লাইলাতুল কদরের গুরুত্ব ও মর্যাদা

॥ এম লোকমান হোসেন॥
লাইলাতুল কদর আরবি শব্দ। লাইলাতুল অর্থ রাত আর কদর শব্দের অর্থ সম্মানিত। লাইলাতুল কদর তথা সম্মানিত রাত। লাইলাতুল কদরের রাত হচ্ছে হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। এটাকে  শবেকদরও বলা হয়। শবেকদর ফারসি শব্দ। শবে অর্থ রাত বা রজনী আর কদর অর্থ সম্মানিত।
এমাসে পবিত্র কুরআনুল কারিম নাজিলের মাধ্যমে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এ রাতকে হাজার মাসের চেয়ে উত্তম ও মহাসম্মানিত রাত হিসেবে আমাদের জন্য দান করেছেন। প্রতি বছর রমযান মাসের শেষ দশকের রাতগুলোর মধ্যে কোনো এক বেজোড় রাত হলো ভাগ্য নির্ধারণ বা লাইলাতুল কদরের রাত।
যে রাতে পবিত্র কুরআন নাজিল হয়েছে, সে রাতই লাইলাতুল কদর। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি কুরআন নাজিল করেছি মর্যাদাপূর্ণ কদর রজনীতে। আপনি কি জানেন, মহিমাময় কদর রজনী কী? মহিমান্বিত কদর রজনী হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। সে রাতে ফেরেশতাগণ ও রুহ অবতরণ করেন; তাঁদের প্রভু মহান আল্লাহর নির্দেশ ও অনুমতিক্রমে সব বিষয়ে শান্তির বার্তা নিয়ে। এ শান্তির ধারা চলতে থাকে ঊষা বা ফজর পর্যন্ত। (সূরা আল কদর)।
রমযান মাস পবিত্র কুরআন নাজিলের মাস। শবেকদর কুরআন নাযিলের রাত। এ রাতেই প্রথম পবিত্র মক্কা মুকাররমার হেরা পর্বতের গুহায় মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে রুহুল আমীন খ্যাত ফেরেশতা হজরত জিবরাইল আ.-এর মাধ্যমে রাহমাতুল্লিল আলামিন প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি মহাগ্রন্থ আল কুরআন নাজিল করেন।
এ কারণে আল্লাহ তায়ালা এ রাতের মর্যাদা বাড়িয়ে দিয়েছেন। এ রাতে মহান আল্লাহ উম্মতে মুহাম্মাদীকে হাজার মাসের ইবাদত-বন্দেগি ও আমলের সমান সাওয়াব দান করেন। কুরআনুল কারিমের অন্য স্থানে এ রাতটিকে বরকতময় রাত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেন, হা-মীম। শপথ সুস্পষ্ট কিতাবের। আমি একে (কুরআন) এক বরকতময় রাতে নাজিল করেছি। নিশ্চয়ই আমি সতর্ককারী। এ রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় স্থিরকৃত হয়। আমার পক্ষ থেকে আদেশক্রমে, আমিই প্রেরণ করে থাকি। আপনার পালনকর্তার অনুগ্রহস্বরূপ ও রহমতস্বরূপ। তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।’ (সূরা দুখান : ১-৬)।
কুরআন নাজিলের কারণে মর্যাদার এ রাতের কথা উল্লেখ করার পর যে মাসে কুরআন নাজিল হয়েছে, সে মাসের কথাও আল্লাহ তায়ালা কুরআনুল কারিমে উল্লেখ করেছেন।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘রমযান মাস! এমন একটি মাস যে মাসে কুরআন নাজিল হয়েছে মানবের মুক্তির দিশারী ও হিদায়াতের সুস্পষ্ট নিদর্শনরূপে। ’ (সূরা আল বাকারা : ১৮৫)।
সুতরাং লাইলাতুল কদরের রাতে আল্লাহর ওইসব বান্দা সবচেয়ে বেশি সম্মানিত ও মর্যাদার অধিকারী হবেন, যাদের সঙ্গে কুরআনের সম্পর্ক বেশি। যিনি কুরআন-সুন্নাহর আলোকে নিজের জীবন পরিচালিত করবেন। বাস্তবজীবনে কুরআন-সুন্নাহর আমলে সাজাবেন জীবন। আর তারাই হবেন সফল।
রমযানের শেষ দশ দিনের যেকোনো বেজোড় রাতে লাইলাতুল কদর তালাশ করা যায়, অর্থাৎ ২১, ২৩, ২৫, ২৭, ২৯ রমযান রাতগুলো। তবে অনেক আলেমদের গবেষণা ও ব্যাখ্যায় এবং বুজুর্গানেদীনের মতে, ২৬ রমযান দিবাগত রাত অর্থাৎ ২৭ রমযান পবিত্র শবেকদরের অন্যতম সম্ভাব্য রাত।
মর্যাদার এ রাত পেলে মুমিন বান্দা আল্লাহর উম্মুল জননী হযরত আয়েশা সিদ্দিকা রা. বর্ণনা করেন, একবার আমি রাসূলুল্লাহ সা.কে জিজ্ঞাসা করলাম- হে আল্লাহর রাসূল! (সা.) আপনি বলে দিন, আমি লাইলাতুল কদর কোন রাতে হবে তা জানতে পারি, তাতে আমি কী (দোয়া) পড়বো?
রাসূলুল্লাহ সা. বললেন, তুমি বলবে, ‘আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন তুহিব্বুল আ’ফওয়া ফা’ফু আন্নি।’
অর্থ: হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমাশীল; ক্ষমা করতে ভালোবাসেন; অতএব আমাকে ক্ষমা করে দিন। (মুসনাদে আহমাদ, ইবনে মাজাহ, তিরমিযী, মিশকাত)।
মর্যাদা: লাইলাতুল কদরের মর্যাদা এত বেশি যে, রাসূলুল্লাহ সা. এ রাতটি পাওয়ার জন্য শেষ দশকে আজীবন এতেকাফ করেছেন।
উম্মতে মুহাম্মদীর উদ্দেশে রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘আমি কদরের রাতের সন্ধানে (রমযানের) প্রথম ১০ দিন এতেকাফ করলাম। এরপর এতেকাফ করলাম মধ্যবর্তী ১০ দিন। তারপর আমার প্রতি ওহি নাজিল করে জানানো হলো যে, তা শেষ ১০ দিনে রয়েছে। সুতরাং তোমাদের যে এতেকাফ পছন্দ করবে, সে যেন এতেকাফ করে। তারপর মানুষ (সাহাবায়ে কেরাম) তাঁর সঙ্গে এতেকাফে শরিক হয়।’ (মুসলিম শরীফ)।
ফজিলত: বিশ্বমানবতার মহাসনদ ও মহাগ্রন্থ আল কুরআন নাজিল হওয়ার কারণে অন্য সব মাসের চেয়ে রমযান মাস বেশি ফজিলত ও বরকতময় হয়েছে। আর রমযানের রাতগুলোর মধ্যে কুরআন নাযিলের রাত লাইলাতুল কদর সবচেয়ে তাৎপর্যমণ্ডিত একটি রাত।
এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আমি একে নাজিল করেছি কদরের রাতে। তুমি কি জান কদরের রাত কী? কদরের রাত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। (সূরা কদর : ১-৩)।
এ আয়াতের ব্যাখায় মুফাসসিরকুল শিরোমণি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘এ রাতের ইবাদত অন্য হাজার মাসের ইবাদতের চেয়ে উত্তম’। (তানবিরুল মিকবাস মিন তাফসিরে ইবনে আব্বাস : ৬৫৪ পৃষ্ঠা)।
তাবেয়ি মুজাহিদ (রহ.) বলেন, এর ভাবার্থ হলো, ‘এ রাতের ইবাদত, তেলাওয়াত, দরূদ, কিয়াম ও অন্যান্য আমল হাজার মাস ইবাদতের চেয়েও উত্তম।’
আমল: লাইলাতুল কদর পেলে যেসব আমল ও দোয়ায় রাত অতিবাহিত করা জরুরি। নফল নামায পড়া, মসজিদে প্রবেশ করে ২ রাকাত (দুখলিল মাসজিদ) নামায পড়া, দুই দুই রাকাত করে (মাগরিবের পর ৬ রাকাত) আউওয়াবিনের নামায পড়া, রাতে তারাবির নামায পড়া, শেষ রাতে সাহরির আগে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়া, সম্ভব হলে সালাতুত তাসবিহ পড়া, সম্ভব হলে তাওবার নামায পড়া, সম্ভব হলে সালাতুল হাজাত পড়া, সম্ভব হলে সালাতুশ শোকর ও অন্যান্য নফল নামায বেশি বেশি পড়া, কুরআন তেলাওয়াত করা, সূরা কদর, সূরা দুখান, সূরা মুযযাম্মিল, সূরা মুদ্দাসির, সূরা ইয়াসিন, সূরা ত্বা-হা, সূরা আর-রাহমান, সূরা ওয়াকিয়া, সূরা মুলক, সূরা কুরাইশ এবং ৪ কুল পড়া, দরূদ শরিফ পড়া, তাওবাহ-ইসতেগফার পড়া, সাইয়্যেদুল ইসতেগফার পড়া, পরিবার-পরিজন, বাবা-মা ও মৃতদের জন্য দোয়া করা, কবর জিয়ারত করা।
লেখক : মাদরাসা শিক্ষক।

Please follow and like us:

Check Also

জলোচ্ছ্বাসে প্লবিত বিস্তীর্ণ অঞ্চল , নিরাপদ আশ্রয় কেন্দ্রের অভাবে গত ৫০ বছরে উপকূলে ৪ লাখ ৭৫ হাজার প্রাণহানি

হুহু করে লোকালয় ঢুকছে সাগরের পানি আবু সাইদ বিশ্বাস, সাতক্ষীরাঃ প্রবল ঘূর্ণিঝড় রিমালের প্রভাবে তীব্র …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

***২০১৩-২০২৩*** © ক্রাইমবার্তা ডট কম সকল অধিকার সংরক্ষিত।