৩১ জুলাইয়ের রাতটি ছিল এক ভিন্নরকম রাত। মনে হচ্ছিল, আগে থেকেই যেন এক অনিবার্য সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে সবাই।
কেন্দ্র থেকে শাখা, থানা, ওয়ার্ড ও উপশাখা সর্বস্তরের জনশক্তি মহান রবের দরবারে প্রিয় কাফেলার ভবিষ্যতের জন্য দোয়া করতে করতে নির্ঘুম রাত কাটিয়েছেন। অনেকেই নফল রোযা রেখেছেন প্রিয় কাফেলার জন্য। উৎকণ্ঠা, অজানা আশঙ্কা এবং মহান রবের ওপর পূর্ণ তাওয়াক্কুলের মধ্য দিয়েই সেই বিভীষিকাময় রাত শেষ হলো সবার।
এখন সবাই শুধু অপেক্ষায় আছেন, যেকোনো মুহূর্তে ফ্যাসিস্ট সরকার তাদের ক্যাঙ্গারু কোর্টের মাধ্যমে ইসলামী ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে পারে।
১ আগস্ট সকাল ৭:০০ টায় যথারীতি দারসুল কুরআনের মাধ্যমে ইসলামী ছাত্রশিবিরের মাসিক কেন্দ্রীয় সেক্রেটারিয়েট বৈঠক শুরু হলো।
কিন্তু বুকের ভেতর প্রতিটি মুহূর্তে ভিন্নরকম উৎকণ্ঠা কাজ করছিল। মনে হচ্ছিল, হয়তো “ইসলামী ছাত্রশিবির” নামে এটাই আমাদের সর্বশেষ কেন্দ্রীয় সেক্রেটারিয়েট বৈঠক।
বৈঠক চলমান অবস্থাতেই নিষিদ্ধ ঘোষণার সংবাদ এসে পৌঁছালো।
মুহূর্তের মধ্যেই পুরো বৈঠকে নেমে এলো পিনপতন নীরবতা। সাহসী, চৌকস ও দৃঢ়চেতা মানুষগুলোর চোখে পানি। সামনে ভেসে উঠছিল লক্ষ লক্ষ জনশক্তি, অসংখ্য শুভানুধ্যায়ী, সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্ট, অঙ্গসংগঠন এবং পুরো সাংগঠনিক কাঠামোর নিরাপত্তার প্রশ্ন। কেন্দ্রীয় দায়িত্বশীল হিসেবে সেই বিশাল দায়িত্ব তখন আমাদের কাঁধে।
প্রশ্ন একটাই এখন আমাদের পরবর্তী করণীয় কী?
কেন্দ্রীয় সভাপতি মঞ্জুরুল ইসলাম ভাই দ্রুত নিজেকে সামলে নিলেন। প্রয়োজনীয় মৌলিক নির্দেশনা জানিয়ে ৩০ মিনিটের জন্য বৈঠক স্থগিত করলেন এবং নির্দেশ দিলেন, দ্রুত শাখা (বিশ্ববিদ্যালয়, মহানগর ও জেলা শাখার) দায়িত্বশীল ভাইদের সঙ্গে বসে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা পৌঁছে দিতে।
কেন্দ্রীয় সভাপতি ভাইয়ের নির্দেশনার আলোকে আমরা জরুরি ভিত্তিতে জুম অ্যাপের মাধ্যমে শাখা দায়িত্বশীলদের সঙ্গে যুক্ত হলাম। পরিস্থিতি, নির্দেশনা ও করণীয় বুঝিয়ে দিয়ে আবার কেন্দ্রীয় সেক্রেটারিয়েট বৈঠকে যুক্ত হলাম।
ফ্যাসিস্ট সরকার চেয়েছিল, নিষিদ্ধ ঘোষণার প্রতিবাদে আমরা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখাবো। এরপর তারা গ্রেফতার অভিযান শুরু করবে, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন দমন করবে এবং তাদের মসনদ আরও শক্তিশালী করবে।
কিন্তু আল্লাহর অশেষ সাহায্যে আমরা ভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করলাম। পরিস্থিতি বিবেচনায় তাৎক্ষণিক কোনো কর্মসূচি না দিয়ে শুধু একটি বিবৃতির মাধ্যমে আমাদের অবস্থান তুলে ধরলাম।
