ঘেরের আইলে সবুজ বিপ্লব: বদলাচ্ছে সাতক্ষীরার কৃষি অর্থনীতি

আবু সাইদ বিশ্বাস: সাতক্ষীরার বিস্তীর্ণ জনপদে মাছের ঘেরের আইলজুড়ে এখন সবুজের সমারোহ। কোথাও মাচায় ঝুলছে করলা, কোথাও বরবটি, আবার কোথাও শসা, ঢেঁড়স, পুঁইশাক, লাউ ও কুমড়ায় ভরে উঠেছে ঘেরের পাড়। কয়েক বছর আগেও যেসব ঘেরের আইল পড়ে থাকত, সেখানে এখন কৃষকের ব্যস্ততা। ভোর থেকে শুরু হয় সবজি তোলা, বাছাই ও বাজারজাতের কাজ। গ্রীষ্মকালীন সবজি বাজারে উঠতে শুরু করায় একদিকে যেমন সরবরাহ বাড়ছে, অন্যদিকে কমতে শুরু করেছে দাম। এতে স্বস্তি ফিরেছে সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যেও। আর উৎপাদন খরচ তুলনামূলক কম হওয়ায় ভালো দাম পেয়ে খুশি চাষিরা। কৃষকদের ভাষ্য, মাছের ঘেরের আইলকে কাজে লাগিয়ে একই জমি থেকে মাছ ও সবজি দুই দিক থেকেই আয় করা সম্ভব হচ্ছে।
মাছের ঘেরের আইলে সবজি চাষের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিষমুক্ত সবজি উৎপাদনের সম্ভাবনা। মাছের সঙ্গে একই ঘেরে সবজি চাষ করায় কীটনাশক ব্যবহারের ক্ষেত্রে কৃষকদের সতর্ক থাকতে হয়। ফলে নিরাপদ সবজি উৎপাদনের একটি সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকার বাজারে সাতক্ষীরার সবজির চাহিদা তৈরি হয়েছে। সড়ক যোগাযোগ সহজ হওয়ায় উৎপাদিত সবজি দ্রুত রাজধানীর বাজারে পাঠানোর সুযোগ পাচ্ছে চাষিরা। সকাল হলেই সড়কের পাশে অস্থায়ী সবজির হাট বসছে। ঘেরের আইল থেকে সবজি তুলে কৃষকেরা সরাসরি সড়কের পাশে এনে বিক্রি করছেন। সেখানে স্থানীয় পাইকার, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও খুচরা বিক্রেতারা সবজি কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।
তবে মাঠ থেকে বাজার পর্যন্ত দামের ব্যবধানই এখন নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। কৃষকের কাছ থেকে যে দামে করলা বা বরবটি কেনা হচ্ছে, পাইকারি ও খুচরা বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে প্রায় দ্বিগুণ বা তারও বেশি দামে। ফলে উৎপাদনের ঝুঁকি নেওয়া কৃষকের বদলে লাভের বড় অংশ চলে যাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে এমন অভিযোগ চাষিদের।

চলতি মৌসুমে সাতক্ষীরা জেলায় প্রায় ৮৭৫ হেক্টর মৎস্যঘেরের আইলে বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ হয়েছে। এর মধ্যে সাতক্ষীরা সদর উপজেলায় ৩৪০ হেক্টর, তালায় ১৬৫ হেক্টর, কলারোয়ায় ৫৫ হেক্টর, আশাশুনিতে ৮০ হেক্টর, কালিগঞ্জে ১৩৫ হেক্টর, দেবহাটায় ২০ হেক্টর এবং শ্যামনগরে ৮০ হেক্টর জমির ঘেরের আইলে সবজি চাষ হয়েছে। এসব জমিতে করলা, বরবটি, লাউ, কুমড়া, শসা, ঢেঁড়স, পুঁইশাকসহ বিভিন্ন জাতের সবজি উৎপাদন হচ্ছে। কৃষি বিভাগের হিসাবে, চলতি মৌসুমে এসব জমি থেকে প্রায় ১৬ হাজার ৬২৫ মেট্রিক টন সবজি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঘেরের আইলে সবজি চাষে আলাদা করে জমি ভাড়া নেওয়ার প্রয়োজন হয় না। ফলে জমি প্রস্তুত ও চাষের খরচও তুলনামূলক কম। মাছের ঘেরের পাশাপাশি সবজি চাষ হওয়ায় একই জমি থেকে বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে করলা ও বরবটির চাহিদা থাকায় এসব সবজি চাষে আগ্রহ বাড়ছে কৃষকদের। ভালো ফলন হলে এক মৌসুমেই উল্লেখযোগ্য আয় করা সম্ভব বলে জানান চাষিরা।

তালা উপজেলার এক কৃষক সুমন জানান, বর্তমানে এক কেজি করলা বিক্রি করে তারা পাচ্ছেন প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ টাকা। অথচ একই করলা পাইকারি বাজারে বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ টাকা কেজি দরে। আর খুচরা বাজারে সেই করলার দাম উঠছে ৭০ থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত। তিনি বলেন, “আমরা মাঠে পরিশ্রম করে সবজি উৎপাদন করি। উৎপাদন খরচ, শ্রমিকের মজুরি, মাচা তৈরি ও পরিবহন খরচ সবই আমাদের বহন করতে হয়। কিন্তু বাজারে গিয়ে দেখি, আমাদের বিক্রয়মূল্যের সঙ্গে খুচরা দামের বিশাল পার্থক্য।” কৃষকদের অভিযোগ, মাঠপর্যায়ে সরাসরি পাইকার বা বড় বাজারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ সীমিত হওয়ায় অনেকটা বাধ্য হয়েই স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে সবজি বিক্রি করতে হয়। এতে উৎপাদনকারী কৃষক ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হন।
সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (খামারবাড়ি)-এর উপপরিচালক কৃষিবিদ মোঃ সাইফুল ইসলাম বলেন, অনেক জায়গায় সড়কের পাশে সবজির হাট বসছে। ঘের থেকে সবজি রাস্তা বা সড়কে আনলেই সেখানে বেচাকেনা হচ্ছে।”এ ধরনের চাষ বাড়লে কৃষকের আয় বাড়ার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হবে।
চাষিদের ভাষ্য, উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখা গেলে এবং বাজারে ন্যায্য দাম নিশ্চিত হলে ঘেরের আইলে সবজি চাষ আরও বিস্তৃত হবে। এতে একদিকে কৃষকের আয় বাড়বে, অন্যদিকে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানও বাড়বে।
সাতক্ষীরার ঘেরের আইলে এখন যে সবুজ বিপ্লব দেখা দিয়েছে, তা কৃষকের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা, কর্মসংস্থান এবং নিরাপদ সবজি উৎপাদনের নতুন দুয়ার খুলতে পারে। কিন্তু সেই সম্ভাবনার সুফল শেষ পর্যন্ত কৃষকের ঘরে পৌঁছাবে কি না তা নির্ভর করছে মাঠ থেকে বাজার পর্যন্ত পুরো সরবরাহব্যবস্থা কতটা কৃষকবান্ধব করা যায়, তার ওপর।

আবু সাইদ বিশ্বাস
সাতক্ষীরা
৮/৮/২৬

 

About news-admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *