বাল্যবিবাহের ভয়াবহ ঝুঁকিতে সাতক্ষীরা # ৭২ শতাংশ মেয়ের বিয়ে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই

# ১ জানুয়ারি থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জেলায় ১১৯টি বাল্যবিবাহ বন্ধ করেছে প্রশাসন

আবু সাইদ বিশ্বাস, সাতক্ষীরা: সাতক্ষীরায় বাল্যবিবাহের প্রবণতা এখনো চরম উদ্বেগজনক অবস্থায় রয়েছে। বিশেষ করে জেলার উপকূলীয় ও প্রান্তিক এলাকায় দারিদ্র্য, শিক্ষার ঘাটতি, সামাজিক অসচেতনতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সংকটের কারণে অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরীদের বিয়ে দেওয়ার প্রবণতা থামছে না।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যানুযায়ী, সাতক্ষীরা জেলায় প্রায় ৭২ শতাংশ মেয়ের বিয়ে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই হয়ে যাচ্ছে। উপজেলা পর্যায়েও চিত্রটি প্রায় একই রকম—শ্যামনগর, কলারোয়া ও কালীগঞ্জে এই হার প্রায় ৬৩ শতাংশ; আর তালা, আশাশুনি, সাতক্ষীরা সদর ও দেবহাটায় এ হার প্রায় ৬২ শতাংশ।

৯ মাসে ১১৯ বিয়ে বন্ধ, তবুও আড়ালে গোপনে বিয়ে
জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের তথ্য মতে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জেলায় ১১৯টি বাল্যবিবাহ বন্ধ করেছে প্রশাসন। গত বছরের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ১৪৩টি। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রশাসনের এই পরিসংখ্যানকে প্রকৃত চিত্র হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ অনেক বিয়ে গোপনে সম্পন্ন হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসন বিয়ে বন্ধ করার পরও গোপনে পরে আবার বিয়ে দিয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

সম্প্রতি সাতক্ষীরা সদর উপজেলার শাল্যে আদর্শ দাখিল মাদ্রাসার অষ্টম থেকে দশম শ্রেণির ১৬ জন ছাত্রীর বাল্যবিবাহের তথ্য সামনে আসে। জেলা বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটির সদস্য সাকিবুর রহমান বাবলার অভিযোগের ভিত্তিতে গত ২৪ সেপ্টেম্বর ১৫ জন শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অর্ণব দত্তের কার্যালয়ে হাজির করা হয়। পরে নথিপত্র যাচাই শেষে শিক্ষার্থীদের ১৮ বছর বয়সের আগে বিয়ে না দেওয়া এবং পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার শর্তে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে লিখিত অঙ্গীকার নেওয়া হয়।

শ্যামনগরের দাতিনাখালী গ্রামের কলবাড়ি নেকজানিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ১৫ বছর বয়সী এক ছাত্রী ও ১৬ বছর বয়সী এক কিশোর বাড়ি থেকে পালিয়ে গেলে উভয় পরিবারকে নিয়ে সামাজিক বৈঠক হয় এবং বয়স পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত বিয়ে না দেওয়ার লিখিত অঙ্গীকার করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, সেই অঙ্গীকার উপেক্ষা করে আইনজীবীর মাধ্যমে নোটারি পাবলিকের সামনে এফিডেভিট করে তাদের বিয়ে দেওয়া হয়। শ্যামনগর থানার ওসি শাফিউল ইসলাম পাটোয়ারী জানান, বিষয়টি সম্পর্কে তারা অবগত। মহিলা বিষয়ক কার্যালয় থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে আইনি সহায়তা চাওয়া হলে পুলিশ ব্যবস্থা নেবে। উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা শারিদ বিন শফিক জানান, অভিযুক্ত ছেলের বাবাকে কার্যালয়ে হাজির হওয়ার জন্য নোটিশ জারি করা হয়েছে।

আইনজীবী অ্যাডভোকেট আবু তালেব এ বিষয়ে জানান, “বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ অনুযায়ী ১৮ বছরের নিচে মেয়ে এবং ২১ বছরের নিচে ছেলের বিয়ে বাল্যবিবাহ হিসেবে গণ্য। নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে এফিডেভিট করিয়ে এমন বেআইনি বিয়েকে বৈধ করার কোনো সুযোগ নেই।”

সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলে বাল্যবিবাহের সঙ্গে পরিবেশগত সংকটের সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে বলে অধিকারকর্মীরা মনে করেন। লবণাক্ততা, সুপেয় পানির তীব্র সংকট, জীবিকার অনিশ্চয়তা ও যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা অনেক পরিবারকে দিশেহারা করে তুলছে। শ্যামনগরের গাবুরা ইউনিয়নের ডুমুরিয়া কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি হেলেনা বিলকিস জানান, তাঁদের ক্লিনিকে আসা গর্ভবতী নারীদের একটি বড় অংশই ১৫ থেকে ১৭ বছরের কিশোরী, যা তাদের মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
সাতক্ষীরা জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক নাজমুন নাহার বলেন, “বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে নিয়মিত অভিযান ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম চলছে। তবে কিছু পরিবার গোপনে বা রাতের আঁধারে অন্যত্র নিয়ে বিয়ে দেওয়ায় তা সব সময় তাৎক্ষণিকভাবে নজরে আসে না। স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি আরও জোরদার করা হচ্ছে।”
সংশ্লিষ্টদের মতে, বাল্যবিবাহ বন্ধে কেবল আইন প্রয়োগই যথেষ্ট নয়; পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন, পুলিশ ও সামাজিক সংগঠনগুলোর সমন্বিত প্রয়াস এখন সময়ের দাবি।

আবু সাইদ বিশ্বাস
সাতক্ষীরা
২৮/৯/২৬

About news-admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *