২৫ হাজার সরকারি টিউব অয়েলে উঠছে না পানি: দুষ্পাপ্য পানযোগ্য পানি: সাতক্ষীরার জনজীবনে হাঁসফাঁস

আবু সাইদ বিশ্বাস, সাতক্ষীরাঃ তীব্র খরা: বৃষ্টি হীনতা ও পানিতে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরার জনজীবনে হাঁসফাঁস তৈরি হয়েছে। গত ৫ মাসে সেভাবে বৃষ্টি না হওয়ায় ভূ-উপরিস্থ পানি শুকিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নেমে গেছে। এতে খাবার পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। একই সাখে সমুদ্র থেকে ভূভাগের অনেক ভিতর পর্যন্তুলোনা পানি ঢুকে পড়েছে। ফলে মানুষকে পানি ও খাবারের সাথে তুলনামূলক বেশি পরিমান লবন গ্রহণ করতে হচ্ছে। এতে অসংখ্য মানুষ স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়েছে। চিকিৎসাবিদদের মতে এ এলাকায় বসবাসকারীদের উচ্চ রক্তচাপ রোগে ভোগার সম্ভবনা বাড়ছে। লবনাক্ততার কারণে উপকূলের নারীদের জরায়ু সংক্রমণ হচ্ছে। বেসরকারী সংগঠন লির্ডাসের তথ্য মতে, উপকূলীয় অঞ্চলে গত ৩৫ বছরে পূর্বের তুলনায় লবনাক্ততা বেড়েছে ২৬ % এবং যার পরিমান ২ পিপিটি থেকে বেড়ে ৭ পিপিটি হয়েছে। শ্যামনগর জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্য মতে শুধু শ্যামনগর উপজেলাতে পানিতে আয়রনের পরিমান রয়েছে প্রতি লিটারে ২৫০ থেকে ৩০০ মিলিগ্রাম। সাতক্ষীরা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান সময়ে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর সাতশ’ ফুট পর্যন্তুনেমে গেছে। তবে স্থান বিশেষে তা পাঁচশ’ ফুট পর্যন্তুরয়েছে। ফলে জেলার ২৫ হাজার সরকারি টিউব অয়েলে পানি উঠছে না। এ ছাড়া পারিবারিকভাবে বসানো হাজার হাজার নলকূপেও পানি নেই। এমনকি সেচের পানি উত্তোলনও বাধার মুখে পড়ছে। এদিকে সাতক্ষীরা পৌর এলাকায় গ্রাহকদের বাড়িতে পানি সরবরাহ বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। কিছু এলাকায় পানি গেলেও শহরের বেশির ভাগ এলাকায় পৌরসভার পানি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এসব এলাকায় মানুষ ১২০০ ফুটেরও বেশি গভীর নলকূপ বসিয়ে নিজ নিজ পরিবারের পানির চাহিদা মেটাচ্ছেন। অনেকে ঝুঁকছে বোতলজাত পানি ব্যবহারে।
জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাবে সাতক্ষীরার শ্যামনগর, আশাশুনি,কালিগঞ্জও তালা,খুলনার দাকোপ, কয়রা, বাগেরহাটের মোংলা, শরণখোলা ও মোরেলগঞ্জ এলাকায় পানযোগ্য পানি খুবই দুষ্পাপ্য। এসব এলাকার বেশির ভাগ উপজেলায় গভীর নলকূপ কার্যকর নয়। এখানে বসবাসরত মানুষ বর্ষার মৌসুমের বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে ৩ থেকে ৪ মাস খাওয়া ও রান্নার কাজে ব্যবহার করে।এসব এলাকার সীমিত সংখ্যক পুকুর, সিডর, আইলা ও আম্ফানের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ক্ষতিগ্রস্থ জলাশয় ও দীর্ঘস্থায়ী খরার কারণে এ বছর পানি সরবরাহ ব্যবস্থা জটিল আকার ধারণ করেছে। জেলা আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায়, বাংলাদের জলবায়ুর বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী বছরের মার্চ মাসে ২ হাজার ১১৫ মিলিমিটার এবং এপ্রিল মাসে ৫ হাজার ৪৬৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হওয়া জরুরি। কিন্তু চলতি বছরে এখনো বৃষ্টিপাতের পরিমাণ তেমন দেখা মেলেনি।

দেশের উপকূলীয় উপজেলা সাতক্ষীরার শ্যামনগরের বুড়িগোয়ালিনী আশ্রয় প্রকল্পে বাস করেন গৃহিণী রেখা রানি। একটি কলস ও একটি বোতল নিয়ে আড়াই কিলোমিটার পথ হেঁটে মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের কলবাড়ীতে আসেন প্রতিদিন। দীর্ঘ এই পথ পাড়ি দেওয়ার একটাই কারণ, সুপেয় পানি সংগ্রহ করা। এভাবে আসা-যাওয়ায় পাঁচ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে আনা ওই পানি পান করে জীবনধারণ করেন পরিবারের অন্য সদস্যরা। উপকূলের এমন অসংখ্য মানুষ প্রতিদিনই সুপেয় পানির জন্য যুদ্ধ করছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিত করলে জনগণের বর্তমান অসুখ-বিসুখের শতকরা ৭০ ভাগ কমে যাবে। অথচ বিপুল আধারের মধ্যে থেকেও উপকূলের মানুষ বিশুদ্ধ পানি থেকে বঞ্চিত। হেলায়ফেলায় নিজেদের সম্পদকে অভিশাপে পরিণত করতে শাসকদের জুড়ি পাওয়া ভার। যত দিন যাচ্ছে, তত পানিদূষণ বাড়ছে; বোতল পানির বাজারও সম্প্রসারিত হচ্ছে। পানি সরবরাহের মূল ব্যবস্থাও নানা প্রকল্পের মধ্য দিয়ে বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়ার আয়োজন চলছে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, কলের পানির চেয়ে

বোতলজাত পানি পরিবেশের জন্য ৩ হাজার ৫০০ গুণ বেশি ক্ষতিকর। স্পেনের বার্সেলোনায় বোতলজাত পানির ব্যবহারের উপর গবেষণা করে বার্সেলোনা ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল হেলথ (আইএসগ্লোবাল) এই তথ্য জানিয়েছে । প্রকৃতপক্ষে, গবেষকরা আবিষ্কার করেছে যে, যদি সমগ্র জনগোষ্ঠী বোতলজাত পানি পান করতে শুরু করে, তাহলে যে পরিমাণ উৎপাদন করতে হবে, তার জন্য বছরে ১ দশমিক ৪৩টি প্রজাতি বিলুপ্ত হবে এবং এর জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আহরণে বছরে প্রায় ৮ কোটি ৩৯ লাখ ডলার খরচ হবে। উপরন্তু, বাস্তুতন্ত্রের উপর ১ হাজার ৪০০ গুণ বেশি প্রভাব পড়বে এবং সম্পদ আহরণের খরচ ৩ হাজার ৫০০ গুণ বেশি হবে।
সাতক্ষীরা মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট-এসআরডিআই এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের উপকূলবর্তী শতকরা প্রায় ৫৩ ভাগ অঞ্চল লবণাক্ততায় আক্রান্ত। এর ফলে যে শুধু মানুষের খাবারের পানির চাহিদার সংকট হচ্ছে তা নয়; বরং কৃষির সংকটও এর সঙ্গে

ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে। ভালো জমিতে যেখানে ফসলের নিবিড়তা জায়গা ভেদে ৪০০ শতাংশও হয়; সেখানে উপকূলে তা মাত্র মাত্র ১৩৩ শতাংশ। সুপেয় পানির অভাবের কারণে শহরে তো বটেই গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছে পানির ব্যবসা। ২০ লিটারের জারে করে পানি বিক্রি করছে জেলার অর্ধশতাধিক কোম্পানি। গভীর নলকূপ বসিয়ে পানি উত্তোলন করে এ ব্যবসা করছেন কিছু মানুষ। তবে এগুলোর অধিকাংশেরই বিএসটিআইয়ের অনুমোদন নেই। বাঁচার তাগিদে মানুষ মানহীন পানিই কিনে পান করছেন।
সাতক্ষীরা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের প্রধান শহিদুল ইসলাম জানান, জেলার ২৩ লাখ জনগোষ্ঠীর ৮৫ শতাংশ মানুষের খাবার পানি সরবরাহ করার সক্ষমতা আমাদের রয়েছে। কিন্তু পানির স্তর নেমে যাওয়ায় মানুষ খাবার পানি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এছাড়াও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর সাতশ’ ফুট পর্যন্তুনেমে গেছে। তবে স্থান বিশেষে তা পাঁচশ’ ফুট পর্যন্তুরয়েছে। ফলে জেলার ২৫ হাজার সরকারি টিউব অয়েলে পানি উঠছে না। এর পরও প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহে তারা কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করে যাচ্ছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এ অবস্থা থেকে উত্তরণের প্রধান উপায় নদী-খাল যেগুলো ভরাট হয়ে গেছে, সেগুলো অবশ্যই খনন করে সেখানে বর্ষাকালের পানি ধরে রাখতে হবে। সেটা দিয়ে খাবার পানির চাহিদা মিটবে আবার ফসলও করা যাবে। বাজেটে বিশেষ বরাদ্ধ রাখা, খাবার পানির সংকট সমাধানে টেকসই ও স্থায়ী সমাধান করা, ভিন্ন ভিন্ন ভৌগোলিক পরিবেশে পানির উৎস সংখ্যা বৃদ্ধি করা, উপকূলীয় বোর্ড গঠন করা, পতিত বা খাস জমিতে জলাধার নির্মান, উপকূলীয় এলাকায় খাবার পানির জন্য সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা দরকার।

 

Please follow and like us:

Check Also

ঘূর্ণিঝড় রেমালের আঘাতে প্রাণ গেল ১১ জনের

# আতংক কাটেনি উপকূলে # বৃষ্টি থাকবে বুধবার পর্যন্ত  # ২ কোটি ২২ লাখ গ্রাহকের …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

***২০১৩-২০২৩*** © ক্রাইমবার্তা ডট কম সকল অধিকার সংরক্ষিত।