আবু সাইদ বিশ্বাস: সমালোচনার মুখে সাতক্ষীরার ৪টি আসনে প্রধানমন্ত্রীর ঈদ উপহার পাচ্ছেন ২ হাজার ৮শ নারী। রোববার (১৫ মার্চ) বিষয়টি নিশ্চিত করে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ঈদ উপহার বিরোধী দল ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের নির্বাচনী এলাকায় বরাদ্দ দেওয়া হবে। সব সংসদীয় এলাকায় প্রধানমন্ত্রীর ঈদ উপহার পাবেন। ইতোমধ্যে সাতক্ষীরা ১,২,৩, ও ৪ আসনে পৃথক ভাবে ৭০০ পিস করে সিনথেটিক কাপড় বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে সেগুলো সাতক্ষীরা জেলাতে এসে পৌঁছালে বন্টন করা হবে বলে সংসদীয় আসনের সংসদ সদস্যরা জানান। এদিকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কে ধন্যবাদ জানিয়ে সাতক্ষীরা ১ তালা কলারোয়া আসনের সংসদ সদস্য মুহা: ইজ্জত উল্লাহ (১৫ মার্চ) তার ফেসবুকে লেখেন, “সমালোচনার পর হলেও বাকি আসনগুলোতেও আসন্ন ঈদ উল ফিতর- ২০২৬ উপলক্ষে অসহায় ও দুঃস্থ মানুষের জন্য ত্রাণসামগ্রী দেওয়ার ঘোষণা দেওয়ায় কৃতজ্ঞতা। তবে পূর্বে ঘোষিত আসনগুলোতে শাড়ি, থ্রি-পিস ও রুমালের কথা থাকলেও বাকি আসনগুলোতে শুধুমাত্র শাড়ির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যা কিছুটা বৈষম্যের ইঙ্গিত দেয়। আশা করি ভবিষ্যতে সহায়তা কার্যক্রমে সবার প্রয়োজন সমানভাবে বিবেচনা করা হবে।”
সাতক্ষীরা ৪ আসনে জামায়াতের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম ফেসবুকে লেখেন, “প্রিয় শ্যামনগরবাসী! আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ত্রান তহবিল হতে তার দলীয় এমপিদের ঈদ উপহারস্বরূপ বস্ত্রসহ প্রায় পাঁচ প্রকারের ত্রাণ সামগ্রী প্রদান করেন। এটা অবশ্যই বৈষম্য মূলক আচরণ। বিরোধী এমপিদের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ উঠলে তিনি পুনরায় প্রত্যেক বিরোধী দলীয় এমপিদের জন্য শুধু কেবল ৭০০ পিস করে সিনথেটিক কাপড় বরাদ্দ দেন। সে আলোকে আমাদের শ্যামনগরের জন্য ৭শ’ পিস সিন্থেটিক কাপড় বরাদ্দ পাওয়ার কথা। বিষয়টিআমার শ্যামনগরের জনগণের অবগতির জন্য জানানো হলো। ধন্যবাদ। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর অ্যাসাইনমেন্ট অফিসার-২ এসএম পারভেজ স্বাক্ষরিত একটি বরাদ্দপত্রে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ভাণ্ডার ২১৫ নির্বাচনী এলাকায় ৭০০ করে সিনথেটিক শাড়ি, ১০০ করে থ্রি-পিস ও ৫০টি করে হাজী রুমাল বরাদ্দ প্রদান হয়। ২১৫ নির্বাচনী এলাকা ঘেঁটে দেখা যায়, এসব আসন সরকারি দলের (বিএনপি ও জোট) সংসদ সদস্যদের। এখানে জামায়েত ইসলামী-এনসিপি জোটসহ স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের জন্য এই বরাদ্দ রাখা হয়নি। বরাদ্দপত্রের নির্দেশনায় বলা হয়েছিল- বরাদ্দকৃত ত্রাণসামগ্রী (শাড়ি, থ্রি-পিস ও হাজী রুমাল) সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকগণ, প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ভাণ্ডার, তেজগাঁও, ঢাকা থেকে সংগ্রহপূর্বক নির্বাচনী এলাকার মাননীয় সংসদ সদস্যের পরামর্শক্রমে সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকার অসহায়, গরীব ও দুঃস্থ জনসাধারণের মাঝে বিতরণ ও হিসাব সংরক্ষণ করবেন; বিশেষ পরিস্থিতিতে জেলা প্রশাসকদের পক্ষে ত্রাণসামগ্রী সংগ্রহ করার ক্ষেত্রে বিলম্বের আশঙ্কা থাকলে সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যগণ নিজ দায়িত্বে ত্রাণসামগ্রী প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ভাণ্ডার, তেজগাঁও, ঢাকা হতে তা সংগ্রহপূর্বক সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে বিতরণ করতে পারবেন। এতে প্রধানমন্ত্রীর সদয় সম্মতি রয়েছে বলে এতে উল্লেখ করা হয়।
ঈদুল ফিতর উপলক্ষে দেশের অসহায়, গরিব ও দুস্থ মানুষের জন্য প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ভাণ্ডার থেকে শাড়ি, থ্রি-পিস ও হাজী রুমাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল ২১৫টি সংসদীয় এলাকায়। এই সহায়তা শুধুমাত্র সরকারি দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও তাদের জোটভুক্ত সংসদ সদস্যদের এলাকায় দেওয়া হয়। সংসদের বাকি আসনগুলোতে থাকা জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের নির্বাচনী এলাকায় এ ধরনের কোনো বরাদ্দ না থাকায় বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা ও ক্ষোভ তৈরি হয়।
