সাতক্ষীরায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে সূর্যমুখী চাষ : আবাদ বেড়েছে দ্বিগুণ

আবু সাইদ বিশ্বাস, সাতক্ষীরাঃ উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরায় ভোজ্যতেলের চাহিদা পূরণে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে সূর্যমুখী চাষ। সোনালী রোদে ঝলমল করা বিস্তীর্ণ মাঠ জুড়ে এখন শুধুই হলুদ রঙের সমারোহ, যা দেখে মনে হয় যেন প্রকৃতি নিজেই হাসছে। কম খরচে অধিক লাভ এবং তেলের বাজারে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে জেলার লবণাক্ত পতিত জমি ও নিম্ন এলাকায় এই ফসলের আবাদ বদলে দিচ্ছে স্থানীয় কৃষির চিরচেনা চিত্র।
মাঠের এই সৌন্দর্য কেবল কৃষকের চোখে স্বপ্নই বুনছে না, বরং দর্শনার্থীদের কাছেও এক প্রধান আকর্ষণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে প্রকৃতিপ্রেমীরা ভিড় করছেন এই হলুদের রাজ্যে। দর্শনার্থীদের মতে, এই পরিবেশ কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং প্রকৃতির প্রতি মানুষের মমতা ও সচেতনতা বৃদ্ধিতেও সহায়ক ভূমিকা রাখছে। স্থানীয় কৃষকরা জানান, ধান বা গমের তুলনায় সূর্যমুখী চাষে ঝুঁকি অনেক কম। প্রতি বিঘায় মাত্র সাড়ে ৩ হাজার টাকা খরচ করে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা লাভের আশা করছেন তারা।
সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে জানা গেছে, চলতি রবি মৌসুমে সাতক্ষীরার সাতটি উপজেলায় ২২৮ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখী চাষ করা হয়েছে। এর মধ্যে, সাতক্ষীরা সদর উপজেলায় ২৭ হেক্টর, কলারোয়ায় উপজেলায় ২২ হেক্টর, তালা উপজেলায় ৬৩ হেক্টর, দেবহাটা উপজেলায় ৭ হেক্টর, কালিগঞ্জ উপজেলায় ৩৪ হেক্টর, আশাশুনি উপজেলায় ১৫ হেক্টর ও শ্যামনগর উপজেলায় ৬০ হেক্টর। তবে গেল বছর জেলায় এ ফসলটি চাষ হয়েছিল ১০৯ হেক্টর জমিতে। এ হিসাব অনুযায়ী চলতি মৌসুমে জেলায় সুর্যমুখির আবাদ বেড়েছে ১১৯ হেক্টর পরিমান।

সরুলিয়া ইউনিয়নের ভারশা গ্রামে ও উপজেলার বিভিন্ন সূর্যমুখী চাষ করা জমিতে গিয়ে দেখা যায়, ফুটে থাকা সূর্যমুখী ফুলের সমাহারে এক নয়নাভিরাম দৃশ্যের অবতারণা হয়েছে। চারদিকে হলুদ রঙের ফুলের মনমাতানো ঘ্রাণ আর মৌমাছিরা ছুটছেন এক ফুল থেকে অন্য ফুলে তাতে মুখরিত হয়ে উঠেছে কৃষকের জমি। এটি যেন ফসলি জমি নয়, এ এক দৃষ্টিনন্দন বাগান।

ভারশা গ্রামের সূর্যমুখি চাষি মো: আকবর হোসেন জানান, সূর্যমুখী ফুল চাষের লক্ষ্য নিছক বিনোদন নয়। মূলত ভোজ্যতেল উৎপাদনের মাধ্যমে খাদ্য চাহিদা মেটাতে এ চাষ করা হচ্ছে। তাই অন্যান্য ফসলের চেয়ে সূর্যমুখী চাষে বেশি লাভের প্রত্যাশা অনেক বেশি। তিনি জানান, সূর্যমুখী ফুলের চাষ করলে ফুল থেকে তেল, খৈল ও জ্বালানি পাওয়া যায়। প্রতি কেজি বীজ থেকে কমপক্ষে আধা লিটার তৈল উৎপাদন সম্ভব। প্রতি বিঘা জমিতে ৭ থেকে ১০ মণ বীজ উৎপাদন হয়। তেল উৎপাদন হবে প্রতি বিঘায় ১৪০ থেকে ২০০ লিটার পর্যন্ত। প্রতি লিটার তেলের সর্বনিম্ন বাজার মূল্য ২৫০ টাকা। প্রতি বিঘা জমিতে খরচ হয় সর্বোচ্চ সাড়ে ৩ হাজার টাকা। বর্তমানে বাজারে ভোজ্যতেলের আকাশছোঁয়া দাম হওয়ার কারণে চাহিদা বেড়েছে সরিষা ও সূর্যমুখী তেলের।

সাতক্ষীরা সদর কৃষি কর্মকর্তা মনির জানান, সূর্যমুখী চাষের জন্য কৃষকদের সব ধরনের সহযোগিতা করা হচ্ছে। ‘কৃষকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দিয়ে সার, বীজ সরবরাহ করা হচ্ছে। এই অঞ্চলে সূর্যমুখীর আবাদ ভালো হলে কৃষিক্ষেত্রে তা নতুন দিগন্তের সূচনা করবে।’

সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম জানান, সাতক্ষীরার মাটি সূর্যমুখী চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এই তেলে থাকা লিনোলিক এসিড হৃদরোগীদের জন্য উপকারী হওয়ায় দিন দিন এর চাহিদা বাড়ছে। কৃষি বিভাগ থেকে নিয়মিত পরামর্শ ও উৎসাহ প্রদানের ফলে জেলায় এই অর্থকরী ফসলের আবাদ ভবিষ্যতে আরও বৃদ্ধি পাবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

আবু সাইদ বিশ্বাস
সাতক্ষীরা
২৮/২/২৬
০১৭১২৩৩৩২৯৯

 

About news-admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *