খাদ্যের দাম ২০ শতাংশ বাড়লে ৫০ লাখ মানুষ নতুন করে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার শিকার হবে
আবু সাইদ বিশ্বাস: জলবায়ু পরিবর্তন, ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত ও সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্নের কারণে বিশ্বজুড়ে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক সংকট তীব্র হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী প্রায় ২৬ কোটি মানুষ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। বিশেষ করে বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তন, ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং মাটিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধির ফলে দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় এলাকায় সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট অঞ্চলের মানুষ তীব্র নিরাপদ খাদ্য সংকট ও পুষ্টিহীনতার ঝুঁকিতে রয়েছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, উপকূলীয় এলাকায় পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে অপুষ্টির হার অত্যন্ত আশঙ্কাজনক; যার মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি শিশু দীর্ঘস্থায়ী পুষ্টিহীনতা বা খর্বকায়তার। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও নদীভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়ে শুধু সাতক্ষীরা শহরের বস্তিতে আশ্রয় নেওয়া জলবায়ু বাস্তুচ্যুত মানুষের ৭৪ দশমিক ৯ শতাংশ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
আজ ১৬ অক্টোবর, বিশ্ব খাদ্য দিবস। কৃষি মন্ত্রণালয় ও জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) যৌথ উদ্যোগে বিশ্বের অন্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি পালিত হচ্ছে। দিবসটির মূল উদ্দেশ্য ক্ষুধা ও অপুষ্টি দূর করা, নিরাপদ খাদ্যের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা এবং সবার জন্য স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা। নিরাপদ খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু ব্যক্তিগত সুস্থতার বিষয় নয়; এটি একটি দেশের জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও টেকসই উন্নয়নের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাঙ্ককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের সপ্তাহব্যাপী বৈঠকের চতুর্থ দিনে অনুষ্ঠিত ‘বিপর্যয়ের মুখে খাদ্য নিরাপত্তা’ বিষয়ক প্যানেল আলোচনায় বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত এবং এসব সংকটের সামষ্টিক অর্থনীতিতে প্রভাব নিয়ে নিজেদের পর্যবেক্ষণ ও করণীয় তুলে ধরেন আলোচকরা।
উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা শহরের ৩৫টি অনানুষ্ঠানিক বস্তির ৩৫৮টি পরিবারের ওপর খাদ্য নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক-খানি বাংলাদেশ পরিচালিত এক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, জরিপে অংশ নেওয়া পরিবারের ৭৪ দশমিক ৯ শতাংশ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে। ৯৫ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবারে কোনো না কোনো সদস্যকে খাবার কম খেতে হয়েছে বা বেলার খাবার বাদ দিতে হয়েছে। ৫২ দশমিক ২ শতাংশ পরিবারের অন্তত একজন সদস্যকে পুরো এক দিন না খেয়ে থাকতে হয়েছে। খাবার জোগাড় করতে ৫৭ দশমিক ৩ শতাংশ পরিবার উৎপাদনশীল সম্পদ বা প্রয়োজনীয় গৃহস্থালিসামগ্রী বিক্রি করেছে। জরিপে দেখা গেছে, ৯৬ দশমিক ৯ শতাংশ পরিবার আংশিক বা পুরোপুরি লবণাক্ত ও আয়রনযুক্ত অগভীর নলকূপের পানির ওপর নির্ভরশীল। গত এক মাসে জরিপভুক্ত অর্ধেক পরিবারের সদস্যদের পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। সরকারি জমিতে অনানুষ্ঠানিকভাবে বসবাসকারী পরিবারগুলোর ৫৯ শতাংশ উচ্ছেদ বা উচ্ছেদের হুমকির মুখে পড়েছে। গত ১২ মাসে ৭৯ দশমিক ১ শতাংশ পরিবার কোনো সরকারি বা বেসরকারি সহায়তা পায়নি। সহায়তা না পেলে বা প্রয়োজন হলে কোথায় অভিযোগ জানাতে হবে, তা জানে না ৯২ দশমিক ৭ শতাংশ পরিবার। শিক্ষা ও শিশুশ্রমের চিত্রও উদ্বেগজনক। ৬ থেকে ১৮ বছর বয়সীদের ৩৩ দশমিক ২ শতাংশ বিদ্যালয়ে নথিভুক্ত নয়। এদের ৩০ শতাংশ শিশুশ্রমে নিয়োজিত।
জাতিসংঘের পশ্চিম এশিয়ার অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশনের (ইএসসিডব্লিউএ) নির্বাহী সচিব রোলা দাশতি বলেন, সংস্থাটির ২২টি সদস্যরাষ্ট্রের মধ্যে ৯টি সরাসরি সংঘাত বা সংঘাত-পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবেলা করছে। তার মতে, খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে শুধু খাদ্যের প্রাপ্যতা নয়, মানুষের খাদ্য কেনার সক্ষমতাও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, একটি পুষ্টিকর খাবারের মূল্য প্রায় ৩৫ শতাংশ বেড়েছে। রোলা দাশতি সতর্ক করে বলেন, খাদ্যের দাম ২০ শতাংশ বাড়লে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ নতুন করে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার শিকার হতে পারে।
ক্রাইম বার্তা