আবু সাইদ বিশ্বাস: পুকুরের নামেই মেলার নাম। সাতক্ষীরার পলাশপোল এলাকায় ঐতিহাসিক একটি পুকুরকে ঘিরেই এ মেলার আয়োজন। পুকুরটির নাম গুড়পুকুর। আর সেই নাম থেকেই মেলার নাম হয়েছে গুড়পুকুরের মেলা। মেলাটির বয়স ঠিক কত বছর, তার নির্ভরযোগ্য লিখিত দলিল এখনো পাওয়া যায়নি। অতীতেও এ মেলা নিয়ে তেমন ধারাবাহিকভাবে লেখালেখি হয়নি। ফলে মেলার উৎপত্তির ইতিহাস অনেকটাই নির্ভর করছে স্থানীয় মানুষের স্মৃতি, প্রবীণদের বক্তব্য এবং প্রচলিত লোককথার ওপর। তবে প্রচলিত ইতিহাস ও সাম্প্রতিক সংবাদ প্রতিবেদন গুলোতে মেলাটিকে প্রায় ৩০০- ৪০০ বছরের পুরোনো বলা হয়েছে।
পুকুরটির নামকরণের মূল কারণ হিসেবে মানেন না আবদুস সোবহান খান চৌধুরী। তাঁর বক্তব্য, চৌধুরীপাড়ার রায় চৌধুরীরা ছিলেন গৌরবর্ণের ব্রাহ্মণ। তাঁদের পুকুরকে বলা হতো ‘গৌরদের পুকুর’। সময়ের ব্যবধানে মানুষের মুখে মুখে সেই ‘গৌরদের পুকুর’ শব্দটি পরিবর্তিত হয়ে ‘গুড়পুকুর’ হয়েছে।
পুকুরসংলগ্ন এলাকার প্রবীণ নিতাই কর্মকারও সোবহান খান চৌধুরীর এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত। এই ব্যাখ্যাটি স্থানীয় ইতিহাসের আরেকটি সম্ভাব্য সূত্র সামনে আনে। অর্থাৎ ‘গুড়পুকুর’ নামটির সঙ্গে সরাসরি গুড়ের সম্পর্ক না-ও থাকতে পারে। উচ্চারণের পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই নামটি বর্তমান রূপ পেয়েছে—এমন ধারণাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
একসময় গ্রামের মানুষের কাছে মেলা মানেই ছিল নতুন জামাকাপড়, মাটির খেলনা, বাঁশের তৈরি সামগ্রী, মিষ্টি, নাগরদোলা আর নানা ধরনের লোকজ বিনোদন। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসত। পরিচিতজনের সঙ্গে দেখা হতো, আত্মীয়তার সম্পর্ক দৃঢ় হতো। ব্যবসায়ীরাও পেতেন পণ্য বিক্রির বড় সুযোগ।
গুড়পুকুরের মেলাও এ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হয়ে উঠেছে। সময়ের সঙ্গে মেলার পরিধি বদলেছে, বদলেছে মানুষের বিনোদনের ধরন। তবু মেলার নামের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সেই পুরোনো পুকুর এবং তার নানা গল্প এখনো মানুষের কৌতূহল জাগায়।
আজকের প্রজন্ম হয়তো জানে না, পুকুরটির নাম কেন গুড়পুকুর। জানে না, বটগাছের নিচে পথিক ও পদ্মগোখরোর সেই গল্পের সত্যতা কোথায়। কিন্তু লোককথাটি টিকে আছে মানুষের স্মৃতিতে।
গুড়পুকুর মেলা তাই শুধু কেনাবেচা কিংবা বিনোদনের আয়োজন নয়। এটি সাতক্ষীরার মানুষের স্মৃতি, বিশ্বাস, লোককথা ও সামাজিক জীবনের দীর্ঘ পথচলার একটি জীবন্ত নিদর্শন। আর পলাশপোলের সেই পুরোনো পুকুর আজও যেন নীরবে বলে যায়—একটি মেলার ইতিহাস কখনো শুধু মেলার ইতিহাস নয়; তার ভেতরে লুকিয়ে থাকে একটি জনপদের গল্প।
প্রবীণ ইতিহাসসচেতন ব্যক্তি আবদুস সোবহান খান চৌধুরীর (৮০) বর্ণনায়, সেই বটগাছ ও পুকুরকে কেন্দ্র করেই একসময় মনসা পূজার প্রচলন শুরু হয়। পূজাকে ঘিরে মানুষের সমাগম বাড়তে থাকে। পরে সেখানে বিভিন্ন পণ্য নিয়ে ব্যবসায়ীরা আসতে শুরু করেন।
আবার স্থানীয় আরেক জনশ্রুতি বলছে, একসময় পুকুরে পানি থাকত না। স্বপ্নে নির্দেশ দেওয়া হয়, পুকুরে একশ ভাঁড় গুড় ঢালতে হবে। নির্দেশ অনুযায়ী গুড় ঢালার পর পুকুরে পানি আসে। এরপর আর পুকুরটি শুকায়নি। সেই থেকেই নাম গুড়পুকুর।
আরেকটি মত অনুযায়ী, পুকুরের তলদেশ থেকে একসময় মিষ্টি পানি উঠত। তাই স্থানীয় মানুষ পুকুরটির নাম দেয় গুড়পুকুর।
খেজুরগাছ ঘিরেও রয়েছে একটি গল্প। বলা হয়, পুকুরের জায়গায় একসময় প্রচুর খেজুরগাছ ছিল। সেসব গাছ থেকে পাওয়া রস দিয়ে গুড় তৈরি করে বিক্রি করা হয়। সেই গুড় বিক্রির অর্থ দিয়ে পুকুরটি খনন করা হয়েছিল। এরপর থেকেই নাম হয় গুড়পুকুর।
ক্রাইম বার্তা