ঈদুল ফিতরের প্রেক্ষাপট, গুরুত্ব, তাৎপর্য ও করণীয়

মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন:  ‘ঈদ’ মানে আনন্দ-উৎসব; ঈদ মানে যা বার বার ফিরে আসে প্রতি বছর। রমজানের রোজার শেষে এ ঈদ আসে বলে এর নাম ‘ঈদুল ফিতর’। ‘ফিতর’ মানে উপবাস ভঙ্গ করা বা রোজা ভাঙা; আরবি ‘আইন, ওয়াও, দাল’ আওদ ধাতু থেকে ঈদ শব্দটি গঠিত। ঈদ শব্দের আভিধানিক অর্থ যা বার বার ফিরে আসে। প্রতি বছরই ইয়াওমুল ফিতর ও ইয়ামুল আজহা ফিরে আসে বলে ইসলামী শরিয়তে ঐ দুটি ঈদ নামে বিশেষিত করা হয়েছে। (আল্লামা রাগিব আল ইসপাহানী, আল মুফরাদাতু লি গারিবিল কুরআন, পৃ. ৩৫৮)।
মুসলিম মিল্লাতের দুটি ঈদের একটি ঈদুল ফিতর। সুতরাং ঈদুল ফিতর বিশ্ব মুসলিমের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহোৎসব। এটি আরবি হিজরী সনের দশম মাস তথা শাওয়াল মাসের প্রথম দিন। রমজানের বরকত লাভের জন্য ত্যাগ, কষ্ট-ক্লেশ ও আয়াস সাধ্য-সাধনার পর যে মাসটি সাফল্যের বার্তা নিয়ে আসবে, তা অবশ্যই মহান। মে মাসের দ্বিতীয় বা তৃতীয় দিনই ঈদ উৎসব। ঈদুল ফিতর ঐ আনন্দ উৎসবকে বলা হয়, যা রমজানের পর আসে। (ড. ইবরাহীম আনীস ও তার সাথীবৃন্দ, আল মুজামুল ওয়াসীত, ইস্তাম্বুল: আল মাকতাবুল ইসলামী তা.বি. ২/৬৯৪)।
‘ঈদুল ফিতর’র প্রেক্ষাপট
সৃষ্টির আদি থেকে প্রত্যেক জাতি এক বা একাধিক দিনে স্বীয় জাতীয় আনন্দ-উৎসব পালন করে আসছে।
মহান পুণ্যময় ঈদুল ফিতর উদযাপন শুরু হয়েছিল হিজরী ২য় সনে। অর্থাৎ প্রায় সাড়ে ১৪০০ বছর আগে। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) মদিনায় হিজরতের পরই ঈদুল ফিতর উৎসব পালন শুরু হয়। অর্থাৎ বদরের যুদ্ধে ‘চূড়ান্ত মীমাংসাকারী’ বিজয় সে বছরেই অর্জিত হয়েছিল। হয়তো এই বিজয়ের স্মৃতিকে আরো আনন্দময় করে তোলার জন্য হজরত মুহাম্মদ (সা.) ওই বছর রমজান মাসের শেষে ঈদ উৎসব পালনের ঘোষণা দিয়েছিলেন। হজরত আনাস (রা.) বর্ণিত একটি হাদিস থেকে জানা যায়, নবী করিম (সা.) মদিনায় এসে দেখলেন মদিনাবাসী বছরে দুটি দিবসে আনন্দ উল্লাস করে থাকে। রাসূল (সা.) জিজ্ঞাসা করলেন, এ দিবস দুটি কী? ওরা বলল, নওরোজ ও মিহিরজান। শরতের পূর্ণিমায় পালিত হয় নওরোজ উৎসব। আর বসন্তের পূর্ণিমায় পালিত হয় মিহিরজান উৎসব। জাহেলি যুগ থেকেই এ দুটি দিবসে আনন্দ-উল্লাসের মধ্য দিয়েই পালিত হয়ে আসছিল। তখন রাসূল (সা.) বললেন, আল্লাহ তোমাদের উক্ত দিবস দুটির পরিবর্তে উত্তম দুটি দিবস দান করেছেন। তা হলো ঈদুল আজহার দিন এবং ঈদুল ফিতরের দিন।
রাসূলুল্লাহ (সা.) জানতেন নওরোজ ও মিহিরজান এই উৎসব দুটির রীতি-নীতি, আচার-অনুষ্ঠান ছিল সম্পূর্ণরূপে ইসলামের আদর্শ পরিপন্থী। জরথুস্থ প্রবর্তিত নওরোজ ছিল নববর্ষের উৎসব। ছয় দিনব্যাপী এই উৎসবের মধ্যে মাত্র একদিন ছিল সাধারণ মানুষের জন্য নির্দিষ্ট। বাকি পাঁচ দিন ছিল সম্ভ্রান্ত বা ধনিকশ্রেণির মানুষের জন্য নির্ধারিত। এজন্য গরিব শ্রেণির মানুষ পাঁচ দিন আনন্দ-অনুষ্ঠান উপভোগ করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতো। ঠিক সেভাবেই ছয় দিনব্যাপী মিহিরজান উৎসবেও শুধুমাত্র একদিন সাধারণ দরিদ্র মানুষ উপভোগ করতে পারত। সুতরাং শ্রেণিবৈষম্য, ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য এবং অশালীনতায় ভরা ছিল ওই উৎসব দুটি। এরই পরিপ্রেক্ষিতে রাসূলুল্লাহর কথামতো আরববাসী নওরোজ ও মিহিরজান উৎসব বাদ দিয়ে বছরে দুটি ঈদ উৎসব পালন শুরু করে। এর ফলে জন্ম নেয় শ্রেণি বৈষম্যহীন, সাম্য মৈত্রী ও অশালীনতামুক্ত আরব সমাজ।
ঈদ উৎসব পালনের আরো একটি ঐতিহাসিক পটভূমি রয়েছে। তা হলো, আরবের অন্যান্য সম্প্রদায়ের মধ্যে নানারকম উৎসবের প্রচলন ছিল। উকাজের মেলা ছিল এ ধরনের একটি বর্ণাঢ্য আয়োজন। এসব উৎসব প্রায়সই নানা অশালীন ও রুচিহীন আনুষ্ঠানিকতায় পূর্ণ থাকত। অন্যদিকে মুসলমানদের জন্য তখন পর্যন্ত কোনো উৎসবের প্রচলন হয়নি। তাদের নিষ্কলুষ বিনোদনের বিষয়টি রাসূলুল্লাহ (সা.) গুরুত্বের সঙ্গে অনুধাবন করেন এবং হিজরীর ২য় সন থেকেই রমজান শেষে ঈদুল ফিতর উৎসব উদযাপনের সূচনা হয়। তারপর শুরু হয় ঈদুল আজহা উদযাপন। এভাবেই শুরু হলো বছরে দুটি ঈদ উদযাপন। এর ফলে জন্ম নেয় শ্রেণিবৈষম্য বিবর্জিত সর্বজনীন আনন্দ উৎসবের।
ঈদের দিনে করণীয়
১. তাকবীর বলা : রাসূল (সা.) ঈদের দিন বেশি বেশি তাকবীর বলতেনÑ আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার ওয়ালিল্লাহিল হামদ। হাদীসে এসেছে, তিনি ঘর থেকে ঈদগাহ পর্যন্ত  তাকবীর দিতে দিতে যেতেন। (হাকিম, তালখীসুল হাবীর, পৃ. ১৪২)।
২. গোসল করা : ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দিন গোসল করতেন। (সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৩১৫)।
৩. সুন্দর পোশাক পরিধান করা : রাসূল (সা.) ঈদের দিন সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন পোশাক পড়তেন। ‘আবদুল্লাহ ইবনে ‘ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বাজারে একটি রেশমী জুব্বা বিক্রি হতে দেখে তা আল্লাহর রাসূল (সা.) -এর নিকট নিয়ে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা.)! আপনি এ জুব্বাটি ক্রয় করুন। তাহলে ঈদের সময় এবং প্রতিনিধি দলের সাথে সাক্ষাতের সময় আপনি এটি পরিধান করতে পারবেন। আল্লাহ্র রাসূল (সা.)  তাঁকে বললেন, হে ওমর! এ পোশাক তো কেবল তাদের জন্যই, যাদের আখিরাতে কোনো অংশ নেই। এরপর ওমর (রা.)  বেশ কিছুদিন অতিবাহিত করলেন। কিছুদিন পর আল্লাহ্র রাসূল (সা.) একটি রেশমি জুব্বা ওমর (রা.)-এর নিকট পাঠিয়ে দিলেন। তিনি সেটি নিয়ে আল্লাহ্র রাসূলের কাছে উপস্থিত হয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা.) আপনি তো বলেছিলেন, এ রেশমি পোশাক শুধু তাদের জন্যই, যাদের আখিরাতে কোনো অংশ নেই, অথচ আপনি এ জুব্বাটি আমার নিকট পাঠিয়েছেন! আল্লাহ্র রাসূল (সা.) তাঁকে বললেন : তুমি এটি বিক্রি করে দাও এবং বিক্রির সে অর্থ দ্বারা নিজের প্রয়োজন পূরণ কর। (সহীহ বুখারী : ৯৪৮)।
কখনো তিনি সবুজ রংয়ের চাদর পরতেন। (সুনানে নাসায়ী ১/১৭৮পৃ.)।
আবার কখনো লাল ফুলের বুটি দেয়া চাদর পরতেন। (ইমাম ইবনুল কাইয়ুম, যাদুল মা’আদ ১/১২১ পৃ.)।
জাবির (রা.) বলেন, দু’ ঈদে ও জমায় নবী (সা.) তাঁর লাল বুটি দেয়া বিশেষ চাদরটি পরতেন। (আল্লামা শাওকানী, নায়লুল আওতার ৩/১৬৬ পৃ.)।
প্রত্যেক ঈদে তিনি এক বিশেষ ইয়ামানী চাদর পরতেন। (ইমাম শাফেয়ী, কিতাবুল উম্ম ২০৬ পৃ.)।
৪. সুগন্ধি লাগানো : রাসূল (সা.) ঈদের দিন সর্বোত্তম খুশবু লাগাতেন। (হাকিম, ফতহুল আল্লাম ১/২২১ পৃ.)।
৫. মিষ্টিদ্রব্য বা খেজুর খাওয়া : ঈদুল ফিতরের দিন ঈদগাহে বের হওয়ার পূর্বে মিষ্টিদ্রব্য বা খেজুর খাওয়া। আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহ্র রাসূল (সা.) ঈদুল ফিতরের দিন ভোরবেলা প্রথমে কিছু খেজুর না খেয়ে বের হতেন না। মুরাজ্জা ইবনে রাজা উবাইদুল্লাহ সূত্রে আনাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেন যে, নবী (সা.) তা বিজোড় সংখ্যক খেতেন। (সহীহ বুখারী : ৯৫৩)।
তবে তিনি ঈদুল আজহার দিনে সালাত না পড়া পর্যন্ত কিছু খেতেন না। (সুনানে তিরমিযী ১/৭১ পৃ.)।
৬. পায়ে হেঁটে যাওয়া :  রাসূল (সা.) পায়ে হেঁটে ঈদগাহে যেতেন। আলী (রা.) বলেন, সুন্নত হলো ঈদগাহে পায়ে হেঁটে যাওয়া। (সুনানে তিরমিযী : ৫৩০)।
৭. সাদাকাতুল ফিতর আদায় : রাসূল (সা.) ঈদের সালাত আদায় করার পূর্বেই সাদাকাতুল ফিতর আদায় করতেন। ‘আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.)  থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) সাদাকাতুল ফিতর (রোজার ফিতরা) হিসেবে মুসলিম দাস, স্বাধীন ব্যক্তি, নরনারী এবং বালক ও বৃদ্ধের ওপর এক সা’ খেজুর কিংবা এক সা’ যব নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। তিনি আরো আদেশ করেন, মানুষ ঈদের নামাজে উপস্থিত হওয়ার আগেই যেন তা আদায় করে দেয়। (বুখারী : ১৫০৩)।
৮. এক রাস্তা দিয়ে যাওয়া অন্য রাস্তা দিয়ে আসা : তিনি এক রাস্তা দিয়ে ঈদগাহে যেতেন এবং অপর রাস্তা দিয়ে বাড়ি ফিরতেন। জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (সা.) ঈদের দিন (বাড়ি ফেরার সময়ে) ভিন্ন পথে আসতেন। (বুখারী : ৯৮৬)।
৯. সালাত আদায় করা  : আবদুল্লাহ্ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহ্র রাসূল (সা.) ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আজহার দিন প্রথমে সালাত আদায় করতেন, আর সালাতের পর খুতবা দিতেন। (সহীহ বুখারী : ৯৫৭)।
জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (সা.), ঈদুল ফিতরের দিন ঈদগাহের উদ্দেশে বের হন। তারপর খুতবার পূর্বে সালাত শুরু করলেন। (সহীহ বুখারী : ৯৫৮)।
হাসান ইবনে আহমদ আল বান্না কিতাবুল আজাহীতে বর্ণনা করেছেন, জুনদুব বলেন, নবী করীম (সা.) আমাদের নিয়ে ঈদুল ফিতরের সালাত পড়েন তখন সূর্য দু’বল্লম ওপরে ছিল এবং সূর্য এক বল্লম ওপরে থাকাকালীন ঈদুল আজহা পড়ান। (তালখীসুল হাবীর ১৪৪ পৃ.)।
১০. ঈদের খুতবা শোনা : সালাত আদায়ের পরে রাসূল (সা.) খুতবা দিতেন এবং মুসল্লিরা মনোযোগ সহকারে শুনতেন। আবদুল্লাহ ইবনু সায়িব (রা.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে ঈদের সালাত আদায় করি। সালাত শেষে তিনি বলেন, আমি এখন খুতবা দেবো। যে খুতবা শোনার জন্য বসতে চায় সে বসবে, আর কেউ চলে যেতে চাইলে চলে যাবে। (সুনানে আবু দাউদ : ১১৫৫)।
ইমাম মালিককে এক ব্যক্তি এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো যে, তিনি ইমামের সাথে ঈদুল ফিতরের সালাত পড়ার পর খুতবা শোনার আগে চলে যেতে পারেন কি? তিনি বললেন, না, ততক্ষণ তিনি যেতে পারবেন না, যতক্ষণ ইমাম না যান। (মুওয়াত্তা ইমাম মালিক, ৬৪ পৃ.)।
১১.ঈদের দিনে মুসাফাহা ও কোলাকুলি : ঈদের দিনে ‘খাস করে’ মুসাফাহ এবং কোলাকুলি ও আলিঙ্গন করার ব্যাপারে কুরআন ও হাদীসে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। তবে কোনো কোনো হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, কোনো মুসলিম ব্যক্তির সাথে সাক্ষাত হলেই তাকে সালাম করতে হবে। (সহীহ মুসলিম, মিশকাত ১৩৩ পৃ.)।
মুসাফাহাও করতে পারে। যেমন আনাস (রা) বলেন, এক ব্যক্তি একদা বলল, হে আল্লাহর রাসূল (সা.)  আমাদের মধ্যকার কোনো ব্যক্তি তার কোনো ভাই অথবা বন্ধুর সাথে সাক্ষাৎ করে সে কি তার জন্য ঝুঁকতে পারে? তিনি বললেন, না। লোকটি বলল, সে কি তাকে জড়িয়ে ধরে কোলাকুলি করবে এবং চুমু দেবে। তিনি বললেন, হ্যাঁ। (তিরমিযী, মিশকাত ৪০১ পৃ.)।
এ হাদীস দ্বারা বোঝা যায় যে, যাদের সাথে সচরাচর দেখা হয়, তাদের সাথে ঈদগাহে দেখা হলে সালাম ও মুসাফাহা করা যেতে পারে। কিন্তু কোলাকুলি প্রয়োজন নেই। তবে হ্যাঁ, কারো সাথে যদি বহুদিন পর ঈদগাহে সাক্ষাৎ হয়, তাহলে তার সাথে কোলাকুলি করা যেতে পারে। যেমন একবার রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পালক ছেলে যায়েদ ইবনে হারেসা (রা) কোনো যুদ্ধ বা সফর থেকে ফিরে বাড়ি ঢুকলে রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁকে জড়িয়ে ধরে আলিঙ্গন করেন। (তিরমিযী , মিশকাত ৪০১ পৃ.)।
উক্ত সাধারণ ও ব্যাপকভাব প্রকাশক হাদীসগুলোর ভিত্তিতে অন্যান্য দিনের মতো ঈদের দিনেও সচরাচর সাক্ষাৎকারীদের সাথে সালাম ও মুসাফাহা করা যাবে এবং বহুদিন পর সাক্ষাৎকারীর সাথে মুআনাকা বা কোলাকুলি করা যাবে।
ঈদের গুরুত্ব ও তাৎপর্য :  ঈদুল ফিতর মুসলিম উম্মাহর নিকট অত্যন্ত গুরুত্ব ও তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিন। এ দিনের গুরুত্ব ও তাৎপর্য সংক্ষেপে নিম্মরূপে ব্যক্ত করা যায়-
১. ঈদুল ফিতরের দিন মুসলমানদের জাতীয় জীবনে সাম্য-মৈত্রীর যে বাস্তব নিদর্শন প্রকাশিত হয়, তা থেকে প্রমাণিত হয় যে, ঐক্যের মধ্যেই সুনিশ্চিত শান্তি সুধা বিদ্যমান।
২. ইসলাম ত্যাগ ও তিতিক্ষার এবং ভ্রাতৃত্ব ও সৌহার্দের যে প্রশিক্ষণ দিয়েছে, ঈদুল ফিতর মুসলমানদের অন্তরে সেই শিক্ষার চেতনাকে নতুন করে জাগিয়ে তোলে।
৩. দীন-দরিদ্র, এতিম, নিঃস্ব ও ছিন্নমূল মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার যে বাস্তব প্রশিক্ষণ মুমিন রমাদান মাসে অর্জন করেছে, তার সোনালি ফসল দর্শনের দিন হচ্ছে ঈদুল ফিতর এর দিন।
৪. ঈদের এই দিনে পারস্পরিক সম্পর্ক মজবুত ও দৃঢ় করার এবং ভ্রাতৃত্বের বন্ধন শক্তিশালী করার আকুল আবেদন আসে চতুর্দিক থেকে।
৫. পূর্ববর্তী নবী-রাসূলগণের দীর্ঘজীবি উম্মতদের সাথে নেকীর প্রতিযোগিতায় আমরা যাতে পরাজিত না হই, সেজন্য আল্লাহ তায়ালা রমাদানে ‘লাইলাতুল কদর’ দান করে যে মহাসুযোগ প্রদান করেছেন, তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দিন ‘ঈদুল ফিতর’।
৬. ঈদুল ফিতর সামাজিক আদব-কায়দা ও শৃঙ্খলাবোধ শিক্ষা দেয়।
৭. মানব স্রষ্টা আল্লাহর আইন পার্থিব জীবনে মেনে চললে ইহকালের মতো পরকালেও এরূপ আনন্দময় জীবন ও প্রশান্তি লাভ করা যাবে, তার বাস্তব জ্ঞান দান করে ঈদুল ফিতর।
৮. রমাদানের স্পর্শ পেয়েও মানুষের যে অংশ পুরোপুরি কলুষমুক্ত হয়নি, ঈদুল ফিতর সেই অংশের কলুষতা মুক্ত করে সমাজকে সজীব করে তোলে।
৯. ঈদুল ফিতর মানুষকে বিনয়ী, নম্র ও হৃদয়বান করে তোলে। যেন ঈদের প্রভাব থেকেই মানুষ অপরের সুখে সুখী হবার তাগিদ অন্তরও অনুভব করে। ছোটদের প্রতি স্নেহ-মমতা এবং বড়দের প্রতি শ্রদ্ধা-ভক্তির প্রাণপ্রবাহে তাদের হৃদয় মন ভরে যায়। স্রষ্টার প্রতি ভালোবাসার সাথে সাথে তারা যেন সৃষ্টির সাথেও সদ্ব্যবহার করতে পারে, যেন সৃষ্টিকে ভালোবেসে সন্তুষ্ট করতে পারে। বস্তুত নিছক এক দিনের হইচই ও মাতামাতির মধ্যেই ঈদের সার্থকতা নিহিত নয়; বরং প্রত্যেক ব্যাপারে পরিচ্ছন্ন মন ও উন্নত চরিত্রের অধিকারী হওয়াতেই ঈদ উৎসবের সার্থকতা ও সফলতা।
