জনগণের ভোটাধিকার আদায় ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজন ঐক্যবদ্ধ অহিংস গণআন্দোলন

॥ হারুন ইবনে শাহাদাত ॥
ভোটাধিকার হারানো জনগণ এখন কী করবে? বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ ৬৩টি বিরোধীদলের আহ্বানে গত ৭ জানুয়ারি তারা ভোটকেন্দ্রে যাননি। নির্বাচনের পর থেকে তারা তাকিয়ে আছে, বিরোধীদলের দিকে। কিন্তু তাদের প্রত্যাশা পূরণের মতো কোনো আলোকবর্তিকার দেখা পাচ্ছেন না বলে মনে করেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ বিরোধীদলের পক্ষে থাকার পরও কেন আন্দোলন-সংগ্রাম সাফল্যের মুখ দেখছে না- এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটের আলোকে এবং কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এ নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। কিন্তু নির্বাচন-পরবর্তী বিরোধীদলের কর্মসূচিতে তেমন কৌশল নির্ধারণের লক্ষণ লক্ষণীয় নয়।
গত ১১ ফেব্রুয়ারি রোববার নয়াপল্টনে বিএনপির কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। এতে ১৩ ও ১৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকাসহ দেশের সব মহানগরে গণসংযোগ ও লিফলেট বিতরণ। ১৭ ফেব্রুয়ারি সব জেলা শহরে এবং ১৮ ও ১৯ ফেব্রুয়ারি সব উপজেলা, থানা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে পালিত হবে একই কর্মসূচি। এছাড়া ১৬ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার বাদ জুমা দেশের সব মসজিদে দোয়া করা হবে ভারত ও মিয়ানমার সীমান্তে দেশ দুটির সীমান্তরক্ষীদের ছোড়া গুলিতে নিহত বাংলাদেশিদের জন্য। বরাবরের মতো একক ও রুটিন কর্মসূচি এটি। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের মতো বড় দাবি আদায়ে প্রয়োজন হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মতো দলমত-নির্বিশেষে সবাইকে মাঠে নামানোর মতো ঐক্যের ডাক। কবে আসবে সেই ডাক- এ প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই। তার মানে কি এই নয় সরকারের প্রতি বিএনপির বার্তা, ‘তোমরা থাকো তোমাদের মতো, আমরা আছি আমাদের মতো।’ এ প্রশ্নের উত্তরে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুক বলেন, “সংসদ চলছে। এটা একটা তেলেসমাতি সংসদ। এ সংসদকে মুরুব্বিরা বলেন, আওয়ামী লীগের ‘এ’ টিম আর ‘বি’ টিম। এ সংসদে জনগণ ভোট দিতে পারে নাই। এ সংসদ নির্বাচনে জনগণ অংশগ্রহণ করে নাই। তবুও এ সরকার ক্ষমতার জোরে নির্বাচন কমিশনের কারচুপিতে ক্ষমতায় বসে গত জানুয়ারি মাসের ১০ তারিখে শপথ নিয়ে সরকার গঠন করেছে। এ সংসদে নাকি একটা বিরোধীদল আছে, তাও ১১ জনের। সেটাও বানিয়ে দিয়েছেন বর্তমান সরকারপ্রধান। এ সংসদ টিকে থাকতে পারে না, জনগণ বলে এ সংসদ আর টিকে থাকার কথা নয়।”
রাজনীতি পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, এ সংসদ টিকে থাকার কথা নয়, তারপরও টিকে আছে এবং হয়তো থাকবেও। কারণ একটি স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে বিরোধীদলগুলো সঠিক কর্মকৗশল নির্ধারণ করে সঠিক কর্মসূচি দিতে পারেনি। তারা ঐক্যবদ্ধ নয়। শুধু মুখের কথায় চিঁড়ে ভিজবে না।
মুখের কথায় চিঁড়ে ভিজবে না
মুখের কথায় চিঁড়ে ভিজবে না সত্য, তাহলে এখন করণীয় কী? এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়, ‘একজন স্বৈরশাসককে ক্ষমতা থেকে সরাতে কত মানুষকে রাস্তায় নামতে হয়?’ শিরোনামে ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ প্রকাশিত ডেভিড এডমন্ডসের লেখা বিবিসির একটি প্রতিবেদন এবং মার্কিন লেখক জন শার্পের লেখা, From Dictatorship to Democracy : A Conceptual Framework for Liberation (স্বৈরাচার থেকে গণতন্ত্র : একটি মুক্তির রূপরেখা) একটি গবেষণামূলক গ্রন্থ। এ কথা সত্য, রাজনীতি বিজ্ঞান সবসময় বইয়ের সূত্র অনুসরণ করে চলে না। সময় ও অবস্থার কারণে নতুন নতুন কৌশল ও সূত্র প্রয়োগ করতে হয়।
‘একজন স্বৈরশাসককে ক্ষমতা থেকে সরাতে কত মানুষকে রাস্তায় নামতে হয়?’ শিরোনামে প্রকাশিত বিবিসির প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন, ডেভিড এডমন্ডস। তিনি লিখেছেন, হার্ভার্ডের একজন গবেষক বিগত কয়েক দশকে বিশ্বের দেশে দেশে যেসব গণআন্দোলন-গণবিক্ষোভ হয়েছে, সেগুলোর ওপর গবেষণা করে দেখিয়েছে, ‘কোনো জনগোষ্ঠীর মাত্র ৩ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ যদি গণবিক্ষোভে যোগ দেন, তাতেই তারা সফল হতে পারেন। বিগত কয়েক দশকে বিশ্বে স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানোর সফল আন্দোলনের অনেক নজির আছে।’ এদেশের বিরোধীদলগুলো কি এমন বিক্ষোভ আয়োজন করতে পারেনি? হয়তো পেরেছে, কিন্তু রাজপথে অবস্থান ধরে রাখতে পারেনি। এ প্রশ্নের সহজ-সরল উত্তর সরকারের নির্যাতন-নিপীড়ন, জেল-জুলুম, খুন-গুম। কিন্তু ইতিহাস বলে স্বৈরাচারী শাসকরা ক্ষমতায় টিকে থাকতে যুগে যুগেই এসব অস্ত্র ব্যবহার করে আসছে। তারপরও শেষ বিজয়ের হাসি আন্দোলনরত জনতার মুখেই দেখা গেছে। কিন্তু কীভাবে তা সম্ভব, তা তুলে ধরা হয়েছে, ‘From Dictatorship to Democracy : A Conceptual Framework for Liberation’ (স্বৈরাচার থেকে গণতন্ত্র : একটি মুক্তির রূপরেখা) নামের হ্যান্ডবুকের পাতায় পাতায়।
সাফল্যের চাবিকাঠি
বিপ্লবের এ হ্যান্ডবুককে স্বৈরশাসকরা তাদের পতনের ইশতেহার বলে মনে করেন। মিয়ানমারের সামরিক জান্তা আইন করে এ বইয়ের বাহক-পাঠকের জন্য সাত বছরের কারাদণ্ডের বিধান করেছে। এ হ্যান্ডবুকের অহিংস আন্দোলন পরিচালনা করবার জন্য ১৯৮টি ‘অস্ত্র’ বা পদ্ধতি উল্লেখ করা হয়েছে। যাকে সাফল্যের চাবিকাঠি হিসেবে বিবেচনা করেছেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা।
একটি সুপরিকল্পিত এবং বাস্তববাদী স্ট্র্যাটেজির গুরুত্ব তুলে ধরে জন শার্প উল্লেখ করেছেন, আন্দোলনকে অবশ্যই নিরস্ত্র এবং অহিংস (Non Violent) হতে হবে। সহিংস আন্দোলনের মানেই হচ্ছে স্বৈরাচারের সবচেয়ে শক্তিশালী জায়গাটিকে (সামরিক বাহিনী) চ্যালেঞ্জ করা, যেটা পুরো ব্যাপারটিকে আরও ঘোলাটে করে তুলবে। আন্দোলনকে গোপন বা আন্ডারগ্রাউন্ড পর্যায়ে না রেখে চেষ্টা করতে হবে যত বেশি সম্ভব গণমানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিতে। প্রকাশ্য আন্দোলনে জনসমর্থন দিন দিন বাড়তেই থাকে। অপরদিকে আন্ডারগ্রাউন্ড কার্যক্রমে কর্মীদের মধ্যে হতাশা এবং ভয় কাজ করে অনেক বেশি। তবে এক্ষেত্রে আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে স্বৈরাচারী সরকারের পক্ষের লোক কিংবা গোয়েন্দাদের অনুপ্রবেশের ঝুঁকি থাকে। কিন্তু এ ঝুঁকিটুকু নিতে হবে। স্বৈরাচারকে হটানোর পরিকল্পনার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, স্বৈরাচার-পরবর্তী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার একটি টেকসই রূপরেখা প্রণয়ন করা। আন্দোলনের মাঝেও এ সেক্টরে কাজ অব্যাহত রাখতে হবে।
তিনি উল্লেখ করেছেন, একটি সুপরিকল্পিত এবং বাস্তববাদী স্ট্র্যাটেজি আন্দোলনকে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে সহায়তা করবে। সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য যা যা রিসোর্স দরকার, তা চিহ্নিত করতে সহায়তা করবে। কারণ স্বৈরাচারের রিসোর্স সকল দিক থেকেই বিপক্ষের অর্থাৎ বিরোধীদলের চেয়ে অনেক অনেক বেশি।
তিনি আরো উল্লেখ করেছেন, আন্দোলন যেন একজন স্বৈরাচারকে উৎখাত করে নতুন আরেক স্বৈরাচারের জায়গা করে না দেয়, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। স্বৈরাচারের আক্রমণ এবং বিভিন্ন চালের প্রতিরক্ষায় নিজেদের ব্যস্ত না রেখে বরং আন্দোলনকেই গতিশীল রাখবে। কার্যকর স্ট্র্যাটেজি না থাকলে আন্দোলন-সংগ্রাম শুধুমাত্র শক্তি আর সম্পদের অপচয় ছাড়া কিছুই হবে না, বরং এটি স্বৈরাচারের ক্ষমতাকে আরও সুসংহত করবে। স্বৈরাচারী সরকারের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা এবং তা জনসাধারণের সামনে খুব কুশলী ও দক্ষভাবে উপস্থাপন করা। জন শার্প এজন্য কয়েকটি কাজ এবং একটি ক্রমধারা অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছেন।
কী সেই কাজ: ১. সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বৈরাচারের প্রতি আনুগত্যের মানসিকতা এবং ভয় দূর করতে হবে। ২. সামাজিকভাবে মানুষকে সংঘবদ্ধ এবং স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে জাগিয়ে তোলার মতো কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হবে। মিডিয়াকে ব্যবহার করে স্বৈরাচারী শাসক সামাজিক-রাজনৈতিক কিংবা অর্থনৈতিক কী কী ক্ষতি করছে, তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে হবে। ৩. শান্তিপূর্ণ হরতাল, অবরোধ, বয়কটের মাধ্যমে স্বৈরাচারের শক্তিকে আক্রমণ করা।
উল্লেখিত কাজগুলো বাস্তবায়নের ক্রমধারাগুলো হলো : ১. পরিকল্পনা বা স্ট্র্যাটেজি নির্ধারণ। ২. দীর্ঘ চিন্তা এবং পরামর্শের মাধ্যমে চূড়ান্ত পরিকল্পনা প্রণয়ন। ৩. ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণি-পেশার এবং ধারার জনতার উপযোগী কর্মসূচি তৈরি ও বাস্তবায়ন। একই জনশক্তিকে বার বার একই ধারার কর্মসূচিতে ব্যবহার করা যাবে না। ৪. আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্যে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা এবং একই সাথে সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের প্রয়োজন মেটানোর সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। ৫. সময়ের বাস্তবতার আলোকে প্রয়োজনমতো যথাযথ পর্যালোচনার ভিত্তিতে কর্মসূচিতে পরিবর্তন আনতে হবে।  ৬. কর্মসূচি কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, স্বৈরাচারের পক্ষ থেকে কী কী প্রতিক্রিয়া আসতে পারে, তা কীভাবে মোকাবিলা করা হবে, অংশগ্রহণকারীদের সে সম্পর্কে সুস্পষ্ট নির্দেশনা অংশগ্রহণের আগেই জানিয়ে দিতে হবে। ৭. আন্দোলনকে নিরস্ত্র এবং অহিংস রাখার জন্য মোটিভেশন চালানো প্রয়োজন। প্রয়োজনে বক্তব্য, লিফলেট ব্যবহার এবং উগ্রপন্থী জনশক্তিকে পরিহার করে কাজ করা যেতে পারে। ক্ষুদ্র কিংবা বড় যাই হোক, প্রতিটি কর্মসূচির বস্তুনিষ্ঠ রিপোর্ট এবং সংবাদ সকল ধারার মিডিয়ায় ছড়িয়ে দিতে হবে। অতিরঞ্জিত কিংবা অসত্য কোনো খবর পুরো আন্দোলনের ক্রেডিবিলিটি নষ্ট করে দেবে। ৮. স্বৈরাচারের বিভিন্ন অপরাধ, নৃশংসতা এবং দুর্নীতি অপশাসনের চিত্র জনসমক্ষে ব্যাপকভাবে তুলে ধরতে হবে। এক্ষেত্রে দেশি-বিদেশি মিডিয়াকে ব্যবহার করতে হবে।
মনে রাখতে হবে, স্বৈরাচারী সরকার যদি পুলিশ বাহিনী, সরকারি আমলাতন্ত্র এবং সামরিক বাহিনীকে সম্পূর্ণ নিজের কব্জায় রাখতে সক্ষম হয়, তাহলে আন্দোলন করে তাকে উৎখাত করাটা অত্যন্ত কঠিন; এমনকি কখনো কখনো সেটা অসম্ভবের পর্যায়েও চলে যায়। তবে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরাচারের পতন ঘটানো কোনো আন্দোলনেরই লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়। কিন্তু সরকারের উল্লেখিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিস্থিতি বিবেচনা করে সতর্কতার সাথে জনগণের পক্ষে কাজে লাগানোর কৌশল নির্ধারণ করতে হবে।
ভুলে গেলে চলবে না, স্বৈরশাসকের পতন কোনো একদলের প্রচেষ্টায় পৃথিবীর কোথাও সফল হয়নি। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ ঐক্যবদ্ধ হলেই আন্দোলন সফল হয়। এজন্য প্রয়োজন ছোট-খাটো মতপার্থক্য ভুলে একসাথে একমঞ্চে আন্দোলনের ডাক।

Please follow and like us:

Check Also

আশাশুনিতে পুশ বিরোধী অভিযান।।২০০ কেজি চিংড়ী জব্দ ও আগুনে পুড়িয়ে বিনষ্ট

এস, এম মোস্তাফিজুর রহমান (আশাশুনি) সাতক্ষীরা।।আশাশুনতে পুশ বিরোধী অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। রবিবার (২১শে এপ্রিল) …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

***২০১৩-২০২৩*** © ক্রাইমবার্তা ডট কম সকল অধিকার সংরক্ষিত।