আপনারা সবাই ভেংগে পড়লে এম পি সাহেবের ছেলেকে কে সান্তনা দেবে। আমি বলরাম আমি ঠিক আছি আমাকে একটু একা থাকতে দেন। আমি আব্বার ইচ্ছা পুরনের অপেক্ষায় আছি। আমি আমার মন ভুরো শুধু আল্লাকে ডেকে বলেছিলাম তুমি আব্বার শেষ ইচ্ছাটা পুরুন করো। কিভাবে করবে আল্লাহ তা আমার জানা নাই। ১টার দিকে জানলাম আমার পারেলে মুক্তি হয়েছে কিন্তু শহরের বাইরে যাওয়া যাবে না। আব্বার কপিন শহরে এনে এখানে একটা জানাযার চন্তিা করছে। আমি বলে দিয়ে ছিলাম আব্বার কপিন যেনো বাড়ি হতে না আনা হয়। আল্লাহ হয় আব্বার ইচ্ছা পুরন করবেন , নতুবা আমি সব কষ্ট মেনে নেব জেলে বসে। বিকাল ৪টায় খবর পেলাম আমার ৩দিনের জামিন হয়েছে। কতৃপক্ষ দ্রুত আমার বের করার সকল ব্যবস্থা নিয়ে মাগরিবের পূর্বে জেল হতে বের করে দিলেন।
জেল হতে বের হয়ে জানতে পারলাম এলাকা হতে আদালাতে আসা মানুষের আর্তনাজ এক জজ্ব সাহেবের চোখে পড়ে। সে আমার উকিলকে জিঙ্গাসা করে কি হয়েছে, এত লোক কেন আপনার পিছনে কান্নাকাটি ছোটা-ছুটি করছে। উকিল সব ঘটনা বলার পর আল্লাহ জজ্ব সাহেবের বিবেক জাগিয়ে দেয়। এবং দ্রুত গতিতে আমার বের করার সকল ব্যবস্থা করেন।
কথিত আছে , একদা আশাশুনি থানার নতুন ওসি তৎকালিন এমপির সাথে সাক্ষাৎ করতে এমপি সাহেবের গ্রামের বাড়িতে যান। বাড়ির সামনে যেয়ে এক লুঙ্গি পরা দাঁড়ি ওয়ালা এক মুরুব্বিকে জ্ঞগাসা করেন আপনিকি এমপি সাহেবের বাড়ি চেনেন। লোকটি তখন বাড়ির কাজে ব্যস্থ ছিল। লোকটি বললো কেন। ওসি সাহেব বললেন আমি থানা থেকে এসেছি। আমি উনার সাথে সাক্ষাৎ করবো। লোকটি বললো আমি সেই এমপি। ওসি সাহেব স্যার বলে দু:খ প্রকাশ করলেন। বললেন স্যার ভুল হয়েছে। আমি বুঝতে পারিনি। একজন এমপি সাহেবের যে এতটায় সাধা সিদে জীবন যান তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আল্লাহ যেন এই মাানুষটিকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মেহমান হিসেবে কবুল করেন। আমীন।

 

Check Also

আলেম-ওলামাদের বিরুদ্ধে অবস্থান মূলত ইসলাম ও দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া : ড. মাসুদ

ষিতে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান এবং পরে বেগম খালেদা জিয়া ছাড়া অন্য কেউ ভূমিকা রাখেননি …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

***২০১৩-২০২১*** © ক্রাইমবার্তা ডট কম সকল অধিকার সংরক্ষিত।