সাতক্ষীরায় সবেক স্বাস্থ্য মন্ত্রী ডা. রুহুল হকের আসনে জামায়াত প্রার্থী ব্যাপক জনপ্রিয়

ক্রাইমবার্তা রিপোট: :সাতক্ষীরা: রাজনৈতিক অঙ্গনে সাতক্ষীরা ৩ আসন নিয়ে জেলায় চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। আসনটিতে আ’লীগরে বর্তমান এমপি সবেক স্বাস্থ্য মন্ত্রী ডা. রুহুল হক ও জামায়াতের বর্তমান জেলা আমীর দক্ষিণ বঙ্গের অন্যতম আলেম মুফতি রবিউল বাশারকে ঘিরে ভোটারদের মাঝে জানার আগ্রহ বেড়েছে। বিগত ৫টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসনটিতে জামায়াত দু’বার, আ’লীগ দ’ুবার ও জাতীয় পাটি একবার জয়লাভ করেন। ২০০১ ও ১৯৯৫ সালের জাতীয় নির্বাচনে জামায়াত, ২০০৮ ও ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আ’লীগ এবং ১৯৯৮ সালে জাতীয় পাটির স্বতন্ত্র প্রার্থী জয়লাভ করেন। বর্তমানে আশাশুনি উপজেলাতে জামায়াত মনোনিত ভাইস চেয়ারম্যান পুরুষ ও বিএনপি মনোনিত মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান । এছাড়া কয়েকটি কেন্দ্র দখল ও জামায়াত মনোনিত প্রার্থীকে মারপিট করে সামান্য ভোটে বিজয় ছিনিয়ে নেয় উপজেলা চেয়ারম্যানের পদটি।
বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের সময়ে আসনটি থেকে ডা. রুহুল হক বিপুল পরিমানে অর্থসম্পদের মালিক হয়েছেন বলে এলাকা বাসির জ্ঞাত। অন্য দিকে আসন টিতে সাবেক দুবারের জামায়াত মনোনিত এমপি এমন রিয়াছাত আলীর জনপ্রিয়তা রয়েছে ঈর্ষান্বিত। যার কারণে বিগত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে তার ছেলে নুরুল আফসার উপজেলাটিতে বিপুল ভোট পান। সেই আসনটিতে এবারের নির্বাচনে লড়ছেন বর্তমান কর্ণধার জামায়াতের বর্তমান জেলা আমীর মুফতি রবিউল বাশার। তিনি ক্লিনইমেজ ও সাদা-সিধে জীবন যাপনে অভ্যস্ত। যে কারণে তিনি ভোটাদের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়। আসনটিতে ২০ দল মনোনিত প্রার্থী তিনি। ধানের শীষ নিয়ে তিনি লড়বেন। নির্বাচনি পরিবেশ সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয় জামায়াতের এ নেতার কাছে। তিনি জানান, নির্বাচনি পরিবেশ বলার মত কিছু নেই। প্রতিদিন তার দলের নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। মারপিট ও হয়রানি করা হচ্ছে। পুলিশ ও সরকার দলীয় বাহিনী তার দলের নেতাকর্মীদের কাছ থেকে গ্রেফতার বাণিজ্য করছে। প্রতিরাতে নেতাকর্মীদেও বাড়ি বাড়ি তল্লাশি করা হচ্ছে। বিএনপি ও জামায়াতের সক্রিয় সদস্যরা বাড়িতে থাকতে পারছে না। এর পরও জনগণ ভোট দিতে ইচ্ছুক। তার দাবী গ্রেফতার ও হয়রাণি বন্ধ করে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনি পরিবেশ তৈরি করা দরকার। যাতে ভোটারা নির্ভয়ে ভোট কেন্দ্রে যেয়ে ভোট দিয়ে আসতে পারে।
আশাশুনি, দেবহাটা ও কালিগঞ্জের আংশিক নিয়ে গঠিত সাতক্ষীরা-৩ আসন। তিনটি উপজেলার ২০টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই আসন। এই আসনটিতে মোট ভোটার ৩ লক্ষ ৮৭ হাজার ৩৩৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লক্ষ ৯৫ হাজার ৫১৮ জন ও নারী ভোটার ১ লক্ষ ৯১ হাজার ৮২০ জন। আশাশুনি উপজেলায় পুরুষ ভোটার বেড়েছে ১০ হাজার ৫৭৫ জন ও নারী ভোটার বেড়েছে ৯ হাজার ৬৭৫ জন। দেবহাটা উপজেলায় পুরুষ ভোটার বেড়েছে ৫ হাজার ৫৮০ জন ও নারী ভোটার বেড়েছে ৫ হাজার ৭৫৭ জন। কালিগঞ্জ উপজেলায় পুরুষ ভোটার বেড়েছে ১৩ হাজার ৪৯৩ জন ও নারী ভোটার বেড়েছে ১২ হাজার ৫৬৮ জন।
