লবণাক্ত উপকূলে আর্সেনিক ও সিসার ঝুঁকিতে জনস্বাস্থ্য সাতক্ষীরায় ৯২ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষ অনিরাপদ পানি পান করছে

আবু সাইদ বিশ্বাস, সাতক্ষীরা: সাতক্ষীরাসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে পানিতে আর্সেনিক ও সিসার ঝুঁকি বাঁড়ছে। জটিল হয়ে উঠছে নিরাপদ খাবার পানির উৎস। জলবায়ু পরিবর্তন, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে লবণাক্ত পানি প্রবেশের কারণে মিঠাপানির অনেক উৎস ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও বিকল্প নিরাপদ পানির ব্যবস্থা থাকলেও তা সারা বছরের চাহিদা মেটাতে পারছে না।
সাতক্ষীরার আশাশুনি, শ্যামনগর, এবং খুলনার কয়রা, দাকোপ ও পাইকগাছা উপজেলার ৩৯টি ইউনিয়ন নিয়ে পরিচালিত একটি গবেষণায় সুপেয় পানির সংকটের আরও উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৬ সালে *ইউটিলিটিজ পলিসি* সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণাটিতে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে ৬৬ হাজার ২৩৪টি পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। পাশাপাশি ৬৬৬টি কমিউনিটি নলকূপ ও ২২৪টি পুকুরের পানির লবণাক্ততা পরীক্ষা করা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, পাঁচ উপজেলায় বছরে গড়ে ৪ দশমিক ৬৫ মাস নির্ভরযোগ্য পানির সরবরাহ বা প্রাপ্যতা থাকে না। পাইকগাছায় এ সময় ৭ দশমিক ১৫ মাস এবং কয়রায় ২ দশমিক ৮৪ মাস। মাত্র ১৬ শতাংশ পরিবারের নিজস্ব খাবার পানির উৎস রয়েছে। প্রায় ৮০ শতাংশ পরিবারে পানি সংগ্রহের দায়িত্ব নারী ও কিশোরীদের ওপর। নিম্নআয়ের পরিবারগুলোকে মাসিক আয়ের সর্বোচ্চ ৪ শতাংশ পর্যন্ত খাওয়ার পানির পেছনে ব্যয় করতে হয়। গবেষণায় পরীক্ষিত নলকূপের পানিতে গড় মোট দ্রবীভূত কঠিন পদার্থের (টিডিএস) পরিমাণ পাওয়া গেছে প্রতি লিটারে ১ হাজার ৭৩৩ মিলিগ্রাম। পুকুরের পানিতে এই পরিমাণ ১ হাজার ৩৩০ মিলিগ্রাম। উভয় ক্ষেত্রেই গড় মাত্রা প্রতি লিটারে ১ হাজার মিলিগ্রামের ওপরে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফ ২০২৫ এর তথ্য মতে, খুলনা বিভাগের ৬৩ দশমিক ২ শতাংশ মানুষের ব্যবহৃত পানির উৎসে ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে। ঘরে পান করার অবস্থায় পানিতে এ জীবাণুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে ৯২ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষের ক্ষেত্রে। এমআইসিএস ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, খুলনা বিভাগের ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষের ব্যবহৃত পানির উৎসে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি আর্সেনিক পাওয়া গেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিত সীমা প্রতি লিটারে ১০ মাইক্রোগ্রাম। বাংলাদেশের প্রচলিত ৫০ মাইক্রোগ্রাম সীমার ওপরে আর্সেনিক পাওয়া গেছে খুলনা বিভাগের ১০ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষের পানির উৎসে। একই জরিপে খুলনা বিভাগের ১০ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষের পানির উৎসে মাঝারি এবং ৩ দশমিক ৮ শতাংশের উৎসে উচ্চমাত্রার লবণাক্ততা শনাক্ত হয়েছে। নিরাপদ পানির উৎস বাড়ির প্রাঙ্গণে থাকা, প্রয়োজনের সময় পানি পাওয়া এবং পানিতে জীবাণু ও আর্সেনিকের গ্রহণযোগ্য মাত্রা নিশ্চিত করার মতো শর্তগুলো একসঙ্গে বিবেচনা করলে খুলনা বিভাগের মাত্র ১৮ দশমিক ২ শতাংশ মানুষ নিরাপদ ব্যবস্থাপনার খাবার পানির আওতায় রয়েছে। বাংলাদেশের প্রচলিত আর্সেনিক মান বিবেচনায় এই হার ২০ দশমিক ১ শতাংশ।
সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর ইউনিয়নের বাসিন্দা আনিছা বেগমের অভিজ্ঞতা উপকূলের বহু পরিবারের বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বাড়ির নলকূপের পানিতে লবণ ও আর্সেনিক থাকায় তা ব্যবহার করা যায় না। প্রতিদিন এক কলস খাবার পানির জন্য দূরের উৎসে যেতে হয়। সেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে পুকুরপাড়ে স্থাপিত ফিল্টার থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয়।
প্রতাপনগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হাজী আবু দাউদের ভাষ্য, ঘূর্ণিঝড় আম্পান ও ইয়াসের সময় বেড়িবাঁধ ভেঙে জোয়ারের পানি প্রবেশ করায় এলাকার সুপেয় পানির উৎসগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এখনো প্রয়োজনের তুলনায় পর্যাপ্ত নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করা যায়নি। অন্যদিকে, গাবুরা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জিএম মাসুদুল আলমের মতে, দ্বীপ ইউনিয়নটিতে বাইরে থেকে পানি সরবরাহ করা কঠিন। নলকূপের পানি লবণাক্ত ও আর্সেনিকযুক্ত হওয়ায় পুকুর খনন, পন্ড ফিল্টারসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা পর্যাপ্ত নয়।
দূষিত পানি ও পানির সংকট উপকূলীয় জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। খুলনার কয়রা ও সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার ৪০ বছর বা তার বেশি বয়সী ১৫ হাজার ৪৭১ জনের ওপর আইসিডিডিআরবি ও ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের যৌথ গবেষণার প্রাথমিক ফলাফলে হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকির একটি চিত্র পাওয়া গেছে। গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের ২১ দশমিক ৬ শতাংশের আগামী ১০ বছরে হৃদ্রোগ বা স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অন্তত ১০ শতাংশ হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়। কয়রায় এ হার ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ এবং আশাশুনিতে ২৩ দশমিক ৬ শতাংশ।
সাতক্ষীরা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ জহিদ পারভেজ জানান, সাতক্ষীরাসহ উপকূলের নিরাপদ পানির সংকট মোকাবিলায় সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে পুকুর খনন, পুকুরপাড়ে বালির ফিল্টার (পিএসএফ), বায়োস্যান্ড ফিল্টার, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণব্যবস্থা এবং জলাধার সংস্কারের মতো কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন এলাকায় এসব ব্যবস্থার অপ্রতুলতা, রক্ষণাবেক্ষণের সমস্যা এবং সারা বছর পানি সংরক্ষণ করতে না পারার কারণে সংকট কাটছে না। এর পরও উপকূলীয় ১০ জেলার ৪৪ উপজেলায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ২ লাখ ৬ হাজার ৮৭২টি ইউনিট স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিশেজ্ঞরা বলছে, সাতক্ষীরার উপকূলে সুপেয় পানির সংকট এখন আর শুধু দৈনন্দিন দুর্ভোগের বিষয় নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, জীবিকা ও বসবাসের ভবিষ্যতের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। গবেষণার তথ্য ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিজ্ঞতা বলছে, বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের পরিবর্তে নিয়মিত পানি পরীক্ষা, কার্যকর রক্ষণাবেক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত পরিকল্পনা ছাড়া এই সংকটের টেকসই সমাধান কঠিন।

আবু সাইদ বিশ্বাস
সাতক্ষীরা
২৭/১০/২৬

About news-admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *