হুসাইন বিন আফতাব :উত্তরীয় বরফশীতল বাতাস আর ঘন কুয়াশার দাপটে কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা। কনকনে শীতের হিমেল হাওয়ায় কাঁপছে প্রকৃতি, কাঁপছে মানুষের জীবন-জীবিকা। গত দুই দিন ধরে সূর্যের দেখা নেই। দিগন্তজুড়ে কুয়াশার সাদা চাদরে ঢাকা পড়েছে জনপদ। এই হাড়কাঁপানো শীতের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছেন জেলার নিম্ন আয়ের, শ্রমজীবী ও ছিন্নমূল মানুষ।
আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, সোমবার ভোরে সাতক্ষীরায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বাতাসের আর্দ্রতা ৯৫ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ায় শীতের তীব্রতা অনুভূত হচ্ছে আরও বেশি। ঘন কুয়াশার কারণে সকাল থেকেই দৃষ্টিসীমা কমে আসায় মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কগুলোতে যানবাহনকে হেডলাইট জ্বালিয়ে চলতে হচ্ছে।
শীতের এই চরম অবস্থায় স্বাভাবিক জনজীবন প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। খুব প্রয়োজন ছাড়া মানুষ ঘর থেকে বের হচ্ছে না। শহর ও গ্রামাঞ্চলে দেখা গেছে, মোড়ে মোড়ে ও খোলা জায়গায় খড়কুটো, শুকনো লতাপাতা ও পরিত্যক্ত কাঠ জ্বালিয়ে আগুন পোহাচ্ছেন ছিন্নমূল মানুষ। আদিম এই আগুনের উত্তাপই যেন তাদের জীবনের শেষ ভরসা।
প্রকৃতির এই রূপ কারও কাছে রোমাঞ্চকর হলেও খেটে খাওয়া মানুষের কাছে তা হয়ে উঠেছে চরম বিপর্যয়। তীব্র শীতে হাত-পা অবশ হয়ে আসায় কাজে বের হতে পারছেন না অনেক দিনমজুর ও রিকশাচালক। যারা পেটের তাগিদে বের হচ্ছেন, তাদের দুর্ভোগ আরও বেশি। সাতক্ষীরা শহরের এক ভ্যানচালক বলেন, “হাত-পা জমে কাঠ হয়ে যাচ্ছে। কুয়াশায় সামনে কিছুই দেখা যায় না। এই অবস্থায় ভ্যান চালানো খুবই কষ্টের।”
শ্যামনগরের ভেটখালী বাজারে কাজের অপেক্ষায় থাকা দিনমজুর মনিরুল ইসলাম জানান, “দুই দিন ধরে রোদ নেই। কনকনে বাতাসে শরীর শক্ত হয়ে যাচ্ছে। তবুও কাজ না করলে সংসার চলবে না।” একই অভিযোগ ভ্যানচালক ও পরিবহন শ্রমিকদেরও। রোদ না ওঠায় যাত্রীর সংখ্যাও কমে গেছে, আয়-রোজগার মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
তীব্র শীতের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে ঠান্ডাজনিত রোগের প্রকোপ। সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগীর চাপ বেড়েছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, শিশুদের নিউমোনিয়া, সর্দি-জ্বর ও ডায়রিয়া এবং বয়স্কদের শ্বাসকষ্ট ও অ্যাজমার সমস্যা বেশি দেখা দিচ্ছে। শয্যা সংকটের কারণে অনেক রোগীকে মেঝেতেই চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের চিকিৎসক রিয়াদ হাসান বলেন, “এই আবহাওয়ায় শিশু ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে। শীত থেকে বাঁচতে গরম কাপড় ব্যবহার, ভোর ও রাতের ঠান্ডা এড়িয়ে চলা এবং আগুন পোহানোর সময় সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।”
শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক সুমন রায় জানিয়েছেন, প্রচন্ড ঠান্ডায় সর্দি কাশি শ্বাসকষ্ট সহ নানা ধরনের অসুস্থতা নিয়ে হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। তিনি আরো বলেন, এই শীতে বিশেষ করে বৃদ্ধ ও শিশুদের সাবধানতা অবলম্বন খুব জরুরী।
শীতের এই হাহাকারের মধ্যেই কিছুটা স্বস্তি নিয়ে পাশে দাঁড়াচ্ছে প্রশাসন। সম্প্রতি গভীর রাতে শ্যামনগর উপজেলার ঈশ্বরীপুর ও ভুরুলিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় শীতবস্ত্র বিতরণ করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামছুজ্জাহান কনক। খানপুর বাসস্ট্যান্ডের ছিন্নমূল মানুষ এবং ধুমঘাট জামিয়া ইসলামিয়া রশিদীয়া হুসাইনাবাদ মাদ্রাসার এতিম শিক্ষার্থীদের হাতে কম্বল তুলে দেন তিনি। এ সময় সহকারী কমিশনার (ভূমি) রাশেদ হোসাইনসহ প্রশাসনের অন্যান্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এছাড়াও জেলার বিভিন্ন উপজেলায় প্রসাশনের পক্ষ থেকে শীতবস্ত্র বিতরণ সহ নানান কর্মসূচি বাস্তবায়ন হচ্ছে।
শ্যামনগরের ইউএনও শামছুজ্জাহান কনক বলেন, “তীব্র শীতে নিম্ন আয়ের মানুষ ও শিশুরা চরম কষ্টে আছে। সরকারের পক্ষ থেকে শীতবস্ত্র বিতরণ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।”
জেলা প্রশাসনের মিডিয়া সেল জানিয়েছে, সাতক্ষীরার সব উপজেলাতেই হতদরিদ্র ও ছিন্নমূল মানুষের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তাপমাত্রা আরও কমলে এই কার্যক্রম জোরদার করা হবে।
আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, জানুয়ারি মাসজুড়েই কুয়াশা ও শীতের এমন পরিস্থিতি অব্যাহত থাকতে পারে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে তাপমাত্রা আরও কমার আশঙ্কা রয়েছে।
শীতের এই ধূসর দিনগুলো হয়তো কেটে যাবে। কুয়াশা সরে রোদ উঠবে। কিন্তু ততক্ষণ পর্যন্ত আগুনের সামান্য উত্তাপ আর একটি কম্বলই সাতক্ষীরার প্রান্তিক মানুষের বেঁচে থাকার স্বপ্ন জিইয়ে রাখছে। সমাজের বিত্তবান ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো এগিয়ে এলে এই হাড়কাঁপানো শীত হয়তো আর কারও জন্য অসহনীয় হয়ে উঠবে না। এমনটা প্রত্যাশা সাতক্ষীরার সাধারণ জনমানুষের।
ক্রাইম বার্তা