এরমধ্যে আশাশুনি উপজেলার ১১টি ইউনিয়নে ভোটার রয়েছে ২ লাখ ১২ হাজার ৫১৬ জন। দেবহাটার ৫টি ইউনিয়নে ৯৭ হাজার ৮২৮ জন এবং কালিগঞ্জের ৪টি ইউনিয়নে ভোটার আছেন ৭৬ হাজার ৯৪৬ জন।
অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত আসনটি শুধুমাত্র আশাশুনি উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত ছিল। নবম সংসদ নির্বাচন থেকে আশাশুনি উপজেলার সাথে দেবহাটা উপজেলা এবং কালিগঞ্জেরও ৪টি ইউনিয়ন যুক্ত করা হয়েছে। সাবেক এবং বর্তমান সাতক্ষীরা-৩ আসনে বিগত ১০টি নির্বাচনের ৪টিতে আওয়ামী লীগ, দুই বার জামায়াত, জাতীয় পাটি, মুসলিম লীগ ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা একবার করে নির্বাচিত হয়েছেন। বর্তমানে আসনটিতে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. আ. ফ. ম রুহুল হক দশম সংসদ নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দীতায় নির্বাচিত হন।
২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে ১ লাখ ৪২ হাজার ৭০৯ ভোট পেয়ে ডা. রুহুল হক প্রথমবারের মত নির্বাচিত হন। ওই নির্বাচনে জামায়তের প্রার্থী মাও. রিয়াসাত আলী ১ লাখ ৩৪ হাজার ৩৫২ ভোট পান।
এর আগে ২০০১ সালের ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শুধুমাত্র আশাশুনি উপজেলা নিয়ে গঠিত সাতক্ষীরা-৩ আসনে জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা রিয়াসাত আলী ৭৩ হাজার ৫৭৭ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগের প্রার্থী ডা. মোখলেছুর রহমান পান ৫৬ হাজার ৯৮২ ভোট।
১৯৯৬ সালের ১২ জুন অনুষ্ঠিত সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আশাশুনি থেকে ৩৯ হাজার ৭২২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের ডা. মোখলেছুর রহমান। সেই লুপটের নির্বাচনে জামাতের প্রার্থী মাওলানা রিয়াছাত আলী ২৩ হাজার ৪৬২ ভোট ও বিএনপির অধ্যক্ষ আলী আহমেদ ৬ হাজার ৪৫৯ ভোট পান।
এর আগে ১৫ ফেব্রুয়ারী ১৯৯৬ সকল দলের বর্জনের মধ্যদিয়ে অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অধ্যক্ষ আলী আহমেদ নির্বাচিত হন।
১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আশাশুনিতে ৩১ হাজার ৬৩১ ভোট পেয়ে জামাতের প্রার্থী মাওলানা রিয়াছাত আলী নির্বাচিত হন। ঐ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের হাফিজুর রহমান ২৯ হাজার ৬৮০ ভোট, জাতীয় পাটির এড. স. ম সালাউদ্দিন ১২ হাজার ৪৯৫ ভোট এবং বিএনপির আব্দুল হালিম পেয়েছিলেন ২ হাজার ৫৩২ ভোট। ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চ অনুষ্ঠিত একদলীয় চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পাটির এড. স. ম সালাউদ্দিন নির্বাচিত হন।
এরপূর্বে ১৯৮৬ সালের ৭ মে অনুষ্ঠিত তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে এড. স. ম সালাউদ্দিন ২২ হাজার ৪৬৩ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন।সেই নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা রিয়াছাত আলী ১৮ হাজার ৪০০ ভোট, আওয়ামী লীগের এসএম রুহুল আমিন ১৭ হাজার ৭৩৪ ভোট এবং বিএনপির কার্তিক চন্দ্র দাস পান ১১ হাজার ৪৬৫ ভোট।
১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আশাশুনি থেকে মুসলিম লীগের এড. আওসাফুর রহমান ১৫ হাজার ৩২৭ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। এই নির্বাচনে বিএনপির বিডি চৌধুরী ১৪ হাজার ৪৮৫ ভোট, জাসদের কার্তিক চন্দ্র মন্ডল ১২ হাজার ৪২৭ ভোট, আওয়ামী লীগের আব্দুল মজিদ ৯ হাজার ১২২ ভোট পান। এ নির্বাচনে জামায়াত অংশ গ্রহণ করেনি।
১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের এসএম নওয়াব আলী ৩২ হাজার ৯৭৩ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। ওই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী কার্তিক চন্দ্র মন্ডল ১২ হাজার ৭৯৭ ভোট এবং ন্যাপের কেএমএ লতিফ পান ১৪ হাজার ৮৪৮ ভোট। এ নির্বাচনেও জামায়াত অংশ গ্রহণ করেনি।
২০১৩ সালের ক্ষমতাসীন সরকারের লুটপাটের নির্বাচনেও আসটির বিভিন্ন উপজেলা ও ইউিিনয়ন পরিষদ নির্বাচনে জামায়াতের প্রাথীরা বিপুল ভোটে নির্বাচিত হন। দেবহাটায় পাঁচটির মধ্যে আওয়ামী লীগের একজন ও জামায়াতের চারজন চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। কালীগঞ্জে ১২টি ইউনিয়নের মধ্যে জামায়াত-বিএনপির নয়জন এবং আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির তিনজন চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। শ্যামনগর উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের মধ্যে ১০ জন জামায়াত-বিএনপি ও দুজন আওয়ামী লীগের সমর্থক চেয়ারম্যান রয়েছেন। আশাশুনিতে ১২টি ইউনিয়নের মধ্যে আটটিতে আওয়ামী লীগ এবং বাকি চারটিতে জামায়াতের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। প্রার্থীদের দাবী লুটপাটের ভোট না হলে সবকটিতে বিএনপি জামায়াতের প্রার্থীরা জয়ী হতেন।
বিগত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আসনটি থেকে জামায়াতের প্রার্থী নূরুল আফসার ৫১ হাজার সাড়ে ৫শ, বিএনপির প্রার্থী ১৮ হাজার এবং আ’লীগের প্রার্থী কয়েকটি কেন্দ্র দখল ্ও জোর করে সিল মেরে ভোট কাটার পরও প্রায় ৫২ হাজার ভোট পেয়ে উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।

আসনটিতে জামায়াত মনোনিত প্রার্থীর নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সচিব মাওলানা নুরুল আফছার জানান, ভোটের ও জোটের সমীকরণে আসনটিতে জামায়াতের বিকল্প নেই। আসনটিতে জামায়াতের যথেষ্ট কর্মী বাহিনি রয়েছে। নিরপেক্ষ ভোট হলে আসনটি ২০ দলীয় জোটের ঘরে উঠবে বলে তার ধারণা।
অন্যদিকে আ’লীগরে বর্তমান এমপি সবেক স্বাস্থ্য মন্ত্রী ডা. রুহুল হক বলেন,তার সময়ে শুধু আশাশুনিতে নয় গোটা সাতক্ষীরা জেলাতে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। তার দাবি স্বাধীনতার পর থেকে এ জেলাতে এত বেশি উন্নয়ন আর কেউ করতে পারিনি। সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ,সদর হাসপাতালের উন্নয়ন,বিনেপোতায় টিটিসি কলেজ,শিক্ষা প্রতিষ্ঠান,স্বাস্থ্য সেবা,বিদ্যুৎ সহ নানা বিষয়ে তার সরকার উন্নয়নের নজির স্থাপন করেছে। যে কারণে সাতক্ষীরা ৩-আসনের মানুষ তাকে চাই এবং আগামি নির্বাচনে তাকে বিপুল ভোটে জয়যুক্ত করবেন।

Facebook Comments
Please follow and like us: