সাতক্ষীরায় দুই দর্শকে আখের আবাদ কমেছে ৭৫ শতাংশ

আখ চাষে ধস: প্রতিবছরই কমছে চিনি উৎপাদন ঃ উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় নিরুৎসাহিত হচ্ছে চাষিরা :
আবু সাইদ বিশ্বাস সাতক্ষীরা : জলবায়ু পরিবর্তন, উৎপাদন খরচ বেশি, নতুন করে চিনিকল গড়ে না উঠা ও ভারতীয় চিনি আমদানিসহ নানা কারণে সাতক্ষীরাসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে আঁখ উৎপাদন চরম আকারে হ্রাস পেয়েছে। দুই দশকে শুধু সাতক্ষীরা জেলাতে আখের উৎপাদন কমেছে ৭৫ শতাংশ। আঁখের ভরা মৌসুমে এসব অঞ্চলে আঁখের দেখা নেই বললেই চলে। মাটিতে লবণক্ষতা বৃদ্ধি, আখে পোকা লাগাসহ সময়মত বৃষ্টিপাত না হওয়ার কারণে আখের চাষ দিনের পর দিন কম হচ্ছে। বাণিজ্যিক ভাবে এ অঞ্চলে যে আখ উৎপাদন হত বতমানে তা আর দেখা যাচ্ছে না। সীমিত সংখ্যক চাষি আখ চাষ ধরে রেখেছে। বিশেষ করে আশ্বিন-কার্তিক মাসে মন্দার সময়ে যারা আঁখ কেটে রস বিক্রয় করে সংসার চালায় তারাই বর্তমানে আঁখ চাষ করছে বলে জানা যায়। এরই মধ্যে ভারতে আঁখ উৎপাদন বেশি হওয়ায় বাংলাদেশে চিনি রপ্তানি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত। আর এজন্য দেশটি প্রতিবেশি বাংলাদেশ ও শ্রীঙ্কাকেই টার্গেট করেছে। দীর্ঘ পাঁচ বছর পর প্রতি মণ আখের দাম মাত্র ৪০ টাকা বাড়িয়েছে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন।

সূত্রমতে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশনের অধীনে বর্তমানে দেশে ১৫টি চিনিকল আছে। এগুলোর বার্ষিক মোট উৎপাদন ক্ষমতা দুই লাখ ১০ হাজার টন। আগে এক লাখ টনের বেশি উৎপাদন করতে পারলেও এখন ৬০-৭০ হাজার টনের বেশি উৎপাদন করতে পারে না। প্রতিবছরই তাদের চিনি উৎপাদন কমছে, বিপরীতে বাড়ছে লোকসান। ট্যারিফ কমিশন বলছে, দেশে যে পরিমাণ আখ উৎপাদিত হয়, তার অর্ধেকও চিনিকলগুলো পেলে তাদের উৎপাদন ক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার করতে পারত।

দেশে বছরে ২৩ লাখ টন অপরিশোধিত চিনি আমদানি হয়; যার শুধু আমদানি মূল্যই সাত হাজার কোটি টাকা। এসব চিনি কারখানায় পরিশোধন হয়ে যখন বাজারে বিক্রি হয় তখন বাজারমূল্য দাঁড়ায় প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। দেশের শীর্ষ পাঁচটি শিল্পগ্রুপ চিনির এই বিশাল বাজারের বেশির ভাগই নিয়ন্ত্রণ করছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইউএসডিএ পূর্বাভাস বলছে গত তিন দর্শকে বাংলাদেশে আখ ও চিনির উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে।

সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, দুই দশক আগেও এ জেলাতে আখ চাষ হতো ব্যাপক ভাবে। তাদের হিসাব মতে, ১৯৯০ সালে সাতক্ষীরা জেলায় আখ চাষ হয়েছে ৫ হাজার ২৫০ হেক্টর জমিতে। ২০০০ সালে আবাদ হয়েছে ৩ হাজার ৯৪৮ হেক্টর। এর পর ২০১০ সালে এ জেলায় আখের আবাদ হয়েছে মাত্র ১৪০ হেক্টর জমিতে। এরপর ২০২২সালে জেলায় আখ চাষ হয়েছে মাত্র ১৩৫ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে সদরে ৫ হেক্টর,কলারোয়ায় ৫ হেক্টর,তালায় ৭০ হেক্টর,দেবহাটায় ২০ হেক্টর,কালিগঞ্জে ২৫ হেক্টর, আশাশুনিতে ০৫ হেক্টর এবং শ্যামনগরে ০৫ হেক্টর।

তালা উপজেলার খলিষখালি মঙ্গলানন্দকাটি গ্রামের সৈয়েদ মেখ জানান, তার গ্রামের ৭০-৮০ শতাংশ কৃষক দীর্ঘকাল ধরে আখ চাষ করছেন। তিনিও ৩০-৩৫ বছর আখ উৎপাদন করেছেন। কিন্তু গত ১০-১২ বছর ধরে তিনি আখ চাষ আর করছেন না। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ২০০০ সালের বন্যা, ২০০৭ সালে সিডর ও ২০০৯ আইলা,২০২০ সালে আম্পান ও ২০২১ সালে ঘূণিঝড় ইয়াসের পর থেকে আগের মতো আখের ফলন হয় না। ফসলি জমিতে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি আখ ক্ষেতে বিভিন্ন রোগবালাই দেখা দিচ্ছে। এসব রোগের কোনো প্রতিকার না পেয়ে ফসলটি চাষ করা বন্ধ করে দিয়েছেন বলে জানান তিনি।
কৃষকরা বলছে, বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আখে ছত্রাক, ডোগা পচা ও লালচে রোগসহ নানা প্রকার সংক্রামক দেখা দিচ্ছে। যে কারণে তারা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে আখ চাষ থেকে।
বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশন সূত্রে জানা গেছে, চিনি উৎপাদন কমে যাওয়ার পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো আখের উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় চাষিরা নিরুৎসাহী। সময় মতো চাষিদের ঋণ ও কৃষি উপকরণ না দেওয়া। এছাড়া আমাদের উৎপাদিত আখগুলোর জাত ভালো না হওয়ায় চিনি পাওয়া যায় কম। উন্নত জাতের আখ চাষ করে বলে বিদেশে একই পরিমাণ জমিতে কম খরচে বেশি আখ পায় এবং তা থেকে চিনিও বেশি হয়। এখন প্রতি হেক্টর জমিতে আমাদের দেশীয় জাতের আখ উৎপাদন হয় ৮ থেকে ১৫ মেট্রিক টন। উচ্চ ফলনশীল আখ চাষ করে পাওয়া যায় হেক্টরপ্রতি ৩০ থেকে ৪০ টন। চিনি উৎপাদনেও তারতম্য রয়েছে। উচ্চ ফলনশীল ১০০ টন আখ মাড়াই করে চিনি পাওয়া যায় ১২ টন। আর আমরা এখন পাচ্ছে ৫ থেকে ৬ টন।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড.মো: জামাল উদ্দীন জানান, জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছেন, শুধু জলবায়ুজনিত কারণেই আখ চাষ কমছে না। এর আরো একটি কারণ হলো চিনিকল না থাকার পাশাপাশি ফসলটি এক বছর মেয়াদী হওয়ায় চাষিরা আগ্রহ হারাচ্ছেন আখ চাষে। তিনি জানান, মাঠপর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তারা রোগের প্রতিকারের জন্য কৃষকদের নানাভাবে পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে।

 

Check Also

সাতক্ষীরায় সুপেয় পানির সংকট: ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে গেছে ৭শ ফুট পর্যন্ত

আবু সাইদ বিশ্বাস, সাতক্ষীরাঃ পানির স্তর নেমে যাওয়াতে সাতক্ষীরাসহ দক্ষিণাঞ্চলে অগভীর নকুপগুলোতে পানির সংকট দেখা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

***২০১৩-২০২৩*** © ক্রাইমবার্তা ডট কম সকল অধিকার সংরক্ষিত।