শিকড়ের সন্ধানে : হজরত নূহ আ.-এর জ্যেষ্ঠপুত্রের বাংলাদেশ

॥ হারুন ইবনে শাহাদাত ॥
আমাদের প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশের সাথে ঐতিহাসিকভাবে জড়িয়ে আছে হজরত নূহ আ.-এর নাম। দ্বিতীয় আদম আ. হিসেবে পরিচিত হজরত নূহ আ.-এর পুত্র ও নাতিরাই এ বঙ্গদেশ বা বাংলাদেশের আদি পুরুষ। তাদের দ্বারা এদেশে মানবসভ্যতার সূচনা। বাংলাদেশের ইতিহাস রচনার পথিকৃৎ গোলাম হোসায়ন জইদপুরি। তিনি বাংলার ইতিহাস নিয়ে ১৭৬৬-১৭৮৮ সালে রচনা করেন ফারসি গ্রন্থ রিয়াজ উস সালাতিন। এ পুস্তকে তিনি হজরত নূহ আ.-এর সাথে বাংলাদেশের ইতিহাসের একটা সম্পর্কের বিষয় উত্থাপন করেছেন। (সূত্র : ড. মোহাম্মদ হাননান : বাঙালির ইতিহাস (প্রাচীন যুগ থেকে ১৯৭৪), আগামী প্রকাশনী, ৩৬, বাংলাবাজার ঢাকা-১১০০, প্রথম বর্ধিত সংস্করণ ফেব্রুয়ারি ২০১৪, প…২৮)। তিনি লিখেছেন, ‘হজরত নূহ আ.-এর পুত্র হামের জ্যেষ্ঠ সন্তান হিন্দ হিন্দুস্তানে আসার দরুন এ অঞ্চলের নাম তাঁর নামানুসারে রাখা হয়। সিন্ধু জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার সাথে এসে সিন্ধদেশে বসতি স্থাপন করায় এ অঞ্চলের নাম তাঁরই নামানুসারে সিন্ধু রাখা হয়। হিন্দের দ্বিতীয় পুত্র বঙ (বঙ্গ)-এর সন্তানরা বাংলায় উপনিবেশ স্থাপন করেন। আদিতে বাংলার নাম ছিল বঙ। (সূত্র : গোলাম হোসায়ন সলীম : বাংলার ইতিহাস (রিয়াজ-উস-সালাতিনের বঙ্গানুবাদ), আকবরউদ্দীন অনূদিত, অবসর প্রকাশন, ফেব্রুয়ারি ২০০৮, পৃষ্ঠা ২৪)। এ এক অন্য ইতিহাস।’ পবিত্র বাইবেল নোহা (নূহ আ.) সংক্রান্ত অধ্যায়েও এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এ ইতিহাস চাপা থাকার কারণেই হয়তো বা বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলন ঠেকানোর মতো কোনো শক্তিশালী আন্দোলন সেই দিন পূর্ববঙ্গের মানুষ গড়ে তুলতে পারেনি।
কারণ ইতিহাস লিপিবদ্ধ করেন বিজয়ীরা। এ কারণেই বিজিতদের বোবাকান্না চাপা পড়ে যায়। কিন্তু কোনো সচেতন জাতি তারা বিজয়ী বা বিজিত যাই হোন না কেন, কালের বিবর্তনে সত্য হারিয়ে যেতে দেয় না। শত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও ইতিহাস চর্চা অব্যাহত রাখে। কারণ তারা জানে, ইতিহাসবিমুখ কোনো জাতি মাথা উঁচু করে বাঁচতে ভুলে যায়। তাই তারা কান্না ভুলে ইতিহাসের সত্যের সন্ধানে নামে। পরাজয়ের গ্লানি ভুলে পথচলা অব্যাহত রাখে। আর ভাবে কোনো একদিন বিজয়ের সিংহ দুয়ার খুলতে পারে। আজকের বাংলাদেশ সেই সাক্ষ্য দিচ্ছে। এ উপমহাদেশের ইতিহাসের পাতায় ‘বঙ্গভঙ্গ’ এবং ‘বঙ্গরদ’ এ দুটি ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে আছে। সরলীকরণ করে যদিও বলা হয়, বর্ণ হিন্দুদের সাম্প্রদায়িকতার নগ্নচরিত্র এবং বঞ্চিত মুসলমানদের ঘুরে দাঁড়ানোর প্রেরণা ইতিহাসের এ বাঁকবদলের ঘটনাপ্রবাহের মাঝে লুকিয়ে আছে। কিন্তু এর তাৎপর্য আরো গভীর। ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর ব্রিটিশ শাসিত ভারতের ভাইসরয় লর্ড কার্জন শাসনকাজ পরিচালনা সহজ করতে বঙ্গ প্রদেশকে বিভক্ত করার আদেশ জারি করেছিলেন। কিন্তু তৎকালীন ভারতের প্রভাবশালী গোষ্ঠী যাদের সহযোগিতায় ব্রিটিশ শাসন দীর্ঘায়িত হয়েছে, সেই বর্ণ হিন্দুরা এ সিদ্ধান্তের বিরোধী কঠোর আন্দোলন শুরু করে। তারা বঙ্গকে তাদের দেবীমাতা রূপে উপস্থাপন করে এক অন্ধ উগ্র সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা সৃষ্টি করেছিল। তাদের এ তীব্র আন্দোলনের চাপে ইংরেজরা ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ করতে বাধ্য হয়। যদিও বঙ্গকে তাদের দেবীমাতা, এ মিথের ঐতিহাসিক কোনো ভিত্তি নেই। বাংলা বিভক্ত করে ফেলার ধারণা লর্ড কার্জন থেকে শুরু হয়নি। অতি প্রাচীনকাল থেকেই এ অঞ্চলের বিভিন্ন ভূ-খণ্ড যেমন : বঙ্গ, গঙ্গে, সমতট. হরিকেল, চন্দ্রদ্বীপ, পুন্ড্র, বরিন্দ, পাহাড়পুর, গৌড়, কর্ণসুবর্ণ, রাঢ় প্রভৃতি নামে শাসিত হয়েছে। নবাবী আমলে অর্থাৎ ১৭৫৭ সাল পর্যন্ত বাংলার সাথে যুক্ত ছিল বিহার ও ঊড়িষ্যা। তারমানে বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলনকারীদের দেবীমাতা রূপে বঙ্গের কল্পিত রূপের ঐতিহাসিক কোনো ভিত্তি নেই। তারা মূলত পূর্ববঙ্গের দরিদ্র শোষিত ও বঞ্চিত মুসলমান এবং নিম্নবর্ণের হিন্দুদের চিরস্থায়ীভাবে পদানত করার রাজনৈতিক কূটকৌশল হিসেবে এ মিথ দাঁড় করিয়েছে।
ইংরেজ রাজশক্তিও গোষ্ঠীর স্বার্থের কাছে নতিস্বীকার করেছিল। যদিও ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হলেও ১৯০৩ সালে প্রথম বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাবসমূহ বিচার বিশ্লেষণ করে তারা সিদ্ধান্ত দিয়েছিল। তখন বঙ্গ থেকে চট্টগ্রামকে বিচ্ছিন্ন করা এবং ঢাকা ও ময়মনসিংহ জেলা দুটিকে আসাম প্রদেশে অন্তর্ভুক্ত করার একটি প্রস্তাবও ছিল। তেমনিভাবে ছোট নাগপুরকে মধ্যপ্রদেশের সঙ্গে আত্তীকরণেরও একটি প্রস্তাব ছিল। ১৯০৪ সালের জানুয়ারিতে সরকারিভাবে এ পরিকল্পনা প্রকাশ করা হয় এবং ফেব্রুয়ারিতে লর্ড কার্জন বঙ্গের পূর্বাঞ্চলীয় জেলাগুলোয় এক সরকারি সফরের মাধ্যমে এ বিভক্তির ব্যাপারে জনমত যাচাইয়ের চেষ্টা করেন। তিনি বিভিন্ন জেলার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে মতবিনিময় করেন এবং ঢাকা, চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহে এ বিভক্তির বিষয়ে সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করে বক্তৃতা দেন। নতুন প্রদেশটির নামকরণ করা হয় “পূর্ববঙ্গ ও আসাম” যার রাজধানী হবে ঢাকা এবং অন্যান্য সদর দফতর হবে চট্টগ্রামে। এর আয়তন হবে ১,০৬,৫৪০ বর্গমাইল এবং জনসংখ্যা হবে ৩১ মিলিয়ন, যাদের মধ্যে ১৮ মিলিয়ন মুসলিম ও ১২ মিলিয়ন হিন্দু। এর প্রশাসন একটি আইন পরিষদ ও দুই সদস্যবিশিষ্ট একটি রাজস্ব বোর্ড নিয়ে গঠিত হবে এবং কলকাতা হাইকোর্টের এখতিয়ার বজায় থাকবে। সরকার নির্দেশ দেয় যে, পূর্ববঙ্গ ও আসামের পশ্চিম সীমানা স্পষ্টভাবে নির্দিষ্ট থাকবে, সাথে সাথে এর ভৌগোলিক, জাতিক, ভাষিক ও সামাজিক বৈশিষ্ট্যাবলিও নির্দিষ্ট থাকবে। সরকার তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে ১৯ জুলাই ১৯০৫ সালে এবং বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হয় একই বছরের ১৬ অক্টোবর। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে স্বয়ং লর্ড কার্জন ঢাকায় এসে মুসলমানদের বোঝান যে, এ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে মুসলমানদের জন্য ভালো হবে। পশ্চিমবঙ্গের অভিজাত ও শিক্ষিত মহল এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠে। এসব প্রতিবাদের মুখেও অবশেষে ১৯০৫ সালে অক্টোবরে বাংলা ভাগ কার্যকর করা হয়। পূর্ববঙ্গের অধিকাংশ মুসলমানই বঙ্গভঙ্গের পক্ষে অবস্থান নেন। হিন্দুদের তুলনায় পিছিয়ে থাকা মুসলমানরা মনে করেছিল এতে তাদের সমূহ উন্নতি হবে। এই মনে করাটাই তাদের জন্য বিপদ ডেকে আনে। পিছিয়ে থাকা মুসলমান ও নিম্নবর্ণের কৃষক-মজুর হিন্দুদের উন্নতি হবে এটা কলকাতার উচ্চবর্ণের হিন্দুরা মেনে নিতে পারেনি।