আনুষ্ঠানিকভাবে মাসিক সেক্রেটারিয়েট বৈঠকের সব এজেন্ডা শেষ করে সমাপনী বক্তব্যে কেন্দ্রীয় সভাপতি মঞ্জুরুল ইসলাম ভাই বললেন:
“ইতিপূর্বে সাংগঠনিক কাজের পাশাপাশি আমরা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ত ছিলাম। কিন্তু আজ থেকে অন্য সব সাংগঠনিক কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। এখন থেকে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনই আমাদের সর্বস্তরের জনশক্তি ও দায়িত্বশীলদের একমাত্র সাংগঠনিক কাজ হিসেবে গণ্য হবে।
এ পথে হয়তো আল্লাহ কবুল করলে আমাদের কিছু ভাই শাহাদাত বরণ করবেন, কিছু ভাই আহত হবেন, কেউ কেউ পঙ্গুত্ব বরণ করবেন।
কিন্তু আল্লাহর সাহায্যে হাসিনার পতন ঘটিয়ে বাংলাদেশের মানুষের মুক্তির সুব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং আমাদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠাই হবে আমাদের প্রধান লক্ষ্য।
আমরা আমাদের অধিকার ফিরিয়েই ঘরে ফিরবো—ইনশাআল্লাহ।”
বৈঠক শেষে কেন্দ্রীয় সভাপতি মঞ্জুরুল ইসলাম ভাই কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক সাদেক আব্দুল্লাহ ভাই এবং আমাকে দায়িত্ব দিলেন অন্যান্য ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ করে আমাদের নিষিদ্ধ করে যে জুলুম করা হয়েছে, তার প্রতিবাদে তারা বিবৃতি দিতে সম্মত হন কি না, সে বিষয়ে কথা বলার জন্য।
আমরা বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ করি। কিন্তু মূল রাজনৈতিক দলের অনুমতি এবং বিভিন্ন বাস্তবতার কারণে অনেকেই প্রকাশ্যে বিবৃতি দিতে রাজি হননি। তবে বিবৃতি না দিলেও কয়েকটি ছাত্রসংগঠনের নীরব সমর্থন ছাত্রশিবিরের প্রতি ছিল। আবার কিছু ছাত্রসংগঠন হাসিনা সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে এবং ছাত্রশিবিরের প্রতি সংঘটিত জুলুমের প্রতিবাদে বিবৃতি প্রদান করেছিল।
মহান রব সত্যপন্থী ও মজলুমদের তাওয়াক্কুল এবং ধৈর্যের প্রতিদান যুগে যুগে দিয়েছেন, ভবিষ্যতেও দেবেন—এই বিশ্বাস আমাদের অন্তরে দৃঢ় ছিল।
সেজন্য আমরা আশাবাদী ছিলাম, আমাদের রব আমাদের একা ছেড়ে দেবেন না। তিনি হতাশ ও নিরাশ হতে নিষেধ করেছেন। তাই আমরা তাঁর ফয়সালার অপেক্ষায় থেকে নিজেদের কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছিলাম।
কিন্তু আমাদের রব যে এত দ্রুত তাওয়াক্কুল ও সবরের প্রতিদান দান করবেন, তা আমরা তখনও বুঝতে পারিনি।
আলহামদুলিল্লাহ।
শুকরান ইয়া রাব্বি।
আব্দুর রহিম
তৎকালীন কেন্দ্রীয় এইচআরডি সম্পাদক
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির
See less
ক্রাইম বার্তা