ঈদুল ফিতরের প্রকৃত তাৎপর্য হলোÑ ব্যক্তি জীবনের নানাবিধ কুপ্রবৃত্তি বা নফসানিয়াতের দমনের সাথে সাথে নানা প্রকার দান ও দাক্ষিণ্যের মাধ্যমে তার বহিঃপ্রকাশ ঘটানো রমাদানে মাসব্যাপী সিয়াম সাধনার দ্বারা মানুষ যে শিক্ষা লাভ করেছে, দান-খয়রাত হচ্ছে তার প্রায়োগিক প্রমাণ। কাজেই ঈদুল ফিতরে ‘সাদাকাতুল ফিতর’ আদায় করার পাশাপাশি অন্যান্য দান, সাদাকাহ এবং আপনার ব্যক্তিগত জীবনের সমূহ কুপ্রবৃত্তির উৎসারণ করার সাধনার মধ্যেই সিয়াম পালনের সফলতা। আর এরই সার্থকতার প্রমাণ হচ্ছে ঈদুল ফিতর। (মাসিক আত তাহরীক, ডিসেম্বর ২০০২, পৃ.৫)।
ঈদের দিনের মাহাত্ম্য : রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, যেদিন ঈদুল ফিতরের দিন, সেদিন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা ফেরেশতাদের সামনে গর্ব করতে থাকেন। অতঃপর বলেন, হে আমার ফেরেশতাগণ! মজদুরের পুরস্কার কী, যে তার কাজ পুরোপুরি করেছে? তখন ফেরেশতাগণ বলেন, হে আমাদের প্রতিপালক! তার পুরস্কার তাকে পুরোপুরি এর প্রতিদান দেয়া। এবার আল্লাহ বলেন, হে আমার ফেরেশতাগণ! আমার দাস ও দাসীরা তাদের ওপর চাপানো কর্তব্য পালন করেছে। তারপর তারা উচ্চৈঃস্বরে (তাকবীর) ধ্বনি দিতে দিতে দোয়ার জন্য (ঈদগাহে) রওনা হয়েছে। আমার সম্মান ও গাম্ভীর্যের কসম! এবং আমার উদারতা ও উচ্চমর্যাদার কসম! আমি তাদের ডাকে অবশ্য অবশ্যই সাড়া দেব। অতঃপর তিনি বলেন, আমি তোমাদের ক্ষমা করে দিলাম এবং তোমাদের খারাপগুলো ভালো দ্বারা বদলে দিলাম। নবী (সা) বলেন, তাই তারা ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়ে ফিরতে থাকে। (বায়হাকী  শুআবুল ঈমান, মিশকাত ১৮৬-১৮৩ পৃ.)।
ঈদ হলো পাপমুক্তির আনন্দ। সফলতা ও বিজয়ের আনন্দ। এ বিজয় নাফসের ওপর আকলের, এ বিজয় শয়তানের ওপর ইনসানের। মনের সব কালিমা দূর করে, মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ভুলে, মান-অভিমান বিসর্জন দিয়ে সবাই হাতে হাত মেলানো, বুকে বুক মেলানো, গলায় গলা মেলানো, অর্থাৎ সবার দেহ-মন এক হওয়ার আনন্দ হলো ঈদের আনন্দ। নিজের মনের হিংসা, ঘৃণা, লোভ, অহংকার, অহমিকা, আত্মম্ভরি, রাগ-ক্রোধ, বিদ্বেষসহ যাবতীয় কুপ্রবৃত্তি থেকে নিজেকে মুক্ত করার আনন্দ। সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ঐক্য, সৌহার্দ্য-সম্প্রীতির আনন্দ।
লেখক : প্রভাষক, সিটি মডেল কলেজ, ঢাকা।

Please follow and like us:

Check Also

ঢাবি ছাত্রীদের পেটাচ্ছেন কুয়াকাটার ছাত্রলীগকর্মী!

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর গতকাল হামলা চালায় ছাত্রলীগ। এর মধ্যে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

***২০১৩-২০২৩*** © ক্রাইমবার্তা ডট কম সকল অধিকার সংরক্ষিত।