আবু সাইদ বিশ্বাস: অনুকূল আবহাওয়া, সময়মতো বৃষ্টিপাত ও বড় ধরনের রোগবালাইয়ের প্রাদুর্ভাব না থাকায় চলতি মৌসুমে সাতক্ষীরায় পাটের বাম্পার ফলন হয়েছে। জেলার বিস্তীর্ণ বিল ও জলাশয়ে এখন চলছে পাট পচানো বা ‘জাক দেওয়ার’ কর্মযজ্ঞ। তবে ফলন ভালো হলেও জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততার চাপ, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি ও বাজারদর নিয়ে উদ্বেগে রয়েছেন চাষিরা।
সাতক্ষীরা সদর, কলারোয়া ও তালাসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলার নিচু জমি ও বিল এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, সারিবদ্ধভাবে পাটের আঁটি পানিতে ডুবিয়ে পচানো হচ্ছে। চলতি মৌসুমে সময়মতো বৃষ্টিপাত হওয়ায় খাল-বিল ও জলাশয়ে পর্যাপ্ত পানি জমেছে। ফলে পাট পচাতে কৃষকদের বাড়তি ভোগান্তি ও পরিবহন খরচ তুলনামূলক কমেছে।
চাষিরা জানান, পাটের আঁটি পানিতে সুবিন্যস্তভাবে রেখে তার ওপর মাটির ঢেলা, কলাগাছ কিংবা কচুরিপানা দিয়ে ডুবিয়ে রাখা হয়েছে। এতে নির্দিষ্ট সময় পর পাট পচে গেলে সহজেই আঁশ ছাড়ানো সম্ভব হবে। খেতের কাছাকাছি জলাশয়ে পানি থাকায় পাট পরিবহনে অতিরিক্ত খরচও হচ্ছে না।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে সাতক্ষীরার সাতটি উপজেলায় মোট ১১ হাজার ৬৭৫ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। এসব জমি থেকে আনুমানিক ১ লাখ ৪২ হাজার বেল পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। স্থানীয় বাজারে ভালো দাম বজায় থাকলে জেলার উৎপাদিত পাটের মোট বাজারমূল্য ২০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশা করছে কৃষি বিভাগ।
উপজেলাভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী, সাতক্ষীরা সদরে ৫ হাজার ২০ হেক্টর, কলারোয়ায় ৩ হাজার ২৫৫ হেক্টর, তালায় ৩ হাজার ১১০ হেক্টর, দেবহাটায় ২০ হেক্টর, কালীগঞ্জে ১০১ হেক্টর, আশাশুনিতে ৯৫ হেক্টর এবং শ্যামনগরে ৯ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে।
অন্য বছরগুলোতে এ সময়ে পাটে ছত্রাকজনিত গোড়া ও কান্ডপচা রোগ, পাতা শুকিয়ে যাওয়া এবং বিছা পোকার উপদ্রব দেখা গেলেও এবার পরিস্থিতি তুলনামূলক ভালো। তালা উপজেলার নগরঘাটা গ্রামের কৃষক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘আগে পাটে বিভিন্ন রোগবালাইয়ের কারণে ওষুধ দিতে দিতে নাভিশ্বাস উঠত। এবার পাটের আবাদ ভালো হয়েছে। এক বিঘা জমিতে ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। বাজার ভালো থাকলে বিঘাপ্রতি ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকার পাট বিক্রি করতে পারব বলে আশা করছি।’
একই গ্রামের কৃষক আলতাফ হোসেন বলেন, শুরু থেকেই কৃষি বিভাগের পরামর্শ এবং সরকারের প্রণোদনার বীজ ও সার পাওয়ায় এবার রোগবালাই কম হয়েছে। পাশাপাশি পাটের গাছও বেশ পুষ্ট হয়েছে।
তবে ভালো ফলনের মধ্যেও দীর্ঘমেয়াদি শঙ্কা রয়েছে কৃষকদের। জলবায়ু পরিবর্তন ও উপকূলীয় ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সাতক্ষীরার বিভিন্ন এলাকায় মাটিতে লবণাক্ততা বাড়ছে। অতিরিক্ত তাপমাত্রা, তীব্র রোদ ও লবণাক্ততার কারণে পাটের বীজের অঙ্কুরোদ্গমও ব্যাহত হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছরে সাতক্ষীরা জেলায় পাটের আবাদ কমেছে প্রায় ১ হাজার ২১০ হেক্টর।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ফিংড়ি গ্রামের কৃষক আব্জাদুর রশিদ জানান, সার ও শ্রমিকের মজুরি বাড়ায় এবার পাট চাষে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। তাদের হিসাবে, বর্তমানে বিঘাপ্রতি খরচ পড়ছে প্রায় ১৯ থেকে ২০ হাজার টাকা। গত বছর এ খরচ ছিল ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকার মধ্যে। ফলে বাজারে প্রত্যাশিত দাম না পেলে লোকসানের আশঙ্কা রয়েছে।
চাষিদের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা এখন পাট পচানো ও আঁশ ছাড়ানোর পর বাজারদর নিয়ে। তাদের দাবি, উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পাটের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা না গেলে ভালো ফলন হলেও কৃষকের লাভ থাকবে না।
এদিকে উপকূলীয় এলাকার লবণাক্ততা মোকাবিলায় সম্ভাবনার নতুন দ্বার খুলেছে ‘লবণসহিষ্ণু দেশি পাট-৮’ জাত। বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিজেআরআই) উদ্ভাবিত এ জাত উপকূলীয় এলাকার লবণাক্ত জমিতে চাষের উপযোগী। গবেষকদের মতে, পতিত এক-ফসলি জমিতে এ জাতের চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে বছরে দুটি ফসল উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হবে। এতে উপকূলীয় অঞ্চলে শস্যনিবিড়তা বাড়ার পাশাপাশি কৃষকের আয়ও বাড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, লবণাক্ততা বাড়ার আগেই শুষ্ক মৌসুমে স্বাদু পানি দিয়ে জমি প্রস্তুত করে আগাম বীজ বপন করা হলে পাটের অঙ্কুরোদ্গমের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব। তবে যথাযথ প্রচারণার অভাবে লবণসহিষ্ণু দেশি পাট-৮ এখনো অনেক কৃষকের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি।
সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, মাঠ পর্যায়ে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ দিচ্ছেন। লবণসহিষ্ণু দেশি পাট-৮ জাত জনপ্রিয় করতে প্রদর্শনী প্লট স্থাপন, কৃষক প্রশিক্ষণ ও মাঠ দিবসের আয়োজন করা হচ্ছে।
কৃষক ও কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উচ্চফলনশীল ও লবণসহিষ্ণু জাতের সরবরাহ বাড়ানো, আধুনিক চাষাবাদ প্রযুক্তির সম্প্রসারণ, সরকারি প্রণোদনা এবং পাটের ন্যায্য বাজারদর নিশ্চিত করা গেলে সাতক্ষীরায় সোনালি আঁশের সম্ভাবনা আরও উজ্জ্বল হবে।
এখন জেলার বিভিন্ন বিল ও জলাশয়ে পাট পচানো এবং আঁশ ছাড়ানোর প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা। পাটের আঁটি পানিতে ডুবিয়ে রাখা আর তীরে আঁশ শুকানোর দৃশ্য ঘিরে গ্রামীণ জনপদে যেমন কর্মচাঞ্চল্য বেড়েছে, তেমনি ভালো দাম পাওয়ার প্রত্যাশায় নতুন স্বপ্ন বুনছেন সোনালি আঁশের চাষিরা।
ক্রাইম বার্তা