র্প্বূবঙ্গের সচেতন মানুষ বুঝতে পারেন, প্রশাসনিক সুবিধার জন্য বিশাল বঙ্গ প্রদেশকে ভেঙে দুই ভাগ করা অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল। কিন্তু এর সাথে জড়িত ছিল রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক আর সামাজিক কারণ।
একটু পেছন ফিরে দেখলে আমরা দেখতে পাই, মুর্শিদকুলী খান সম্রাট আওরঙ্গজেবের সময়ে ১৭০০ সালে বাংলার দেওয়ান হিসেবে বঙ্গে নিয়োগ পান। সে সময় বঙ্গের রাজধানী ছিল ঢাকা। কিন্তু ১৭০৪ সালে মুর্শিদকুলী খান রাজধানী ঢাকা থেকে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে নিয়ে যান। তিনিই নিজের নামে মুর্শিদাবাদের গোড়াপত্তন করেন। ঢাকায় নিরাপত্তার অভাবে ও কেন্দ্রের সাথে দূরত্বের অজুহাতে তিনি রাজধানী পরিবর্তন করেন। রাজধানী পরিবর্তন দুই বঙ্গের মাঝে এক অসম অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থার সৃষ্টি করে। ঢাকা থেকে রাজধানী পশ্চিমবঙ্গে যাবার পর থেকেই ঢাকাসহ পূর্ববঙ্গের উন্নয়ন কমে যেতে থাকে। ইংরেজ শাসনামলে রাজধানী মুর্শিদাবাদ থেকে চলে যায় কলকাতায়। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য, উন্নয়নসহ সব দিক থেকেই পূর্ব বাংলা পিছিয়ে যেতে থাকে। রাজধানীর ওপর নির্ভরশীল ভূস্বামী, ব্যবসায়ীসহ অনেকেই ঢাকা ছেড়ে কলকাতায় যাওয়া শুরু করে। ফলে ঢাকা ও পূর্ববঙ্গের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতিও প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। দুই বঙ্গের মধ্যে চরম অর্থনৈতিক বৈষম্য সৃষ্টি হয়। কলকাতা ছিল অবিভক্ত বঙ্গের মূল কেন্দ্র। কলকাতা শুধু প্রদেশ নয়, বরং পুরো ভারতে ব্রিটিশ শাসনের রাজধানী ছিল। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড ছিল কলকাতাকেন্দ্রিক আর পূর্ববঙ্গ পর্যন্ত সেগুলো খুব কমই পৌঁছাতে পারত। পূর্ব বাংলার কাঁচামাল দিয়ে শিল্প কারখানা গড়ে উঠতে থাকা কলকাতা ও এর আশপাশের অঞ্চলে, লাভের বেশিরভাগই যেত কলকাতার বণিক শ্রেণির পকেটে। আর অর্থনৈতিক দীনতায় দিন কাটাত পূর্ববঙ্গের কৃষকরা। পূর্ববঙ্গের পাট দিয়ে বেশিরভাগ পাটকল গড়ে ওঠে হুগলি নদীর তীরে।
কৃষিভিত্তিক পূর্ববঙ্গের জমিদাররা বেশিরভাগই স্থায়ী নিবাস গড়ে রাজধানীতে। আর তাদের প্রতিনিধিরা খাজনার জন্য নির্যাতন চালাত পূর্ববঙ্গের নিরীহ কৃষকদের ওপর। কষ্ট করত পূর্ববঙ্গের কৃষকরা আর ফল ভোগ করত কলকাতার জমিদাররা। অর্থনৈতিক সংকটের কারণে পূর্ববঙ্গের লোকেরা শিক্ষাতেও এগোতে পারত না। ফলে কলকাতার লোকেরা সহজে চাকরি পেলেও অবহেলিত পূর্ববঙ্গের লোকেরা চাকরি পেত না সহজে। চট্টগ্রামের সুপ্রাচীনকাল থেকে সমুদ্রবন্দর থাকলেও ব্রিটিশ আমলে এর উন্নয়নে কোনো কাজই করা হয়নি বলতে গেলে। বরং রাজধানী কলকাতার বন্দরের লাভ কমে যাবে চিন্তা করে সরকার ও ব্যবসায়ী শ্রেণি চট্টগ্রাম বন্দরকে পুরোপুরি অবহেলা করেছিল। ঢাকা থেকে কর আদায় করে সে কর দিয়ে উন্নয়ন হতো