স্টাফ রিপোটার: আসন্ন মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমান পরীক্ষা-২০২৬ সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও নকলমুক্ত পরিবেশে আয়োজনের লক্ষ্যে প্রত্যেক কক্ষে থাকবে সিসি ক্যামেরা। একই সঙ্গে ডিজিটাল ট্র্যাকিং, সিসিটিভি নজরদারি এবং প্রশ্নপত্রের ত্রিস্তরীয় নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এবারের পাবলিক পরীক্ষা। এই নীতির আওতায় শুধু পরীক্ষার্থীরাই নয়, কোনো ধরনের অনিয়ম প্রমাণিত হলে দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের চাকরিচ্যুতির মতো কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরীক্ষার প্রস্তুতির ক্ষেত্রে সরকার কোনো ধরনের ছাড় দিচ্ছে না। সেই সঙ্গে শিক্ষামন্ত্রীও স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, এবার খাতায় কোনো ধরনের ‘গ্রেস মার্ক’ বা অনুকম্পার সুযোগ থাকবে না; শিক্ষার্থীরা যা লিখবে, তার ভিত্তিতেই প্রকৃত নম্বর প্রদান করা হবে। মেধার এই লড়াইকে স্বচ্ছ করতে প্রতিটি পরীক্ষা কেন্দ্রকে আনা হচ্ছে সিসিটিভি ক্যামেরার কঠোর নজরবন্দিতে। শুধু ক্যামেরা স্থাপনই নয়, ধারণকৃত ফুটেজ প্রতি সাত দিন অন্তর সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া, প্রশ্নপত্র সুরক্ষায় এবার প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা হচ্ছে। বিজি প্রেস থেকে প্রশ্নগুলো প্রথমে বিশেষ ‘ফয়েল প্যাকে’ এবং পরবর্তীতে একটি ‘ওয়ান টাইম’ সিকিউরিটি খামে ভরা হচ্ছে। এই খামটি এমনভাবে তৈরি যে, একবার খোলা হলে তা আর পুনরায় লাগানো সম্ভব নয়। ট্রেজারি থেকে প্রশ্ন কেন্দ্রে নেওয়ার সময় একজন ট্যাগ অফিসার সার্বক্ষণিক উপস্থিত থাকবেন এবং পরীক্ষা শুরুর মাত্র ১৫ থেকে ২০ মিনিট আগে সবার উপস্থিতিতে খাম খোলা হবে। ফলে প্রশ্ন ফাঁসের চিরাচরিত ছিদ্রপথগুলো এবার পুরোপুরি বন্ধ হতে যাচ্ছে। পরীক্ষা কেন্দ্রের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবার পরীক্ষার্থীদের ওপর থাকছে কঠোর বিধিনিষেধ। কোনো পরীক্ষার্থীই নিজ প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা দিতে পারবে না। কেন্দ্রে প্রবেশের আগে প্রতিটি শিক্ষার্থীকে নিবিড় ‘নিরাপত্তা চেক’ পার হতে হবে। পরীক্ষার্থীদের দেহ তল্লাশি করে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে; নারী পরীক্ষার্থীদের তল্লাশির জন্য নারী শিক্ষকের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এছাড়া, কেন্দ্রসচিব ব্যতীত অন্য কোনো শিক্ষক বা কর্মকর্তা পরীক্ষা কেন্দ্রে মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে পারবেন না। সাইবার নজরদারি ও গুজব রোধ: পরীক্ষার আগে গুজব ও ডিজিটাল জালিয়াতি রুখতে সাইবার নজরদারি কয়েক গুণ বাড়ানো হয়েছে। প্রশ্ন ফাঁসের গুজব ছড়িয়ে যারা সাধারণ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করবে, তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক জেল- জরিমানাসহ কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর বিশেষ শাখা সার্বক্ষণিক নজরদারি করবে। পরিদর্শন ও মনিটরিং টিম: শিক্ষা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, পরীক্ষা শুরুর আগেই প্রতিটি কেন্দ্রের ভৌত অবকাঠামো ও প্রস্তুতি যাচাই করতে বিশেষ পরিদর্শন টিম গঠন করা হয়েছে। বিশেষ করে মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নকলের প্রবণতা বন্ধে এবার বিশেষ ‘লাইভ মনিটরিং’ সিস্টেম চালু করা হচ্ছে। প্রতিটি কেন্দ্রে জেলা প্রশাসক বা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি ‘কেন্দ্র কমিটি’ গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি পরীক্ষা পরিচালনার যাবতীয় বিষয়গুলো পরিচালনা করবে। যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা: এসএসসি পরীক্ষার সার্বিক প্রস্তুতির বিষয়ে ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক এস এম কামাল উদ্দিন হায়দার বলেন, আমরা ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, নকলমুক্ত এবং প্রশ্নফাঁসের নূন্যতম সুযোগহীন পরিবেশে অনুষ্ঠানের জন্য বদ্ধপরিকর। সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বাস্তবায়নে এবার প্রতিটি পরীক্ষা কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং সেই ফুটেজ নিয়মিত বোর্ডে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রযুক্তির