শ্রীলঙ্কার চাটুকারিতা সাংবাদিকরা গণধোলায়ের শিকার

শ্রীলঙ্কায় দেশব্যাপী রাজপথ জুড়ে চরম উত্তেজনার আঁচ লেগেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও। অনেকেই অনেক রকম খবর ফেসবুক, টুইটারে প্রচার করছেন। সেগুলোর মধ্য থেকে অনেকগুলো আবার ভাইরাল হয়ে পড়েছে। তেমনি একটি হলো শ্রীলঙ্কার সরকারপন্থী জনৈক ‘সাংবাদিকের’ কয়েকটি ছবি। সুস্বাস্থ্যের অধিকারী তথাকথিত ওই সাংবাদিককে শ্রীলঙ্কার সদ্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দ রাজাপাকসে সহ ক্ষমতাধর অনেকের সাথেই ঘনিষ্ঠভাবে বিভিন্ন ছবিতে দেখা যাচ্ছে। আবার ওই সাংবাদিকেরই মার খাওয়া অর্ধ নগ্ন ছবি ভাইরাল হয়ে পড়েছে। নেটিজেনদের মধ্যে যারা এসব ছবি শেয়ার করছেন তাদের দাবি ওই সাংবাদিকের সাথে সরকারের উচ্চ পদে আসীন ব্যক্তিদের ছিল সুসম্পর্ক। প্রকৃত সাংবাদিকতা বাদ দিয়ে তিনি তাদের তোষামোদিতেই ব্যস্ত থাকতেন। তাই সুযোগ বুঝে জনগণ রাজপথে পেয়ে তাকে আচ্ছামত গণধোলাই দিয়েছে। ঘটনার সত্যতা যাচাই করা সম্ভব না হলেও তা নিয়ে মজা করতে ছাড়ছেন না বেশিরভাগ মানুষ।

অনু মোস্তফা নামে একজন তার বিভিন্ন ছবি পোস্ট করে টুইট করেছেন, “সাংবাদিকরা জাতির বিবেক হিসেবেই পরিচিত

আবার তারাই নেতাকে স্বৈরাচারী করে তোলে। শ্রীলঙ্কার এই অসহায়-নিরুপায় সাংবাদিকের অবস্থা দেখুন। রাজা দেশ ছেড়ে পালাতে সক্ষম হলেও সাংবাদিক পালাতে পারে নি। মার খেয়ে তার অবস্থা হাইব্রিড আলুর মতো হয়ে গেছে।” বি রানাতুঙ্গা নামে একজন লিখেছেন, “শ্রীলঙ্কার জনগণ, সেইসব সাংবাদিকদের মারধর করেছে যারা নিয়মিতভাবে ভুয়া খবর ছড়ায়, জনমতের মেরুকরণের জন্য অপপ্রচার চালায় এবং ইচ্ছাকৃতভাবে জনগণকে ভুল পথে নিতে বিভ্রান্ত করে।”

ওই সংবাদিকের ছবিগুলো নিয়ে মজা করার পাশাপশি নেটিজেনদের অনেকেই শ্রীলঙ্কার সব সাংবাদিকদের ‘সরকারের দালাল’ বলে আখ্যা দিচ্ছেন। শ্রীলঙ্কার অনেক সাংবাদিক সরকারের আজ্ঞাবহ হিসেবে কাজ করলেও অন্তত সব সাংবাদিকই যে তেমন নন, সেটি বোঝা যায় নানা ঘটনাপ্রবাহে।

মাস দুয়েক আগেই শ্রীলঙ্কায় চামুদিথা সমরবিক্রমা নামে সরকারের সমালোচক এক হাই-প্রোফাইল টিভি সাংবাদিকের বাড়িতে সশস্ত্র হামলা চালানো হয়। ওই হামলার ঠিক আগেই তিনি এক সম্প্রচারে ক্ষমতাসীন রাজাপাকসে পরিবার এবং তাদের মিত্রদের সমালোচনা করেছিলেন। হামলাটি তাহলে কারা চালয়েছিল তা সহজেই অনুমেয়। ওই হামলার পর স্থানীয় গণমাধ্যম অধিকার বিষয়ক সংগঠম ফ্রি মিডিয়া মুভমেন্ট বলেছিল, “এই হামলা সাম্প্রতিক সময়ে শ্রীলঙ্কায় সাংবাদিকরা যে কী রকম বিপজ্জনক পরিবেশে কাজ করছে সেটাই দেখিয়ে দিলো।”

গত বছর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছিল, “শ্রীলঙ্কার গণমাধ্যম খুব বেশি মাত্রায় সেল্ফ-সেন্সরশিপের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। সম্ভবত সাম্প্রতিককালে নানাবিধ ভীতি প্রদর্শনের সাথে তাদের ভয়ঙ্কর পরিচিতি হয়েছে বলেই তারা এমনটা করছে। শেষবার যখন এই রাজাপাকসে পরিবার ক্ষমতায় ছিল, তখন দমন-পীড়নের শিকার হওয়ার ক্ষেত্রে সাংবাদিকরাই সামনের সারিতে ছিল।”

সদ্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দ রাজাপাকসে যখন শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট ছিলেন তখন তার ভাই ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট গোটাবাইয়া রাজাপাকসে প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ছিলেন। পরবর্তীকালে শ্রীলঙ্কার অপরাধ তদন্তকারীরা অভিযোগ করেন যে ওই দায়িত্ব পালনকালে গোটাবাইয়া রাজাপাকসে সাংবাদিকদের উপর হামলা করার জন্য সামরিক ডেথ স্কোয়াড পরিচালনা করেছিলেন।

বিরোধীদের অভিযোগ, ২০০৫ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত এক দশক মাহিন্দ রাজাপাকসে প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন গণমাধ্যমের উপর পরিকল্পিতভাবেই আক্রমণে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। গণমাধ্যমের স্বাধীনতার পক্ষে সক্রিয় আন্তর্জাতিক সংগঠন “রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স” এর মতে, ওই এক দশকে অন্তত ১৪ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছিলেন। বাকিদেরও হুমকি, অপহরণ ও নির্যাতনের মধ্যে রাখা হয়েছিল। তামিল সাংবাদিকরা অস্বাভাবিকভাবে হামলার শিকার হয়েছিলেন। যেসব দেশে সাংবাদিকদের হত্যা করা হয় এবং তাদের খুনিরা ছাড়া পেয়ে যায়- এমন এক সূচকে ২০১৪ সালে শ্রীলঙ্কা সারা বিশ্বের মধ্যে চতুর্থ অবস্থানে ছিল।

২০১৫ সালে রাজাপাকসে সরকার পরাজিত হলে সাংবাদিকরা ফের ভয়ভীতি ছাড়া লেখালেখি শরু করেন। দুর্নীতি এবং সাংবাদিক নির্যাতনের কারণে গোটাবাইয়া দোষী সাব্যস্ত হন। কিন্তু পুনরায় রাজাপাকসেরা ক্ষমতায় ফিরে এলে ২০১৯ সালে তাকে এ সংক্রান্ত সমস্ত অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এতে সাংবাদিকরা ঘাবড়ে যান। ফের গণমাধ্যমে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম হয়।

হামলা আর হয়রানির কারণে সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের উপর ব্যাপক প্রভাব পড়েছিল। কলম্বোভিত্তিক ব্যবসায়ী এবং সমাজ সেবক নিশান রাজকুর্ণ বরাবরই রাজাপাকসে সরকারের তীব্র সমালোচক। তিনি মানবজমিনকে বলেন, “ভয় এমন এক জিনিস যা আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ে। ভয় আমাদের সাংবাদিকতাকে প্রভাবিত করে। আমরা নির্দিষ্ট লাইনের মধ্যে লিখতে শিখেছি, কিছু না বলতে শিখেছি। ক্ষমতার বিপরীতে সত্য কথা বলাই সাংবাদিকতার কাজ হলেও যতবারই সাংবাদিকের ওপর হামলা হয় এবং অপরাধীরা মুক্ত হয়ে যায়, ততবারই স্বাধীন রিপোর্টিংয়ের সুযোগ সঙ্কুচিত হয়।”

তবে, শ্রীলঙ্কায় চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভে নানা প্রতিবন্ধকতা থাকা স্বত্ত্বেও অনেকভাবেই সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে দেশটির গণমাধ্যম। সরকারবিরোধী বিক্ষোভগুলোর খবর এবং তাদের দাবি-দাওয়া ফলাও করে প্রচার করছে সংবাদপত্র। নিশান যেমনটি বলছিলেন, “একটা সময় শ্রীলঙ্কার সাংবাদিকদের ছিল একটাই চাওয়া, আর তা হলো কোনরকমভাবে বেঁচে থাকা। কিন্তু, এখন সেই পরিস্থিতি আর নেই। মানুষ রাজপথে নেমে গেছে। সাংবাদিকরাও নিজেদের জায়গা থেকে যথাসাধ্য চেষ্টা করছেন।”

Check Also

আলেম-ওলামাদের বিরুদ্ধে অবস্থান মূলত ইসলাম ও দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া : ড. মাসুদ

ষিতে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান এবং পরে বেগম খালেদা জিয়া ছাড়া অন্য কেউ ভূমিকা রাখেননি …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

***২০১৩-২০২১*** © ক্রাইমবার্তা ডট কম সকল অধিকার সংরক্ষিত।