কলকাতা, ঊড়িষ্যা আর বিহারে। রেল ব্যবস্থার উন্নয়নও ছিল পশ্চিমকেন্দ্রিক। ঢাকার মতো প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ শহরের সাথে ছিল না রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা। এসব অর্থনৈতিক অবহেলা প্রতিনিয়ত পূর্ববঙ্গের জনগণ ও ব্যবসায়ীদের পশ্চিমবঙ্গবিরোধী করে তুলছিল। এ ঘটনা এক প্রচণ্ড রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯০৫-এ প্রবলভাবে বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে কলকাতার হিন্দু-মুসলমানদের মিলনের লক্ষ্যে রাখি বন্ধনের আয়োজন করেছিলেন। ১৯০৬ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বঙ্গভঙ্গ রদ করার প্রস্তাবকদের জন্য এক মর্মস্পর্শী গান ‘আমার সোনার বাংলা’ লেখেন।
প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক সুবিধার জন্য পূর্ব বাংলাকে গুরুত্ব দেয়ার দরকার অপরিহার্য হলে বঙ্গভঙ্গের পেছনে কাজ করেছিল কিছু রাজনৈতিক ব্যাপারও ছিল। এ বিষয়গুলো ঠিকই বুঝতে পেরেছিল পশ্চিমবঙ্গের উচ্চবর্ণের হিন্দুরা। শিক্ষা-দীক্ষায় যদি পূর্ববঙ্গের মানুষের চোখ খুলে যায়, তখন কী আর ওরা তাদের দেবতা বলে মানবে? এ হীন মানসিক চেতনাই ছিল মূলত বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলনের মূল। এ সত্য উপলব্ধি করতে উপমহাদেশের মানুষকে বেশি দিন অপেক্ষা করতে হয়নি। ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি দেশ সৃষ্টির কথা ওঠে, তখন তারা স্বেচ্ছায় তাদের কথিত মায়ের অঙ্গছেদন ঠিকই করে। বঙ্গ ভাগকে পূর্বাংশ পাকিস্তানের সাথে এবং পশ্চিমাংশ ভারতের সাথে নিয়ে নেয়। বাহ্ কী চমৎকার রাজনীতি! কিন্তু এ চমৎকার রাজনীতির পিছনে যে সত্য লুকিয়ে আছে, তা জানলে বলতেই হয়Ñ ঠেলার নাম বাবাজি। ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ ঘোষণার পর মুসলমানরা বুঝতে পারে ঐক্যবদ্ধ হওয়া ছাড়া তাদের উন্নতির বিকল্প কোনো পথ নেই। মুসলিম সমাজ অনুধাবন করতে সক্ষম হয় যে, মুসলমানরা একটি স্বতন্ত্র জাতি হিসেবে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার ন্যায্য অংশ অর্জন করতে পারবে। এ প্রেক্ষিতে ১৯০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর ঢাকায় মুসলিম শিক্ষা সম্মেলনের এক অধিবেশন বসে। সম্মেলন শেষে ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহর প্রস্তাবিত রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে ১৯০৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের জন্ম হয়। বঙ্গভঙ্গ রদ হবার পর পূর্ব বঙ্গের মানুষ নিজেদের নিগৃহীত অবস্থাটি খুব ভালোভাবে অনুভব করতে পারে। ১৯১২ সালের ৩১ জানুয়ারি ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ ঢাকায় এলে নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী, শেরেবাংলা এ.কে ফজলুল হকের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের জন্য এ অঞ্চলে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জানান। লর্ড হার্ডিঞ্জ এ দাবির যৌক্তিকতা অনুভব করে ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। সরকারিভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেবার পর পশ্চিমবঙ্গের বুদ্ধিজীবীরা এর বিরোধিতা করা শুরু করেন। সংবাদপত্র ও রাজনৈতিক মঞ্চ এ বিরোধিতা প্রকাশের প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এ দ্বন্দ্ব হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্বের চেহারা ধারণ করে। গুরুদাস বন্দোপাধ্যায় বলেছিলেন, “পূর্ববঙ্গের মানুষ মুসলমান ও কৃষক; ওরা বিশ্ববিদ্যালয় দিয়ে কী করবে? বিশ্ববিদ্যালয় কি কৃষি কাজ করার স্থান?” সে সময় এমন রবও ওঠে, “মুসলমানদের জন্য আর কত বিশ্ববিদ্যালয় হবে?”
এর জবাবে পূর্ববঙ্গের বুদ্ধিজীবী ও প্রতিনিধিত্বশীলরা এবং ব্রিটিশরাজ এটা নিশ্চিত করেছিলেন যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শুধুমাত্র মুসলমানদের জন্য নয়, বরং পূর্ববঙ্গের পিছিয়ে পড়া সকল সম্প্রদায় ও জাতির মানুষকে এগিয়ে নেয়ার জন্য স্থাপন করা হচ্ছে, সকলে এখানে পড়াশোনোর সুযোগ পাবেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় বিরোধিতা করেছিলেন, এমন আরেকজন পশ্চিমবঙ্গীয় বুদ্ধিজীবী হলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আশুতোষ মুখোপাধ্যায়। তিনি রীতিমতো আদাজল খেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতায় নেমেছিলেন। পত্রিকায় লেখালেখি, বক্তৃতা, সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সাথে দেখা করাসহ হেন প্রচেষ্টা নেই, যা উনি করেননি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে দুই বাংলার বিরোধ বাড়তে থাকে। বিরোধের চেহারা ক্রমশ ধর্ম, ভাষাগত ও জীবনাচরণের পার্থক্যের দিকে রূপান্তরিত হতে থাকে। পশ্চিম ও পূর্ববঙ্গের বিরোধ তিক্ততার সর্বোচ্চ পর্যায়ে চলে যায়। বাধার মধ্যেও ১৯২০ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ভারতীয় আইনসভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিলটি সিলেক্ট কমিটিতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয় এবং ১৮ মার্চ সর্বসম্মতিক্রমে এ্যাক্টে পরিণত হয়। ১৯২০ সালের ২৩ মার্চ গভর্নর জেনারেল কর্তৃক “দি ইউনিভার্সিটি এ্যাক্ট” অনুমোদন লাভ করে। এর আওতায় ঢাকায় একটি আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়। এ আইনের বলে ১৯২১ সালের ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়।
বঙ্গভঙ্গ এবং বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলন এ অঞ্চলের মানুষের আত্মোপলব্ধি জাগ্রত করেছে এতে কোনো সন্দেহ নেই। সেই জাগ্রত চেতনারই সফল আমাদের স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। যতদিন আমরা এ চেতনার আলোয় পথ চলব, ততদিন আমাদের কেউ পদানত করতে পারবে না। ইতিহাসের এ সোনালি অধ্যায় শুধু পাঠ করলেই হবে না, অধ্যয়ন ও গবেষণা করতে হবে। গবেষণার ধারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম তা অব্যাহত রাখতে হবে।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক।

Please follow and like us:

Check Also

কারিগরি শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যানকে অব্যাহতি

সনদ বাণিজ্য চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে স্ত্রী গ্রেফতার হওয়ার পর এবার বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষাবোর্ডের …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

***২০১৩-২০২৩*** © ক্রাইমবার্তা ডট কম সকল অধিকার সংরক্ষিত।