শনিবার (১৪ মার্চ) সাতক্ষীরার চার এমপি ফেসবুকে ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রতিবাদ জানান। জামায়াত ও এনসিপির সংসদ সদস্যরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে বিষয়টি নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করেন।
সাতক্ষীরা-১ আসনের সংসদ সদস্য বঅধ্যক্ষ মুহা: ইজ্জত উল্লাহ ফেসবুকে লেখেন, প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে শুধুমাত্র সরকার দলীয় এমপি গণের নির্বাচনী এলাকায় ঈদ উপহার হিসেবে কাপড় বরাদ্দ দেওয়া হলেও বিরোধীদলীয় এমপিগণের নির্বাচনী এলাকায় সেই বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। কেন এই বৈষম্য? সরকার কি দেশের জন্য নাকি দলের জন্য?
সাতক্ষীরা-২ আসনের সংসদ সদস্য মুহাদ্দিস আব্দুল খালেক বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ভাণ্ডার থেকে ঈদ উপলক্ষে দরিদ্র অসহায় মানুষদের জন্য কাপড় বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে শুধুমাত্র সরকার-দলীয় এমপিদের নির্বাচনী এলাকায়। প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল মূলত দেশের সকল অসহায় মানুষের জন্য। কিন্তু এমন সিদ্ধান্ত সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে যেমন প্রশ্ন তোলে তেমনি দেশের অন্য সব এলাকার দরিদ্র অসহায় মানুষের সাথে তামাশার শামিল। এর মাধ্যমে দেশে আবারও বৈষম্যের একটি চিত্র ফুটে উঠেছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং লজ্জাজনক। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে গঠিত সরকারের প্রধানমন্ত্রীর কাছে এটি মোটেও প্রত্যাশিত নয়। আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে তার এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের দাবি জানাচ্ছি।
সাতক্ষীরা ৩ আসনের সংসদ সদস্য মুহাদ্দিস রবিউল বাশার বলেন, আমরা কি তাহলে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ এর পরিবর্তে ‘সবার আগে বিএনপি নীতিতে’ যাচ্ছি। স্লোগান কি শুধু রেটরিক? প্রধানমন্ত্রী কি শুধু ৫০% লোকের? আমাদের এলাকার মানুষ মনে হয় ট্যাক্স ভ্যাট দেয় না? জাতি এই বৈষম্য মনে রাখবে।
প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল কোনো দলীয় তহবিল নয় মন্তব্য করে ক্ষোভ প্রকাশ করে সাতক্ষীরা ৪ আসনে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম ফেসবুকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল থেকে ঈদ উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকায় অসহায় ও দুস্থ মানুষের জন্য কাপড় বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে অত্যন্ত দুঃখের সাথে লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, এই বরাদ্দ শুধুমাত্র সরকার-দলীয় সংসদ সদস্যদের নির্বাচনী এলাকায় প্রদান করা হয়েছে; বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের নির্বাচনী এলাকায় এ ধরনের কোনো বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল কোনো দলীয় তহবিল নয়; এটি রাষ্ট্রের একটি মানবিক সহায়তা তহবিল, যা দেশের সকল নাগরিকের কল্যাণে ব্যবহারের জন্য প্রতিষ্ঠিত। সুতরাং এ তহবিল থেকে সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বৈষম্য সৃষ্টি করা সমীচীন নয়। আমরা বিশ্বাস করি, প্রধানমন্ত্রী সমগ্র বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী কোনো নির্দিষ্ট দলের নয়।
দেশের সব জনগণ সমানভাবে রাষ্ট্রের সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার অধিকার রাখে। তিনি আরও লেখেন, প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিভাজন পরিহার করে দেশের সকল নির্বাচনী এলাকার অসহায় ও দুস্থ মানুষের জন্য সমানভাবে বরাদ্দ নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানানো হচ্ছে। দেশের মানুষ আর এ ধরনের বৈষম্য দেখতে চায় না।
ক্রাইম বার্তা