‘জলবায়ুু পরিবর্তন’ —– ঝুঁকিতে উপকূলের ৪০ শতাংশ কৃষিজমি

বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা দুই লাখ ৪০ হাজার কৃষকের
আবু সাইদ বিশ্বাস,সাতক্ষীরাঃ ‘জলবায়ুু পরিবর্তনে সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে পড়েছে সাতক্ষীরাসহ উপকূলের কৃষিখাত’। বৃষ্টিপাত কমে যাওয়া এবং অসময়ে বৃষ্টিপাত কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের শস্য এবং ফসল উৎপাদনে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। কৃষক তার জমিতে ফসল ফলাতে পারছেন না, হালের পশু ও অন্যান্য গৃহপালিত পশুর খাদ্যের ব্যাপক সংকট দেখা দিয়েছে। লবণাক্ততার জন্য চাষযোগ্য জমি উর্বরতা হারাচ্ছে। কৃষি খামার বাড়ি সাতক্ষীরার তথ্য মতে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সাতক্ষীরার ১ লাখ ৮৮ হাজার ৬২৬ হেক্টর আবাদি জমির মধ্যে ৮১ শতাংশেরও বেশি জমি অর্থাৎ ১ লাখ ৫৩ হাজার ১১০ হেক্টর জমি লবণাক্ততায় রূপ নিয়েছে। আর পতিত জমি রয়েছে ৪০ হাজার ৯৮১ হেক্টর। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা লির্ডাস, ব্রেড ফর দ্য ওয়ার্ল্ডসহ জলবায়ু অধিপরামর্শ ফোরামের তথ্যমতে, জেলার ২৩ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮১ জন মানুষের মধ্যে পাঁচ লক্ষাধিক কৃষক জমিতে ফসল উৎপানে ক্ষতির মুখে পড়েছে। গবেষকদের মতে, কৃষিজমির লবণাক্ততা যদি বাড়তে থাকে তাহলে কৃষি আয় বছরে ২১ শতাংশ কমে যাবে এবং উপকূলীয় অঞ্চলের ৪০ শতাংশ কৃষিজমি হুমকির মুখে পড়বে। এতে এই অঞ্চলের দুই লাখ ৪০ হাজার কৃষকের বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রায় প্রতিবছর এপ্রিল, মে, জুন এবং সেপ্টেম্বর, অক্টোবর, নভেম্বরে বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপ ও নিম্নচাপের তান্ডবে ব্যাপক জলোচ্ছ্বাসে তলিয়ে যায় উপকূলবর্তী হাজার হাজার একর স্থলভাগ। এছাড়া সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে সমুদ্রের লোনাপানি উপকূলীয়ু অঞ্চল থেকে যশোর, কুষ্টিয়ুা, ফরিদপুর এবং কুমিল্লা পর্যন্ত উত্তর দিকে ধাবিত হচ্ছে।

কৃষি তথ্য সার্ভিসের তথ্যানুযায়ী তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার ফলে ধানের উৎপাদন দিন দিন কমে যাচ্ছে। এর প্রধান কারণ হলো, সাধারণত ধান চাষের ক্ষেত্রে ১৮-৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা প্রয়োজন হয়। কিন্তু শীতের সময় তাপমাত্রা ১৮ ডিগ্রির অনেক নিচে নেমে যায় এবং গরমের সময় ৩৫ ডিগ্রির ওপরে উঠে যায়। এতে ধানের পরাগায়ণে অনেক সমস্যা হয় এবং উৎপাদন ব্যাহত হয়। সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ২০১৯-২০ মৌসুমে এ জেলায় রোপা আমন চাল উৎপাদন হয়েছিল ২ লাখ ৭৫ হাজার ৮৬ টন, ২০২০-২১ মৌসুমে উৎপাদন হয় ২ লাখ ৫৮ হাজার ১০০ টন, ২০২১-২২ মৌসুমে উৎপাদন হয় ২ লাখ ৪৬ হাজার ৭২৮ টন এবং ২০২২-২৩ মৌসুমে জেলায় সরকারিভাবে আমন চাল উৎপাদন হয় ২ লাখ ৪১ হাজার ৮৫৮ টন। সেই হিসাবে ২০১৯-২০ মৌসুমের তুলনায় ২০২২-২৩ মৌসুমে ৩৩ হাজার ২৩৮ টন উৎপাদন কমে গেছে। ২০১৫-১৬ মৌসুমে জেলায় আমনের আবাদ হয় ৯৪ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে সেখানে ২০২৩-২৪ মৌসুমে জেলায় আমন চাষ হয় ৮৮ হাজার ৭৬৮ হেক্টর জমিতে। কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত জলবায়ু পরিবর্তন ঘটায় সাতক্ষীরায় বন্যা, খরা ও জলাবদ্ধতার পাশাপাশি মাটি ও পানির লবণাক্ততা বেড়ে গেছে। এতে ক্রমেই আমন ধানের উৎপাদন কমে যাচ্ছে। গত চার বছরের ব্যবধানে আমন ধান উৎপাদন কমেছে ৩৩ হাজার টন

জাতীয় প্রশিক্ষণ একাডেমি, গাজীপুরের গ্রামীণ অর্থনীতি বির্ষয়ক উপপরিচালক ড. মো. দেলোয়ার হোসেন মজুমদার মতে, বাংলাদেশের জীবিকা নির্বাহের প্রায় ৮৮ শতাংশ কৃষি খাতের ওপর নির্ভরশীল এবং জিডিপিতে অবদান প্রায় ১৬ শতাংশ। কৃষি মৌসুমি অবস্থার যেকোনো পরিবর্তনের সাথে সংবেদনশীল, এমনকি তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, মৌসুমের সময় ও সময়কাল, বারবার বন্যাসহ মাটি ও পানিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধির সাথে কৃষির উৎপাদন সরাসরি জড়িত। আশঙ্কার বিষয় হলো, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কৃষকরা প্রায় ৫৫% প্রাকৃতিক সম্পদের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে পারে। কৃষিকাজের জন্য জমির পরিমাণ কমে গিয়ে খাদ্যশস্য উৎপাদন প্রায় ৩০% কমে যেতে পারে। এমনকি মানবসম্পদের জোগান ১৫% হ্রাস এবং কৃষকের স্বাস্থ্য ঝুঁকি প্রায় ২৫% বেড়ে যেতে পারে। ফলে সার্বিক উৎপাদনশীলতা কমে আয় হ্রাস পাওয়ায় আর্থিক সম্পদে গ্রামীণ মানুষের অভিগম্যতা প্রায় ৪৬% কমে যেতে পারে।

আইপিসিসির পঞ্চম প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০৫০ সাল নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ায় বাংলাদেশে প্রায় ২.৭ কোটি লোক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ২০১৩ সালে প্রকাশিত ক্লাইমেট ভালনারেবল মনিটর অনুসারে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ফলে ২০৩০ সাল নাগাদ বাংলাদেশে প্রতি বছর অতিরিক্ত ছয় লাখ মানুষ ঝুঁকিতে রয়েছে এবং ১২৫ কোটি ডলারের অতিরিক্ত অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে।

জাতীয় কৃষি গবেষণা সিস্টেমের (এনএআরএস) এর তথ্য মতে, কৃষি প্রধান বাংলাদেশে কৃষিভিত্তিক উৎপাদনের জন্য যেখানে ছিল যথাযোগ্য তাপমাত্রা, ছিল ছয়ুটি আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্যমন্ডিত ঋতু, সেখানে দিনে দিনে জলবায়ুু পরিবর্তনের কারণে ঋতু হারিয়ে যেতে বসেছে এবং তার সাথে সাথে বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা সবকিছুতে আমূল পরিবর্তন আসছে। বাংলাদেশ নাতিশীতোষ্ণ তাপমাত্রার দেশ হিসেবে পরিচিত হলেও বিগত কয়েক বছরে তাপমাত্রার অস্বাভাবিক আচরণ সেই পরিচিতি ম্লান হয়ে যাচ্ছে। জলবায়ুু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশে বৃষ্টিপাত হ্রাস পাবে বলে বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা। বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশে বৃষ্টিপাতের মৌসুম এবং ধরন পরিবর্তিত হয়েছে।
কৃষক রহিমা বেগম বলেন, ”আমাদের ঘের রয়েছে, সেখানে দেখেছি অতিরিক্ত গরমে মাছ মারা যাচ্ছে, আবার ভারী বৃষ্টিপাতে ঘের তলিয়ে গিয়েছিল। কৃষক আকছেদ জানান, প্রচন্ড গরমে তার বোরো ধানে চিটি আসছে। এতে তার অনেক বেশি ক্ষতি হয়ে যাবে।
জেলা আবহাওয়ুা অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জুলফিকার আলী রিপন বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের ব্যাপক প্রভাব পড়ছে উপকূলীয় এলাকায়। ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, জলাবদ্ধতা ও মাটির লবণাক্ততা উপকূলের প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শীতের সময় অধিক শীত, গ্রীষ্মে প্রচন্ড গরম এবং বর্ষায় অতিবৃষ্টির ফলে দুর্ভোগ বাড়ছে।
সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মোঃ সাইফুল ইসলাম জানান, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির প্রভাবে জলবায়ুু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে কৃষিখাত। জলবায়ুু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ থেকে কৃষি উৎপাদনকে রক্ষা করতে জলবায়ুু পরিবর্তনের সঙ্গে অভিযোজন উপযোগী কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে কাজ করে যাচ্ছে কষি বিভাগ। পাশাপাশি কৃষিখাতে উদ্ভাবিত প্রযুক্তিকে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের হাতে পৌঁছে সর্বাতœক প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে।

 

 

 

Please follow and like us:

Check Also

ঘূর্ণিঝড় রেমালের আঘাতে প্রাণ গেল ১১ জনের

# আতংক কাটেনি উপকূলে # বৃষ্টি থাকবে বুধবার পর্যন্ত  # ২ কোটি ২২ লাখ গ্রাহকের …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

***২০১৩-২০২৩*** © ক্রাইমবার্তা ডট কম সকল অধিকার সংরক্ষিত।