এই নিশ্চিন্ন পাহারায় কোনো ধরনের অনিয়ম ঢাকা পড়ার সুযোগ নেই। প্রশ্নপত্রের সুরক্ষায় আমরা এবার ফয়েল প্যাক এবং ওয়ান টাইম সিকিউরিটি খাম ব্যবহার করছি, যা শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। যদি কোনো কেন্দ্রে বা কক্ষ প্রত্যবেক্ষকের দায়িত্বে কোনো গাফিলতি ধরা পড়ে, তবে কেবল পরীক্ষার্থী নয়, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও তাৎক্ষণিক বিভাগীয় ও কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’ অন্যদিকে, আসন্ন দাখিল পরীক্ষার বিষয়ে বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান বলেন, এসএসসি, দাখিল ও সমমানের পরীক্ষা শিক্ষার্থীদের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। তাই এই পরীক্ষা কোনোভাবেই প্রশ্নফাঁস, নকল বা অনিয়মের মাধ্যমে বিতর্কিত হতে দেওয়া যাবে না। সরকার এক্ষেত্রে ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি গ্রহণ করেছে এবং আমরাও সেটি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করব। তিনি আরও যোগ করেন, ‘প্রতিটি পরীক্ষা কেন্দ্রে সিসিটিভি স্থাপন ও নজরদারি জোরদারের মাধ্যমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে। কেন্দ্রসচিবসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিজ নিজ ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে— এই বার্তা আমরা এরই মধ্যে পৌঁছে দিয়েছি।’ পরীক্ষার আগেই সচল করতে হবে সব সিসিটিভি ক্যামেরা : মাউশি। এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা সুষ্ঠু, সুন্দর ও নকলমুক্ত পরিবেশে আয়োজনের লক্ষ্যে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের জন্য ১১টি কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ১. এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা-২০২৬ গ্রহণের লক্ষ্যে নির্বাচিত প্রতিটি পরীক্ষাকেন্দ্র এবং কেন্দ্রের প্রতিটি কক্ষে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন নিশ্চিত করতে হবে। ২. যেসব পরীক্ষাকেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা অচল বা অকার্যকর অবস্থায় রয়েছে, সেসব কেন্দ্রের ক্যামেরা পরীক্ষা শুরুর আগেই সচল করতে হবে। ৩. সিসিটিভি ক্যামেরায় ধারণ করা সব ভিডিও যথাযথভাবে সংরক্ষণ করতে হবে এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের চাহিদা অনুযায়ী তা সরবরাহ করতে হবে। ৪. প্রতিটি পরীক্ষাকেন্দ্রের প্রতিটি কক্ষে দেয়ালঘড়ি (কাঁটাওয়ালা) স্থাপন করতে হবে। ৫. স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে পরামর্শক্রমে পরীক্ষাকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করতে হবে। ৬. কেন্দ্রসচিব ছাড়া পরীক্ষার হলে কোনো শিক্ষক বা পরীক্ষার্থী যাতে মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে না পারে তা নিশ্চিত করতে হবে। ৭. কোনো পরীক্ষার্থী যাতে নকল বা অসদুপায় অবলম্বন করতে না পারে সে বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। পরীক্ষার্থীদের দেহ তল্লাশি করে কেন্দ্রে প্রবেশের অনুমতি দিতে হবে এবং ছাত্রীদের ক্ষেত্রে মহিলা শিক্ষকের মাধ্যমে তল্লাশির ব্যবস্থা করতে হবে। ৮. পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে কেন্দ্রের প্রধান ফটকে অভিভাবকসহ শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা টাঙিয়ে দিতে হবে। ৯. প্রতিটি পরীক্ষাকেন্দ্রে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে হবে এবং পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের ব্যবস্থা রাখতে হবে। ১০. সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড কর্তৃক কেন্দ্রসচিবদের দেওয়া নির্দেশনাসমূহ যথাযথভাবে প্রতিপালন করতে হবে। ১১. উপরোক্ত নির্দেশনাসমূহ কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে; কোনো অবহেলা বা গাফিলতির কারণে অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। মাউশি জানিয়েছে, এবারের এসএসসি পরীক্ষা ঘিরে সব ধরনের অনিয়ম রোধে কেন্দ্রীয় ও মাঠপর্যায়ে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। মাউশি স্পষ্ট জানিয়েছে, এসব নির্দেশনা বাস্তবায়নে কোনো ধরনের অবহেলা বা গাফিলতি হলে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রসচিবসহ দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ক্রাইম বার্তা