আওয়ামী লীগের নির্বাচনী কৌশল: ষ্ট্রদূতদের নিয়মিত কাউন্সিলিং করা হবে

স্টাফ রিপোর্টার |  বিএনপির রাজপথে কর্মসূচি পালন করতে বাধা না দেয়া, মহাজোটের আকার বাড়ানো, ছোট দলগুলোকে সরকারের পক্ষে রাখা, বিভিন্ন এনজিও, নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংগঠনগুলোর সাথে সুসম্পর্ক রেখে প্রভাবশালী দেশগুলোর সাথে সুসম্পর্ক এবং রাষ্ট্রদূতদের নিয়মিত কাউন্সিলিং করা হবে। দলের অনুগত সুশীলদের কাজে লাগানো, বিএনপিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পুরনো মামলাগুলো সচলের কৌশল থাকবে।
ইয়াছিন রানা
ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের ক্যারিশমার কাছে বিএনপিসহ দেশের অন্যসব রাজনৈতিক দলের কৌশল মøান। সময়ের সিদ্ধান্ত সময়ে গ্রহণে দলটির জুরি নেই। রাজনৈতিক দূরদৃষ্টির সিদ্ধান্ত নিয়ে ২০১৪ সালে বিএনপির বর্জনের মধ্যেই নির্বাচনে নির্বাচিত হয়ে দলটি ৫ বছর নির্বিঘেœ ক্ষমতায় থেকেছে। ২০১৮ সালে সংলাপের মাধ্যমে বিএনপিকে ম্যানেজ করে নির্বাচনে এনে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছে। দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনে আগে বিএনপিসহ অন্যান্য দল নির্দলীয় সরকারের অধীনে ছাড়া নির্বাচনে যাবে না বলে ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ নেতারা মনে করছেন শেষ পর্যায়ে ভোটের আগে এমন ম্যাজিক দেখানো হবে তাকে বিএনপি নির্বাচনে আসতে বাধ্য হবে। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কৌশলের কাছে বিএনপি এখনো শিশু। দলটির নেতারা বলছেন, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে যাবে যে বিএনপি নিজের অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়োজনে ভোটে আসতে বাধ্য হবে। তবে এবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কারণে ‘নির্বাচন কঠিন হতে পারে’ এমন ভাবনা থেকে নির্বাচনে প্রায় শতাধিক আসনে নতুন মুখকে মনোনয়ন দেবে বলে জানা গেছে।

টানা তিন টার্ম ক্ষমতায় থাকায় আওয়ামী লীগের নীতি নির্ধারকরা মনে করছেন আগামী দ্বাদশ নির্বাচন বিগত নির্বাচনের চাইতে ভিন্ন রকমের এবং কঠিন হবে। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের মতো বিএনপিকে সহজেই বোকা বানানো যাবে না। দেশি-বিদেশি দৃষ্টি ভোটের দিকে থাকবে ফলে নির্বাচন কঠিন হবে। তাই দলকে সংগঠিত করে, দেশের সকল বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচনে আনা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাথে সুসম্পর্ক রেখে আগামী নির্বাচনে জয়লাভের ছঁক কষছেন। বর্তমানে মাঠের বিরোধী রাজনৈতিক দল বিএনপি সাফ জানিয়ে দিয়েছে আওয়ামী লীগের অধীনে নির্বাচনে আসবে না। কিন্তু বিএনপিকে যেভাবেই হোক নির্বাচনে আনতে চায় আওয়ামী লীগ। তাই গত নির্বাচনের মতো শেষ সময়ে ‘সংলাপ’র মতো নতুন কোনো ম্যাজিক দেখাবে ক্ষমতাসীনরা; যেন সকল দলের অংশগ্রহণে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়াও নির্বাচন উপলক্ষে নানামুখি কর্মকৌশল নিয়ে এগোচ্ছে আওয়ামী লীগ। সময় ও পরিস্থিতি অনুযায়ী পদক্ষেপ নেয়া হবে।

আওয়ামী লীগ সূত্র বলছে, যেকোনো কৌশলে হোক বিএনপিকে নির্বাচনে নিয়ে আসার টার্গেট আওয়ামী লীগের। কারণ বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে কি-না তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বড় ইস্যু। গত নির্বাচনের শেষ সময়ে গণভবনে ‘সংলাপ’ আয়োজনের মাধ্যমে বিএনপিকে নির্বাচনে নিয়ে আসা হয়েছিল। এবারও নতুন কোনো কৌশলে বিএনপিকে নির্বাচনমুখি করা হবে।

এছাড়া আওয়ামী লীগের কৌশলগুলোর মধ্যে রয়েছে, বিএনপিকে রাজপথে কর্মসূচি পালন করতে বাধা না দেয়া, মহাজোটের আকার বাড়ানো, ছোট ছোট রাজনৈতিক দলগুলোকে সরকারের পক্ষে রাখা, বিভিন্ন এনজিও, নির্বাচনী সংস্থা, নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংগঠনগুলোর সাথে সুসম্পর্ক রাখা, বিশ্বের প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর সাথে সুসম্পর্ক রাখা, নিয়মিত রাষ্ট্রদূতদের কাউন্সিলিং করা।

এদিকে বিএনপিকে মাঠপর্যায়ে কর্মসূচি পালন করতে দিলে যেকোনো উদ্ভ‚ত পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তাই বিএনপিকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য পুরনো মামলাগুলো সচল করা হবে, মামলার চার্জ গঠন, দ্রæত হাজিরা রাখা, জামিন বাতিল করার হাতিয়ার থাকবে সরকারের কাছে।

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ বলেন, মুখে যাই বলুক, আগামী নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেবে। আওয়ামী লীগ নির্বাচন নিয়ে কোনো ফন্দি ফিকির করে না, এ অভ্যাস বিএনপির আছে। আমরা আগামী নির্বাচন অবাধ ও শান্তিপূর্ণ করতে যা যা করা দরকার তা করব।

মহাজোটের আকার বাড়ানো : আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে মহাজোটের আকার বাড়বে। ছোট ছোট রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে ইতোমধ্যে যোগাযোগ শুরু করেছে সরকার। নির্বাচনের আওয়ামী লীগের পক্ষে অবস্থান ঠিক রাখতে দেন-দরবার করা হচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক নেতা জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা সেল এবং গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে যেন নির্বাচনের আগ থেকে তারা সরকারের পক্ষে ভ‚মিকা রাখে।

জনপ্রিয় প্রার্থী বাছাই : আগামী নির্বাচনে দলের প্রার্থী মনোনয়নে এখন থেকেই জনপ্রিয়তার জরিপ করছে আওয়ামী লীগ। গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে সারা দেশে এ জরিপ করা হচ্ছে। সম্প্রতি এমন এক জরিপে ৮৪ জন সংসদ সদস্য অজনপ্রিয় এবং ইমেজ সঙ্কটে ভ‚গছেন বলে উঠে এসেছে। এছাড়া যারা এমপি প্রার্থী রয়েছেন তাদের মাঠ পর্যায়ে সক্রিয় হতে বলা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বাড়ানো : পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের সাথে ঘনিষ্ঠ এবং প্রভাব বিস্তার করে এমন দেশগুলার সাথে যোগাযোগ বাড়ানো হয়েছে। নির্বাচনের সময় তাদের ভ‚মিকা বা অবস্থান যেন আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে না যায় সেজন্য নিয়মিত তাদের ব্রিফিং করা হবে। সরকারের পাশাপাশি আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক উপ-কমিটি এ বিষয়ে ভ‚মিকা পালন করবে।

নির্বাচনসংশ্লিষ্ট বেসরকারি সংস্থাগুলো নিয়ন্ত্রণ : নির্বাচনের আগে নির্বাচনসংশ্লিষ্ট যেসব বেসরকারি সংস্থাগুলো প্রেস ব্রিফিং, সভা, সেমিনার করে থাকে তারা যেন আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে কথা না বলে এবং সরকারের পক্ষে কথা বলে সেজন্য তাদের সাথে যোগাযোগ বৃদ্ধি করেছে আওয়ামী লীগ।

নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের সাথে যোগাযোগ বৃদ্ধি : নির্বাচনে বিভিন্ন সংস্থা নির্বাচন পর্যবেক্ষক হিসেবে কাজ করে থাকে। এসব দেশীয় ও বিদেশি সংগঠনগুলোর সাথে সরকার যোগাযোগ বাড়িয়েছে।
গুজব প্রতিরোধ : সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো বন্ধে এবং গুজব প্রতিরোধে কাজ করবে সরকারের আইসিটি মন্ত্রণালয় এবং আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উপ-কমিটি। এ বিষয়ে দলের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার আবদুস সবুর জানিয়েছেন, বিভিন্ন ট্রেনিং এর মাধ্যমে এক লাখ কর্মী তৈরি করা হয়েছে গুজব প্রতিরোধ এবং সরকারের উন্নয়ন প্রচারের জন্য।

ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ : নির্বাচনের আগে ব্যবসায়ীরা যেন দ্রব্য মূল্যের দাম বাড়িয়ে অস্থিরতা তৈরি করতে না পারে সেজন্য ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করা হবে। এছাড়া ব্যবসায়ীরা যেন নির্বাচনের সময় বিএনপির নেতাদের অর্থ সরবরাহ না করতে পারে সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

জানতে চাইলে নির্বাচনের প্রস্তুতির বিষয়ে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেন  বলেন, আগামী নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসেবে দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা দলকে সুসংগঠিত করার নির্দেশ দিয়েছেন। এজন্য মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির সম্মেলন, দ্রæত পূর্ণাঙ্গ কমিমিট গঠন, কোন্দল দূর করার জন্য কাজ করছি আমরা। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, দেশে ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করেছেন বঙ্গবন্ধু এবং তার কন্যা শেখ হাসিনা। সব দল যেন নির্বাচনে অংশ নিতে পারে এবং জনগণ সুন্দরভাবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে তাই সকল ধরণের পদক্ষেপই নেয়া হবে। তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে অনেক সিদ্ধান্ত নিতে হয়। সময় ও পরিস্থিতি অনুযায়ী যা করার দরকার তাই করবে আওয়ামী লীগ। ইনকিলাব

Check Also

আলেম-ওলামাদের বিরুদ্ধে অবস্থান মূলত ইসলাম ও দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া : ড. মাসুদ

ষিতে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান এবং পরে বেগম খালেদা জিয়া ছাড়া অন্য কেউ ভূমিকা রাখেননি …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

***২০১৩-২০২১*** © ক্রাইমবার্তা ডট কম সকল অধিকার সংরক্ষিত।