উপকূলের ’ভয়ঙ্কর’ ‘মে’

আবু সাইদ বিশ্বাস, সাতক্ষীরা: উপকূলের মানুষের কাছে সবচেয়ে ভয়াল মাস ‘মে’। গত কয়েক বছর যে ঘূর্ণিঝড়গুলো আঘাত হেনেছে, তার অধিকাংশই মে মাসে। এখন ঘূর্ণিঝড়ের খবর শুনলেই আতঙ্কে দিন কাটে তাদের। প্রতি বছর দুর্যোগের পর নতুন করে ঘর বাঁধেন, বছর না ঘুরতেই আবারো যোগ হয় ঘরবাড়ি হারানোর আতঙ্ক। প্রতিবছর এই মাসের শেষে সুন্দরবন উপকূলে আছড়ে পড়ে আইলা, ফণী, ইয়াস ও আম্পানের মতো প্রলয়ংকরী সব ঘূর্ণিঝড়। দুর্যোগ মৌসুম শুরু হলেই ভাঙন ধরে সুন্দরবন সংলগ্ন উপকূলীয় উপজেলা শ্যামনগর, আশাশুনি ও কয়রার বিভিন্ন বেড়িবাঁধে।
আবহাওয়া অধিদফতর বলছে, চলতি মাসে উপকূলীয়াঞ্চলে একাধিক নিম্নচাপের সম্ভাবনা রয়েছে। সেই সাথে বৃষ্টি, বজ্রবৃষ্টি এবং ঝড় ঝাপটার সম্ভাবনা প্রবল। ফলে অতীত ইতিহাস উপকূলবাসীকে চরমভাবে ভাবিয়ে তুলেছে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয় সূত্র জানায়, বিগত ২০০৯ সালের ২৫ মে ঘূর্ণিঝড় আইলা খুলনা উপকূলে আঘাত হেনেছিল। ২০১৭ সালের ৩০ মে ঘূর্ণিঝড় মোরা, ২০১৯ সালের ২ মে ফণী, ২০২০ সালের ১৮ মে আম্পান, ২০২১ সালের ২৬ মে ইয়াস, ২০২২ সালের ৭ মে অশনি, একই বছরে সিত্রাং এবং ২০২৩ সালের ১৪ মে মোচা আঘাত হেনেছিল। সর্বশেষ ২০২৪ সালের মে মাসে আঘাত হানে প্রবল ঘূর্ণিঝড় ‘রেমাল’। যা ২৬ মে সন্ধ্যা থেকে ২৭ মে সকাল পর্যন্ত বাংলাদেশ সুন্দরবন উপকূল ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ উপকূলে আঘাত হানে। সে হিসাবে প্রতি বছর মে মাসে নিয়মিতভাবেই প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঁচড়ে পড়ছে উপকূলে। ফলে ঘরবাড়ি ও সবকিছু হারানোর আতঙ্কে থাকেন উপকূলবাসী।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কর্মকর্তাদের দাবি, উপকূলীয় ওই তিন জেলার ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ অনেকটাই সংস্কার করা হয়েছে। আরো কিছু এলাকা সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বেশ কিছু এলাকায় টেকসই বাঁধ নির্মাণের কাজ চলছে। বাঁধের যেসব অংশ ঝুঁকিপূর্ণ সেগুলো পর্যবেক্ষণে রেখেছে পাউবো।
উপকূলের বাসিন্দারা বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধের বিষয়টি জনপ্রতিনিধিদের জানালেও তাঁরা শুধু আশ্বাস দেন। বাঁধ মেরামতে কেউ উদ্যোগ নেন না। বর্ষায় যখন জোয়ারের পানি বাঁধ উপচে পড়ার উপক্রম হয়, তখন মেরামতে উদ্যোগ নেয় কর্তৃপক্ষ। এতে একদিকে কাজের ব্যয় বাড়ে, অন্যদিকে কাজ হয় নিম্নমানের। প্রায় সময় বাঁধ ভেঙে এলাকা প্লাবিত হয়। জনপ্রতিনিধিদের দাবি, পরিকল্পিত ও স্থায়ী বাঁধ নির্মিত না হওয়ায় প্রতিবছর ভাঙন দেখা দেয়। এ জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কর্মকর্তাদের গাফিলতিই দায়ী।

আতঙ্কের কথা জানিয়ে শ্যামনগর উপকূলের বাসিন্দা মাসুম বিল্লাহ বাংলা বলেন, ‘মে মাস এক আতঙ্কের নাম। গত বছরের ঝড়ে আমার বাড়ির সব ভেসে গিয়েছিল। কোনও রকমে এখন ঠিক করে বাস করছি। আবার আসতেছে। ঝড় এলে পরিবার নিয়ে স্কুলে গিয়ে উঠি। ঝড় আমাদের নিত্যসঙ্গী। প্রতি বছরই আসে, বাঁধ ভাঙে, ঘরবাড়ি নিয়ে যায়। গ্রামের সবাই মিলে ঠিক করি। এবারও ঘরবাড়ি হারানোর আতঙ্কে আছি।’

সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ও আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর সুন্দরবন সংলগ্ন প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও নদীভাঙন কবলিত দুটি অতি-ঝুঁকিপূর্ণ ইউনিয়ন। গাবুরা, খোলপেটুয়া ও কপোতাক্ষ নদের মাঝে অবস্থিত একটি সম্পূর্ণ দ্বীপ ইউনিয়ন । আইলা, আম্পানসহ বিভিন্ন ঘূর্ণিঝড়ে এখানকার বেড়িবাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা তলিয়ে যায়। এই দ্বীপে সুপেয় পানির তীব্র সংকট রয়েছে এবং এখনও বেশিরভাগ এলাকায় পাকা রাস্তা গড়ে ওঠেনি। তবে বর্তমানে ভাঙন রোধে প্রায় ১,০২৩ কোটি টাকা ব্যয়ে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ মেগা প্রকল্প চলমান রয়েছে।

খোলপেটুয়া ও প্রতাপনগর খালের তীরবর্তী অঞ্চল। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের সময় অতিরিক্ত জোয়ারের পানিতে এখানকার নদী রক্ষা বাঁধ ভেঙে প্রবল প্লাবনের সৃষ্টি হয়। উপকূলীয় এই অঞ্চলে নদীর লবণাক্ত পানি ঢুকে কৃষি ও মৎস্য সম্পদের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে। নদীবাহিত পলি ও সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য থাকার পরও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ প্রভাবের কারণে এই দুটি অঞ্চল চরম ঝুঁকিপূর্ণ।

আবু সাইদ বিশ্বাস
সাতক্ষীরা
১৯/৫/২৬

About news-admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *