পাটের দাম নিয়ে শঙ্কায় সাতক্ষীরার হাজারো চাষি : হ্রাস পেয়েছে পাটের আবাদ

আবু সাইদ বিশ্বাস:সাতক্ষীরা: শ্রাবণের ঝরা বৃষ্টি ও ভাদ্র মাসের শুরুতে খেত থেকে পাট তুলে সেই পাট পচিয়ে আগে ভাগে ঘরে তুলতে চান সাতক্ষীরার কৃষকরা। এজন্য পাট কেটে জাগ দিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা। তবে উৎপাদন খরচের সঙ্গে বাজারমূল্যের অসমতার কারণে শঙ্কায় রয়েছেন চাষীরা। দুই বছর আগেও সোনালি আঁশের ফলন ও দাম দুটোই ছিল তুলনা মূলক ভাল। কিন্তু চলতি বছরে সরকারের পাটকলগুলো বন্ধ থাকায় পাট বিক্রি নিয়ে বেকায়দায় পড়তে পারে এমন দুশ্চিন্তায় আছে জেলার হাজারো কৃষক। মৌসুমের শুরুতে প্রয়োজনীয় বৃষ্টিপাত না হওয়ায় গতবছরের চেয়ে এবছর জেলাতে ৭৩০ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ কম হয়েছে। আবার মৌসুমের শেষের দিকে অধীক বৃষ্টিপাতের কারণে অনেকের খেতে পাটের গোড়ায় পঁচন ধরেছে। এর পরও উৎপাদনের লক্ষ্য মাত্রা ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছেন জেলা কৃষি বিভাগ। পাটকল চালু হলে কৃষকরা ভাল দাম পাবেন বলছে জেলা কৃষি উপরিচালক।
সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী জানা গেছে, চলতি ২০২০-২১ মৌসুমে জেলার সাতটির মধ্যে ছয়টি উপজেলাতে পাট উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৩৮ হাজার বেল। এরমধ্যে সাতক্ষীরা সদরে ৫৭ হাজার বেল, কলারোয়ায় ৪২ হাজার বেল, তালায় ৩৫ হাজার ৪শ বেল, দেবহাটায় ১০২০ বেল, কালিগঞ্জে ১৬২০ বেল ও আশাশুনিতে ৯০০ বেল এবং শ্যামনগরে ৬০ বেল। ২০১৯-২০ মৌসুমে জেলাতে এক লাখ ৩৭ হাজার ৬২৪ বেল পাট উৎপাদিত হয়।
চলতি মৌসুমে জেলাতে পাটের আবাদ হয়েছে ১১ হাজার ৫শ হেক্টর জমিতে। এরমধ্যে সাতক্ষীরা সদরে ৪ হাজার ৭৫০হেক্টর, কলরোয়ায় ৩ হাজার ৫০০ হেক্টর, তালায় ২ হাজার ৯৫০ হেক্টর, দেবহাটায় ৮৫ হেক্টর, কালিগঞ্জে ১৩৫ হেক্টর, আশাশুনিতে৭৫ হেক্টর ও শ্যামনগরে ৫হেক্টও জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। গত বছরের তুলনায় ৭৩০ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হ্রাস পেয়েছে। এরপরও ৩৭৬ বেল পাটের উৎপাদন বেশি ধরা হয়েছে। কৃষি বিভাগের দাবী বিগত বছরের তুলনায় চলতি মৌসুমে উৎপাদনের মান ভাল। চলতি মৌসুমে জেলা কৃষি বিভাগ হেক্টর প্রতি ১২ বেল পাট উৎপাদন হবে ধারণা করছেন।

সরেজমিন সাতক্ষীরা সদর উপজেলার, ব্যাংকদহা,শিবপুর,আগরদাড়ি,ঝাওডাঙ্গা,বল্লি ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামে গিয়ে দেখা গেল দিগন্তজোড়া পাট। দেখে মনে হয়, সবুজের গালিচা বিছিয়ে রাখা হয়েছে।
কয়েকজন পাট চাষির সাথে কথা হয়। তারা জানান, এক বিঘা জমিতে পাট চাষ করতে একজন কৃষকের ব্যয় হয় ৯ হতে ১০ হাজার টাকা। অথচ এক বিঘা জমিতে ভালো আবাদ হলে পাট পাওয়া যায় আট মণ। গতবার উঠতি বাজারে মণপ্রতি ১১শ’-১২শ’ টাকায় বিক্রি হয়েছে। এতে কৃষককে বিঘাপ্রতি এক হাজার থেকে ১২শ’ টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হয়েছে। এবছর সরকারী পাটগুলো বন্ধ করে দেয়ায় লোকসানের পরিমাণ বাড়তে পারে বলে চাষীদের শঙ্কা।

তালা উপজেলার ধানদিয়া,নগরঘাটা,ইসলামকাটি,সরুলিয়া ও খলিষখালি ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে মাঠের পর মাঠ পাট খেত যেন সোনালি আঁশে দোল খাচ্ছে। কৃষকের স্বপ্ন এখন পাট খেতে।
কপতাক্ষ নদসংলগ্ন পাটকেলঘাটা থেকে ইসলামকাটি সড়কের দুধারে উপড়ে ফেলা পাট দেখা যায়। চাষীরা জানান,অধিক বৃষ্টির কারণে খেতে পানি জমে থাকায় পাটে গোড়া পঁচে গেছে। পাট লম্বা হচ্ছে না। তাই তারা পাট খেত পরিষ্কার করে আমন ধানের আবাদ করবে।

ঝুসখোলা গ্রামের পাটচাষী আব্বাস জানান, সময়মত বৃষ্টি না হওয়া ও পরে অধীক বৃষ্টি পাতের কারণে তালা অঞ্চলে এবার ভাল পাট হয়নি। এছাড়া পাট খেতে পচে যাচ্ছে।
পাটকেলঘাটার পাইকারি ক্রেতা রফিকুল ইসলাম জানান, পাট এখনো বাজারে উঠতে শুরু করেনি। পাট উঠলে বোঝা যাবে দাম কেমন হবে। সরকারি পাটকলগুলো বন্ধ। তবে পাটের দাম বলা যাচ্ছে না কেমন হবে।
তালা উপজেলা কৃষি অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) শুভ্রাংশু শেখর দাশ বলেন, এ বছর মৌসুমের শুরুতে বৃষ্টি কম হওয়ায় তালায় পাটের আবাদ লক্ষ্য মাত্রার চেয়ে কিছুটা কম হয়েছে। তবে, কৃৃষকদের করণীয় সম্পর্কে তারা নিয়মিত পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন।

সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-বাদল চন্দ্র বিশ্বাস জানান, উপকুলীয় জেলা সাতক্ষীরা অঞ্চলে পাট চাষ বাড়ছে। এ এলাকার কৃষকরা অন্যান্য ফসলের পাশাপাশি কম বেশি পাট চাষ করে থাকে। তিনি বলেন, বন্ধ করে দেয়া পাটকল গুলো বেসরকারী ভাবে চালু হলে চাষীর পাটের উপযুক্ত দাম পাবে।

পার্শবর্তি দেশ ভারতে পাটের দাম তুলনা মূলক বেশি থাকায় সাতক্ষীরা নসীমান্ত দিয়ে পাট পাচারের আশঙ্কা করছে সংশ্লিষ্টরা।

সোনালি আঁশের সুদিন ফিরে আসুক, ন্যার্য দাম পাক চাষীরা এমনটায় কামনা করছেন এ অঞ্চলের হাজার হাজার পাটচাষী।

Check Also

প্রতাপনগ ইউপি চেয়ারম্যান জাকিরের বিরুদ্ধে মহালুটপাটের অভিযোগ

আশাশুনি প্রতিনিধি:   সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে বইয়ের পাতা ছিঁড়ে বয়স্ক, …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *