সাতক্ষীরা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ

স্টাফ রিপোটার: সাতক্ষীরা সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আসাদুজ্জামান বিরুদ্ধে ভয়ভীতি প্রদর্শন, অনিয়ম, অর্থতৎরূপ,শ্লীতাহানি, ফ্যাসিবাঁদি আচারণ, আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের পুনর্বাসন এবং দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি বরাদ্দকৃত অর্থ থেকে ক্ষুদ্র মেরামত, রুটিন মেইনটেন্যান্স, প্রশ্ন বিক্রি, স্লীপসহ বিভিন্ন খাতের অর্থ লোপাটের অভিযোগকে কেন্দ্র করে শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় সূত্র মতে, বিভিন্ন প্রকল্পে সদর উপজেলাধীন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের কাছ থেকে প্রায় ৩০-৪০ ভাগ অর্থ আদায় করেন শিক্ষা অফিসার আসাদুজ্জামান । কখনও কখনও বরাদ্দের অর্থ শিক্ষকদের অজান্তেই আত্মসাৎ করেন। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ দায়ের হলেও অদৃশ্য প্রভাবের কারণে তিনি বছরে পর বছর বহাল তবিয়তে রয়েছেন।
একাধিক অভিযোগে জানা গেছে, আসাদুজ্জামান পূর্ববর্তী সরকারের রাজনৈতিক তহবিলে অর্থ প্রেরণের মাধ্যমে ক্ষমতার ছত্রছায়ায় ছিলেন। ফলে তার অনিয়ম নিয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পায়নি। যোগদানের পর তিনি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পুরোনো ভবনগুলো গোপনে নিলামে তুলে ক্ষমতাসীন দলের কর্মীদের কাছে হস্তান্তর করেন। এতে একাধিক বিদ্যালয়ে শ্রেণিকক্ষের সংকট দেখা দেয়।
কয়েক জন প্রধান শিক্ষক জানান,, শিক্ষা অফিসার আসাদুজ্জামান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিভিন্ন প্রান্তিক মূল্যায়ন পরিচালনায় ২০২৫ সালে ছাত্রছাত্রী প্রতি ২০ টাকা করে ফিস আদায় করেন। ভাই ভাই প্রেসে প্রশ্নপত্রের দাম সর্বোচ্চ ৬ টাকা থাকলেও ছাত্র-ছাত্রী প্রতি ২০ টাকা করে আদায় করা হয়েছে। একই সময়ে উপজেলায় মোট ছাত্র-ছাত্রী রয়েছে ৩১ হাজার। তাহলে একটি মূল্যায়ন পরীক্ষায় মোট আদায় করা হয়েছে ৬ লক্ষ ২০ হাজার টাকা। তাহলে ৩টি প্রান্তিক মূল্যায়নে আদায় করেন ১৮ লক্ষ ৬০ হাজার টাকা। প্রতি মূল্যায়নের প্রকৃত খরচ ১ লক্ষ ৮৬ হাজার টাকা। সেই হিসেবে তিনটি প্রান্তিক মূল্যায়নের প্রকৃত খরচ ৫ লক্ষ ৫৮ হাজার টাকা। অর্তাৎ অতিরিক্ত ১৩ লক্ষ ২ হাজার টাকা তিনি আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষিকা জানান, তিনি অধিকাংশ সময় সুন্দরী শিক্ষিকাদের অফিসে ডেকে তার রুমে বসিয়ে রাখেন এবং তাদের সাথে আপত্তিকর কথাবার্তা বলেন, কয়েকজন শিক্ষিকাকে অবৈধ সম্পর্কের প্রস্তাব দিয়েছেন বলে জানান তারা। এ ব্যাপারে সুষ্ঠু তদন্ত হলে ভুক্তভোগীরা তাদের বক্তব্য পেশ করবেন।
অভিযোগে আরো জানা যায়, স্লীপ ও অন্যান্য বরাদ্দ বাবদ স্কুল প্রতি ৫০০ টাকা করে আদায় করেন তিনি। ক্ষুদ্র মেরামত বাবদ স্কুল প্রতি ১৫ শত টাকা করে আদায় করেন তিনি। পায়রাডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দপ্তরী কাম প্রহরীর চাকরি চলে গেলে তাকে আবার নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ৩ লক্ষ টাকা উৎকোষ দাবি করে অফিস সহকারী ওয়াদুদের মাধ্যমে। বাঁধনডাঙ্গা গ্রামের ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলামের মুক্তিযুদ্ধের গেজেট বাতিল হওয়ায় কোটায় চাকরি পাওয়া তার দুই ছেলে হাসানুজ্জামান ও মনিরুজ্জামান এর আই পি ই এম এসে মুক্তিযোদ্ধা কোটা ছিল। তাদের নিকট থেকে শিক্ষা অফিসার আসাদুজ্জামান মোটা অংকের উৎকোচ নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা কোটা পরিবর্তন করে পোস্য কোটা করে দেওয়ারও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এদিকে সদ্য অনুষ্ঠিত হওয়া জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে ভোট কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ৫৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংস্কার ও মেরামতের জন্য ২০২৫-২৬ অর্থবছরের পরিচালনা বাজেটের আওতায় মোট ৬৭ লক্ষ ৭৫ হাজার টাকা বিশেষ বরাদ্দ দেয়া হয় । সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দুই ধাপের স্মারক অনুযায়ী প্রথম ধাপে ২২ লক্ষ ৫৮ হাজার ৩৩০ এবং দ্বিতীয় ধাপে ৪৫ লক্ষ ১৬ হাজার ৬৭০ টাকা বরাদ্দ প্রদান করা হয়। অফিস সূত্রে জানা যায়, বিদ্যালয় গুলোকে নিরাপদ ও ভোট গ্রহণের উপযোগী করতে দরজা জানালা মেরামত, মেঝে সংস্কার, চুনকাম ও রং করা,বৈদ্যুতিক সংযোগ ঠিক করা,পর্যাপ্ত লাইট, ফ্যান স্থাপন,টয়লেট ও স্যানিটেশন উন্নয়ন, সুপের পানির ব্যবস্থা, বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে রাস্তা সংস্কার এবং কোথাও কোথাও সিসি ক্যামেরা স্থাপন সহ আসবাবপত্র মেরামতের কাজ করার কথা ছিল।
তবে সরেজমিনে কয়েকটি বিদ্যালয় ঘুরে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। বাটকেখালি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১৪ নং দক্ষিণ ঘোষপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ধুলিহর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কামাননগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের উল্লেখযোগ্য কোনো সংস্কার কাজের দৃশ্যমান প্রমাণ পাওয়া যায়নি । অনেক শ্রেণী কক্ষে পুরনো দরজা জানালা, নষ্ট বৈদ্যুতিক সংযোগ ও জরাজীর্ণ অবকাঠামো আগের মতই রয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি। বিদ্যালয়গুলোর প্রধান শিক্ষকদের কাছে নির্বাচন চলাকালীন সংস্কার বরাদ্দের বিষয়ে জানতে চাইলে তারা সরকারি তথ্য দিতে অনীহা প্রকাশ করেন। কয়েকজন প্রধান শিক্ষক দাবি করেন,উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার থেকে সাংবাদিকদের কোন তথ্য না দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। কয়েকজন প্রধান শিক্ষক বলেন অফিস খরচ বাবদ বরাদ্দ অনুযায়ী ১০.০০০/=দশ হাজার টাকা থেকে ২০.০০০/=বিশ হাজার টাকা রাখতে বলেন।পরবর্তীতে অফিস সহকারি ওয়াদুদের মাধ্যমে প্রায় ৮.০০.০০০/= আট লক্ষ টাকা আদায় করে আত্মসাৎ করেন। এদিকে স্থানীয়দের মধ্যে অভিযোগ উঠেছে,বরাদ্দের অর্থের বড় অংশ যথাযথ ভাবে কাজে ব্যয় হয়নি। অভিযোগে বলা হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের যোগসাজশে অর্থের অপচয় বা আত্মস্বাদের ঘটনা ঘটতে পারে। সাতক্ষীরা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মোহাম্মদ রুহুল আমিনের সাথে কথা হলে তিনি এ প্রতিবেদক কে বলেন কোন অবস্থাতে তথ্য গোপন করা যাবে না। আপনি বলেছেন আমি তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করছি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াত শিক্ষকদের ভোট কেন্দ্রে দায়িত্ব পালনে বাঁধা প্রদান করে। এমনকি শুরুতেই ভোট কেন্দ্রে কর্মরত শিক্ষকদের শিক্ষদের তালিকায় বিএনপি ও জামায়াত পন্থি শিক্ষকদের তালিকা থেকে বাঁদ দেন।
এ বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আসাদুজ্জামান কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান, আমার বিরুদ্ধে যে-সব অভিযোগ করা হয়েছে সবগুলোই মিথ্যা। আমি কোন প্রকার অনিয়ম-দুর্নীতির সাথে জড়িত নই।

About news-admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *