॥ জামশেদ মেহ্দী॥
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের কাছে বিএনপির লিখিত মতামত প্রদানের পর কমিশন থেকে বেরিয়ে এসে সাংবাদিকদের কাছে বিএনপি যে বক্তব্য দেয়, সেটি পড়ে জনগণ বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেছেন। বিএনপির প্রতিনিধিদলের নেতা সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ৭১ আর ২৪-এর গণঅভ্যুত্থান এক হতে পারে না। তিনি বলেন, সংবিধান সংস্কার কমিশন একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধের সঙ্গে একই কাতারে ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানকে নিয়ে এসেছে। আমরা মনে করি, এটি সমীচীন নয়। এরপর সালাহউদ্দিন যে কথাটি বলেন, সেটি রীতিমতো একটি তথ্যবোমা ফাটানোর সমান। তিনি বলেন, বর্তমান সংবিধানের প্রিয়াম্বলই অপরিবর্তিত রাখতে হবে বলে আমরা মনে করি। (দৈনিক সমকাল, ২৪ মার্চ)। দৈনিক যুগান্তরের ২৪ মার্চ সংখ্যার প্রথম পৃষ্ঠায় প্রকাশিত প্রধান সংবাদের অন্যতম সাব হেডিং, ‘গণভোট ও গণপরিষদে না/ঐকমত্য কমিশনের সংস্কার প্রস্তাবে বিএনপির মতামত/সংবিধান সংশোধন করা যেতে পারে, তবে মূলনীতি পরিবর্তন নয়”। এসব উক্তির মাধ্যমে বিএনপি তাদের মৌলিক আদর্শ সম্পূর্ণ উল্টে ফেলে দিল। কারণ বর্তমান সংবিধানের প্রিয়াম্বল বা প্রস্তাবনাই হচ্ছে সংবিধানের মূলনীতি। এ মূলনীতি হলো ৪টিÑ (১) গণতন্ত্র, (২) সমাজতন্ত্র, (৩) ধর্মনিরপেক্ষতা ও (৪) জাতীয়তাবাদ। আসুন, দেখা যাক প্রস্তাবনা বা মূলনীতিতে কী আছে। প্রস্তাবনায় রয়েছে, ‘আমরা অঙ্গীকার করিতেছি যে, যেসকল মহান আদর্শ আমাদের বীর জনগণকে জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে আত্মনিয়োগ ও বীর শহীদদিগকে প্রাণোৎস্বর্গ করিতে উদ্বুদ্ধ করিয়াছিল- জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার সেই সকল আদর্শ এ সংবিধানের মূলনীতি হইবে।’
বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করার পর বর্তমান সংবিধান সংশোধনও করেনি বা বাতিলও করেনি। অর্থাৎ শেখ হাসিনার সংবিধান রীতিমতো বহাল রয়েছে। বিএনপির এখন ঐ সংবিধানের প্রিয়াম্বল বা মূলনীতিতে অটল থাকার অর্থ হলো, তারা বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতায় এখন বিশ্বাসী। তার অর্থ হলো বিএনপি তার বিগত ৪০ বছরের আদর্শ পরিত্যাগ করে সেসব আদর্শ গ্রহণ করেছে, যেগুলো আওয়ামী লীগ বিগত ৭২ বছর ধরে লালন করে এসেছে। অবশ্য এখানে বলা দরকার যে, উপরোক্ত চারটি মূলনীতির মধ্যে ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণমুক্ত হওয়া পর্যন্ত ধর্মনিরপেক্ষতাকে আওয়ামী লীগ তাদের দলীয় আদর্শরূপে গ্রহণ করেনি। ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর বাংলাদেশের সংবিধান অনুমোদন করার সময় অকস্মাৎ ধর্মনিরপেক্ষতা ঢুকে পড়ে।
প্রশ্ন হলোÑ কোন পটভূমিতে বিএনপি তাদের আদর্শ পরিবর্তন করল? আমার কাছে সংবিধান সংস্কার কমিশনের পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট রয়েছে। ১৩৭ পৃষ্ঠার ঐ রিপোর্টের ৬ পৃষ্ঠায় নাগরিকত্ব শিরোনামে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসেবে বাঙালি…’ কমিশন এ বিধানটি বিলুপ্ত করার সুপারিশ করছে। সুপারিশ করা হচ্ছে যে, বর্তমান অনুচ্ছেদ ৬(২) নিম্নোক্তভাবে সংশোধন করা হোকÑ বাংলাদেশের নাগরিকগণ বাংলাদেশি বলে পরিচিত হবেন। সংবিধানের মূলনীতি শীর্ষক ৫নং সুপারিশে বলা হয়েছে, ‘কমিশন সুপারিশ করছেন যে, সংবিধানের মূলনীতি হিসেবে সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক সুবিচার, বহুত্ববাদ এবং গণতন্ত্রকে অন্তর্ভুক্ত করা হোক।’ ৫.২: বহুত্ববাদ বর্ণনা করতে গিয়ে রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশ একটি বহুত্ববাদী, বহুজাতি, বহু ধর্ম, বহু ভাষী ও বহু সংস্কৃতির দেশ, যেখানে সকল সম্প্রদায়ের সহাবস্থান ও যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিত করা হবে।’
সুতরাং এ সুপারিশে দেখা গেল যে, ড. আলী রীয়াজের নেতৃত্বাধীন সংবিধান সংস্কার কমিশন রাষ্ট্রের মূলনীতিতে সমাজতন্ত্রের পরিবর্তে সাম্য, সামাজিক সুবিচার, মানবিক মর্যাদা এবং বহুত্ববাদের সুপারিশ করেছে।
রাষ্ট্রের মূলনীতিÑ এ শিরোনামে বলা হয়েছে, ‘কমিশন সংবিধানের মূলনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র এবং জাতীয়তাবাদ এবং এই সংশ্লিষ্ট সংবিধানে ৮, ৯, ১০ ও ১২নং অনুচ্ছেদগুলো বাদ দেওয়ার সুপারিশ করছে।’ সংবিধানের চতুর্থ পৃষ্ঠায় যে ৪টি মূলনীতি বিলোপ করার সুপারিশ করা হয়েছে, সেগুলো হলোÑ ৮.১, ৯(বাঙালি জাতীয়তাবাদ), ১০ (সমাজতন্ত্র ও শোষণ) এবং ১২ (ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা)।
সংবিধান সংস্কার কমিশন শেখ হাসিনার সংবিধান থেকে যেসব মূলনীতি বাদ দেওয়ার সুপারিশ করেছে, সেগুলোই এতদিন ধরে বিএনপি, জামায়াত প্রভৃতি জাতীয়তাবাদ এবং ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী রাজনৈতিক দলসমূহের আদর্শ ছিল। বিএনপি তাদের মৌলিক আদর্শ থেকে সরে গেলেও তাদের সেই মৌলিক আদর্শই তো সংবিধান সংস্কার কমিশন সমুন্নত করেছে। এখন সেখান থেকে বিএনপি ৩৬০ ডিগ্রি ডিগবাজি কেন দিল সেটি বোধগম্য নয়। অভিজ্ঞ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে বিএনপি এখন মনে করে যে ক্ষমতায় যেতে হলে একটি বড় দেশের পছন্দমতো চলতে হবে, যারা ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী।
এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, গত ২০ মার্চ ইংরেজি ডেইলি স্টারের প্রথম পৃষ্ঠায় একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। সংবাদের শিরোনাম, Tarique warns of extremists, fascists waiting to pounce- Says secularism, democracy will be priority of BNP. বঙ্গানুবাদ: চরমপন্থী এবং ফ্যাসিবাদিরা ছোবল মারার জন্য ওত পেতে আছে, হুঁশিয়ারি তারেক রহমানের। বলেন, বিএনপির অগ্রাধিকার হবে ধর্মনিরপেক্ষতা এবং গণতন্ত্র।
রিপোর্টে বলা হয়, Warning that extremists and fascists could again bury democracy in Bangladesh, BNP acting chairman Tarique Rahman yesterday said his party, along with other democratic parties, will prioritise maintaining the country’s secular character and strengthening democracy.
“We would like to draw the attention of the interim government that if it fails to control the evil activities of religious extremists and their radicalism, extremist groups and defeated fascist forces will once again bury democracy in the country,” he told at an iftar party via videoconference. বঙ্গানুবাদ: তারেক রহমান এই মর্মে হুঁশিয়ারি দেন যে, চরমপন্থি এবং ফ্যাসিস্টরা আবার বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে কবর দিতে চায়। তাই অন্যান্য গণতান্ত্রিক দলের সাথে মিলে বিএনপি দেশের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র এবং গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করাকে অগ্রাধিকার দেবে। আমরা অন্তর্বর্তী সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই যে, তারা যদি ধর্মীয় চরমপন্থী, র্যাডিক্যালিজম, চরমপন্থি গ্রুপ এবং পরাজিত ফ্যাসিস্টদেরকে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয় তাহলে তারা আবার গণতন্ত্র হত্যা করবে।
তারেক রহমান আরো বলেন, “To uphold the country’s secular character, the democratic forces will pursue a political settlement that strengthens Bangladesh’s democratic system. This includes bringing the fleeing mafia clique, responsible for massacres, to justice at any cost, while resolutely opposing extremism and religious fundamentalism,” said Tarique. বঙ্গানুবাদ: দেশের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র সমুন্নত করার জন্য দেশের গণতান্ত্রিক শক্তিসমূহ এমন একটি রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠা করবে, যেটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে। এজন্য প্রয়োজন যে মাফিয়া শক্তি গণহত্যার জন্য দায়ী, যেকোনো মূল্যে সেই পলাতক মাফিয়া শক্তির বিচার করা। একই সাথে চরমপন্থি এবং ধর্মীয় মৌলবাদীদের মুখোশ উন্মোচন করা।
বিএনপি যে তার মৌলিক আদর্শের পরিবর্তন ঘটিয়েছে, উপরোক্ত দুটি ঘটনার পর আর কিছু বলার অবকাশ থাকে না। অথচ এই সেই বিএনপি, যে দলটির প্রতিষ্ঠাতা এবং দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমান দেশে শেখ মুজিব প্রতিষ্ঠিত বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রকে সংবিধান থেকে বিলোপ করেন। তার স্থলে তিনি সন্নিবেশ করেন বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, আল্লাহর প্রতি ঈমান এবং সামাজিক ন্যায়বিচার। সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মারফত শেখ মুজিবুর রহমান যে বাঙালি জাতীয়তাবাদভিত্তিক ধর্মনিরপেক্ষ ব্যক্তি স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেই চতুর্থ সংশোধনী বাতিল করে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি ঈমান, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করেন।
প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ ছিল পঞ্চম সংশোধনী। বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষ বিশ্বাস করেছিলেন, শেখ মুজিব ধর্মনিরপেক্ষতার নামে বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ ৯০ শতাংশ মানুষকে ধর্মহীন করছেন। তারা আরো বিশ্বাস করতেন, বাংলাদেশ নামক এ ভূখণ্ডটির মানুষ শুধুমাত্র বাঙালি নয়, তারা বাঙালি এবং মুসলমান। তাই জেনারেল জিয়া ‘জয় বাংলার’ পরিবর্তে চালু করেন ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’। তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে চালু করেন বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। ভারতীয়দের ইন্ধনে তাদের স্থানীয় দোসরদের হাতে জিয়াউর রহমান শহীদ হওয়ার পর তার বিধবা পত্নী বেগম খালেদা জিয়া শক্ত হাতে স্বামীর আদর্শের পতাকা সমুন্নত রাখেন। এজন্য ইতিহাসে জেনারেল জিয়া এবং খালেদা জিয়ার নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখিত রয়েছে।
এখন এ ২৪/২৫-এর বিএনপি সেই আদর্শকে এক পাশে সরিয়ে রেখে যে সমাজতন্ত্রের পথে চলেছে, সেটি বাংলাদেশের জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। অনেকে মনে করেন যে, বাংলাদেশের বর্তমান তরুণ ও যুবসমাজ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিস্ময়কর উন্নতির ফলে ধর্মনিরপেক্ষতার পথে ধাবিত হচ্ছেন, তাহলে তারা বড় ভুল করবেন। জুলাই বিপ্লবের মূল চালিকাশক্তিই ছিল এদেশের টগবগে তরুণ ও যুবা। এই লাখ লাখ তরুণ ও যুবসমাজ বজ্রের ধ্বনি কেড়ে নিয়ে আওয়াজ তুলেছিলেন, ‘দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা’। আরো আওয়াজ তুলেছিলেন, ‘নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবার’। কিন্তু বিএনপির বর্তমান অবস্থান দেখে পর্যবেক্ষকরা মন্তব্য করেছেন, পতিত স্বৈরাচার ফ্যাসিস্ট হাসিনার মরা ঘোড়ায় চড়ে দলটির নেতারা দিল্লির পথে চলতে শুরু করেছে।
বেগম জিয়ার দ্বিতীয় মেয়াদের পুরা ৫ বছর একটি স্লোগানে প্রকম্পিত হয়েছে রাজপথ। আর সেটি হলো ভারতীয় আধিপত্যবাদবিরোধী স্লোগান, ‘সিকিম নয় ভুটান নয়, এদেশ আমার বাংলাদেশ’।
সেই স্লোগানের অনুরণন আজ শোনা যায় বাংলাদেশের তরুণদের কণ্ঠে। তাদের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়েছেন বাংলাদেশের শিক্ষিত তরুণীরা। আগামী দিনে যে নির্বাচন হতে যাচ্ছে, সেই নির্বাচনে তরুণ ভোটারদের সংখ্যা হলো ৩ কোটি। অভিজ্ঞ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, এই ৩ কোটি তরুণ শক্তিই হবে আগামী নির্বাচনের ডিসাইডিং ফ্যাক্টর। বিএনপির সেক্যুলারিজমের আদর্শ গ্রহণ দলটির প্রতি এ তরুণ শক্তির আকর্ষণ সৃষ্টি করবে নাকি বিকর্ষণ সৃষ্টি করবে, সেটি নির্ধারিত হতে যাচ্ছে আগামী দিনে।
Email: jamshedmehdi15@gmail.com