জলবায়ু পরিবর্তনে সুন্দরবনে পাখিদের সংখ্যা কমেছে আশঙ্কাজনক ভাবে: বিলুপ্তির পথে অসংখ্য বন্যপ্রাণী

আবু সাইদ বিশ্বাস, সুন্দরবন ফিরেঃ জলবায়ু পরিবর্তনে পাখিদের সংখ্যা কমেছে আশঙ্কাজনক ভাবে। কমেছে পাখির আবাসস্থল। বিলুপ্তির পথে অসংখ্য বন্যপ্রাণী। বিশেষ করে উপকূলীয় জেলাসমূহসহ সুন্দরবন অঞ্চলে জীববৈচিত্রে পড়েছে সরাসরি হুমকির মুখে। বৈশ্বিক পাখি বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার প্রজাতির মধ্যে প্রায় ৪২ হাজার প্রজাতি হুমকির মুখে আছে, যা মোট প্রজাতির প্রায় ২৮ ভাগ। বিগত দুশো বছরে সুন্দরবনের আয়তন কমে গেছে প্রায় অর্ধেক। এভাবে চলতে থাকলে আগামী একশ বছরের মধ্যে এই বন সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যাবে। বনবিশেজ্ঞরা বলছে, বনের উপর মানুষের অধিক নির্ভরশীলতার কারনে ক্রমান্বয়ে এর আয়তন অতি দ্রুত সংকুচিত হয়ে আসছে। বনের আয়তনের সাথে সাথে হ্রাস পাচ্ছে এর জীববৈচিত্র। সুন্দরবনের বাস্তুসংস্থানের জন্য অত্যন্তগুরুত্বপূর্ণ রয়েল বেঙ্গল টাইগার সহ, ২ প্রজাতির উভচর, ১৪ প্রজাতির সরীসৃপ, ২৫ প্রজাতির পাখি এবং ৫ প্রজাতির স্তনপায়ী প্রাণী হুমকির মুখে। জীববৈচিত্র রক্ষার জন্য সুন্দরবনে একাধিক অভয়ারণ্য গড়ে তোলা হলেও কাজে আসছে না তার সুফল। পাখি বিশেজ্ঞরা বলছে এক দিকে বাংলাদেশ অংশে সুন্দরবনে পাখি সংখ্যা কমলেও ভারত অংশে সুন্দরবনে পাখির সংখ্যা বাড়ছে। পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্য সুন্দরবনের পাখি-বৈচিত্র্যের রিপোর্ট প্রকাশ করেছে জুওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া। ‘বার্ডস অফ দ্য সুন্দরবন বায়োস্ফিয়ার’ নামের সেই বইটিতে এই অঞ্চলে প্রাপ্ত প্রতিটি পাখি প্রজাতির ছবি-সহ বিশদ বর্ণনা নথিভুক্ত হয়েছে। বইটিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ৪২০০ বর্গ কিলোমিটার অঞ্চল জুড়ে সুন্দরবনে পরিযায়ী ও স্থানীয় পাখি মিলিয়ে রয়েছে ৪২৮টি প্রজাতি। দেশে প্রাপ্ত ১২টি প্রজাতির মাছরাঙার ৯টিরই দেখা মেলে এই অঞ্চলে। সেইসঙ্গে গোলিয়াথ হেরোন, স্পুনবিল স্যান্টপিপার, হুইমবেল, লার্জ ইগ্রেট, টেরেক স্যান্ডপিপার, প্যাসিফিক গোল্ডেন প্রোভারের মতো বিরল প্রজাতিও লক্ষ করা যাচ্ছে এই অঞ্চলে। যা ইতিবাচক দিক হিসাবেই মনে করছেন ভারতের প্রাণী বিশেষজ্ঞরা। ভারতে বর্তমানে ১৩০০ প্রজাতির পাখির দেখা মেলে। যার প্রায় এক তৃতীয়াংশই বাসিন্দা সুন্দরবনের। বৈচিত্র্যের নিরিখে গোটা ভারতের মধ্যে যা রয়েছে শীর্ষস্থানে। আবাসস্থল ও অবাধে চলাচলের জন্যে বাংলাদেশ অংশের পাখিরা ভারত অংশের সুন্দরবনে নিজেদের নিরাপদ মনে করছে বলে সংশৃষ্টরা মনে করেন।
অন্যদিকে কমতে থাকায় বাংলাদেশে বন্য প্রাণীর প্রজাতির সংখ্যা এখন দাড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ১০০। এর মধ্যে পাখি প্রজাতির সংখ্যা প্রায় ৭২১। বাংলাদেশে বন্য প্রাণীর অবস্থা কী, তা দেখার জন্য ২০১৫ সালে প্রকাশিত আইইউসিএনের লাল তালিকা দেখা যেতে পারে। সেখানে রিপোর্টে বলা হয়েছে, প্রায় ১২৫ প্রজাতির বন্য প্রাণী হুমকি বা বিলুপ্তির মুখে আছে, যা মোট প্রজাতির প্রায় ১৪ ভাগ। গত ১০০ বছরে প্রায় ৩১ প্রজাতির বন্য প্রাণী হারিয়ে গেছে, যা এ দেশের মোট বন্য প্রাণীর প্রায় ২ ভাগ।
সূত্রমতে তিন দশক আগেও বাংলাদেশে অসংখ্য বন্যপ্রাণীর সমাগম ছিল। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল ছিল বন্যপ্রাণীদেও স্বর্গরাজ্য। সাঁঝের বেলায়শিয়ালের হাঁকডাক কিংবা বাগডাশার হুঙ্কারে কলজে কেঁপে উঠত সে সময়। আজকাল তেমন একটা শোনা যায়না ওসব। আগের মতো সে রকম বন্যপ্রাণীর আনাগোনাও নজরে পড়ছে না এখন আর। নানাবিধ কারণেই দেশ থেকে ওরা হারিয়েযেতে বসেছে আজ। তন্মধ্যে প্রধান কারণগুলো হচ্ছে ১. বন্যপ্রাণীদের আবাসস্থল ধ্বংস করে দেওয়া। ২. অবাধে বৃক্ষনিধন (বিশেষ করে গাছের প্রাকৃতিক কোটরে যে সব পাখি বাসা বাঁধে তাদের প্রজননে বিঘ্ন ঘটছে ব্যাপক)। ৩. খাদ্য সংকট। ৪. জলাশয়ভরাট। ৫. পাখিদের বিচরণক্ষেত্র হাওর-বাঁওড়সহ অন্যান্য জলাশয়েঅতিরিক্ত মাছ শিকার। ৬. চরাঞ্চলে জেলেদের উৎপাতের ফলে মৎস্যভুক পাখিরা বিপাকে পড়ছে। ৭. বন্যপ্রাণী শিকার ও পাচারের ফলে আশঙ্কাজনক হারে এদের সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে।
সরকারে পক্ষ থেকে বলা হয়েছে বন্যপ্রাণী রক্ষার্থে কার্যকরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। গতবছরে দেশের প্রায় ৩২টি এলাকায় পাখিশুমারি করা হয়েছে। এছাড়া বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন-২০১২ পাস হয়েছে। উক্ত আইনের ১নং ও ২নং তফসিলে ৬৫০ প্রজাতির পাখিকে প্রোটেক্টেড বার্ড হিসাবে অন্তর্ভুর্ক্ত করা হয়েছে। পাখি শিকারের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদন্ড অথবা সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। শকুনের মরণঘাতী ওষুধ ডাইক্লোফেনাক উৎপাদন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পাখিপ্রেমীদের উৎসাহিত করতে ‘বঙ্গবন্ধু অ্যাওয়ার্ড ফর ওয়াইল্ড লাইফ কনজারভেশন’ প্রদান করা হচ্ছে। উদ্ধারকৃত ও আহত পাখির সেবাদানে সারা দেশে চারটি অঞ্চলে ‘বন্যপ্রাণী উদ্ধার কেন্দ্র’ স্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়াও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন-২০১২তে বাঘ বা হাতি হত্যা করলে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা জরিমানা ও ৭ বছরের কারাদন্ডর বিধান রাখা হয়েছে।

Please follow and like us:

Check Also

ইছামতি নদীরপাড় কেটে পাইপ বসিয়ে মৎস্য পয়েন্ট তৈরি: ঝুঁকিতে বেড়িবাঁধ

নিজস্ব প্রতিনিধি: ইছামতি নদীর পাড় কেটে অবৈধভাবে পাইপ বসিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে মৎস্য রেণু প্রসেসিং …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

***২০১৩-২০২৩*** © ক্রাইমবার্তা ডট কম সকল অধিকার সংরক্ষিত।